দুদিন ধরে গা কাঁপিয়ে জ্বর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা শরীরে। একেবারে কাবু করে ফেলেছে, বিছানা হতে উঠতেই মাথা ঘুরাচ্ছে। মুসা শুয়ে শুয়ে ভাবছে আজ যদি রিকশা নিয়ে না বেরোয়, তবে বউ নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। আজ নিয়ে তৃতীয় দিন, জমানো টাকায় খাচ্ছে। একজন রিকশাওয়ালার ঘরে কিইবা টাকা জমে!
মুসা চিঁ চিঁ করে ডাক দিলো, শিউলি, শিউলি। চৌকির পাশেই মাটিতে বসে আছে, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। রিকশাওয়ালার স্ত্রীর মুখে দীর্ঘমেয়াদী হাসির সুযোগ আসেইনা, বরং প্রায়শই দুশ্চিন্তার ছাপ থাকতে থাকতে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্থায়ী হয়ে যায়।
শিউলি মুখ তুলে বলল, কি হইছে? কিছু কইবেন?
-আইজকা ট্যাকা আছে ঘরে? খাবি কি আইজকা?
-আল্লায় মুখ দিছে, আল্লাই খাওন দিবো। এতো চিন্তা করেন ক্যান?
মুসা কিছু বলল না। ডাক্তারের কাছে যাবার উপায় নাই। পাশের ফার্মেসীতে গিয়েছিলো। কিছু ঔষধ দিয়ে দিয়েছে। সেগুলোই খাচ্ছে।
গরীব মানুষেরা খুব কমই ডাক্তারের কাছে যায়। এলাকার ঔষধের দোকানদারেরাই তাদের জন্য ডাক্তার। মুসা শুয়ে শুয়ে শুধু ভাবছে, এভাবে জ্বর বাঁধিয়ে থাকাও রিকশাওয়ালাদের জীবনে পোষায় না। তাদের জীবনের ধারাপাতের অংকটা আলাদা। কবে শরীরটা ঠিক হবে, কে জানে!
শিউলি হঠাৎ উঠে দাঁড়াতেই মুসা ভাবলো, তাকে কিছু বলবে হয়তো। মুসা কে কিছু না বলে শিউলি বেরিয়ে গেলো ঘর হতে। একা ঘরটাতে মুসা একা একা শুয়ে আছে। টাকা দরকার, খাবারের জন্য টাকা দরকার। মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে মুসার। কোন আগাম ইংগিত না দিয়েই দুচোখ ভরে উঠলো পানিতে। মনে মনে আল্লাহ্কে ডাকতে লাগলো। আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও বুঝে নাই। ঘরের ভেতর নড়াচড়ার শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখে, শিউলি ফিরে এসেছে। ঘরের কোণায় মেঝেতে কিছু প্লাস্টিকের বাটি দেখতে পেলো। শিউলি তাকে দেখেই বলল,
-এই বস্তিতে এমনেই দুনিয়ার চোর ছ্যাঁচড় থাকে। আপনে দরজা খুইলাই ঘুমাইয়া গেলেন!
মুসার দুই চোখ ঘরের কোণার প্লাস্টিকের বাটিগুলোর দিকেই। শিউলি মুসার চোখের দিক দেখে বলল,
-ঘরে তো কিছুই নাই। আমগো ঘরের ডাইন দিকের দুই ঘর পর কুসুম আপার ঘর, আপনেরেতো কইছিলাম,আমগো দ্যাশেই বাড়ি। আপার কাছে গেছিলাম। তারপর আচানক একটা ঘটনা ঘটছে।
-কি হইছে? মুসা জিজ্ঞেস করল।
-আপায় আমগো দুইজনের জন্য ভাত, তরকারী দিয়া দিছে আর বলছে, আগামী যে কয়দিন আপনে অসুস্থ থাকবেন, হেয় খাওন পাডাইবো।
-কি কইলি, শিউলি? মুসার কণ্ঠে বিস্ময়।
-ঘটনা আরো আছে। আমি খাওন নিয়া ঘরের কাছে আইসা দেখি, আপনের রিকশার গ্যারেজের মালিক খারাইয়া আছে। আমগো ঘর খুঁজতাছে। আপনে আইজ তিনদিন যাননা দেইখা আইছিলো।
-কস কি? মুসার বিস্ময় যেন কাটছেই না।
-হেয় আপনের জ্বরের কতা শুইনা পাঁচশ ট্যাকা দিলো আমার কাছে। আর কইছে, কুনো চিন্তা না করতে।
কথাটা শুনে মুসা ভাবলো এইমাত্র আল্লাহ্র কাছে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। আর কিছু ভাবতে চাইছে না সে। আড়চোখে শিউলির দিকে তাকাল মুসা, শিউলির মুখে ঠিক এখন কোন দুশ্চিন্তার রেখা নেই।
Comments
Be this story’s first reader
+20 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.