বাবারে! চাইরট্যা (চার) ভাতের জন্য এত কষ্ট, এই সংসারে। মৌলিক অধিকার বঞ্চিত একজন স্ত্রী তার অভাবগ্রস্থ স্বামীর কথোপকথনে সন্তানদের উদ্দেশ্যে সহজ সরল কষ্টের আকুতি। যে সংসার সাজিয়েছেন তারই রূপরেখায় ভেসে উঠা একটি সামাজিক চিত্র এটি। ক্ষুধার যন্ত্রণা পৃথিবীর সমস্ত কান্নার উৎস যেন এই একটি শব্দেই বাঁধা। জীবন তো আসলে এক অন্তহীন পথচলা, যেখানে প্রতিটা পদক্ষেপের পেছনে লুকিয়ে থাকে তীব্র আকাঙ্ক্ষা। প্রতিদিন ভোর হয় এক আকাশ আলো নিয়ে, কিন্তু সেই আলোর নিচে কত হাজারো প্রাণ দুমুঠো অন্নের খোঁজে পিষ্ট হয়, তার হিসাব কোনো মহাজাগতিকের খাতায় লেখা থাকে না।
অধিকাংশ মানুষের বেঁচে থাকার আদিম ও চিরন্তন সংগ্রাম যেন দুমুঠো ভাতের জন্য। অভাব, অনটন আর দারিদ্র্যতা যেন এদেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসেছে। সকালের সূর্যটা উঁকি দেয়, শুরু হয় এক নীরব যুদ্ধ। কাকডাকা ভোরে অভিজাত পাড়ার জানলাগুলো বন্ধ থাকে, ঠিক তখনই রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায় কিছু ক্লান্ত অবয়ব। তাদের চোখে স্বপ্নের রঙিন ক্যানভাস নেই, আছে শুধু আজ দুপুরের কিংবা রাতের থালায় কিছুটা অন্নের নিশ্চয়তা পাওয়ার আকুলতা। ইট-পাথরের এই নিষ্ঠুর নগরে প্রতিটি ইটের গাঁথুনি, প্রতিটি পিচঢালা রাস্তার নিচে চাপা পড়ে আছে কত শত দীর্ঘশ্বাস। দিনশেষে তো একটাই প্রশ্ন—দুমুঠো ভাতের জন্যই তো এত কষ্ট, তাই নয় কি?
হাড়ভাংগা খাটুনি কিংবা তীব্র রোদে যখন রিকশার প্যাডেলে ক্রমাগত চাপ পড়ে, তখন শরীরের প্রতিটি পেশি যেন এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয়। ঘামের প্রতিটি ফোঁটা যখন তপ্ত মাটিতে মিশে যায়, তখন সেখানে কোনো বিলাসিতার গল্প লেখা হয় না। সেখানে লেখা হয় টিকে থাকার এক অলিখিত মহাকাব্য। যে হাত কোনোদিন কলম ধরতে পারত, সেই হাত আজ আবর্জনার স্তূপে প্লাস্টিক খোঁজে। যে চোখে একদা আকাশের তারা গোনার সাধ ছিল, সেই চোখ আজ শুধু চেয়ে থাকে কোনো এক দয়াবানের হাতের দিকে। এই বৈপরীত্যের নামই জীবন, যেখানে এক মুঠো চালের দাম অনেক সময় একটা আস্ত জীবনের চেয়েও দামি হয়ে ওঠে।
মাঝরাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখন ক্ষুধার জ্বালাও তীব্রভাবে জেঁকে বসে। জরাজীর্ণ ঘরের কোণে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে যখন পেটের ভেতরের হাহাকারটা মোচড় দিয়ে ওঠে, তখন চারপাশের অন্ধকারটা যেন আরও গাঢ় মনে হয়। সভ্যতার সমস্ত প্রগতি, সমস্ত বড় বড় আবিষ্কার যেন এই ক্ষুধার্ত পেটের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। আকাশে চাঁদের আলো যতই স্নিগ্ধ হোক না কেন, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে তা কেবলই একটা ঝলসানো রুটি ছাড়া আর কিছুই নয়। চারটা ভাতের জন্য মানুষকে কতটা নিচে নামতে হয়, কতখানি আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, তা কেবল সেই বোঝে যার থালাটা দিনের পর দিন শূন্য পড়ে থাকে।
নদীর স্রোত যেমন পাড় ভেঙে এগিয়ে যায়, তেমনি মানুষের জীবনও সমস্ত কষ্টকে বুকে চেপে বয়ে চলে। তবুও মানুষ আশায় বুক বাঁধে। কাল হয়তো একটা ভালো দিন আসবে, কাল হয়তো পেট পুরে খাওয়া যাবে—এই সামান্যতম আশাটুকুই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু পরদিন ভোরে আবার সেই একই বৃত্ত, একই সংগ্রাম। চারটা ভাতের জন্য এই যে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলা, এই যে অপমানের গ্লানি মুখ বুজে সহ্য করা, এ যেন এক অনন্তকালের শাস্তি। কি অপরাধ? দারিদ্র্যতা?
পৃথিবীর সমস্ত সুখ, ভালোবাসা আর সমস্ত সম্পর্কের ভিত্তি যেন এক অদ্ভুত উপায়ে এই অন্নসংস্থানের সাথে জুড়ে আছে। অন্নহীন মানুষের কাছে উৎসবের আলোও ফিকে, আনন্দের গানও যেন এক করুণ সুরের বাঁজে। দিনশেষে যখন ক্লান্ত দেহটা কোনোমতে একটু আশ্রয়ের খোঁজে ফেরে, তখন শূন্য থালার দিকে তাকিয়ে মন থেকে কেবল একটিই হাহাকার বেরিয়ে আসে—চাইরট্যা ভাতের জন্য কেন এত কষ্ট? দুমুঠো ভাতের জন্যই তো মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এতটা পথ পাড়ি দেয়, তবুও কেন এই প্রাপ্তি এত কঠিন, এত দুষ্প্রাপ্য? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিন মিলবে না, কিন্তু এই কষ্টের নদীটা অবিরত বয়েই চলবে।।
মোঃ আবু হানিফ
২১ কার্তিক ১৪৩৩
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.