রাঙামাটির কুতুকছড়ি। এক তরুণী মোবাইলের স্ক্রিনে ঝুঁকে আছেন। স্ক্রিনে পাহাড়ি গয়নার ছবি, আর মনে একটাই প্রশ্ন, "এই ছবি কি কেউ কিনবে?"
সময়টা ২০১৭। দীপ্তি চাকমা তখন স্নাতকের ছাত্রী। পকেটে পুঁজি নেই, আছে শুধু ইচ্ছেটুকু।
পাহাড়ি গয়না নিয়ে ব্যবসার স্বপ্ন তাঁর অনেক দিনের। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না, ব্যবসা শুরু করতে লাগে। সেই টাকাটাই ছিল না।
তবু থেমে থাকেননি। ফেসবুকে খুলে ফেললেন একটা পেজ।
তারপর নেমে পড়লেন বাজারে। গয়নার দোকানে ঘুরে ঘুরে পছন্দের নকশার ছবি তুলতেন, সেই ছবি তুলে দিতেন নিজের পেজে। কেউ পছন্দ করলে একটাই শর্ত, আগে দিতে হবে অর্ধেক টাকা।
সেই অগ্রিম টাকা দিয়েই দোকান থেকে গয়না কিনতেন দীপ্তি। তারপর পাঠিয়ে দিতেন ক্রেতার ঠিকানায়। "ওই টাকাটাই ছিল আমার পুঁজি," বলেন তিনি।
কিন্তু টাকার চেয়েও কঠিন ছিল অন্য জিনিস। অচেনা এক ফেসবুক পেজে আগাম টাকা পাঠানোর মতো বিশ্বাস আদায় করা। সেই বিশ্বাস তাঁকে একটু একটু করে অর্জন করতে হয়েছে।
মোড় ঘুরল এক বান্ধবীর বিয়েতে।
বিয়ের সব গয়নার অর্ডার পেলেন দীপ্তি। তাঁর কাছে এটা ছিল বড় এক সুযোগ। কনের গলায়, হাতে, কপালে পাহাড়ি গয়না দেখে মুগ্ধ হলেন আত্মীয়স্বজনরা। একজন, দুজন করে নতুন ক্রেতা আসতে লাগল।
সঙ্গে বাড়ল আত্মবিশ্বাস।
অনলাইনে ব্যবসা দাঁড়াতেই পুঁজিও বাড়তে থাকল। ২০২২ সালে রাঙামাটি শহরে খুললেন প্রথম বিক্রয়কেন্দ্র, 'অর্নামেন্টস অব ধনপুদি'। ক্রেতার চাহিদা আরও বাড়ল। দুই বছর পর, ২০২৪ সালে, দ্বিতীয় বিক্রয়কেন্দ্র খাগড়াছড়ির জামতলায়।
ফেসবুকের সেই ছবিগুলো এখন সাজানো শোরুমের কাচের ভেতর।
আলজরা, আঙুলি, হুজি হার, থেং হার, বাজু, কয়েন মালা, নেকলেস, টিকলি, আংটি, চুড়ি। এ তালিকা পাহাড়ি নারীর সাজের এক জীবন্ত দলিল। গুলো শুধু অলংকার নয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিয়ে, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানে এসব গয়না পরার চল আছে। প্রতিটি গয়নায় মিশে আছে একটি জনগোষ্ঠীর রুচি ও ঐতিহ্য।
"এই গয়নার আলাদা সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য আছে," বলেন দীপ্তি। "আমি চাই, এসব অলংকার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাক।"
অনলাইনের কল্যাণে সেটা সম্ভব হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতার কাছে এখন পৌঁছে যাচ্ছে পাহাড়ের গয়না। আর শোরুমে এসে ক্রেতারা নিজের হাতে তুলে দেখতেও পারছেন।
ব্যবসার পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন দীপ্তি। যদিও ব্যবসার কারণে পড়ালেখায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে, থেমে যাননি।
২০১৩ সালে রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক। ২০১৫ সালে রাঙামাটি সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক। ব্যবসা শুরুর পর ২০২০ সালে আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। ২০২২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর।
"পড়াশোনা শেষ করে আর চাকরির পেছনে ছুটতে হয়নি," বলেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠানই যে নিজের কর্মক্ষেত্র।
আজ দুটি প্রতিষ্ঠান চালান দীপ্তি। খাগড়াছড়ির শোরুমে কাজ করছেন দুজন। তাঁদের একজন সেখানকার সরকারি কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী। একজন তরুণী উদ্যোক্তার হাত ধরে আরেকজন তরুণ-তরুণী কাজ শিখছেন, রোজগার করছেন।
কর্মীদের বেতন-ভাতা আর দোকানভাড়া মিটিয়ে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা থাকে দীপ্তির হাতে।
পাশে আছেন স্বামী প্রমোতোষ চাকমা, ব্যবসা পরিচালনায় সহযোগিতা করেন। আর আছে কুতুকছড়ির সেই বাড়ি, যেখানে বাবা সতীশ চন্দ্র চাকমা ও মা শিখা চাকমার বড় মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠেছেন তিনি।
জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সুস্মিতা খীসা বলেন, দীপ্তি দক্ষতার সঙ্গে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী অলংকার বাজারজাত করছেন। প্রতিটি অলংকারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন তিনি। এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু প্রশংসার ভিড়ে দীপ্তির চোখ আটকে থাকে অন্য এক ছবিতে।
পাহাড়ের অনেক নারী নিজের উদ্যোগে কিছু করতে চান। ইচ্ছে আছে, সাহস আছে। নেই শুধু প্রয়োজনীয় পুঁজি। সেই পুঁজির অভাবে তাঁরা শুরুই করতে পারেন না।
"যদি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে নারী উদ্যোক্তা আরও বাড়ত," বলেন দীপ্তি।
দীপ্তির শুরুটা হয়েছিল ক্রেতার আগাম টাকায়। আরও অনেক নারীর শুরুটা হতে পারত সহজ শর্তের ঋণে। পাহাড়ের কোনো এক ঘরে হয়তো আজও কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে ঝুঁকে আছেন, মনে সেই একই প্রশ্ন, একই স্বপ্ন।