তাসমিরার দর্পণ

November 6, 2026

17 views

কুয়াশাচ্ছন্ন এক শীতের রাতে ঘড়ি যখন বারোটার ঘরে কাঁটা ছুঁইছুঁই, তখন তাসমিরা তার কাঠের টেবিলের সামনে নিস্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। তার সামনে রাখা ছিল একটি প্রাচীন, মরচে ধরা ব্রোঞ্জের ফ্রেমের আয়না। এই আয়না সাধারণ কোনো কাচ ছিল না—তাসমিরার বিশ্বাস ছিল, মানুষের মনের ভেতরের যত কুৎসিত লোভ, ভণ্ডামি আর মুখোশপরা রূপ রয়েছে, তা এই আয়নার গভীরে ঠিক প্রতিচ্ছবির মতো ধরা পড়ে।

তাসমিরা পেশায় ছিল একজন অনুসন্ধানকারী ও লেখক। সে সমাজের সেই অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করত, যা সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে ঢাকা থাকে—বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সেই বিকৃত মানসিকতা, যা দিনের আলোয় নিজেদের সাধু বলে জাহির করলেও রাতের অন্ধকারে পিশাচের রূপ ধারণ করে।

হঠাৎ আয়নার মসৃণ কাচে এক মৃদু শিহরণ জাগল। কাচের ভেতর থেকে নীলচে আলোর স্ফুলিংগ ছড়িয়ে পড়ল পুরো ঘরে। তাসমিরা দেখল, আয়নার ভেতরে ভেসে উঠছে শহরের এক ধনকুবের ও প্রভাবশালীর প্রতিচ্ছবি, যে বাইরে বড় বড় দাতব্য কাজের কথা বলে বেড়ায়, অথচ তার মনের অন্দরে লুকিয়ে আছে এক পশুবৃত্তি ও ক্ষমতার লোভ।

তাসমিরা শক্ত করে তার হাতের কলমটি ধরল এবং দৃঢ় গলায় বিড়বিড় করে বলল, "সমাজ যতই তোমাদের আড়াল করতে চাক না কেন, তোমাদের এই নোংরা মুখোশ আমি টেনে হিঁচড়ে নামাবোই। অন্ধকারের রাজত্ব চিরস্থায়ী হতে পারে না।"

আয়না থেকে ভেসে এল এক ঠান্ডা দীর্ঘশ্বাস আর অস্ফুট ফিসফিসানি। কিন্তু তাসমিরা এক বিন্দুও ভয় পেল না। সে তার খাতাটি হাতে তুলে নিয়ে সেই রহস্যময় মায়াবী নগরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল, যেখানে প্রথম সত্যটি তার প্রমত্ত পদচারণার অপেক্ষায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।

মায়ার সেই ভাঙা প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে তাসমিরা যখন অন্ধকারের একদম গভীরে এসে পৌঁছাল, তখন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে এল। এটি ছিল সেই গোপন কুঠুরি, যেখান থেকে পুরো শহরের দুর্নীতি, শোষণ আর পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামির কলকাঠি নাড়া হতো।

সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই অপরাধ জগতের মূল হোতা—যাকে এতদিন সমাজের সবাই একনামে সাধু ও ন্যায়পরায়ণ বলে মানত। তার চারপাশে তখন কুৎসিত এক আতঙ্কের পরিবেশ। তাসমিরাকে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে সে বিকৃত হেসে বলে উঠল, "তুমি একা আমাদের এই বিশাল সাম্রাজ্য ঠেকাতে পারবে না, তাসমিরা! সমাজ আমাদেরই কথায় চলে!"

কিন্তু তাসমিরা একটুও পিছপা হলো না। তার আত্মবিশ্বাসী চোখদুটো তখন জ্বলছে। সে তার হাতের জাদুকরী খাতাটি মেলে ধরল এবং তার কলমের ডগা থেকে ছড়িয়ে পড়ল তীব্র নীল আলোর এক বিশাল বন্যা। সেই আলোর স্পর্শে অন্ধকারের চাদর এক নিমেষে পুড়তে শুরু করল। খাতার পাতা থেকে বেরিয়ে আসা সত্যের প্রবাহ সেই নরপিশাচদের সমস্ত অহংকার, জালিয়াতি এবং গোপন দলিল চিরতরে ছাই করে দিল।

তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল সেই অন্ধকার সাম্রাজ্যের ভিত। পুরুষদের সেই নোংরা ও পিশাচসুলভ মুখোশগুলো চিরকালের মতো খসে পড়ল আলোর নিচে।

মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে তাসমিরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। শহরের আকাশ থেকে তখন মায়াবী কুয়াশা কেটে গিয়ে নতুন ভোরের এক স্নিগ্ধ আলো উঁকি দিচ্ছে। সে বুঝতে পেরেছিল—অন্ধকার যতই গভীর হোক না কেন, একজন মানুষের সত্য ও সাহসিকতার একটা ছোট স্ফুলিংগই যথেষ্ট সমস্ত কুসংস্কার ও ভণ্ডামির জাল চিরতরে ছিঁড়ে ফেলার জন্য।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login