ফুরসা গ্রামের মেঠোপথ ধরে কেউ যদি সকালবেলায় হেঁটে যায়, তবে ধানের শিষের ডগায় জমে থাকা শিশির কণার চেয়েও খাঁটি একখানা হাসির দেখা পাওয়া যেত। সেই হাসিটা ছিল জগাইয়ের।
পুরো নাম জগলু মণ্ডল, কিন্তু ফুরসা কিংবা পাশের বৈরাগীর চকের কেউই তাকে পুরো নামে চেনে না। সবার কাছে সে কেবলই ‘জগাই’। বয়স তার তিরিশের কোঠায় পা রেখেছে বছর খানেক আগেই, কিন্তু তার মনটা যেন আটকে আছে কোনো এক সাত-আট বছরের শিশুর সারল্যে। লম্বাটে গড়ন, রোদে পোড়া তামার মতো শক্ত তামাটে শরীর, চুলগুলো উসকোখুসকো আর পরনে সবসময় একটা গিঁট দেওয়া তালি মারা সুতি লুঙ্গি। চোখেমুখে কোনো হিসেবি চতুরতা নেই, বরং এমন একখানা বোকা শোকা চাহনি,যা দেখলে মনে হয় এই পৃথিবীর কোনো ছলচাতুরীই তার চামড়া ভেদ করে অন্তরে ঢুকতে পারেনি।
ফুরসা গ্রামে মানুষের অভাব ছিল না। চতুর মানুষ, অহংকারী মাতব্বর, কূটকচালি বুড়ো আর আধুনিক চালচলন শেখা শহরের পড়ুয়া ছেলে,সব রকমের মানুষেরই মেলা ছিল এই গ্রামে। কিন্তু জগাই ছিল এদের সবার চেয়ে আলাদা, এক স্বতন্ত্র জাতের মানুষ। জগাইয়ের কোনো নিজস্ব জমিজমা ছিল না। গ্রামের উত্তর পাড়ায় শ্মশানঘাটের দিকে যেতে পুরোনো একটা ডুমুর গাছের তলে একচিলতে খড়ের ছাওয়া মাটির কুঁড়েঘর,এটাই ছিল তার সংসার। মা মারা গেছেন বহু বছর আগে, বাবার মুখ তো তার স্মৃতিতেই নেই। একলা মানুষ। পেটের ভাত জোগাড় করতে সে প্রতিদিন বের হতো মানুষের বাড়ির কামলা খাটতে।
কারও খেতের ধান কাটতে হবে? জগাই আছে। কারও পুকুরের তলদেশ থেকে পাঁক তুলে পাড় বাঁধতে হবে? জগাইকে ডাকো। কারও খড়ের গাদা তুলতে হবে কিংবা মহাজনের গোলা থেকে ধানের বস্তা হাটের নৌকায় তুলতে হবে? এক ডাকে পাওয়া যাবে জগাইকে।
বিনিময়ে সে কোনোদিন দরদাম করত না। কামলা দেওয়ার পর গৃহস্থ যদি দুটো পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ দিয়ে হাতে দশ-বিশটা টাকা গুঁজে দিত, জগাই তাতেই দুই পাটি দাঁত বের করে এমনভাবে হাসত, যেন কুবেরের ধন পেয়ে গেছে। আর কেউ যদি ফাঁকি দিয়ে আধপেটা খাইয়ে নামমাত্র মজুরি দিয়ে বিদায় করত, জগাই তাতেও বিন্দুমাত্র মন খারাপ করত না। গামছায় টাকাটা বাঁধতে বাঁধতে বলত, "গরিবের বেশি টেকা দিয়া কী হইব কও? সোমসার তো কেবল এই পেটটার! উপরঅলা ভাত দিলেই তো রাত কাবার।"
তার এই বোকামির জন্য গ্রামের মানুষের কাছে সে ছিল একাধারে হাসির পাত্র আর তামাশার খোরাক। দোকানের দাওয়ায় বসে যখন অলস বিকেলে তামাকের হুঁকো টানতে টানতে মোড়ল বা মাতব্বরের দল বসত, তখন জগাইকে মেঠোপথ দিয়ে যেতে দেখলেই হাঁক পাড়ত আসাদ মাতব্বর।
"এই যে জগাই পণ্ডিত! শুনলাম তুই নাকি কাল রাইতে চাঁদের আলোয় ধান বুনতে গেছিলি? তা চাঁদের আলোয় ধানের চারা কয়টা গজাইল রে?"
চারপাশের মানুষ খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠত। জগাই থমকে দাঁড়িয়ে বোকা বোকা চোখে চেয়ে থাকত। তারপর কোনো রাগ না করে মাথায় হাত চুলকাতে চুলকাতে বলত, "মাতব্বর জেঠা, চাঁদের আলো তো বড় মিঠে লাগে! গাছপালাও বুঝি একটু আলো চায়, তাই দেখতে গেছিলাম।"
"আরে বোকার হদ্দ!" আসাদ মাতব্বর চায়ের কাপে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে বলত, "তোর মাথার ঘিলু তো ছাগলের লেজের সমানও না! যা যা, মোড়ের দোকান থাইকা আধা সের জিলিপি আর দুইটা পান নিয়া আয় যা। এক আনা বকশিশ দিমু।"
জগাই হাসিমুখে ফরমাশ খাটতে ছুটত। সে বুঝত মানুষ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে থাকা অপমানটুকু বোঝার মতো কোনো তিক্ততা তার হৃদয়ে ছিল না। সে ভাবত, মানুষ হাসছে,এটাই তো আনন্দের কথা। কেউ তার কারণে হাসলে ক্ষতি কী?
তবে গ্রামের মানুষ জগাইকে নিয়ে যতই হাসিঠাট্টা করুক না কেন, একটা নির্মম সত্য ফুরসা গ্রামের ছোট-বড় সবাই মনে মনে জানত,বিপদ-আপদে জগাইয়ের চেয়ে আগে আর কাউকে পাওয়া যায় না। যেখানে স্বার্থের গন্ধ নেই, যেখানে কোনো লাভ-লোকসানের হিসাব নেই, সেখানেই যেন সবার আগে জগাইয়ের খালি পা দুটো এসে থামত। গত বছর ভাদ্র মাসের এক কালবৈশাখীর রাতে রহমত শেখের টিনের চালাটা মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল। ঘরের নিচে চাপা পড়েছিল রহমতের বুড়ো মা আর দুটো অবুঝ বাচ্চা। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি, আকাশ চিরে বাজ পড়ছে একের পর এক। গ্রামের জোয়ান ছেলেরা তখন নিজের ঘরের খুঁটি সামলাতেই ব্যস্ত, কারও ঘরে যাওয়ার সাহস কারও ছিল না।
ঠিক সেই ঘোর দুর্যোগের রাতে ভেজা কাকের মতো একা ছুটে এসেছিল জগাই। চিৎকার করে কাউকে না ডেকে সে একাই সেই ভাঙা চালের ভারী শালকাঠ নিজের পিঠের ওপর তুলে ধরেছিল। দাঁতে দাঁত চেপে এক দানবীয় শক্তিতে চালটা উঁচু করে ধরে রেখে সে চিৎকার করেছিল, "শেখ ভাই! পোলাপান নিয়া বাইর হও! আমি ধইরা রাখছি, তাড়াতাড়ি!"
দশ মিনিট ধরে সেই প্রচণ্ড ভারী চাল একাই কাঁধে বয়ে রেখেছিল জগাই, যতক্ষণ না রহমত তার পরিবারকে নিরাপদে বের করে আনল। যখন সবাই নিরাপদ হলো, তখন কাঠের চাপে জগাইয়ের ডান কাঁধের চামড়া ছড়ে রক্ত ঝরছিল। কিন্তু সে রক্ত মুছতে মুছতে একগাল হেসে বলেছিল, "বড় বাঁচা বাঁইচা গেল শেখ ভাই! পোলাপানের গায়ে এক ফোঁটা চোট লাগে নাই।"
তেমনি কারও বাড়িতে কেউ মারা গেলে লাশ দাফন বা সৎকারের কাজে যখন রক্তসম্পর্কের আত্মীয়রাও ছোঁয়াছুঁয়ি বা খরচের ভয়ে পিছপা হতো, জগাইকে বলতে হতো না। সে সবার আগে কোদাল কাঁধে নিয়ে গোরস্থানে বা শ্মশানে গিয়ে মাটি কাটা শুরু করত। কলেরায় যখন গ্রামের মানুষ পালিয়ে যেত, জগাই তখন অসুস্থ মানুষের মাথায় জলপট্টি দিত। গ্রামের ডাক্তার বিধুভূষণবাবু প্রায়ই বলতেন, "জগাইয়ের মাথায় হয়তো বুদ্ধি একটু কম, কিন্তু ওর বুকের খাঁচায় যে কলিজাটা আছে, ওটা ফুরসা গ্রামের দশটা চতুর মানুষের বুকের চেয়েও বড়।"
কিন্তু মানুষ বড় অদ্ভুত জীব। বিপদ কেটে গেলে কৃতজ্ঞতার আয়ু খুব বেশিদিন থাকে না। রোদ উঠলে ছাতার প্রয়োজন যেমন ফুরিয়ে যায়, বিপদ কাটলেই মানুষ আবার জগাইকে সেই ‘পাগলা’, ‘হাবাগোবা’, ‘বোকা জগাই’ বানিয়ে তামাশার পাত্র করে তুলত। জগাই কোনোদিন এর প্রতিবাদ করেনি। তার কাছে কোনো কিছুর বিনিময় চাওয়াটাই ছিল অচেনা এক অনুভূতি।
সেই বছর শ্রাবণ মাসটা ফুরসা গ্রামের মানুষের জন্য এক অভিশাপ নিয়ে এল। টানা পনেরো দিন ধরে আকাশের মুখ আর খোলা গেল না। অবিরাম বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে ফুরসা নদীটা যেন এক ক্ষুধার্ত রাক্ষসীর রূপ ধারণ করল। নদীর ঘোলা পানি বাঁধের কাছাকাছি এসে আছড়ে পড়তে লাগল তীব্র গর্জনে। গ্রামের মানুষ প্রমাদ গুনল। এই বাঁধ যদি ভেঙে যায়, তবে ফুরসা আর বৈরাগীর চক,দুটো গ্রামের শত শত বিঘা জমির আমন ধান আর হাজারো বসতবাড়ি এক রাতের মধ্যে তলিয়ে যাবে।
গ্রামের মোড়ল আসাদ মাতব্বর বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে শুকনো মুখে তামাক খাচ্ছিলেন। সঙ্গে গ্রামের জোয়ান ছেলেরা। সবাই মিলে মাটি ফেলে বাঁধটা উঁচু করার চেষ্টা করছে, কিন্তু নদীর স্রোতের তোড়ে কোদালের মাটি নিমেষেই ধুয়ে চলে যাচ্ছে।
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে কান পাতা দায়।
হঠাৎ পশ্চিম পাশের বাঁধ থেকে একদল চিৎকার করে উঠল, "সর্বনাশ হইছে গো মাতব্বর সাব! পশ্চিমের কোণায় বড় ফুটো হইয়া গেছে! বাঁধের তলা দিয়া পানি সুরসুর কইরা ঢুকতাছে!"
মুহূর্তের মধ্যে হাহাকার পড়ে গেল। বাঁধের সেই জায়গায় একটা বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। নদীর পানির চাপে ভেতরকার মাটি ধসে পড়ছে। আর আধঘণ্টা এই অবস্থা চললে পুরো বাঁধটাই ধসে একাকার হয়ে যাবে।
"বাঁশের খাঁচা আর বালির বস্তা আনো!" মাতব্বর চিৎকার করলেন। "তাড়াতাড়ি!"
কিন্তু বালির বস্তা ফেললেও লাভ হচ্ছিল না। ঘূর্ণিস্রোতের টান এত বেশি ছিল যে বস্তা ফেললেই তা গর্তের ভেতরে না গিয়ে নদীর গভীরে ভেসে চলে যাচ্ছিল। কাউকে গর্তের একদম কাছে নেমে বাঁশের খুঁটি পুঁতে বস্তাগুলো আটকে রাখতে হবে। কিন্তু নদীর সেই ঘূর্ণিপাকের কাছে নামা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। যে নামবে, তাকে স্রোত টেনে নিয়ে যাবে অতল তলে।
গ্রামের বড় বড় বীরপুরুষেরা তখন পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। রহমত শেখ, কাসেম, বাদল,সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কারও পা সামনে সরছে না। জীবন বাঁচানোর মায়ায় সবাই স্তব্ধ।
"কে আছো জোয়ান? একজন নাইমা খুঁটিটা না ধরলে গ্রাম ভাইসা যাইব রে!" মাতব্বর প্রায় কেঁদে ফেললেন।
কিন্তু ভিড়ের ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। মানুষের আত্মরক্ষা করার স্বার্থপরতা তখন প্রকৃতির রোষের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল জগাই। তার পরনে সেই শতচ্ছিন্ন লুঙ্গিটা শক্ত করে মালকোঁচা মারা। গায়ে কোনো জামা নেই। বৃষ্টিতে তার তামাটে শরীর বেয়ে জলের ধারা নামছে। তার চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই; সেই পরিচিত, শান্ত সারল্য। সে একখানা ভারী শাল কাঠের গুঁড়ি আর একটা বড় হাতুড়ি হাতে তুলে নিল।
"জগাই! তুই কই যাস?" চিৎকার করে উঠল রহিম মেম্বার। "ওখানে নামলে বাঁচবি না রে!"
জগাই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। বৃষ্টির ফোঁটা তার চোখের পাতায় কাঁপছিল। সে একগাল হাসল,সেই চিরচেনা ফোকলা, নিষ্পাপ হাসি।
"আমি মইরা গেলে কারও তো কোনো ক্ষতি নাই মেম্বার কাকা! আমার ঘরে তো কান্দনের কেউ নাই। কিন্তু গ্রাম ভাইসা গেলে অতগুলো ছোট ছোট ছাওয়াল-মাইয়া না খাইয়া মরব। আমি খুঁটিটা পোঁতার চেষ্টা করি।"
কেউ তাকে বাধা দেওয়ার আগেই জগাই ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই উত্তাল, ঘূর্ণায়মান ঘোলা জলের মধ্যে।
পানির প্রচণ্ড ধাক্কায় সে একবার তলিয়ে গেল। সমবেত মানুষ আঁতকে উঠে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর জগাইয়ের মাথাটা ভেসে উঠল ঠিক বাঁধের ফাটলটির মুখে। সে এক হাতে পাথরের মতো শক্ত করে বাঁধের শেকড় আঁকড়ে ধরে অন্য হাতে সেই শাল কাঠের গুঁড়িটা গর্তের মুখে বসাল।
তারপর শুরু হলো এক অতিমানবীয় লড়াই। একহাতে বুকসমান পানির ধাক্কা সামলে অন্যহাতে ভারী হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়িটাকে মাটির গভীরে ঠুকে ঠুকে বসাতে লাগল জগাই। প্রতিটা ঘায়ে তার শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা ফুলে উঠছিল। নদীর স্রোত তাকে বারবার টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল, কিন্তু জগাই নড়ল না। সে যেন নিজেই এক জীবন্ত বাঁধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
"বস্তা ফালাও! ওরে মানুষজন, বস্তা ফালাও!" নিচ থেকে গর্জে উঠল জগাইয়ের কণ্ঠ। সে আর বোকা জগাই নয়, সে তখন সাক্ষাৎ কালান্তক এক রূপ ধারণ করেছে।
জগাইয়ের সেই অলৌকিক সাহস দেখে পাড়ের মানুষের বুকের ভেতরের জড়তা ভেঙে গেল। দশ-বারোজন যুবক আর দেরি না করে বালির বস্তা এনে ফেলতে শুরু করল জগাইয়ের পোঁতা খুঁটিটার গায়ে। জগাই নিজের দুই হাত দিয়ে সেই বস্তাগুলোকে গর্তের মুখে চেপে ধরে রাখতে লাগল। এক বস্তা, দুই বস্তা, দশ বস্তা... ধীরে ধীরে গর্তটা বুজে আসতে লাগল।
পানির প্রবাহ কমে এল। বাঁধের ধসটা অবশেষে আটকে গেল। ফুরসা গ্রাম বেঁচে গেল এক চরম ধ্বংসের হাত থেকে। পাড়ের মানুষগুলো আনন্দে উল্লাস করে উঠল। "বাঁধ ঠেকানো গেছে! বাঁধ বাঁচছে!"
কিন্তু সেই উল্লাসের মাঝেই হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠল, "জগাই কই? এই মানুষজন, জগাইরে তো দেখা যায় না!"
মুহূর্তের মধ্যে উল্লাস থেমে গিয়ে এক হিমশীতল নীরবতা নেমে এল। সবাই দেখল, বাঁধের ফাটল তো বন্ধ হয়েছে, কিন্তু যেখানে জগাই দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে কেবল ঘোলা পানির এক উন্মত্ত ঘূর্ণি ঘুরছে। শেষ বস্তাটি ফেলার সময় নদীর তলদেশের এক অদৃশ্য চোরাস্রোতের টানে পানির তলার মাটি সরে গিয়েছিল, আর সেই সাথে এক নিমেষে তলিয়ে গেছে অবসন্ন, ক্লান্ত জগাই।
"জগাই! ও জগাই!" গ্রামের জোয়ান ছেলেরা এবার কোনো ভয় না পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে। জাল ফেলা হলো, নৌকা নিয়ে খোঁজা হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু শ্রাবণের সেই সর্বগ্রাসী নদী আর কাউকে ফেরত দিল না। নদী যেন তার ক্ষুধা মেটাতে ফুরসা গ্রামের সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে পবিত্র প্রাণটিকেই ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
পরদিন সকালে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। মেঘ কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী রোদ উঠল ফুরসা নদীর চরে। সবুজ ধানের খেতগুলো অক্ষত অবস্থায় বাতাসে দুলছে, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু পুরো ফুরসা গ্রামে আজ কারও ঘরে চুলো জ্বলেনি।
নদীর বাঁধে যেখানে ধস নেমেছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের শত শত মানুষ। আসাদ মাতব্বর, যিনি কোনোদিন কোনো গরিব মানুষের জন্য এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেননি, তিনি সেই ভেজা মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কাঁদছেন। "আমারে মাফ কইরা দে রে জগাই! আমরা তোরে পাগল কইতাম, বোকা কইতাম! কিন্তু আজ বুঝলাম,আসল পাগল তো আমরাই ছিলাম রে বাপ! যারা সারাজীবন শুধু নিতে শিখছি, দিতে শিখি নাই। আর তুই একাই দিয়া গেলি সবকিছু!"
রহমত শেখ, বিধু ডাক্তার, পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা,সবার চোখেই আজ অবিরল অশ্রু।যে জগাইকে নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে চায়ের দোকানে হাসির রোল উঠত, যে জগাইকে মানুষ তামাশা করে দু-এক আনা পয়সা ছুড়ে দিত, সেই জগাই আজ তাদের সবার অস্তিত্বের ঋণ নিজের বুকে তুলে নিয়ে চলে গেছে না-ফেরার দেশে। আজ তাদের হাসানোর মতো কেউ নেই, বোকা বোকা কথায় উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা,কোনোদিন যদি আবার গ্রামে কোনো দুর্যোগ নামে, তবে কোনো স্বার্থ ছাড়া এমন বুক পেতে দেওয়ার মতো মানুষ আর কোনোদিন এই ফুরসা গ্রামের মাটিতে জন্মাবে কি না, তা কারও জানা নেই।
গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল,নদীর সেই বাঁধটির নাম রাখা হবে ‘জগাইয়ের বাঁধ’। আর সেই ভাঙা ডুমুর গাছতলায়, যেখানে তার ছোট্ট কুঁড়েঘরটা ছিল, সেখানে একটা বকুল ফুলের গাছ লাগানো হলো। আজও ফুরসা গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে মানুষ কান পেতে শোনে। নদীর কলকল ধ্বনির মাঝে যেন দূর থেকে এক অস্ফুট, সরল হাসি ভেসে আসে। যে হাসিতে কোনো রাগ ছিল না, ক্ষোভ ছিল না, ছিল কেবল এক চিরন্তন ভালোবাসা। জগাই হয়তো এই পৃথিবীর কঠিন হিসাবে বোকা ছিল, কিন্তু ঈশ্বরের খাতায় সে লিখে দিয়ে গেছে এক অনন্য মহত্ত্বের নাম,যা ফুরসা নদীর পলিমাটির মতো কোনোদিন মুছে যাবে না।