কতো বছর পর? তা প্রায় ত্রিশ বত্রিশ বছর তো হবেই। চেহারা তেমন পাল্টায়নি। আমি মুখের দিকে তাকিয়ে এক লহমায় চিনে ফেললাম। আমাদের ভূবন। সেই ভুবন। আমার ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু। এক ক্লাসে পড়তাম আমরা সেনবাগ থানার সেনবাগ পাইলট হাই স্কুলে।
এত বছর পর দেখে আমি যেই না ওকে ভুবন বলে ডাক দিলাম, সে একটু চমকে গিয়েছিলো বৈকি। সাথে সাথে আমার মুখের দিকে চেয়েছিল কিছুক্ষণ। এরপর আবার যখন বললাম, কিরে ভূবন, চিনতে পারছিস না? বোধহয় আমার গলার আওয়াজ শুনেই চিনে ফেলেছে বা মনে করতে পেরেছে। একটা লুঙ্গী, আর ময়লা শার্ট গায়ে দিয়ে পান খেয়ে লালচে দাঁতগুলো দিয়েই একটা আকর্ণ হাসি দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলল,
-সেলিম, আমাগো সেলিম! কেমন আচিস বন্ধু?
আমাকে কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে কি মনে করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
-কেমন আছেন?
-এই ব্যাটা, আপনে কি রে? তুই আমাকে তুই বলে ডাকবি।
-নাহ, তুইতো সাহেব হই গেছত।
-আরে বাদ দে, কিসের সাহেব? আমরা চোডবেলার স্কুলের বন্ধু। আমগো মইদ্দে আবার আপনে কিল্লাই ক-রি?
- না , ঠিক আচে। কতো বছর অই গেছে গৈ, মাঝে মইদ্দে মনে কইরচি তোরে। মনে কইরছিলাম, আর দেয়া অইতো ন কোনদিন। বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভূবন।
-হূন, আল্লায় চাইলে কি না অয়! আয়, চা খাবিনি? বলেই ওর জবাবের অপেক্ষা না করে ওর হাত ধরে নিয়ে গেলাম পাশের চায়ের দোকানটার দিকে।
চা খেতে খেতে লক্ষ্য করলাম, ভুবন যেন কিছুটা উদাস হয়ে সামনের রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো, একবার জিজ্ঞেস করি, কেমন আছে? কি করছে? তবে ওর পোশাক দেখে মনে হোলোনা যে ভালো কিছুতে আছে। বছর দশেক আগে একবার গ্রামের বাড়ি যাবার পর ওর ছোট ভাই এর সাথে দেখা হয়েছিলো, সে আমায় বলেছিল, আমি যেন ভুবনের জন্য একটা কাজ ঠিক করে দিই। আমি তখন ওর কাছে ভুবনের ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম। ও বলতে পারেনি। শহরের নাগরিক ব্যস্ততায় আমিও এরপর বাড়িতে গেছি কম আর গেলেও ভুবনের ভাই এর সাথে আর দেখা হয়নি।
কি মনে করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,
-এখন কি করছিস, ভুবন?
-তেমন কিছুনা, তুই তো সব জানিস।
আমি ঠিক মনে করতে পারলাম না, কিসের কথা বললো ও। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভূবন মনে হয় বুঝে ফেলেছে যে, আমার কিছুই মনে নাই। সে নিজেই এবার বলা শুরু করলো।
-যুদ্ধের বছর তোরা চলে গেলি ইন্ডিয়া। আমরা তো যাইনো । বাবা ভিডা ছাড়ি যাইতো চায়নো। কিন্তু হেই ভিডাত বাবা মরি গেলো গৈ। যুদ্ধের বছরেই বাবাকে পাকিস্তানিরা মারি ফালাইছে, মারেও মাইরছে। আঁই আর আঁর ছোড ভাই বিকাশ হেইদিন বাড়ি আছিলাম না। হেরলাই বাঁচি গেছি। এপ্রিলে আঁই যুদ্ধে চলি গেছি। খালি মনে কইরছি, মইরতে তো অইবোই একদিন, তাইলে দেশের লাই মরি যাইয়ুম। মরি ন, দোস্ত। বাড়িত আই দেইখছি, জমি জিরাত দখল অই গেছে। খালি ভিডা ছাড়া আর কিচ্ছু নাই।
আমারও মনে পড়ে গেলো, যুদ্ধের বছর আমি কলেজে পড়ি। কাঠমিস্ত্রি হারাণের ছেলে ভূবন টাকার অভাবে ক্লাশ সিক্সের পর আর পড়ালেখা করেনি। কিন্তু ও একাত্তরে যুদ্ধে চলে গিয়েছিলো। আমি যাইনি। ভেতরে ভেতরে একটা মন খারাপের ভাব এসে হাজির হলো আমার ভেতর।
-আরো হুইনবি নি? জিজ্ঞেস করলো ভূবন আমার মুখের দিকে চেয়ে।
আমার মুখে কোন কথা আসছে না। তবুও জিজ্ঞেস করলাম, তোর ছোট ভাই এখন কোথায়?
-হেতে ইন্ডিয়া চলি গেছে। আঁই যাই ন। আঁই কিল্লাই যাইয়ুম? দ্যাশ ইয়ান তো আঁরও। আঁই তো যুদ্ধ কইরছি এই দ্যাশের লাই।
এখন সত্যি সত্যি আমার মুখে আর কোন কথা আসছে না। এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভূবন মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি করছি?
আমি সত্য কথাটা বলতে পারলাম না। যুদ্ধের পরপরই আমি রেশনের ডিলারশিপ নিয়েছি। সেটায় বিস্তর টাকা হয়েছে আমার। আমি কোনওরকমে আমতা আমতা করে বললাম, না, আছি দোস্ত। একটা ছোটখাটো চাকরী করিয়ের।
সম্ভবত আমার কথার দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করেই ভূবন বলল, তাইলে ঠিক আছে। কিছু লোক যুদ্ধের পর পাঞ্জাবীগো দোকান পাট, বাড়িঘর দখল কইরছে, রেশনের , সারের ডিলারশিপ লোই বিস্তর ট্যাঁয়া কামাইছে।
আমি খুব সাবধানে একটা ঢোঁক গিললাম। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে সত্যিই আমি পাঞ্জাবীদের ফেলে যাওয়া দুটো দোকান দখল করেছিলাম। সেগুলো এখন ভাড়া দিয়েছি। এখন অবশ্য আমি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
ভুবন তখনো বলেই চলেছে,
-আঁই বিশ্বাস করি, তুই খারাপ মানুষ ন। তুই আঁই একলগে লেয়াহড়া কইরছি। আমরা খারাপ অইতো হাইরতাম ন।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য নতুন কিছু খুঁজছি। কি মনে করে জিজ্ঞেস করে ফেললাম,
-তুই কি করচ? চলোরই ক্যামনে?
কথাটা শুনে ভূবন এবার একটা দারুণ হাসি দিলো। ওর পান খাওয়া দাঁতের হাসিটা এবার কেন যেন দারুণ ভালো লাগলো আমার। সৎ মানুষের হাসি একটা স্বর্গীয় দৃশ্য।
-দোস্ত, কতো মাইনসের কাছে গেছিলাম, একটা চাকরীর লাই। কেউ দে ন। শেষে অন্ ইয়ানে কাম করি।
-কোথায় কাজ করিস?
-না, দোস্ত। হেইরকম কিছু না। কইলে কষ্ট হাইবি।
কথাটা বলেই ভূবন মাথা কিছুটা নিচু করে ফেলল।
এবার আমি কি মনে করে জিজ্ঞেস ফেললাম আবার।
-কাজে আবার লজ্জা কিসের?
-না বন্ধু, কোন লজ্জা নাই। দ্যাশ স্বাধীনের পর যারা যারা হারাম কামাইছে, তাদেরকে দেখি।
-ক্যামনে? আমি জিজ্ঞেস করি।
-দোস্ত, আমি আজিমপুর কবরস্থানে গোর খাদকের কাম করি। আঁই তো হিন্দুও না, মুসলমানও না। আঁই মানুষ। ইয়ানে আঁই মানুষের লাই কবর খুঁড়ি। অসৎ মাইনসের গায়ে অনেক আলগা চর্বি থাকে। হেইগুলারে কবর দেয়ার সময় আঁর লগে ব্যাকে বিড়বিড় করে দোয়া ফড়ে আর আঁই বিড়বিড় করি হারামখোর কই গালি দেই।
আমি কিছু না বলে থ মেরে ভুবনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শুধু মনে হলো, দশ বছর আগে ভুবনের জন্য একটা চাকুরী খুঁজে দেয়া উচিত ছিলো আমার।
(লেখাটিতে নোয়াখালী জেলার কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে)
নোটঃ গল্পটি আমার লেখা ভুবনের একটা চাকরি দরকার গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া।