অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন- সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সকাল থেকেই প্রকৃতির মেজাজটা কেমন যেন গম্ভীর। আকাশটা মেঘলা, বাতাসের ভারি ভাব যেন বলে দিচ্ছিল আজ বিশেষ কিছু ঘটতে চলেছে। অডিটোরিয়ামের বিশাল চত্বর জুড়ে উৎসবের আমেজ কিন্তু ব্যাকস্টেজের মেকআপ রুমে তখন বিরাজ করছে শ্বাসরূদ্ধকর নিস্তব্ধতা।
চারজন মানুষ- রিদওয়ান, সানিদ, তানভীর আর সুনিয়া। পরস্পরের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, তবু সেই হাতে যেন প্রাণের স্পন্দন নেই, আছে কেবল হিমশীতল ভয়। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে কামারের হাঁপানির মতো। কপালে বিনবিনে ঘাম, চোখেমুখে এক অজানা আতঙ্ক। সবার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- ‘যদি সংলাপ ভুলে যাই? যদি টাইমিং ভুল হয়? দর্শকরা যদি না হাসে? কিংবা যদি বিদ্রুপের হাসি হেসে ওঠে?’ এত দিনের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম কি তবে ধুলোয় মিশে যাবে?
মঞ্চের ওপরে তখন হাজার ওয়াটের আলোর ঝলকানি। ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে এল, শুরু হতে যাচ্ছে নাটক। নাটকের শিরোনাম: ‘একটি স্বপ্নের গল্প’। নিঃশব্দে পর্দা সরে গেল। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মৃদু গুঞ্জন মুহূর্তেই থেমে গেল। হাজার জোড়া চোখ তখন মঞ্চের দিকে নিবদ্ধ।
যখন তারা প্রথম মঞ্চে পা রাখল, মনে হলো পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। কিন্তু সেই কম্পন স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। প্রথম সংলাপটি উচ্চারণ করার সাথে সাথেই ঘটে গেল এক অলৌকিক রূপান্তর। যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় তাদের ব্যক্তি সত্তা উবে গেল কর্পূরের মতো। তারা তখন আর গম্ভীর রিদওয়ান, চঞ্চল সানিদ, আবেগপ্রবণ তানভীর বা শান্ত সুনিয়া নয়। তারা তখন নাটকের জীবন্ত চরিত্র।
মঞ্চের একপাশে একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার, উপরে একটি স্তিমিত ল্যাম্পশেড জ্বলছে। অন্যপাশে চার রঙের চারটি বড় কাঁচের জার, যা চারজন বন্ধুর ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতীক। ব্যাকগ্রাউণ্ডে খুব ধীর লয়ে একটি বাঁশির সুর বাজছে।
(মঞ্চ অন্ধকার। হঠাৎ স্পটলাইট পড়ে রিদওয়ানের ওপর। সে মঞ্চের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এটিই তার সেই প্রস্তাবিত ‘রক্ত-মাংসের’ সংলাপ।)
রিদওয়ান: ‘আমরা সবাই অভিনেতা, তাই না? প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা করে অদৃশ্য মুখোশ পরি। মা-বাবার সামনে বাধ্য সন্তানের মুখোশ, বন্ধুদের সামনে চিরকাল হাসিখুশি থাকার মুখোশ আর সমাজের সামনে এক সফল মানুষের মুখোশ। কিন্তু... যখন মাঝরাতে আয়নার সামনে দাঁড়াই তখন সেই মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষটাকে চিনতে পারি কি?’
(এ সময় মঞ্চের একপাশ থেকে হালকা আলোয় সুনিয়াকে দেখা যায়। সে একটি ডায়েরি হাতে বসে আছে। তার কণ্ঠে আভিজাত্য নয় বরং এক অদ্ভুত একাকীত্ব।)
সুনিয়া: ‘আমার বাবা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই। মা চেয়েছিলেন প্রকৌশলী। অথচ কেউ জানতে চায়নি আমার ডায়েরির পাতায় বন্দী থাকা ওই নীলচে কবিতাগুলো কী চায়। আমি ক্লাসে চুপ থাকি কারণ আমার চিৎকার কেউ শুনবে না। গম্ভীর থাকাটা আমার স্বভাব নয়, ওটা আমার আত্মরক্ষার ঢাল।’
(মঞ্চের অন্য কোণ থেকে সানিদ ধীর পায়ে হেঁটে আসে। তার হাতে একটি ভাঙা গিটার। তার চিরচেনা হাসিটা আজ নেই।)
সানিদ: ‘সবাই বলে আমি খুব হাসাতে পারি। কিন্তু কেউ জানে না আমার ঘরের নোনাধরা দেয়ালে কতগুলো দীর্ঘশ্বাস জমা হয়ে আছে। সানিদ হাসছে মানেই সানিদ ভালো আছে- এই ধারণাটাই আমার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমি হাসাই কারণ আমি চাই না কেউ আমার মতো করে একাকীত্বের স্বাদ পাক।’
(তানভীর মঞ্চের এক অন্ধকার কোণ থেকে আলোয় বেরিয়ে আসে। সে কিছুটা কাঁপছে কিন্তু তার চোখে আজ সাহস।)
তানভীর: ‘আমি যখন কথা বলতে যাই, শব্দগুলো আমার গলায় আটকে যায়। মানুষ হাসে। অথচ সেই আটকে যাওয়া শব্দগুলোর ভেতরে কতগুলো অব্যক্ত ভালোবাসা ছিল, কতগুলো জমাট বাঁধা অভিযোগ ছিল- তা শোনার ধৈর্য কারও হয়নি। আজ আমি সেই সব হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো বলতে চাই।’
(রিদওয়ান একাকী মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে)
রিদওয়ান: ‘আপনারা ভাবছেন এটা একটা নাটক? না! এটা একটা আয়না। যেখানে আমরা নিজেদের খুঁজে পাচ্ছি। জীবনটা তো আসলে একটা জেমস চকলেটের প্যাকেট। বাইরে থেকে নানা রঙের হাতছানি কিন্তু ভেতরটা সবারই এক- সেই চকলেটের মতোই মিষ্টি আর তিতকুটে অনুভূতির মিশ্রণ। আমরা আজ এখানে জয়ী হতে আসিনি, এসেছি নিজেদের মুক্তি দিতে। এই চারজন বন্ধু আজ একে অপরের হাত ধরেছি কেবল একটা পারফর্মেন্স করার জন্য নয় বরং এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নিজেদের খুঁজে পাওয়ার জন্য। (দর্শকদের দিকে তাকিয়ে) আপনাদের ভেতরেও কি কোনো এক তানভীর, কোনো এক সুনিয়া বা সানিদ ডুকরে কাঁদছে না? হাত বাড়িয়ে দিন তাঁদের দিকে। কারণ দিনের শেষেÑবন্ধুই হলো সেই আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি আর সেই হারানো নিজেকেই আবার নতুন করে খুঁজে পাই।’
তাদের প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি নড়াচড়ায়, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে দর্শকরা নিজেদের ছায়া দেখতে পেল। সানিদের কৌতুক দর্শকদের হাসাল, তানভীরের কান্না দর্শকদের চোখে জল আনল, আর সুনিয়া ও রিদওয়ানের গভীরতা দর্শকদের ভাবিয়ে তুলল। অডিটোরিয়ামের বাতাস তখন আর কেবল অক্সিজেনে পূর্ণ নয়, তা পূর্ণ হয়ে উঠল এক তীব্র আবেগে। পিনপতন নীরবতা- যেন একটি মাছি ওড়ার শব্দও শোনা যাবে। এই নীরবতাই বলে দিচ্ছিল, তারা দর্শকদের আত্মার সংযোগ ঘটাতে পেরেছে।
নাটকের শেষ দৃশ্য। আবহসংগীতের করুণ সুর বাজছে। মঞ্চের মাঝখানে চারজন বন্ধু একে অপরের হাত ধরল। তাদের চোখে জল কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। তারা যখন শেষ সংলাপটি দিল, মনে হলো সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। পুরো হলরুম স্তব্ধ, মন্ত্রমুগ্ধ।
কয়েক সেকেন্ডের এই স্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ফেটে পড়ল করতালির শব্দ। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! হাততালির শব্দ যেন থামতেই চায় না, ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে মঞ্চের ওপর। দর্শকদের কেউ কেউ চোখ মুছছে, কেউ বা নিজের অজান্তেই আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছে। এই ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ ছিল তাদের এতদিনের কষ্টের সেরা পুরস্কার।
পর্দা নেমে এল। কিন্তু নাটকের রেশ তখনো কাটেনি। ব্যাকস্টেজে ছুটে এলেন খয়ের স্যার। সেই কঠোর, রাশভারী মানুষটার চশমার কাঁচ আজ ঝাপসা। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে চারজনের মাথায় হাত রাখলেন। ভেজা গলায় বললেন, ‘শোনো, আজ আমি তোমাদের শিক্ষক হিসেবে আসিনি। এসেছি একজন গর্বিত দর্শক হিসেবে। তোমরা আজ মঞ্চে যা করলে, তা কেবল অভিনয় ছিল না- তা ছিল জীবন। তোমরা আজ সত্যি করে দেখিয়েছ, আত্মাকে কীভাবে উজাড় করে দিতে হয়।’ গুরুর এই স্বীকৃতি তাদের কাছে হাজারো পুরস্কারের চেয়েও দামী মনে হলো।
দর্শকদের সেই করতালি একসময় মিলিয়ে গেল, হলরুম খালি হয়ে গেল। কিন্তু যা রয়ে গেল, তা এক চিরস্থায়ী সম্পদ। তারা বুঝতে পারল, এই নাটকটি কেবল একটি পারফর্মেন্স বা বিনোদন ছিল না। এটি ছিল তাদের একাত্ম হওয়ার, একাত্মা হওয়ার যাত্রা। এই কয়েক মাসে তাদের মাঝে যে সম্পর্কের সুতো বোনা হয়েছে, তার কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। এটি বন্ধুত্বের চেয়েও অনেক বেশি কিছুÑ যেখানে মিশে আছে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মান-অভিমান আর নিঃশর্ত নির্ভরতা।
সেদিন নাটকের শেষ মুহূর্তে সুনিয়া বলেছিল এক অমোঘ সত্য, যা আজও তাদের কানে এবং হৃদয়ে বাজে:
‘বন্ধুত্ব মানে শুধু পাশাপাশি হাঁটা বা অকারণে হাসাহাসি করা নয়। বন্ধুত্ব মানে হলো ভরসা, তপ্ত রোদে শীতল ছায়া। বন্ধুত্ব এমন এক আয়না যেখানে আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি আবার সেই হারানো নিজেকেই এক নতুন সুন্দর রূপে খুঁজে পাই।’
রিদওয়ান সেই সংলাপটি নিজের মনের গভীরে গেঁথে রেখেছিল। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল, তাদের এই বন্ধুত্বই হলো জীবনের প্রথম সার্থক কবিতা। যে কবিতায় কোনো ছন্দ বা মিলের তোয়াক্কা করা হয়নি, ব্যাকরণের কোনো নিয়ম মানা হয়নি, রচিত হয়েছে কেবল একদম নিখাদ ভালোবাসার কালিতে।