ঢাকা মহানগরের বিরামহীন, যান্ত্রিক কোলাহল যেখানে এসে ক্লান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, ঠিক সেখান থেকেই এক মায়াবী নীরবতার চাদর মুড়ি দিয়ে জেগে থাকেÑশ্যামলপুর। ইট-কাঠের জঞ্জাল এখানে হার মেনেছে প্রকৃতির স্নিগ্ধ, সবুজ আলিঙ্গনের কাছে। শহরের সীমানা পেরোলেই রাস্তার দুপাশে মাথা দুলিয়ে স্বাগত জানায় শুভ্র কাশফুলের সারি যেন তারা শরতের শ্বেতবসন পরিহিতা কোনো অপ্সরী। আর সেই প্রকৃতির কোলে, শতবর্ষী গাছেদের নিবিড় ছায়ায় মমতা মাখানো এক বিদ্যাপীঠ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে- ‘শ্যামলপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। এর প্রতিটি ইটের পাঁজর ঘেঁষে লেখা আছে কতশত কিশোর-কিশোরীর বেড়ে ওঠার ইতিহাস, কত না বলা প্রেমের আখ্যান আর ভাঙাগড়ার গল্প।
ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়েছিল চারটি ভিন্ন হৃদয়ের এক অদ্ভূত রসায়নের গল্প। চারটি ভিন্ন গতিপথের নদী যেমন মোহনায় এসে একাকার হয়ে যায় তেমনি বন্ধুত্বের মোহনায় মিশেছিল তারা।
সময়টা ছিল সেপ্টেম্বর। শরতের আকাশ তখনো বর্ষার মায়া কাটাতে পারেনি। নীল আকাশের বুকে মাঝেমধ্যেই জমে উঠছে অভিমানী কালো মেঘ আর ঝরছে অঝোর ধারা। এমনই এক বৃষ্টিস্নাত সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রথম দেখা হলো তাদের। একাদশ শ্রেণির প্রথম দিন। বাতাসে নতুন বইয়ের মলাটের সেই মাদকতাময় গন্ধ আর বৃষ্টিভেজা মাটির সেঁাদা ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। কলেজের করিডরে তখন অচেনা মুখগুলোর ভিড়, নবীনদের চোখেমুখে শঙ্কা আর উত্তেজনার মিশ্রণ। সেই ভিড়ের মাঝেই সহসাই চারটি প্রাণ খুঁজে পেল এক অদৃশ্য সুতোর টান। তখনও কেউ জানত না ক্ষণিকের এই দেখাই একদিন মহাকালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
রিদওয়ান: একাকীত্বের সম্রাট
ক্লাসরুমের একদম শেষ প্রান্তের জানালার পাশটা যেন তার অঘোষিত রাজত্ব। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে আর জানালার কাঁচ চুইয়ে পড়া সেই বৃষ্টির ফোঁটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রিদওয়ান। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক জোড়া অত্যন্ত পর্যবেক্ষণশীল চোখ। কোলে তার নিত্যসঙ্গীÑ একখানা বাউণ্ডুলে খাতা আর হাতে ধরা কলম। সে কথা বলে কম কিন্তু তার সেই নীরবতাই যেন হাজার শব্দের আধার। ক্লাসের হইচই তাকে স্পর্শ করে না। কেউ কেউ তাকে আড়চোখে দেখে ফিসফিস করে বলে ‘বোরিং’ বা ‘আঁতেল’। রিদওয়ান সব শোনে কিন্তু প্রতিবাদ করে না; কেবল ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রাখে এক রহস্যময় মুচকি হাসি। সে জানে, শব্দের বুননে সে যে জগত তৈরি করতে পারে তা এই দৃশ্যমান জগতের চেয়েও বিশাল ও রঙিন। তার কাছে নিঃসঙ্গতা মানে একাকীত্ব নয় বরং নিজের আত্মার সাথে বোঝাপড়ার এক শ্রেষ্ঠ সময়।
সানিদ: প্রাণোচ্ছল এক ঝড়
ঠিক যেন রিদওয়ানের উল্টো মেরুর বাসিন্দা সানিদ। ক্লাসে তার প্রবেশটাই হলো ঝড়ের মতো। দরজা দিয়ে ঢুকতেই তার মুখের উজ্জ্বল হাসি যেন মেঘলা দিনে এক ফালি রোদ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। প্রাণোচ্ছল, দুরন্ত এক তরুণ। তার হাসিতে এমন এক জাদুকরী আকর্ষণ আছে যে, অপরিচিত কেউও তাকে আপন ভাবতে বাধ্য হয়। ক্লাসে ঢোকার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে পেছনের বেঞ্চ থেকে সামনের বেঞ্চ- সবার সাথে হাইÑহ্যালো শেষ করে ফেলেছে। টিফিনের ফাঁকে বন্ধুর চিপস চুরি করে খাওয়া থেকে শুরু করে জটিল অংকের ক্লাসে হাসির রোল ওঠানো- সানিদ সবখানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ‘ক্রাশ’ খাওয়া আর মেয়েদের সাথে সখ্যতা গড়া তার কাছে এক ধরণের শিল্প। কিন্তু এই চপলতার আড়ালে যে এক বিশ্বস্ত বন্ধু লুকিয়ে আছে, যে কি না বন্ধুদের জন্য জান দিতেও প্রস্তুত- তা বুঝতে হয়তো একটু সময় লাগে।
তানভীর: কাঁচের মতো স্বচ্ছ হৃদয়
দরজার কাছে খুব সংকোচে দাঁড়িয়ে ছিল তানভীর। সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ সে। স্বভাবটা ঠিক যেন কাঁচের মতোÑস্বচ্ছ এবং ভঙ্গুর। মুখে সর্বদা এক ম্লান, লাজুক হাসি লেগেই থাকে। তার চোখের দিকে তাকালে এক পবিত্র সরলতা খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষের কথায় সহজে বিশ্বাস করা তার সহজাত প্রবৃত্তি আর এটাই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। পরীক্ষায় এক নম্বর কম পেলে তার মন খারাপ হয়, চোখ ছলছল করে ওঠে। অথচ রাস্তার ধারের কোনো ভিখারির চোখে জল দেখলে সে নিজের টিফিনের টাকা অকাতরে দিয়ে দেয়, নিজের ক্ষুধার কথা ভুলে যায়। তানভীরের হৃদয়টা এতটাই নরম যে, সামান্য আঘাতেই সেখানে দাগ পড়ে যায়। সে ভালোবাসা পেতে চায় কিন্তু চাইতে জানে না।
সুনিয়া: ধ্রুবতারার দীপ্তি
সবশেষে এল সে- সুনিয়া। চারজনের বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু। যখন সে ক্লাসে প্রবেশ করল, মনে হলো এক পশলা বসন্তের বাতাস বয়ে গেল পুরো ঘরে। চুলে সাধারণ একটা ক্লিপ, পোশাকে নেই কোনো বাহুল্য কিন্তু তার ব্যক্তিত্বে আছে এক অদ্ভুত ধ্রুবতারার দীপ্তি। সে কেবল রূপবতীই নয়, তার হাঁটাÑচলায়, তাকানোয় আছে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস। প্রথম দিনেই ক্লাসের অধিকাংশ ছেলের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিলেও সুনিয়ার চোখে ছিল অন্য ঘোর। সে স্বপ্ন দেখে আকাশ ছেঁায়ার। তার বাচনভঙ্গি এতটাই মুগ্ধকর যে, সে কথা বললে চারপাশ শান্ত হয়ে শুনতে চায়। সে জানে সে কী চায় আর তা অর্জনের জন্য কতটা পথ হাঁটতে হবে।
বৃষ্টি তখনো থামেনি। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর ভেতরে নতুন ক্লাসের গুঞ্জন। নিয়তি তখন খুব গোপনে তার চিত্রনাট্য সাজাচ্ছিল। চারটি ভিন্ন রঙের সুতো- গম্ভীর রিদওয়ান, চঞ্চল সানিদ, লাজুক তানভীর আর দীপ্তিময়ী সুনিয়াÑ ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল এক অমোঘ গ্রন্থির দিকে। শ্যামলপুরের সেই ভেজা বাতাস সেদিন হয়তো ফিসফিস করে বলেছিল, ‘শুরু হলো এক নতুন গল্পের, যার নাম-বন্ধুত্ব।’