মুরগি পালন করা মায়ের কাছে সংসারের সব কাজের শেষে ওভারটাইম করার মতোই ছিল। সংসার বড় হয়ে যাওয়ায় গরু-ছাগল কিনেও শেষ পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন বাবা। যদিও নিয়মিত দুধ কেনা হতো। শাকসবজির অভাব ছিল না, উঠোনের এক কোণে ছিল ছোট্ট সবজির বাগান। পুকুরেও মাছের অভাব ছিল না। তবে মাঝেমধ্যে বড় মাছ, বিশেষ করে ইংলিশ, বোয়াল ও চিতল মাছ বাবা বাজার থেকে কিনে আনতেন। বাড়িতে সারি সারি সুপারি গাছও ছিল। শুধু পান, চুন আর সাদাপাতা কিনতে হতো।
মায়ের বড় শখগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল হাঁস পালন। এর মধ্যে রাজহাঁস ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়।
একদিন মা বাবাকে দিয়ে বাজার থেকে চারটি রাজহাঁসের বাচ্চা কিনিয়ে আনলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই একটি একটি করে সবগুলো বাচ্চা মারা গেল। মায়ের মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
এভাবেই কিছুদিন কেটে গেল। মা মুরগির ডিম বিক্রি করে টাকা জমাতে লাগলেন। টাকার কিছুটা ঘাটতি পূরণ করতে কয়েকটি মোরগও বিক্রি করলেন। উদ্দেশ্য একটাই—যেভাবেই হোক, এবার আর রাজহাঁসের বাচ্চা নয়, বড় রাজহাঁস কিনে আনবেন।
মা শেষ পর্যন্ত তাই করলেন। বাবা বাজার থেকে ৪০০ টাকায় দুটি বড় রাজহাঁস কিনে নিয়ে এলেন।
ভালোই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর শুরু হলো নতুন বিপত্তি। রাজহাঁস দুটি মানুষ দেখলেই তেড়ে গিয়ে নখ দিয়ে আঁচড় দিত। অনেক শিশুর মা্্স পর্যন্ত নিয়ে নিত। প্রায় সবারই অভিযোগ। পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকেই রাজহাঁসের ভয়ে আমাদের বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিলেন।
অবশেষে মা বাধ্য হয়ে রাজহাঁস দুটি বিক্রি করার জন্য আমাকে পাঠালেন।
চোখে অশ্রু নিয়ে মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বিক্রি না করে যেন বাড়িতে ফিরে না আসি।
আমি প্রায় সন্ধ্যার দিকে ৪০০ টাকার রাজহাঁস দুটি মাত্র ১৬৫ টাকায় বিক্রি করে দিলাম। সেই টাকা থেকে আবার দুই টাকা খাজনা বাবদ দিয়ে আসতে হলো।
বাড়িতে ফিরে মায়ের হাতে টাকা তুলে দিলাম।
মায়ের মন আরও খারাপ হয়ে গেল।
সেদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমারও খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু কী আর করার ছিল!
সে সময় টাকার যে মূল্য ছিল, তা শুধু তাঁরাই জানেন, যাঁরা সেই সময়ের সংসারজীবন দেখেছেন, টাকার অভাব বুঝেছেন এবং অল্প অল্প করে জমানো টাকার পেছনে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নের মূল্য উপলব্ধি করেছেন।