FF.
গুরু ও শিষ্যের পাঠ: কাঁচা মাটির পুতুল থেকে প্রাণবন্ত শিল্পী Book page

Chapter 3

গুরু ও শিষ্যের পাঠ: কাঁচা মাটির পুতুল থেকে প্রাণবন্ত শিল্পী

Sep 21, 2026 4 min read

মহড়ার ঘরটিতে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা। বাতাস যেন থমকে আছে এক অজানা আশঙ্কায়। এতদিন নিজেদের মতো করে যা প্র্যাকটিস চলছিল তাতে একটা ছন্দপতন ঘটল যখন বাংলা বিভাগের সবচাইতে রাশভারী ও কড়া শিক্ষক, খয়ের স্যার দরজায় এসে দাঁড়ালেন। মানুষ হিসেবে তিনি হয়তো হাসিখুশি কিন্তু শিল্পের প্রশ্নে তিনি যেন এক নির্মম বিচারক- সেখানে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে তিনি নারাজ।

প্রথম দিন তিনি যখন ওদের অভিনয় দেখতে বসলেন, পুরো ঘরের আবহাওয়া বদলে গেল। অভিনয়ের মাঝপথে হঠাৎ তিনি হাত তুললেন। সেই হাতের ইশারা কোনো সাধারণ সংকেত ছিল না, ছিল এক প্রবল ধমকের পূর্বাভাস। চশমার কাঁচের ভেতর দিয়ে তাঁর তীক্ষ্ম দৃষ্টি যেন তীরের মতো বিঁধছিল ওদের বুকে। তিনি ধীর কিন্তু বজ্রকঠিন স্বরে বললেন, ‘থামো! এসব কী হচ্ছে? তোমরা কি মঞ্চে সংবাদ পাঠ করতে এসেছ? নাকি আবৃত্তি করছ? তোমরা কি শব্দের শরীর বোঝো না? অভিনয়ের আত্মা অনুভব করো না?’

একটু থেমে তিনি হতাশায় মাথা নাড়লেন, ‘এ তো অভিনয় নয়, এ যেন সুতোয় বাঁধা কাঠের পুতুলের প্রাণহীন নড়াচড়া! বাদ দাও এসব, তোমাদের দিয়ে হবে না।’

মুহূর্তের মধ্যে এক শ্মশানের নীরবতা গ্রাস করল রিহার্সাল রুমটাকে। সানিদ যে সব সময় ফাজলামি আর হাসাহাসিতে ঘর মাতিয়ে রাখে তার মুখেও কোনো রা নেই। সুনিয়া ভয়ে কুঁকড়ে গেছে আর তানভীরের সংবেদনশীল চোখে টলমল করছে অপমান আর কষ্টের জল। মনে হচ্ছিল তাদের এতদিনের সব স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

কিন্তু হারের আগে হার মানতে নারাজ রিদওয়ান। সে দলের নেতা, এই জাহাজের নাবিক। নিজের বুকের ভেতর তোলপাড় করা ভয়টাকে চেপে রেখে সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল খয়ের স্যারের দিকে। স্যারের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কিন্তু বিনম্র শ্রদ্ধায় সে বলল, ‘স্যার, আমরা তো কাঁচা মাটি। কুমোর যেমন করে মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়ে আপনি আমাদের সেভাবে গড়ে নিন। আমরা শিখতে চাই স্যার। আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিন। দয়া করে আমাদের নিজেদের প্রমাণ করার আরেকটা সুযোগ দিন।’

রিদওয়ানের কণ্ঠে এমন কিছু ছিল- হয়তো সেই জেদ, সেই আকুতি, যা খয়ের স্যারকে তাঁর নিজের ফেলে আসা তারুণ্যের কথা মনে করিয়ে দিল। তাঁর কঠিন চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো। তিনি হয়তো রিদওয়ানের মাঝে নিজেরই এক প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি রাজি হলেন।

শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। প্রতিদিন বিকেলে খয়ের স্যার নিজে উপস্থিত থেকে ওদের সময় দিতে শুরু করলেন। তিনি কেবল নির্দেশক ছিলেন না, হয়ে উঠলেন এক জাদুকর। তিনি শেখালেন অভিনয় মানে কেবল চেঁচিয়ে সংলাপ বলা নয়। তিনি বললেন, ‘শোনো, গলার স্বর নামিয়ে এনো কিন্তু আবেগটাকে ধরে রেখো। চোখের ভাষায় কথা বলো। মঞ্চে যখন নীরব থাকবে, সেই নীরবতা যেন চিৎকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়। অভিনয় হলো নিজের অস্তিত্বকে ভুলে গিয়ে চরিত্রের আত্মার ভেতরে বিলীন হয়ে যাওয়া।’

খয়ের স্যারের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে ওদের রূপান্তর ঘটতে শুরু করল। যেন আগুনের আঁচে সোনা খাঁটি হয়ে উঠছে।

সুনিয়ার দ্বিধা আর জড়তা কেটে গিয়ে জন্ম নিল এক ‘দৃঢ় ব্যক্তিত্বময়ী অভিনেত্রী’, যে মঞ্চে দাঁড়ালে দর্শক চোখ ফেরাতে পারে না।

সানিদের সেই অগভীর চপলতা আর স্থূল মজা পরিণত হলো পরিমিত ও বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধে, যা নাটকের গুরুগম্ভীর মুহূর্তেও স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে আনে।

তানভীর শিখল কীভাবে নিজের বুকের গভীরের কান্না আর অনুভূতিগুলো মঞ্চে উগরে দিতে হয়, কীভাবে দর্শকের চোখে জল আনতে হয়।

আর রিদওয়ান? সে হয়ে উঠল এই পুরো দলের মেরুদণ্ড এক দক্ষ নাবিক, যে ঝড়ের মধ্যেও জাহাজ ঠিক রাখতে জানে।

অবশেষে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর প্র্যাকটিস শেষে সবাই যখন মেঝের ওপর গোল হয়ে বসে আছে, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি ঘিরে ধরল ওদের। ঘামে ভেজা শরীর কিন্তু চোখেমুখে জয়ের আনন্দ। তানভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে বন্ধুদের দিকে তাকাল। তার গলা ধরে এল। সে বলল, ‘জানিস, আমরা চারজন যেন এক প্যাকেট রঙিন জেমস চকলেট। ওপর থেকে দেখতে হয়তো আমাদের রঙ আলাদা- কারও রাগ বেশি, কেউ বা শান্ত, কেউ চঞ্চল। কিন্তু স্বাদে আমরা সবাই এক, সবাই মিষ্টি। আর সবচেয়ে বড় কথা, প্যাকেটের ভেতরে আমরা যেমন একসঙ্গে থাকি বাস্তবেও আমরা একে অপরের পরিপূরক।’

তানভীরের কথায় সবাই হেসে উঠল কিন্তু সেই হাসিতে ছিল এক গভীর তৃপ্তি। তারা বুঝতে পারল, খয়ের স্যার কেবল তাদের অভিনয় শেখাননি, তিনি তাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ভেঙে যাওয়ার পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে শিল্পের ছোঁয়ায় জীবনকে রাঙিয়ে তুলতে হয়।

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.