“সৎ গুণই জ্ঞান”- গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের এই উক্তিটি দ্বারা মানবজাতির মানসিক বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে জ্ঞানের গুরুত ও তাৎপর্য প্রকাশ পেয়েছে। সূর্যের আলো ছাড়া পৃথিবী যেমন অন্ধকারময়, ঠিক তেমনি জ্ঞানের আলো ছাড়া কোন জাতি তার জীবনীশক্তিকে হ্রাসকরে হয়ে উঠে অন্ধকারময়। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সমগ্র জগতে মানবজাতির জীবন চলার পথের পাথেয় হলো জ্ঞান। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই ধরণীতে বহুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটলেও, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠিদের মধ্য থেকে জ্ঞানসাধনায় অল্পসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। মূলত সকল যুগেই জ্ঞানচর্চায় সীমিত হলেও ঐ অল্পসংখ্যক জ্ঞানসাধকদের দ্বারাই এ পৃথিবীর কার্যকর পরিবর্তন সাধিত হয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, জগতে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলেও দেখা যায়, একমাত্র জ্ঞানই একধর্মী এবং এক ধর্মা গুন যেখানে সকল ধর্মই তার অনুসারী। জ্ঞান হলো মানব দেহের মায়োজেনিক হার্টের মতো, যে হৃৎস্পন্দনের উপর ভিত্তি করে মানুষের দেহ বা আত্না বেচে থাকে ঠিক তেমনি জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে মানুষের ধর্ম বেচে থাকে। কাজেই এই জ্ঞান যারা অর্জন করেছেন কেবল ঐ সকল বিদ্বজ্জনরাই এর মর্ম উপলব্দি করতে পারেন। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সাধনার পর এই জ্ঞানতপস্বীরা তাদের অর্জিত জ্ঞানকে উৎসর্গ করে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে। যাতে তারা ভুলপথে ধাবিত না হয়ে, সঠিক পথের পথিক হয়ে, সমগ্র পৃথিবী ও তার মানবগোষ্ঠিকে অনেক দূর পথ এগিয়ে নিতে যেতে পারেন।
জ্ঞানচর্চার মধ্যদিয়ে মানুষের মনে নতুন চেতনার আবির্ভাব ঘটে। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রচলিত বিভিন্ন বিশ্বাস, সংস্কার ও বিধান সম্পর্কে তাদের মনে সংশয় ও প্রশ্নজাগে। তার সাথে নবোৎসাহে ক্রমে ক্রমে মানুষের মধ্যে উন্মোচন হয় নতুন নতুন পথের সন্ধান যার ফলশ্রুতিতে অদ্যাবধি আমাদের ব্যস্ত পৃথিবীতে এই জ্ঞানকে ঘেরে যোগসাধন হয়ে চলেছে নব নব প্রাণের উত্থান।
বস্তুত এই জ্ঞানের প্রকৃত উৎসস্থল হলো মানুষের মন। “যে জাতি মনে বড় নয়, সে জাতি জ্ঞানে বড় নয়” প্রমথ চৌধুরীর এই কথা গুলিতে জ্ঞানের সাথে মানুষের মনের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সে সত্যতা প্রকাশ পেয়েছে। মূলত পার্থিব জগতে মানুষের মনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোর বোধোদই হলো জ্ঞান। যা মানুষ তার স্বীয় বিচারশক্তি ও যুক্তিরদ্বারা প্রকাশ করে থাকে। এই উভয়দিকে লক্ষ রেখে যারা নিজেদেরকে পরিচালন করেন তারাই জ্ঞানী। জ্ঞান দুই প্রকার শুদ্ধজ্ঞান ও অশুদ্ধজ্ঞান। শুদ্ধজ্ঞান হলো ব্যক্তির মানবসত্তা আর অশুদ্ধজ্ঞান হলো ব্যক্তির জীবসত্তা। বাস্তবিকঅর্থে উভয় প্রকার জ্ঞানদিয়ে বস্তুুজগতের সঙ্গে মানুষের জানাশোনা চলে। যার ফলস্বরূপ জগতে কেউ প্রশংসিত আবার কেউ নিন্দিত। শুদ্ধজ্ঞান মানুষের মনে সৎচিন্তাকে জাগ্রত করে দিয়ে নিজ আত্মার ক্ষুন্নিবারণ করে, যা দেশ ও মানবজাতির কল্যাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। পক্ষান্তরে অশুদ্ধজ্ঞান মানুষের মনকে অসৎচিন্তায় অনুপ্রাণিত করে স্বীয়আত্মাবমাননার মধ্য দিয়ে শুদ্ধজ্ঞানকে বিপ্রকৃষ্ট করে তুলে।
সুতরাং বলা যায় পুস্তক পাঠ করে, প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নিয়ে অথবা মেধাতালিকায় অবস্থান করেই কেবল জ্ঞানার্জন করা সম্ভব নয়। যদিনা সে জ্ঞান শুদ্ধজ্ঞান হয়। যে জ্ঞান মানুষের নৈতিক উৎকর্ষের সহায়ক শুধু তাই গ্রহনযোগ্য আর যে জ্ঞান মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের সহায়ক অবশ্যই তা বর্জনীয়। বাহ্যদৃষ্টিতে প্রয়াশ দেখা যায়, জগতে অনেক মানুষ আছে যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাসহ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে এই শুদ্ধজ্ঞানের চর্চা করলেও তারা পার্থিবজীবনে অর্থ, ক্ষমতা, প্রভাবপতিপত্তি, উচ্চভিলাষী মনোভাব ও স্বল্প সময়ে অধিক সম্পদের মালিক হওয়ার প্রত্যাশা ইত্যাদি কারণে মনে প্রলুব্ধ হওয়ায় শুদ্ধজ্ঞানকে উপেক্ষা করে অশুদ্ধজ্ঞানকে সাদরে গ্রহন করে নেয়। ফলে ঐ চর্চিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের ক্রিয়াকলাপের মধ্যদিয়ে অর্জন করতে না পারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক সন্নিবদ্ধ করা চর্চিত জ্ঞানগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়।
সেই সাথে ব্যক্তি তার নিজ নামিয় শিক্ষার সনদপত্রের দ্বারা একজন শিক্ষিত মানুষের পরিচয় বহন করলেও সমাজ বা রাষ্ট্রের কল্যাণে তাদের দ্বারা ইতিবাচক কোন প্রভাব বিস্তার করেনা। বরং প্রকৃত শুদ্ধজ্ঞান থেকে বিচ্যুত হওয়ায় ঐ সকল জ্ঞানপাপীরা তাদের স্ব-স্ব শিক্ষাসনদের জোড়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে দেশ ও জাতির জীবনে ডেকে আনে চরম দূর্ভোগ।
অতীত গ্রিকসভ্যতা থেকে শুরু করে, এমন কি উনবিংশ শতাব্দির সেই বাংলার নবজাগরণ থেকে অদ্যাপি, বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিকসহ অনেক জ্ঞানশীল অভিজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাদের শুদ্ধজ্ঞানের কথন গুলো দেশ ও জাতির কল্যাণে স্বরচিত গ্রন্থগুলোতে সুনিপুণভাবে তুলে ধরলেও এমনকি সরকারিভাবে দেশের শিক্ষাকমিশন কর্তৃক নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে নৈতিক শিক্ষা , মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞান,অন্তরের মুক্তি, ব্যাক্তিকে মনুষ্যত্ববোধে উন্নীত হওয়ার শিক্ষা এবং সমাজ সংস্কারসহ সেই শুদ্ধজ্ঞানের বিভিন্ন ইতিবাচক দিকগুলো লিপিবদ্ধ করা হলেও ঐ অশুদ্ধজ্ঞানের মোহে পঠিত শুদ্ধজ্ঞানগুলো চাপা পড়ে থাকে শত শত পুস্তকের পাতায়। যে কারণে দেশের বিদ্যাপীঠ গুলোর নির্মাণকলায় চমৎকার স্থাপত্য নিদর্শনসহ বিভিন্ন সময় শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন ইত্যাদি বিধিব্যবস্থা নির্ধারণ করেও শিক্ষার কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছেনা। ফলে প্রকৃত শিক্ষার সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উভয় ক্ষেত্রে দুর্নীতি ব্যাপক ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। যে কারণে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং নিশ্চল ও বিমর্দিত হয়ে নাশ হতে থাকে দেশের সার্বিক সক্ষমতা অর্জন।
যেহেতু জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানার্জন উভয়ই এক নয়। চর্চা হলো অনুশীলন বা অভ্যাস আর অর্জন হলো চেষ্টার দ্বারা প্রাপ্তি লাভ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো জ্ঞানচর্চার একটি মাধ্যম মাত্র। সেই চর্চিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে কর্মকান্ডের সাথে প্রয়োগ করে আনীত সঠিক ফলাফলই হলো জ্ঞানার্জন। কাজেই অশুদ্ধজ্ঞানের নেতিবাচকতা পরিহারপূর্বক পুস্তকপাঠের সাথে জীবনপাঠের দীক্ষায়, শুদ্ধজ্ঞানের চর্চা করেই কেবল শিক্ষার প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। সর্বোপরি, জ্ঞানের সাথে মানুষের মনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবীড়। বলা যায় জ্ঞানই মনের ধারক আবার জ্ঞানই মনের বাহক। একমাত্র সুন্দর ও সুশৃঙ্খল মন থেকেই সৃষ্টি হয় শুদ্ধজ্ঞান। যাকে সংশ্রয় করে গড়ে উঠে সমৃদ্ধ ও সভ্য জাতি।
অতএব জ্ঞানের মাহাত্ম্যে বলা যায়, জ্ঞান হলো মানবজাতির জীবনোপায়। যার বলে বলীয়ান হয়ে উঠে মানুষের মন ও প্রাণের শক্তি। যাকে উপাশ্রয় করে মানুষ তার চিত্তোন্নতি লাভের মধ্যদিয়ে এ পৃথিবীতে ক্রমাগত উদ্ভাবন করে যাচ্ছে নতুন নতুন সৃষ্টি এবং যাকে মনোরাজ্যে লালন করে মনুষ্যজাতি জীবনযুদ্ধে খুজেপায় তাদের মুক্তি। তাই অবশেষে জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে জ্ঞান চক্ষু দিয়ে অবলোকন করলে মানতেই হবে জ্ঞান সাধকদের সকল উক্তি।