Story

যাদুকর

November 8, 2026

9 views

তখন আমার বয়স কত হবে? আট কি নয়। আমাদের গ্রামের নাম ছিল রতনপুর, আর ঠিক দুই ক্রোশ দূরে ধলেশ্বরীর শাখা নদীটির বাঁকে প্রতি বুধবার বসত রামপুরার হাট।সেই হাটের একটা নিজস্ব গন্ধ ছিল,কাঁচা তামাকের ঝাঁঝ, নতুন পাটের সোঁদা গন্ধ, জিলিপির ফুটন্ত তেলের ধোঁয়া আর শত শত ঘর্মাক্ত মানুষের নিঃশ্বাসের মিলিত এক আদিম উত্তাপ। বুধবারের দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলেই গাঁয়ের পথ ধরে সাইকেলের ঘণ্টার টুংটাং আওয়াজ আর দূর থেকে ভেসে আসা সওদাগরদের হাঁকডাক মনটাকে চঞ্চল করে তুলত। আমার মতো আধন্যাংটো, ধুলোবালি মাখা শিশুদের কাছে রামপুরার হাট ছিল কোনো রূপকথার অচিনপুর।

সেদিন ছিল অঘ্রাণের এক নরম রোদমাখা বিকেল। বাবার আঙুল ধরে হাটে গিয়েছিলাম। বাবার উদ্দেশ্য ছিল সস্তার শীতের মুগ ডাল আর দুটো মাটির হাঁড়ি কেনা। কিন্তু আমার চোখ খুঁজছিল অন্য কিছু। হাটের উত্তর মাথায়, বুড়ো বটগাছটার নিচে যেখানে ভিড় জমেছিল সবচেয়ে বেশি, সেখান থেকে কাঁসার ঘণ্টার অবিরাম ঠুং-ঠাং শব্দ ভেসে আসছিল। মানুষের ভিড় ঠেলে, বাবার হাতের মুঠো আলগা করে আমি কোনোমতে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

সেখানেই প্রথম দেখেছিলাম তাকে। পরনে তার উজ্জ্বল লাল রঙের একটা আলখেল্লা, যার জরির সুতোগুলো অনেক জায়গায় ঘষা খেয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। মাথায় ময়ূরের পালক গোঁজা এক অদ্ভুত পাগড়ি। মুখখানা তামাটে, চোখ দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা। তার সামনে একটা কালো কাপড় পাতা, তার ওপর রাখা পিতলের একটা ঘটি, কাঠের দুটো ছোট গোলক আর একটা মরচে-পড়া রূপালী কৌটো।

লোকটা কোনো সাধারণ ফেরিওয়ালা নয়, সে ছিল জাদুকর। তার নাম কেলু ওস্তাদ। চারপাশের উৎসুক গ্রামবাসীর দিকে তাকিয়ে কেলু ওস্তাদ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, "নজর এক জায়গায় রাখিস বাপসকল! এই দুনিয়াটা চোখের পলকের ফাঁদে চলে। যা দেখিস তা নাই, আর যা নাই তাই চোখের সামনে নাচে!"

আমার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক অচেনা বাদ্য বাজছিল। কেলু ওস্তাদ তার দুই হাতের আস্তিন কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। তারপর জনতার দিকে চেয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, "আপনাদের মাঝখান থেকে কেউ একটা কাগজের নোট দিন তো দেখি! দশ টাকা, কুড়ি টাকা, কিংবা পঞ্চাশ টাকা। যার বুকের পাটা বড়, সে একখানা একশো টাকার নোট দিন। চোখের সামনে যা ঘটবে, বাড়ি ফিরে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারবেন না!"

ভিড়ের মধ্যে কানাঘুষো শুরু হলো। সে যুগে একশো টাকার নোট কোনো ফেলনা বিষয় ছিল না। চাষাভুষো মানুষের কাছে ওটা এক সপ্তাহের খোরাকি। হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন ইউনিয়ন পরিষদের কেরানি মহিম মুখুয্যে। পকেট থেকে একটা খাস্তা, কড়কড়ে একশো টাকার নোট বের করে তিনি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ওস্তাদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, "এই নাও ওস্তাদ। কিন্তু খবরদার, নোটের যদি কোনো ক্ষতি হয়, হাটের মাতব্বর দিয়ে চামড়া তুলিয়ে নেব!"

কেলু ওস্তাদ একগাল হাসল। পানের রসে লাল হয়ে থাকা তার দাঁতগুলো বিকেলের আলোয় চিকচিক করে উঠল। "ক্ষতি হলে ওস্তাদের কল্লা কেটে রেখে দেবেন, বাবু! তবে ক্ষতি নয়, যা হবে তা কেবল ঈশ্বরের কৃপায় হবে।"

ওস্তাদ নোটটি দুই আঙুলে তুলে ধরল। তারপর বাতাসে একবার নাড়া দিল,ফরফর করে উঠল কাগজের শরীর। এরপর সেই রূপালী কৌটোর ঢাকনা খুলে নোটটিকে ভাঁজ করে ভেতরে রেখে দিল। কৌটোর ডালা বন্ধ করে সে তার খড়ির কাঠি দিয়ে তিনবার ঠক ঠক করে আঘাত করল।

"ওরে ইন্দ্রের ঘোড়া, ওরে কুবেড়ের সিন্দুক! একে দশ করিস, দশকে শত করিস!" ওস্তাদ অদ্ভুত সুরেলা গলায় মন্ত্র পড়তে লাগল। তার চোখ দুটো যেন বিস্ফারিত হয়ে স্থির হয়ে রইল। চারপাশের গোটা হাট যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। পাশের তেলেভাজার কড়াইয়ের ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দটুকু ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ ছিল না। হঠাৎ এক ঝটকায় কৌটোর ডালা খুলে ফেলল ওস্তাদ। তারপর যা ঘটল, তা আমার কচি মস্তিষ্কে এক মহাভূমিকম্পের সৃষ্টি করল। ওস্তাদ কৌটোর ভেতর হাত ডোবাল। একখানা নয়, দুখানা নয়,পরপর বের করে আনতে লাগল একশো টাকার লালচে নোট!

একটা, দুটো, তিনটে... করে ঠিক দশটা নোট! ওস্তাদ বাতাসে সেই দশটি নোট মেলে ধরল। ঠিক যেন একখানা আস্ত ময়ূরের পাখা! মহিম মুখুয্যের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। ভিড়ের ভেতর থেকে একসঙ্গে শত শত মানুষের বিস্ময়ধ্বনি উঠল,"আরে বাপরে বাপ! এ যে স্বচক্ষে দেখা অলৌকিক কাণ্ড!" ওস্তাদ মুখুয্যে মশাইয়ের হাতে তার আসল নোটটি ফেরত দিয়ে বাকি নয়টি নোট নিজের আলখেল্লার পকেটে পুরে নিল। পুরো হাট তখন কেলু ওস্তাদের জয়গান গাইছে। আর আমি? আমি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।

একটি একশো টাকার নোট থেকে দশটি নোট! মুহূর্তের মধ্যে একশো টাকা হাজার টাকা হয়ে গেল? কোনো ঘাম ঝরাতে হলো না, রোদবৃষ্টিতে মাঠে কোদাল চালাতে হলো না, বাবার মতো হিসাবের খাতায় চোখ গুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হলো না? সেদিনই, সেই রামপুরার হাটের ধুলোমাখা বটতলায় দাঁড়িয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলেছিলাম। স্কুলে মাস্টারমশাই যখন জিজ্ঞেস করতেন, "বড় হয়ে কী হতে চাস?" কেউ বলত ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা পুলিশ। আমি মনে মনে বলতাম,আমি যাদুকর হব। একশো টাকার নোট থেকে দশটি নোট বানাব, শূন্য বাতাস থেকে ফুল ফোটাব, আর মানুষের দুঃখকষ্টগুলোকে একটা তুড়িতে হাওয়ায় উড়িয়ে দেব।

বাড়ি ফিরে আমার আর কোনো কাজে মন বসল না। পড়ার বইয়ের ভেতর চোখ রাখলে কেবলই রূপালী কৌটো আর কড়কড়ে একশো টাকার নোট ভাসত। আমার পরিবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ। বাবা ছিলেন স্থানীয় এক আড়তের সামান্য হিসাবরক্ষক। মাসকাবারে যে সামান্য কটি টাকা পেতেন, তা দিয়ে ডাল-ভাতের সংস্থান করতেই মা’র চোখের জল নাকের জলে এক হতো। আমাদের মাটির চালার ঘরটায় ফুটো দিয়ে বর্ষাকালে জল পড়ত। মা বাতের ব্যথায় ভুগতেন, টাকার অভাবে ডাক্তার দেখানো যেত না। প্রতি মাসের শেষে বাবাকে দেখতাম তেলের কুপি জ্বালিয়ে ছেঁড়া ডায়েরির পাতায় দেনা-পাওনার হিসাব মেলাতে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন।

একদিন রাতে বাবা খেতে বসেছেন। কাঁসার থালায় সামান্য একটু ফ্যানাভাত আর পোড়া লঙ্কা। বাবা মলিন হেসে মাকে বললেন, "বড়বাবুর কাছে দশটা টাকা ধার চেয়েছিলাম সুরেনের স্কুলের মাইনেটা দেব বলে। দিল না গো। বলল আড়তে নাকি মন্দা চলছে।" বাবার সেই করুণ মুখখানা দেখে আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। আমি ভাবলাম, কেলু ওস্তাদ কেন আমাদের বাড়ি আসে না? কেন সে বাবার শূন্য পকেটে একবার তার হাতটা বুলিয়ে দেয় না?

পরের দিন সকাল থেকেই আমার 'যাদুবিদ্যা' সাধনা শুরু হলো। বাড়ি থেকে একটা ভাঙা টিনের কৌটো আর বাঁশঝাড় থেকে একটা সোজা কঞ্চি কেটে আনলাম। কঞ্চিটায় কয়লা ঘষে কুচকুচে কালো করে নিলাম,ওটাই আমার জাদুকাঠি। কিন্তু জাদু দেখাতে হলে তো আসল টাকা চাই! আমার কাছে তো একটা কানাকড়িও নেই। অবশেষে বহু দ্বিধা আর ভয়ের পর, মায়ের ঠাকুরের সিংহাসনে রাখা লক্ষ্মীর মাটির ভাঁড়ের তলা থেকে চুরি করে একটা চকচকে এক টাকার অ্যালুমিনিয়ামের কয়েন বের করলাম। ভাবলাম, অন্যায় তো কিছু করছি না; একটা টাকাকে যদি দশটা বানাতে পারি, তবে তো নয়টা টাকা মাকেই ফিরিয়ে দেব! মা তখন কত খুশি হবে!

ঘরের কোণে বসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। কালো কাপড় নেই, তাই মায়ের একটা পুরনো কালো সুতির ওড়না মেঝেতে পাতলাম। তার ওপর রাখলাম সেই টিনের কৌটো। এক টাকার কয়েনটা কৌটোর ভেতর রেখে চোখ বন্ধ করলাম। কেলু ওস্তাদের মতো সুর করে আওড়াতে লাগলাম, "ওরে ইন্দ্রের ঘোড়া, ওরে কুবেড়ের সিন্দুক! একে দশ করিস, দশকে শত করিস!"

তিনবার কঞ্চি দিয়ে কৌটোয় আঘাত করলাম। বুকটা তখন ঢিপঢিপ করছে। নিশ্বাস বন্ধ করে ধীরে ধীরে কৌটোর ঢাকনা খুললাম। ভেতরে কেবল একটাই এক টাকার কয়েন পড়ে আছে। একটুও বদলায়নি।

আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। নিশ্চয়ই মন্ত্রে কোনো ভুল হয়েছিল! অথবা কঞ্চির কাঠিতে জাদু নেই! আমি আবার চেষ্টা করলাম। এবার আরও জোরে মন্ত্র পড়লাম। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। একবার, দুবার, দশবার... কিন্তু না। সেই একটা টাকাই স্থির হয়ে বসে রইল, কোনো ভাই-বেরাদর জন্মাল না।

হতাশায়, অপমানে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। মা ঢুকে আমাকে ওই অবস্থায় দেখে চমকে গেলেন।

"এ কী জামিল! তুই মেঝেতে ওসব কী করছিস? আর এটা তো মান্নতের টাকা!"

আমি আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। মাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলাম, "মা, আমি তো খারাপ কিছু করিনি! আমি চেয়েছিলাম এই একটা টাকাকে দশটা বানাতে। বাবার মাইনের টাকা হয়ে যেত, তোমার ওষুধের টাকা হয়ে যেত... হাটের যাদুকর তো পেরেছিল, আমি কেন পারলাম না?"

মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তাঁর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "ওরে পাগল ছেলে, ওসব হলো চোখের ভুল। ওসব মায়া। মানুষ যা চোখে দেখে, সব সত্যি নয়। জাদু দিয়ে যদি ভাত জুটত, তবে ওই যাদুকর কেন ছেঁড়া আলখেল্লা পরে হাটে হাটে ভিক্ষে করত রে?" মায়ের কথায় সেদিন কোনো যুক্তি খুঁজে পাইনি। আমার শিশুমন ভাবল, মা কিছু বোঝে না। ওস্তাদ নিশ্চয়ই কোনো আসল গুপ্তবিদ্যা জানে যা আমাকে শেখায়নি। আমার জেদ আরও চেপে বসল,যেভাবেই হোক, আমাকে আসল যাদুকর হতেই হবে।

বছরের পর বছর কাটতে লাগল। শৈশব পেরিয়ে আমি কৈশোরে পা দিলাম, তারপর প্রথম যৌবনে। কিন্তু বুকের ভেতরের সেই সুপ্ত বাসনাটা কোনোদিন ছাইচাপা পড়েনি। আমি বুঝতে শিখেছিলাম যে, রাস্তাঘাটের জাদুকররা যা দেখায় তাকে বলে 'হাতসাফাই' বা 'ইলিউশন'। কিন্তু আমার মন কেবল হাতসাফাইয়ে তৃপ্ত হতে চাইল না। আমি বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতে চাইতাম অতিপ্রাকৃতকে। আমি বিশ্বাস করতাম, এই ব্রহ্মাণ্ডে এমন কোনো গুপ্ত চাবি আছে, যা দিয়ে পার্থিব অভাব-অনটনকে এক লহমায় মুছে ফেলা সম্ভব।

কলেজে পড়ার সময় আমি শহরের পুরনো বইয়ের দোকানগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম। কামরূপ-কামাখ্যার তিব্বতি তন্ত্র, লাল কিতাব, ইন্দ্রজাল, হিপনোটিজম আর প্রাচীন মিশরের জাদুবিদ্যার বই খুঁজে খুঁজে পড়তাম। সহপাঠীরা যখন প্রেমিকা কিংবা চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন মেসবাড়ির অন্ধকার চিলেকোঠায় বসে মোমবাতি জ্বালিয়ে চোখের পলক না ফেলে মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকার সাধনা করতাম,যাকে বইয়ের ভাষায় বলে 'ত্রাটক যোগ'। ভাবতাম, দৃষ্টিশক্তি এমন ধারালো করব যে দেয়ালের ওপারে কী আছে দেখতে পাব, মানুষের মনের কথা পড়তে পারব।

কিন্তু বাস্তব বড় নির্মম। আমার স্বপ্নগুলো যখন ডানা মেলছে, তখনই সংসারে নেমে এল ঘোর অন্ধকার। বাবা হঠাৎ একদিন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়লেন। তাঁর শরীরের ডান পাশটা অবশ হয়ে গেল। আড়তের চাকরিটা চলে গেল মুহূর্তেই। যে সংসারের চাকা বাবার সামান্য আয়ে টেনেটুনে ঘুরত, তা এক নিমেষে থমকে দাঁড়াল। তখন আমার তাসের খেলা, ত্রাটক সাধনা আর ইন্দ্রজালের মন্ত্র কোনো কাজেই এল না। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ওষুধের দোকানে কোনো মন্ত্র চলে না; সেখানে লাগে আসল টাকা।

সেই প্রথম আমি প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অদ্ভুত আক্রোশ অনুভব করলাম। এতদিন ধরে যে জাদুর স্বপ্ন আমি বুনেছি, তা আমাকে এক ফোঁটা সাহায্য করতে পারছে না কেন? একদিন গভীর রাতে বাবার গোঙানির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম। নিজেকে বড় অপদার্থ মনে হলো। ঠিক তখনই মনে পড়ল কেলু ওস্তাদের কথা। শুনেছি সে এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছে, আর হাটে ঘোরে না। পাশের মহকুমার এক শ্মশানঘাটের কাছে কুঁড়েঘর বেঁধে থাকে। মানুষ বলে সে নাকি এখন তান্ত্রিক হয়ে গেছে।

পরদিন সকালেই কাউকে কিছু না বলে বাসে চড়ে বসলাম। আমাকে জানতেই হবে,সেই একশো টাকাকে দশটা করার আসল রহস্য কী ছিল? ওটা কি নিছকই হাতসাফাই, নাকি এর পেছনে কোনো গুপ্ত সত্য আছে? যদি থাকে, আজ আমার বাবার জন্য সেই জাদুর বড় প্রয়োজন।
মায়ানগর নামের সেই আধা-শহুরে জনপদের শেষ প্রান্তে, শ্মশান লাগোয়া এক নিমগাছের নিচে কেলু ওস্তাদের ডেরা। ভাঙাচোরা মাটির দেওয়াল, ওপরে খড়ের ছাউনি। উঠোনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাসের প্যাকেট, জং ধরা খাঁচা, আর কিছু শুকনো হাড়গোড়। কুঁড়েঘরের ভেতরে একটা টিমটিমে মাটির প্রদীপ জ্বলছিল। সেখানে চটের বস্তার ওপর বসে ছিল এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ।

তার চুল-দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গেছে। গায়ের সেই উজ্জ্বল লাল আলখেল্লাটা এখন শতচ্ছিন্ন, তালি মারা। কিন্তু চোখের সেই দৃষ্টি,সেই জ্বলন্ত কয়লার মতো দৃষ্টিটা এক ফোঁটাও ম্লান হয়নি।

আমি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাঁপা গলায় বললাম, "ওস্তাদজি..."

 বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকাল। তার কোটরগত চোখ দুটো দিয়ে আমাকে মাপল কয়েক মুহূর্ত। কর্কশ গলায় বলল, "কে রে তুই? হাত দেখাতে এসেছিস? ভূত ছাড়াবি? ওসব আমি ছেড়ে দিয়েছি বহুকাল। যা, ভাগ এখান থেকে!"

আমি এগিয়ে গিয়ে তার পায়ের কাছে বসে পড়লাম। "না ওস্তাদ, আমি হাত দেখাতে আসিনি। আমি আপনার সেই রামপুরার হাটের দর্শক। প্রায় পনেরো বছর আগে আমি আপনাকে একশো টাকার একটা নোট থেকে দশটা নোট বানাতে দেখেছিলাম। সেই থেকে আমি জাদুকর হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঘুরছি। আজ আমার বাবা মৃত্যুশয্যায়, আমাদের ঘরে অন্ন নেই। আমাকে দয়া করে সেই মন্ত্রটা শিখিয়ে দিন ওস্তাদ! কী করে একটা নোট থেকে দশটা নোট করতে হয়?"

আমার কথা শুনে কেলু ওস্তাদ কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ খিখি করে এক অদ্ভুত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির শব্দে ঘরের চালে বসে থাকা দুটো প্যাঁচা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। হাসতে হাসতে সে কাশতে লাগল, কাশির দমকে তার শীর্ণ শরীরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।

হাসি থামলে সে আমার দিকে অদ্ভুত করুণ দৃষ্টিতে তাকাল।

"তুই আজও সেই ঘোরের মধ্যে আছিস ছোকরা? তুই ভেবেছিস আমি জাদুকর?"

"তবে আপনি কী ছিলেন?" আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

কেলু ওস্তাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত বাড়িয়ে ভাঙা একটা মাটির মালসা থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে সে শান্ত গলায় বলল, "আমি ছিলাম এক ক্ষুধার্ত ভণ্ড। এক পেট-চালানো বাজিকর।"

"ভণ্ড?" আমার সারা শরীর যেন অবশ হয়ে এল।

"তবে সেই দশটা নোট? চোখের সামনে যে আপনি মহিম মুখুয্যের নোটটা কৌটোয় রেখে দশটা বের করলেন?"

ওস্তাদ মলিন হাসল। তার সেই ফোকলা দাঁতের হাসিতে কোনো রহস্য ছিল না, ছিল কেবল বেঁচে থাকার করুণ ইতিহাস।

"ওরে বোকা ছেলে, ওই রূপালী কৌটোটা ছিল দোতলা। তলপেটে একটা গোপন স্প্রিং ছিল। কৌটোর তলার খোপে আমি আগের থেকেই আমার নিজের জমানো, ঘাম ঝরিয়ে কামানো নয়টা একশো টাকার নোট ভাঁজ করে লুকিয়ে রেখেছিলাম। মুখুয্যের নোটটা ভেতরে ঢুকিয়ে ডালা বন্ধ করার সময় বুড়ো আঙুলের চাপে স্প্রিংটা আলগা করে দিতাম। ওপরের খোপের নোটটা নিচে চলে যেত, আর নিচের দশটা নোট এক হয়ে ওপরে ভেসে উঠত। কোনো মন্ত্র ছিল না রে বাপ, ওটা ছিল তামার পাত আর স্প্রিংয়ের কেরামতি!"

আমার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পনেরোটা বছর ধরে যে অলৌকিক বিশ্বাসকে আমি হৃদয়ে লালন করেছি, যা ছিল আমার সমস্ত স্বপ্নের ভিত্তিপ্রস্তর, তা নিছক একটা যান্ত্রিক ধোঁকাবাজি?

"নিজের টাকা?" আমি অস্ফুটে বললাম, "আপনি নিজের নয়শো টাকা লুকিয়ে রেখেছিলেন?"

"হ্যাঁ রে পাগলা!" ওস্তাদের গলার স্বর ভারী হয়ে এল, "হাটের মানুষদের বিশ্বাস করাতে হতো যে আমি বড় যাদুকর। তবেই না তারা খেলা শেষে আমার থালায় চারআনা, আটআনা পয়সা ফেলত! সেই পয়সা জমিয়েই তো আমার চাল-ডাল জুটত। আমি যদি একশো টাকাকে সত্যি সত্যি দশটা করতে পারতাম, তবে কি এই ছেঁড়া চটের ওপর শুয়ে বিড়ির ধোঁয়া গিলতাম? আমি কি তবে রাজার হালে থাকতাম না? সৃষ্টির নিয়ম ভাঙার ক্ষমতা কি মানুষের থাকে রে?"

কেলু ওস্তাদ উঠে দাঁড়াল। ঘরের কোণ থেকে একটা ধুলোবালি মাখা কাঠের বাক্স টেনে আনল। ডালা খুলে সে ভেতর থেকে বের করল সেই রূপালী কৌটোটা। মরচে ধরে ওটার রূপালী রং প্রায় চটে গেছে। কৌটোটা আমার হাতের তালুতে তুলে দিয়ে সে বলল, "এই নে তোর জাদু। নিয়ে যা। যদি পারিস, এটা দিয়ে কোনো হাটে দাঁড়িয়ে দশটা মানুষকে বোকা বানিয়ে দুটো পয়সা রোজগার করিস। কিন্তু মনে রাখিস, পেটের জাদুই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাদু, আর সেই জাদুর কোনো মন্ত্র হয় না।"

আমি স্তব্ধ হয়ে সেই কৌটোটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। যে জিনিসটাকে একদিন আমার কাছে আলাদিনের প্রদীপ মনে হয়েছিল, আজ তা কেবলই এক টুকরো মূল্যহীন টিন ছাড়া আর কিছুই নয়।

নদির ঘাট থেকে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারপাশের গাছপালাগুলো অন্ধকারে আবছা হয়ে আসছে। আমার ভেতরের শিশুটা সেদিন পুরোপুরি মরে গেল।

 আমি বুঝলাম, আকাশ থেকে কোনো মন্না-সালওয়া নাজিল হয় না। শূন্য হাত নাড়িয়ে ভাতের থালা ভরানো যায় না। জীবনটা কোনো ম্যাজিক শো নয়; জীবন এক নির্মম যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার জন্য ঘাম আর রক্ত দিয়ে লড়াই করতে হয়।

বাড়ি ফিরে আমি আমার সমস্ত জাদুর বই, সেই কালো কাপড়, ত্রাটকের মোমবাতি,সবকিছু উঠোনের এক কোণে স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দিলাম। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আমার শৈশবের স্বপ্ন, কৈশোরের মোহ আর যৌবনের অন্ধবিশ্বাস। ছাই হয়ে উড়ে গেল আমার "যাদুকর" হওয়ার ইচ্ছে। কেবল সেই মরচে-পড়া রূপালী কৌটোটা ফেলে দিতে পারলাম না। ওটাকে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম,আমার আজন্ম বোকামির স্মারকচিহ্ন হিসেবে।

পরদিন থেকেই শুরু হলো আমার অন্য এক লড়াই। যে অহংকার আমাকে এতদিন সাধারণ কাজ করতে বাধা দিত, তা চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। টিউশনি শুরু করলাম। সকালে দুটো, সন্ধ্যায় তিনটে। রাত জেগে এক প্রকাশনীর প্রুফ দেখার কাজ নিলাম। দিনে আঠারো ঘণ্টা খাটতাম।

বাবা আর বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে তিনি দেখে গিয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে আর হাওয়ায় ভাসা কোনো স্বপ্নচারী নয়, সে মাটির ওপর শক্ত পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে।

বাবার শ্রাদ্ধের দেনা শোধ করতে আমার তিন বছর সময় লেগেছিল। তারপর আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকের করণিক পদে পরীক্ষা দিলাম এবং চাকরিটা পেয়ে গেলাম। জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলতে লাগল। মা চলে গেলেন এক শান্ত শীতের রাতে। আমি একা হয়ে গেলাম। তারপর এক শুভদিনে সহকর্মীদের পছন্দে বিয়ে করলাম মিতাকে। ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিলাম শহরের এক শান্ত পাড়ায়। আমাদের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান হলো,তার নাম রাখলাম কুঁড়ি।

ব্যাংকের ডেস্কে বসে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার নোট গুনতাম। ক্যাশ কাউন্টারে বসে আঙুলের ডগায় জল লাগিয়ে যখন খড়খড় করে নোটের বান্ডিল গুনতাম, তখন মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠত। ভাবতাম,ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! একসময় যে হাত দিয়ে শূন্য থেকে টাকা বানাতে চেয়েছিলাম, আজ সেই হাত কেবল অন্যের টাকা গুনে গুনে ক্লান্ত হয়। দিনশেষে সেই কাচের খাঁচা থেকে বের হয়ে আমার পকেটে থাকে কেবল মাসের বাঁধা মাইনে।

আমি এখন পুরোপুরি একজন বাস্তববাদী, কেরানি-মার্কা মধ্যবিত্ত মানুষ। মাসের প্রথম সপ্তাহে বাজারের ফর্দ মেলাই, বিদ্যুৎ বিল আর বাড়ি ভাড়ার হিসাব কষি। জাদুকর হওয়ার সেই পুরনো ইচ্ছেটা এখন আমার কাছে রূপকথার গল্পের মতো দূরের কোনো দ্বীপের স্মৃতি।

সময় নদীর জলের মতো বয়ে যায়। দেখতে দেখতে কুঁড়ির বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। ওর বড় বড় চোখ দুটোর দিকে তাকালে আমি মাঝে মাঝে নিজের শৈশবকে দেখতে পেতাম। কী অপার বিস্ময় নিয়ে সে এই পৃথিবীটাকে দেখে! প্রজাপতির পেছনে ছোটে, বৃষ্টির ফোঁটা ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, আর চাঁদের বুড়ির চরকা কাটার গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ে।একদিন অফিস থেকে ফিরেছি। শরীরটা অসম্ভব ক্লান্ত। মাস শেষের চাপ চলছে ব্যাংকে, মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করেছি, এমন সময় কুঁড়ি এসে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

"বাবা! ও বাবা! ওঠো না, দেখো আমার কী হয়েছে!"

আমি চোখ খুলে দেখলাম, তার ছোট্ট ডান হাতটা শক্ত করে মুঠো করা। মুখখানা ভীষণ গম্ভীর।

"কী হয়েছে মা?" আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

কুঁড়ি তার মুঠো করা হাতটা আমার নাকের সামনে তুলে ধরে বলল, "বলো তো আমার হাতে কী আছে?"

আমি হাসলাম। "চকলেট?"

"উঁহু, হয়নি!" সে মাথা নাড়ল।

"তবে কি কোনো পুতুল?"

"একদম না! তুমি চোখ বন্ধ করো, আমি জাদু দেখাব!"

আমি ক্লান্ত মুখে চোখ বন্ধ করলাম। কুঁড়ি তার কচি গলায় সুর করে বলল, "আব্রাকা ডাব্রা... ছু মন্তর ছু!"

তারপর সে আমার গালে হাত দিয়ে বলল, "এবার চোখ খোলো!"

 আমি চোখ খুললাম। কুঁড়ি তার ছোট্ট হাতের মুঠো খুলে ধরেছে। সেখানে কিছু নেই, হাতটা সম্পূর্ণ খালি। কিন্তু ওর মুখে বিজয়ের এক অদ্ভুত দীপ্তি! সে খিলখিল করে হেসে উঠল, "দেখেছ বাবা? আমার হাতে একটা লাল পিঁপড়ে ছিল, আমি ওটাকে বাতাসে মিলিয়ে দিয়েছি! আমি জাদুকর হয়ে গেছি!"

কুঁড়ির সেই নিষ্পাপ হাসি আর চোখের আনন্দ দেখে আমার বুকের ভেতর বহু বছর ধরে জমে থাকা বরফ যেন এক নিমেষে গলে গেল। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমার ড্রয়ারের গভীরে লুকিয়ে রাখা সেই পুরনো মরচে-পড়া রূপালী কৌটোটার কথা। আমি উঠে গিয়ে ড্রয়ার খুলে কৌটোটা বের করে আনলাম। অনেক বছর পর ওটা আমার হাতে উঠল। ধুলো মুছে আমি কুঁড়ির সামনে এসে বসলাম।

মিতাও রান্নাঘর থেকে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে আমাদের দেখছিল।

আমি কুঁড়িকে বললাম, "কুঁড়ি, তুমি তো অনেক বড় জাদুকর। কিন্তু তুমি কি জানো, তোমার বাবাও একসময় জাদু জানত?"

কুঁড়ির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "সত্যি বাবা? তুমি জাদু পারো? দেখাও না!"

আমি সোফার পেছনে রাখা ফুলদানি থেকে নিঃশব্দে একখানা লাল কাগজের তৈরি কৃত্রিম গোলাপ তুলে নিলাম,যা মিতা ড্রয়িংরুম সাজানোর জন্য কিনেছিল। অতি সন্তর্পণে, বহু বছর আগে শেখা সেই সামান্য হাতসাফাইয়ের কায়দায় ফুলটিকে আমার বাঁ হাতের তালুর পেছনে আড়াল করে রাখলাম।

তারপর রূপালী কৌটোটা কুঁড়ির সামনে রাখলাম।

"কুঁড়ি, এই কৌটোটা খালি, তাই না?" আমি ডালা খুলে দেখালাম। ভেতরে কিচ্ছু নেই।

"হ্যাঁ বাবা, খালি।"

"এবার দেখো।" আমি ডালা বন্ধ করলাম।

তারপর কুঁড়ির হাতটা ধরে কৌটোর ওপর রাখলাম। বললাম, "তুমি আর আমি মিলে মন্ত্র পড়ব। বলো,ওরে মেঘের দল, ওরে বনের পাখি, যা নেই তাকে এনে দে দেখি!"

কুঁড়ি আমার সঙ্গে সুর মিলিয়ে চিৎকার করে বলল, "এনে দে দেখি!"

আমি নিঃশব্দে হাতের তালু ঘুরিয়ে, এক ঝটকায় ডালা খুলে কৌটোর ওপর থেকে সেই লাল গোলাপটি কুঁড়ির চোখের সামনে তুলে ধরলাম।

"এই দেখো!"

কুঁড়ির মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। তারপর সে আনন্দে চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল, "গোলাপ ফুল! বাবা খালি কৌটো থেকে গোলাপ ফুল বের করেছে! মা, দেখো, বাবা সত্যিই জাদুকর!"

সে ফুলটি নিয়ে সারা ঘরময় নাচতে লাগল। মিতা দরজায় দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধ হাসিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আর আমি? আমি বসে রইলাম সেই সোফাটায়। আমার চোখের কোণ দিয়ে দুটো ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আজ চল্লিশ বছর বয়সে এসে, এই ছোট্ট ড্রয়িংরুমে বসে আমি জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি উপলব্ধি করলাম। কেলু ওস্তাদ ভুল বলেছিল। এই পৃথিবীটা কেবল পেট-চালানো ধোঁকাবাজি আর তামার স্প্রিংয়ের কেরামতি নয়। জাদু সত্যিই আছে

যে বাবা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দিনশেষে সন্তানের জন্য এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট নিয়ে বাড়ি ফেরে এবং সন্তানের হাসিমুখ দেখে নিজের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে যায়,সে-ই তো আসল জাদুকর। যে মা সামান্য একটু ডাল-ভাতকে পরম মমতায় অমৃত বানিয়ে পরিবারের মুখে তুলে দেয়,সে-ই তো সবচেয়ে বড় ঐন্দ্রজালিক।

যে মানুষটি চরম দুঃখের মধ্যেও অন্য একজনকে একটুখানি আশার আলো দেখাতে পারে, সে-ই তো প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ যাদুকর। ছোটবেলায় আমি একশো টাকার নোট থেকে দশটি নোট বানানোর ক্ষমতা চেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম সেটাই শ্রেষ্ঠ জাদু। আজ আমি বুঝেছি, অভাব আর কষ্টের এই ধূসর পৃথিবীতে এক ফোঁটা নির্ভেজাল আনন্দ তৈরি করতে পারার চেয়ে বড় কোনো জাদুবিদ্যা এই ব্রহ্মাণ্ডে আর নেই।

 আমি আমার মরচে-পড়া রূপালী কৌটোটার দিকে তাকালাম। ওটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওটা আর কোনো প্রতারণার স্মারক নয়; ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। বাইরে তখন ঝুপ করে রাত নেমেছে। শহরের রাজপথে নিয়ন আলোগুলো জ্বলে উঠছে একের পর এক। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠান্ডা বাতাস আমার কপাল ছুঁয়ে গেল। আমি মনে মনে বললাম,হ্যাঁ, ওস্তাদজি, আমি আজ সত্যিই যাদুকর হয়েছি। আমার সেই ইচ্ছে পূরণ হয়েছে।

 

 

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login