FF.
মঞ্চের আহ্বান: ভিন্ন সুরের এক অভিন্ন সিম্ফনি Book page

Chapter 2

মঞ্চের আহ্বান: ভিন্ন সুরের এক অভিন্ন সিম্ফনি

Sep 21, 2026 4 min read

সেদিন ক্লাসে যখন বাংলা শিক্ষক গম্ভীর স্বরে ঘোষণা দিলেন, ‘বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসবে মঞ্চস্থ করতে হবে একটি নাটক’, তখন পুরো ক্লাসে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। কিন্তু আসল চমকটা অপেক্ষা করছিল তখনও। স্যার দল গঠন করতে গিয়ে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে বা হয়তো নিয়তির ইশারায় চারটি নাম একসাথে উচ্চারণ করলেন- ‘রিদওয়ান, সানিদ, তানভীর আর সুনিয়া’। তখন ক্লাসের অনেকেই মুখ টিপে হাসল। আগুন আর জলকে কি কখনও এক পাত্রে রাখা যায়?

কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসবের আর মাত্র এক মাস বাকি। ‘নাট্য পরিবেশনা’ এই উৎসবের হৃদপিণ্ড। হাজারও দর্শকের সামনে নিজেদের প্রমাণ করার এই লড়াইয়ে নামল এমন চারজন মানুষ, যাদের চিন্তার জগৎ একে অপরের চেয়ে আলোকবর্ষ দূরে। ক্লাসের করিডোরে, ক্যান্টিনের আড্ডায় বাজি ধরা শুরু হয়ে গেল- ‘এই দল টিকবে না, দুদিনেই ভেঙে যাবে।’ বন্ধুদের এই অবজ্ঞা তাদের চারজনের কানেও পৌঁছাল। আর ঠিক তখনই নিছক এক ‘নাটক’ তাদের কাছে হয়ে উঠল এক অঘোষিত যুদ্ধ, এক অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ।

প্রথম কয়েকটা দিন ছিল চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার। চারজনের চারটি ভিন্ন মেরু যেন কিছুতেই এক হতে চাইছিল না।

সুনিয়া: ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা মেয়েটি, যার জগৎ ভীষণ গোছানো, গম্ভীর এবং রিজার্ভ।

তানভীর: পেছনের সারির লাজুক ছেলেটি, যার চোখের ভাষায় অনেক কথা থাকলেও মুখে জড়তার আড়ষ্টতা।

সানিদ: যার কাছে জীবনটা একটা জোকস, সব কিছুতেই তামাশা খোঁজা যার স্বভাব।

রিদওয়ান: যে ক্লাসে থেকেও যেন নেই সর্বদা ডুবে থাকে নিজের ভাবনার এক নিজস্ব খেয়ালে।

সংঘাতের শুরু হলো চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্ট নিয়ে। ক্যাম্পাসের লনে গোল হয়ে বসে প্রথম মিটিংয়েই বেধে গেল তুমুল তর্ক।

সুনিয়া নিজের নোটবুক খুলে বলল, ‘দেখো, আমাদের মান বজায় রাখতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ারের কোনো ক্লাসিক নাটকই সেরা হবে। সেখানে গাম্ভীর্য আছে, সাহিত্যের ওজন আছে।’

তানভীর আমতা আমতা করে প্রতিবাদ করল, ‘কিন্তু... কিন্তু বর্তমান সময়টা দেখব না? আমাদের উচিত আধুনিক, সমাজÑসচেতন কিছু করা। যা মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেবে।’

সানিদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হইহই করে উঠল, ‘আরে ধুর! তোদের এসব প্যানপ্যানানি কে দেখবে? নাটক হবে জম্পেশ হাসির! দর্শক পেট চেপে হাসবে, সিটি বাজাবে। ট্র্যাজেডি দিয়ে কি আর জীবন চলে?’

তর্ক যখন তুঙ্গে, চিৎকার-চেঁচামেচিতে যখন কান পাতা দায় তখন এতক্ষণ চুপ করে থাকা রিদওয়ান খাতা থেকে মুখ তুলল। তার শান্ত চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা মুহূর্তেই সবাইকে থামিয়ে দিল। সে ধীর কিন্তু ইস্পাতকঠিন স্বরে বলল, ‘আমরা কেন অন্যের লেখা ধার করা গল্প বলতে যাব? আমরা চারজন চার রকম। আমাদের নিজেদের জীবনের হাসি, কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর না বলা কথাগুলো দিয়ে যদি একটা গল্প সাজাই? মেকি চরিত্রের চেয়ে রক্ত-মাংসের সত্য গল্প কি দর্শকদের বেশি ছোঁবে না?’

মুহূর্তের জন্য বাতাস ভারী হয়ে গেল। সানিদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, সুনিয়া ভাবুক হয়ে পড়ল। রিদওয়ানের প্রস্তাবটা যেন তীরের মতো বিঁধল সবার মনে। সত্যিই তো, অন্যের গল্প তো সবাই বলে, নিজেদের কথা কজন বলে?

শুরু হলো নতুন এক লড়াই। কলেজের লাইব্রেরির ধুলোমাখা নির্জন কোণে, কখনো বা ক্যাম্পাসের শেষ প্রান্তের সেই বিশাল প্রবীণ ছাতিম গাছতলায়-বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল তাদের আড্ডায়। স্ক্রিপ্ট লেখা কি আর সহজ কাজ? ঝগড়া হলো, তীব্র মান-অভিমান হলো। কেউ একজন রাগ করে চলে গেল, আবার পরদিন ঠিকই ফিরে এল একবুক মায়া নিয়ে।

প্রথম খসড়া পড়ার পর সুনিয়া মুখ ভার করে বলেছিল, ‘এটা বড্ড কাঁচা, রিদওয়ান। এতে গভীরতা নেই, এটা কারো হৃদয় স্পর্শ করবে না।’ সেই কথাটি হয়তো খুব কড়া ছিল কিন্তু তা ছিল সততায় মোড়ানো। সেই অভিমানে আর জেদে তারা আবার বসল। এবার আর কলম দিয়ে নয় তারা লিখতে শুরু করল হৃদয় দিয়ে।

নিজেদের পুরোনো স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে তারা বের করে নিয়ে এলো জীবনের গোপন অধ্যায়গুলো। রিদওয়ান তুলে আনলো মধ্যবিত্ত পরিবারের নোনাধরা দেয়ালের ভেতরের সংগ্রাম, বয়ঃসন্ধির বিভ্রান্তি আর কোনো এক ভাঙা সম্পর্কের অব্যক্ত হাহাকার। তানভীর শোনাল মফস্বল শহরের কুয়াশাচ্ছন্ন স্বপ্ন, নিজের কষ্টের কথা বলল, সানিদ শোনাল তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা একাকীত্বের গল্প। সুনিয়ার গাম্ভীর্যের আড়ালে যে কোমল মনটি লুকিয়ে ছিল, তাও বেরিয়ে এল।

ধীরে ধীরে সাদা কাগজের পাতায় ফুটে উঠতে শুরু করল এক জীবন্ত আখ্যান। এটি আর নিছক কোনো নাটক রইল না এটি হয়ে উঠল তাদের চারটি আত্মার প্রতিচ্ছবি। ছাতিম তলায় বসে যখন তারা ফাইনাল স্ক্রিপ্ট পড়ছিল তখন বিকেলের শেষ আলোয় চারজনের চোখই ছলছল করছিল। তারা বুঝতে পারল- তারা কেবল একটি নাটক লিখছে না, তারা একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.