আকাশে রোদ, পরিস্কার নীল আকাশে সাদা পাতলা তুলোর মতো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সাথে বৃষ্টিও হচ্ছে। ছোটোবেলায় এমন সময়ে বলতাম, "রোদ হচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে, খেকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে!" শরীর দুর্বল। হাটতে পারিনা বেশিদূর। হাপিয়ে যাই। বেশিক্ষণ হেলান দেওয়া ছাড়া বসে থাকলেও ক্লান্তি লাগে। বেশ অনেকদিন হসপিটালাইজড ছিলাম ডেঙ্গু জ্বরে, আরও কিছু কারনে। ডাক্তার বলসে ৩ সপ্তাহ মিনিমাম বেডরেস্টে থাকতে। এরপরেও বিকেল-সন্ধ্যার আশ পাশ দিয়ে প্রতিদিন ই বের হই। আমি ঘরে থাকতে পারিনা, দম বন্ধ লাগে। এবারের অসুস্থতায় আমি দুটো ব্যাপারে খুব ই সারপ্রাইজড। এক হচ্ছে, টানা এতোদিন খোলা আকাশের নিচে একবারের জন্যও আমার যেতে মন চায় নাই। দুই নম্বর টা হচ্ছে এক সপ্তাহ র বেশি সময় আমি শক্ত খাবার ছাড়া ছিলাম, বমির কারনে। স্যালাইন এর ওপরেই ছিলাম। হাত ইঞ্জেকশান আর ক্যানোলা এর ফুটো দিয়ে ভরে আছে। অসুস্থতা যতই হোক, না খেয়ে থাকাটা আমার কাছে এক বিদেশি টার্ম, আমি একটু খাদক টাইপের মানুষ। অথচ এখন তেমন কিছু খাইতেও মন চায়না, ওজন কমে গেছে এক ধাক্কায় সাত কেজি। চাইলেও আগের মতো পারিনা। রিকভার করতে সময় লাগবে কিছুটা। এই খেকশিয়ালের বিয়ে উপলক্ষে মন চাইলো একটু একা বের হতে।
দুপুরের বৃষ্টি থামার পরে রামদিয়া বাজার থেকে একটা ভ্যান নিলাম বিকেল ৪ টার দিকে। বহরপুর দিয়ে বালিয়াকান্দি যাবো। কাউকে কল টল দেইনাই। বাজার ক্রস করে পকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে মুখে নিলাম। পরিষ্কার আকাশ, ঠান্ডা বাতাস বইছে। সুন্দর আবহাওয়া। চোখ দুটো বড় করে নিয়ে তাকালাম চারপাশে। এটা করি মাঝে মাঝে। চোখ বড় করে তাকালে দুনিয়ার বস্তুগুলো আরেকটু বেশি চোখে পড়ে। পরিচিত জায়গাও অপরিচিত লাগে সামান্য। অপরিচিত কিছুর প্রতি মানুষের যেমন তীব্র ভয় কাজ করে, তেমন আকর্ষণ ও কাজ করে। এজন্যেই অপরিচিত জায়গায় ঘুরতে যেতে মানুষ ভালোবাসে। কাঠাল গাছের নতুন গজানো পাতা আর কুশি চোখে পড়লো। ছোটো বেলায় গাছের মুকুল, গাছের নতুন পাতা, এসবের ওপর প্রবল আকর্ষণ কাজ করতো। চোখ একদম কাছে নিয়ে দেখতাম।
এক পিচ্চি উঠলো একটু সামনে যেতেই। গায়ে সরকারি কলেজের ড্রেস। রা.স.ক এর ইউনিফর্ম এ বেশ কিছু চেইঞ্জ আনসে। ব্যাজ গুলোও চেইঞ্জ করসে দেখলাম। আমরা থাকাকালে এতো ভ্যারাইটি ছিলনা। তবে শনিবারে এই পিচ্চি কলেজড্রেস পরিহিত অবস্থায় কেন আল্লাহ মালুম। কাছে দেখি ব্যাগ-বোকচা। সম্ভবত শুক্র-শনির ছুটিতে বাড়িতে আসছিলো। কলেজের দিনগুলো কি মজার ছিল, শান্তিপূর্ণ ছিল! বৃহঃস্পতিবারে বাড়িতে চলে আসতাম। মনে হলো বালিয়াকান্দি না গিয়ে নদীর পারে যাই। এমন কতো বিকেল পার করসি পদ্মার পাড়ে কলেজে থাকতে তার হিসেব নাই। মন চাইলেই চলে যেতাম হাটতে হাটতে। করোনার ভেতরে হোস্টেল থেকে মেসে শিফট হলাম যখন, সেই বিকেলগুলোতে আরো বেশি যাওয়া হতো।
বহরপুর নেমে বাস নিলাম। কাছে বাইক টাইক নাই। আব্বুর টা বাসায় নাই। আর নরমালি বাড়িতে থাকলে অর্ঘ্য, আলামিন, ওদের কারো বাইকেই ঘুরাঘুরি করা হয়। ওরা কেউ ই এলাকায় নাই। মুরগী ফার্ম নেমে রিকশা নিলাম। গোদারবাজারের ভাড়া নাকি ৫০ টাকা! এখন বুঝি বুড়ো মানুষেরা কেন ভাড়া নিয়ে খ্যাচখ্যাচ করে। তর্কাতর্কি করিনাই খুব একটা। উঠে পড়লাম আমার শাহ সিমেন্ট এর ছাতা তে ভর দিয়ে। পিকুলিয়ার ছাতা; কালোগুলো দাদা-নানা দের ব্যবহার করতে দেখসি ছেলেবেলায়। আগে লজ্জা লাগতো এগুলো ব্যবহার করতে। স্কুলে ছিলাম। আব্বু এই ছাতা নিতে বললেই ঝগড়া লাগায়ে নিতাম। এখন এগুলো বেশ লাগে। কাজের জিনিস!
রিকশা ছাড়তেই পুলিশ লাইনের মোড় এর সামনে এক ভ্যানওয়ালা হুট করে রিকশার সামনে ঢুকে গেল। একটুর জন্য আমার রিকশায় লাগেনাই। রিকশাওয়ালার বয়স বেশি না, আমার থেকে ছোটোই হবে। ভ্যানওয়ালার বয়স মিড-থার্টিস এর লাগলো। দাঁত লাল-কালো-সাদার সংমিশ্রণ, পড়নে লুঙ্গি, শরীর হ্যাংলা পাতলা, গায়ে একটা বেগুনী রঙ এর স্ট্রাইপ করা টি শার্ট।
-এইডে কুনু ধরন হইলো গাড়ি চালানের? হুট করে গাড়ি ঢুকোয় এমনে কেউ?
-তো তুই দেকপিন্যা যে আশে পাশে গাড়ি আছে নাহি? বেরেক কি হুদ্দাই রাকছিস রিকশায়?
-বুকাচুদা নাকি? ভ্যান চালাতি না পারলি চালাতি আসো ক্যা?
গালি শুনে মনে হলো ভ্যানওয়ালা মাথায় আগুন উঠে গেছে।
আমাদের রিকশায় ভ্যান দিয়ে চাপ দিয়ে ওই মোড় এই গাড়ি সাইড করালো। আমি রিকশাতে বসা। নানান রঙের দাঁতের ভ্যানওয়ালা ভাই এসে দুরুম করে এক চড় কষে দিল রিকশার ছেলেটাকে। রিকশায় ছেলেটাও দেখলাম বুম বুম করে কিল ঘুষি মারতে থাকলো। দোষ টা ভ্যানওয়ালার। একবার মনে হলো ভ্যানওয়ালার কলার ধরে উচু করে আছাড় দেই একটা। মনে পড়লো আমার শরীর এ মাংস আর শক্তি বাদে বাকি সব ই আছে এই অবস্থায়। আমি কিছু বলার মতোও শক্তি পেলাম না। তবে রিকশা চালকের কিল ঘুষি দেখে ভালোই লাগছিলো। ওদের মারামারিরত অবস্থাতেই নিচে নেমে পকেট থেকে একটা একটা বিস্কুট বের করে মুখে নিলাম। আমি ছাতা তে ভর দিয়ে দাড়ায়ে মারামারি দেখছি। দুই-আড়াই মিনিট এর গেঞ্জামে আমার রিকশাওয়ালা বেশ অনেকগুলো মাইর খেয়ে গেল। স্টার্টিং ভালো হলেও ভ্যানওয়ালার গায়ে জোর বেশি। ক্ষিপ্রতা দুজনের ই বেশি। আমার বিস্কুট অর্ধেক শেষ। এমন অবস্থায় মানুষজন জড়ো হয়ে গেল। দুটো পুলিশ ও চলে এলো জ্যাম বাধিয়ে ফেলার কারনে। পুলিশ লাইন হিসেবে পুলিশের সংখ্যা কম। প্রথম পুলিশ আমাকে বললো, "কি মিয়া ওনাদের আটকাইতে পারেন নাই? টানতেসেন দাড়াইয়া দাড়াইয়া!"
বললাম, "না। পারিনাই। মন চায়নাই।" দ্বিতীয় পুলিশ মনে হলো একটু থতমত খেয়ে গেছে। এধরনের রিপ্লাই এ তারা অভ্যস্ত না সম্ভবত। বাঙালীরা ইউনিফর্ম এর লোকেদের দেখলেই চাটতে শুরু করে। এই অভ্যাস আম-জনতার ও, ইউনিফর্মের লোকেদের ও। ভিন্ন উত্তর পাওয়ায় চেহারা দেখে মনে হলো একটু চটে গেছে। কিছু না বলে দেখলাম মারামারি ছাড়িয়ে ছেড়ে দিল। আমাকেও আর কিছু বললোনা।
রিকশায় উঠলাম ওটাইতে। একেবারে গোদারবাজার গিয়ে নামলাম। ছেলেটাকে এর মাঝে দুই-একবার চোখ মুছতে দেখা গেল। এই ধরনের মারামারির সাথে ছেলেটা মনে হয় এখনো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নি। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবন বেশ লম্বা; ওর টা যে কেবল শুরু, সেটা বুঝে উঠতে বেশি সময় নিলে চলবে না।
ইটের ভাটার এরিয়াতে দেখলাম অনেক দোকান দিসে। তবে লোক নাই তেমন। অল্প কিছু মানুষ। আজকের আকাশ আসলেই সুন্দর, এতো বিস্তৃত যে মনে হচ্ছে তিনভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় ছবি তুলতে পারলে ভালো হতো। চোখে যা দেখছি, এঁকে ফেলতে পারতাম। কলেজে থাকতে এখানে কতো আসছি আর তার হিসেব নাই। নদী পার হলেই পাবনা জেলা। ঠিক সোজাসুজি তাকালে দূর আকাশে মেঘ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, কালচে রঙ দেখতে। বাম পাশের আকাশ টা গাঢ় কমলা রঙ এর আর ডান পাশে ঘন নীল। নদীর পার দিয়ে দুই তিনটা নোউকা ভিড়ানো। নদীর ভেতর দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নোউকা ঘটঘট শব্দ করতে করতে বয়ে যাচ্ছে। আজ বিকেলের বাতাস কেমন যেন স্নিগ্ধ! এমনিতেও নদীর বাতাসে অদ্ভুত এক শুদ্ধতা আছে। ঢাকা শহরের বাতাস বেশ ভারী। এখানে শ্বাস নিয়ে আরাম। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেলাম ৩-৪ দিন হতে চললো। শরীর টা খুব নিস্তেজ লাগে। আগের মতো বল পাইনা। বেশি সময় হেলান দেওয়া ছাড়া বসে থাকলেও ক্লান্ত লাগে।
নদী, সমুদ্র, ঝিড়ি, বা এমন যেকোনো জায়গার পানি যা বহমান অথবা যার তল দেখা যায়না, এমন পানি দেখলে আলাদা এক শান্তি কাজ করে। মনে হয়ে মনের ময়লা ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
-আর দুই তিনজন হলি ছাইড়ে দিব। খালি পুঞ্চাশ, খালি পুঞ্চাশ!
মাঝির এই কথা শুনে নোউকায় চড়ে বসলাম। নৌকার অপর পাশে এক বাবা তার দুই মেয়ে আর পিচ্চি এক ছেলে কে নিয়ে নৌকায় উঠসে। নৌকা ছাড়তেই ইঞ্জিনের ঘটঘট শব্দ টা শুরু হলো, বিরক্তিকর শব্দ। তবে ঠান্ডা বাতাস এর তীব্রতা বাড়ার সাথেই মনে হলো শব্দটাও মেনে নেওয়া যায়। কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হয়। নদীর কিছুটা ভেতর দিয়ে আমাদের নৌকা চলছে বাম দিকে। নৌকার ওপারের ভদ্রলোক দেখলাম বেছানো শীতলপাটির ওপরে টান হয়ে শুয়ে আছে হাত দুটো মাথার নিচে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে। ওনার মেয়ে দুটো ছবি তুলে দিচ্ছে একে অপরের আর পিচ্চিটা খরগোশের মতো পশ্চারে পানি ধরার চেষ্টা করছে। নদীর ধার দিয়ে চরের বাড়ি গুলো চোখে পড়লো। এক পশলা বন এর মতো জায়গা, কিছু বড় বড় মেহগণি গাছের নিচে টিনের ঘর। চোখের সামনে যতদূর যায় আকাশ লালচে কমলা রঙ ধারণ করে আছে। চোখ দুটো বন্ধ করলাম, নৌকার দোলানি তে ছোটোবেলার কথা মনে পড়লো। বিষয়টা কি স্বাভাবিক কি না কে জানে, আমার অনেক ছোটোবেলার অনেক কথা মনে আছে। এবার মনে পড়লো আম্মা পায়ের ওপর রেখে পা দোলাতে দোলাতে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিত সেই কথা। চোখ খুলতে মন চাইলোনা, মনে হলো একটা ঘোরের ভেতর চলে গেছি। সুখকর সময় হয় স্বপ্নের মতো, স্বপ্ন ভেঙে যায় সে আমরা চাই বা না চাই। মাঝি, নৌকা আবার ঘাটে এনে থামালো। এই অংশ টুকু আরো শান্তির। যখন ইঞ্জিন টা বন্ধ করে আর নৌকা তার গতি কমাতে কমাতে ঘাটে এসে পৌঁছে, তখন নদীর পানি চিরে নৌকা চলার শব্দ বাদে কিছু পাওয়া যায়না। পানির শব্দ বড়ই মন কাড়ে। কিছুক্ষণ পড়ে অন্ধকার নামার কিছুক্ষণ আগে নদীর মাঝের ওই মেঘ মাথার ওপরে চলে এলো। বৃষ্টি শুরু হলো। যে দু’চারজন লোক ছিল, সবাই নদীর পাড়ের বেঞ্চগুলো ছেড়ে দিয়ে মাথার ওপর ঠাই খুজতে শুরু করলো। একটা ছাগল দেখলাম বেঞ্চের নিচে এসে আশ্রয় নিল। এক নেড়ি কুকুর যার পা ভাঙা, সেও দেখলাম উঠে আস্তে আস্তে দোকান গুলোর দিকে যেতে শুরু করলো, তার সঙ্গী রা ততক্ষণে চলে গেছে যদিও। নেড়ি কুকুরটার জন্য মায়া লাগলো। ঝড় আসলে সবাই ই আশ্রয় খোঁজে, কেউ কেউ পিছে পড়ে যায়, সেটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর স্বাভাবিক জিনিসগুলোর প্রতিই আমাদের যত আক্রোশ! লাভ হয়না, দিন শেষে আমরা মেনে নেই সব কিছুই। গুড়ো বৃষ্টি পড়ছে, আমি ছাতা টা খুলে ওই ছাগলের সাথে গিয়ে হেলাম দিয়ে বসলাম। বেঞ্চের নিচে এক ছাগল, ওপরে আরেকজন। মুখে একটা বিস্কুট নিয়ে নদীর দিকে মুখ করে, জীবনের হিসেব করতে লাগলাম। হিসেব মিললো না। সকল হিসেব মিলে, জীবনের হিসেব কারোর ই মিলে না। মাঝে মাঝে বৃষ্টি সমেত বাতাসের ঝাপটা এসে লাগলো। সময় কেটে গেল দেড় ঘণ্টা, অন্ধকার হয়ে গেল, কিন্তু আমি কোথায় যেন পরে রইলাম। কারন সময় সব কিছুকেই ছুয়ে দেয়। তবে ঘোরের মধ্যে থাকা মানুষের চিন্তাকে ছোয়ার সাধ্য সময়ের নেই।