খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বানিয়াখামার বস্তির সরু গলি ধরে হাঁটলে একটি ছোট ঘরের সামনে মাঝেমধ্যে সেলাই মেশিনের টুংটাং শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ যেন কেবল কাপড় জোড়ার শব্দ নয়, বরং একটি নারীর স্বপ্ন জোড়ার গল্পও বলে। সেই নারীর নাম লাভলী খাতুন। বয়স ২৮। দুই বছর আগেও যার প্রতিটি দিন কেটেছে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার ভেতর, আজ তিনি নিজের পরিশ্রম আর সাহসের জোরে দাঁড়িয়েছেন স্বাবলম্বী নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।
এক সময় জীবন যেন তাকে বারবার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছিল। দিনমজুর স্বামী, চার বছরের ছোট্ট সন্তান আর শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে একটি ঘরে ঠাসাঠাসি করে বসবাস ছিল তার নিত্যদিনের বাস্তবতা। স্বামীর অল্প আয়ে সংসার চলত না ঠিকমতো। কখনও কখনও খাবার জোটানোও কঠিন হয়ে পড়ত। এর মধ্যেই একদিন পায়ে ফোড়া ওঠে। ব্যথায় হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে যায়। পরে অস্ত্রোপচার করতে হয়। দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে থাকা বা ভারী কাজ করা সম্ভব ছিল না। ফলে সংসারের টানাপোড়েন আরও বেড়ে যায়।
অনেক রাতেই ঘুম ভেঙে যেত লাভলীর। নিঃশব্দ অন্ধকারে বসে তিনি ভাবতেন—আগামীকাল কীভাবে চলবে সংসার? ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে? সেই সব রাত ছিল অনিশ্চয়তার, ভয়ের আর অজানা দুশ্চিন্তার রাত।
কিন্তু মানুষের জীবনে কখনও কখনও একটি ছোট সুযোগই বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। ২০২৪ সালে লাভলী যুক্ত হন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের টিভিইটি (কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) প্রোগ্রামের সঙ্গে। সেখানে তিনি সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে সাহস করে একটি সমবায় সমিতি থেকে ৩১ হাজার টাকা ঋণ নেন এবং একটি বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন কেনেন। সেই মেশিনটিই হয়ে ওঠে তার নতুন জীবনের সূচনার প্রতীক।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘরের এক কোণে বসেই শুরু করেন সেলাইয়ের কাজ। প্রথম দিকে অর্ডার ছিল কম। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিবেশী ও পরিচিতদের মধ্যে তার কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এখন তার ১২ জন নিয়মিত গ্রাহক আছেন, আর ৪০ জনেরও বেশি মানুষ মাঝেমধ্যে অর্ডার দেন। মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকার বেশি আয় হয় তার। এই আয় দিয়েই এখন সংসার চালান, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দেন এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে চলেছেন।
লাভলী বলেন, “কোনও সঞ্চয় ছিল না। তবু সাহস করে ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন কিনেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল—এই সিদ্ধান্তই হয়তো আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। এখন মনে হয়, সেই সিদ্ধান্তই আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে।”
শুধু নিজের জীবন বদলেই থেমে থাকেননি লাভলী। ঘরের এক কোণে ছোট পরিসরে অন্য নারীদেরও সেলাই শেখান। আশপাশের অনেক নারী তার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শিখছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে নিজেও সেলাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। তাদের চোখেও জ্বলছে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন।
লাভলীর মতো আরও অনেক নারী খুলনা শহরের বস্তি এলাকায় নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন। ওয়ার্ল্ড ভিশনের শহর এরিয়া প্রোগ্রামের আওতায় সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৭৫ জন নারী স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে গেছেন। কেউ পোশাক তৈরি করছেন, কেউ সৌন্দর্য পরিচর্যার কাজ করছেন, আবার কেউ খাদ্য উৎপাদনের ছোট উদ্যোগ শুরু করেছেন।
ওয়ার্ল্ড ভিশন খুলনার এরিয়া প্রোগ্রামের সিনিয়র ম্যানেজার ফুলি সরকার জানান, নারী ও শিশুদের উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু পুষ্টি, শিশুবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম রোধ এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বছর ১০৫ জন নারী, ৪৩ জন প্রতিবন্ধী এবং ৬৪ জন বেকার যুবক কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
আজ লাভলীর ঘরে সেলাই মেশিনের শব্দ মানে শুধু কাপড় সেলাই নয়—তা যেন আশা, সাহস আর আত্মবিশ্বাসের গল্পও বলে। একসময় যে নারী দুশ্চিন্তায় রাত কাটাতেন, আজ তিনি স্বপ্ন দেখেন নিজের ছেলেকে বড় হয়ে ডাক্তার বানানোর। তার বিশ্বাস, শিক্ষা আর পরিশ্রম থাকলে দারিদ্র্য কখনও স্থায়ী হয় না।
ছোট্ট ঘরে বসে সেলাই করতে করতে লাভলী যেন প্রমাণ করে দিচ্ছেন—স্বপ্ন যদি দৃঢ় হয়, তবে সেলাইয়ের সূতাও একদিন জীবনের ছিন্ন অংশগুলো জুড়ে দিতে পারে।