"আমি শপথ করিতেছি যে, মানুষের সেবায় সর্বদায় নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। দেশের প্রতি অনুগত থাকিব। দেশের একতা ও সংহতি বজায় রাখিবার জন্য সর্বদা সচেষ্ঠ থাকিব। অন্যায় ও দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দিব না। হে প্রভু, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন বাংলাদেশের সেবা করিতে পারি এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়িয়া তুলিতে পারি"
আমিন।
ছুম্মা আমিন। বা! কি সুন্দর শপথ। এই শপথ যেন আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণেরটানে প্রতিটি আত্মার এক পবিত্র শপথ। আমাদের এই শপথ যেন দেশ গড়বার শপথ, জাতীকে প্রজ্বলিত করবার শপথ। আমাদের এই শপথ যেন পাপমুক্ত হবার শপথ, আমাদের এই শপথ যেন সমগ্র ধরিত্রীর বোধনের আলোকচ্ছটা, যে আলোয় আলোকিত হবে সমগ্র বসুধা।
শপথ স্বদেশ প্রেমের পরিচায়ক। শপথের মধ্য দিয়েই দেশ ভক্তি ও দেশ প্রেমের নিদর্শন প্রকাশ পায়। শপথ অর্থ প্রতিজ্ঞা, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি, কাউকে কোন কথা দেওয়া বা কোন কাজ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। আর এই প্রতিজ্ঞাত শপথের উৎপত্তি হয়েছে সমাজে বসবাসরত মানুষের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে, যা দেশ ও দেশের মানুষেরা তাদের গতানুশোচন হয়ে সার্বিক কল্যাণের জন্য বেছে নিয়েছে।
আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে মানব শিশুরা তাদের স্ব-স্ব পরিবারে ভূমিষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে সমাজে বেড়ে উঠার পর প্রথমত, বিদ্যালয়ে গমনের মধ্য দিয়ে এই শপথ গ্রহণ করতে শিখে। অতঃপর সেই বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষাজীবন অতিক্রম করে, মানুষের দায়িত্ব ও দেশের দায়িত্ব কাধে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্তরে কর্মময় জীবনে নিজেকে নিয়োজিত করে। শুধু তাইনয়, সেই সাথে কর্মময় জীবনের প্রারম্ভে তারা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পবিত্র শপথ পাঠ করে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কর্মময় জীবনের এক নব অধ্যায়ের সূচনা করে। নবজীবনের সূচনালগ্নে সজোরে পাঠকরা তাদের এই শপথের ধ্বনিতে দেশ যেন সমুদ্যত, সফলতার সম্ভাবনায় আকাশ বাতাস যেন মুখরিত। মহোৎসবের সমারোহে শপথের এই শিহরণে, দেশকে যেন হাতছানি দেয় মঙ্গলবার্তা।
বস্তুত, সদৃশ চলমান শপথের আদলে অঙ্গীকারের এই ধারা অব্যহত থাকলেও, আমাদের দেশে কতক শ্রেণীর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারী মানুষ আছে যারা, বিদ্যালয় থেকে তাদের কর্মময় জীবনের শুরুপর্যন্ত মুখেআনা এই শপথ সমুচ্চারণ করলেও, প্রকৃত সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে অবদমন করে লোভ লালসার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। হীনমনতার কারণে এই উৎপথগামীরা নিজ স্বার্থস্বার্থান্ধে, দেশের মায়া ত্যাগ করে দীর্ঘদিনের পাঠ করা এই শপথকে বিলোপ করে দেয়। শুধু তাই নয় সেই শপথের ধারাকে উপেক্ষা করে তারা দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করাতো দূরের কথা, দেশকে একটি শক্তিশালী ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়ায়। ফলে দেশে ও জাতীর জীবনে নেমে আসে দূর্ভোগের করাল ছায়া।
কিন্তু হায়! স্বীয় মনুষ্যত্বের চরম অবমাননাকারী সেই মুখোশখোলা ধর্মধ্বজীদের ন্যায়, কোথায় পালালো তোমাদের মুখমারা সেই শপথ? দীর্ঘ জীবনের সেই দেশ ভক্তি, দেশ প্রেম ও দেশ গড়ার শপথ তোমরা মুখে মানলেও মনে মানোনি। সমাজ জীবনের মিথস্ক্রিয়ায় সামাজিকীকরণের প্রকৃত দিকটি তোমাদের নিষ্প্রভ মনে রেখাপাত করেনি। সমাজের সামাজিক পরিবেশে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠলেও প্রকৃত সামাজিকীকরণের শিক্ষাকে উপড়ে ফেলায় সামাজিক ক্ষেত্রে নিজেদের স্বীয় পরিপূর্ণতা অর্জন এবং সমাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে পরিণত হতে ব্যর্থ করেছে। ফলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে নিয়োজিত করেও ব্যক্তিত্বরহিত। তাইতো দেশের এত অবনতি। মুখের শপথ ও মনের শপথ এক হওয়া চাই। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারীরা একদিকে যেমন দেশ ও জাতির শত্রু অন্য দিকে তেমনি ধর্মের শত্রু। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের মধ্যদিয়ে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নকে ব্যাহত করে। দেশ ও জাতীর শক্তিকে বিনষ্ট করে শুধু তাই নয়, এই বিশ্বাসঘাতকদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের ফলে বেহাত হয় মানুষের স্বাধীনতা, অস্তমিত হয় দেশের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা বিনাশকারী ঐ শপথ ভঙ্গকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার নিন্দিত স্বাক্ষ্য, আজও বহন করে ইতিহাসের পাতা।
সর্বোপরি, সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠি ও প্রতিষ্ঠানের আচার আচরণ ও জীবনযাত্রার মানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনই হলো সামাজিক উন্নয়ন। সমাজ থেকে মানুষ নয়, মানুষ থেকেই সমাজের সৃষ্টি। তাই মানুষের মনের ইতিবাচক সংস্কারই হলো সমাজ ও দেশের সংস্কার। যেহেতু সমাজে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ থেকেই গড়ে উঠেছে সামাজিক মূল্যবোধ। তাই প্রকৃত সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে শপথের স্থায়ীত্ব নিশ্চিতকরণ সম্ভব। মানুষ হিসেবে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রকৃত সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জন ব্যতিত দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করার সংকল্প নিতান্তই অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। অতএব সেই সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে আত্মার ভিতরে আত্মস্থ করে কর্তব্যপরায়ণ হয়ে, সমবেত ভাবে দেশকে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অবিরাম প্রয়াসের মধ্যদিয়েই আমাদের শপথ পরিপূর্ণতা অর্জন করবে। চল সকলে মিলে জাগ্রতচিত্তে শপথের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শপথের গুণকীর্তন করে বলে যাই -
শপথেই খুজে পাই সু-পথ,
শপথেই ভুলে যাই সকল কু-পথ।
শপথেই দূর হয় সকল বিমত,
শপথেই সফল হয় দেশের অভিমত।