FF.
পর্ব ১ঃ Weber-Fechner Book page

Chapter 1

পর্ব ১ঃ Weber-Fechner

Oct 14, 2026 12 min read

গল্প শুরুর আগে একটু নান্দীপাঠ করি, কারণ এই বস্তুটি ছাড়া আমাদের উত্তরবঙ্গের কোনো কিছুই শুরু হয় না। বিয়েবাড়িতে ভোজের আগে শাঁখ বাজে, ধানের আগে আষাঢ়ে মেঘ ডাকে, আর আমাদের ইউনিভার্সিটিতে সেমিস্টারের আগে একটা না একটা নোটিস ঝোলে, যাতে লেখা থাকে "পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত ক্লাস যথারীতি চলিবে।"

শিলিগুড়ি থেকে রাজা রামমোহনপুরের দিকে বাসে চেপে এলে এক সময় বাঁদিকে চা-বাগান শুরু হয়। সবুজ, ঢেউ খেলানো, যেন কেউ পৃথিবীর গায়ে একটা বিশাল মখমলের চাদর বিছিয়ে রেখেছে। আর যেদিন আকাশ পরিষ্কার থাকে, সেদিন সেই চাদরের ওপারে কাঞ্চনজঙ্ঘা দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক যেন কোনো গম্ভীর অধ্যাপক, যিনি সব জানেন কিন্তু কিছু বলবেন না। এই ক্যাম্পাসে আমি এসেছি দিনহাটা থেকে, ঝোলায় একটা সিরিঙ্গে মার্কা গামছা আর বুকে এক টুকরো ভয় নিয়ে। ভয়টা ছিল, শহরের ছেলেমেয়েদের মাঝখানে আমি টিকব তো?

টিকে গিয়েছিলাম। ডিপার্টমেন্ট, আকবর চাচার দোকান আর বন্ধুরা মিলে আমাকে টিকিয়ে দিয়েছিল। শুধু একটা জিনিস তখনও জানতাম না: মানুষ অনেক সময় টিকে থাকে বলেই এমন একদিন আসে, যেদিন টলে যাওয়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সেই দিনটার কথাই বলছি।

আজ আবার দেরি হয়ে গেল! বেশ ছিলাম আকবর চাচার দোকানে বসে একটা হাফ লিকার চা নিয়ে। ক্লাস ছিল দুটো তিরিশ নাগাদ। সেই লজঝরে Weber-Fechner Law নিয়ে ক্যালর ক্যালর শুরু করবে কমলিকা ম্যাম, সেন্সরি ফিজিওলজি পেপারে। আগের দিন তিনবার বুঝিয়েছে, আবার সেই একই জিনিস। প্র্যাক্টিকালের নম্বর খালি ওনার হাতে আছে বলে মুখ বুজে সহ্য করতে হয় এই অসহ্য ক্লাস। আর খালি থেকে থেকে "তুমি কোন গ্রাম থেকে উঠে এসেছ গো?" এই জিনিসটাই বিরক্ত লাগে আমার। বসে বসে বেশ মোবাইলে একটা ভালো বলিউড সিনেমা দেখছিলাম! সেপ্টেম্বরের শেষ। বৃষ্টি যাই-যাই করেও যাচ্ছে না, যেন বিদায় নিতে এসে গেটে দাঁড়িয়ে গল্প জুড়েছে। দোকানের টিনের চালে একটু আগে এক পশলা হয়ে গেছে, এখন চালের কিনারা বেয়ে টুপটাপ জল ঝরছে। মাটি থেকে সোঁদা গন্ধ উঠছে, আর রাস্তার ধারে কাশফুলের ঝাড় বাতাসে মাথা নাড়ছে, যেন বলছে, "যা না, ক্লাসে যা, ধরা পড়বি।" আমি কাশফুলের কথা কানে তুলিনি। মাঝেমধ্যে প্রকৃতির উপদেশ মানুষ শোনে না, পরে বোঝে। 

আকবর চাচা আমার চায়ের কাপ তুলে নিতে নিতে বললেন, "যাও বাবা, আজ আর ধার বাড়াব না। দেরি হলে ম্যাডাম  ক্যালান দেবানি।"

"চাচা, আমার তো ধার নেই!"

"আছে। খাতায় লেখা আছে। 'পনি, সাতাশ টাকা'।" চাচা মিটিমিটি হাসলেন। "তোমাদের নেকাপড়া এত, খুচখাচ জিনিস কি মাথায় থাকে? কিন্তু আমি ভুলি না, আরে কাজ বলতে তো এটাই।"হাহাহা! 

চাচার দোকানের খাতাটা একটা দেখার মতো জিনিস। মলাট ছেঁড়া, পাতাগুলো চায়ের দাগে দাগে বাদামি, আর প্রতিটা পাতায় ছাত্রছাত্রীদের নামের পাশে অঙ্ক। অন্তুর পাতাটা আলাদা করে সেলাই করা, কারণ ওর হিসেব একটা পাতায় ধরে না। চাচা বলেন, "এই খাতায় এই ইউনিভার্সিটির আসল ইতিহাস লেখা আছে, বাবা। ভিসি-র ফাইলে লেখা থাকে কে কবে এল গেল। আমার খাতায় লেখা থাকে কে কত ধার রেখে গেল। কোনটা বেশি সত্যি, ভেবে দেখো।"

মেন গেট থেকে জুলজি ডিপার্টমেন্ট হেঁটে দশ মিনিট। আমি পাঁচ মিনিটে এলাম, বুকের ভেতর রেলগাড়ি নিয়ে। রাস্তার দু ধারে শিরীষ আর কৃষ্ণচূড়ার সারি, তাদের পাতা থেকে তখনও জল ঝরছে। পথের ধারে ইউনিভার্সিটির পুরোনো নোটিস বোর্ড, তার ওপর কেউ চক দিয়ে লিখে রেখেছে, "অ্যাটেন্ডেন্স ৭৫%, নইলে পরীক্ষা নয়।" তার নিচে আরেক হাতের লেখা, "আর ভালোবাসা ১০০% না হলে কী হবে?" কে লিখেছে জানি না। সম্ভবত অন্তু। সবকিছুতেই তার হাতের ছাপ।

করিডোরে হারাধনদা বালতি-ঝাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে, আমাকে দেখে চোখ টিপলেন। "ম্যাডাম আজ সকাল থেকে তিনবার তোমার খোঁজ করেছেন, পনি। মুড ভালো না।"

"কেন, কী হয়েছে?"

"কাল রাতে ডিপার্টমেন্টের কচ্ছপটা পালিয়েছিল। ম্যাডামের কলেজ জীবন থেকে নাকি ওটাকে চেনেন।"

কচ্ছপের কথা শুনে আমার হাসি পেল, এবং হারাধন দা একবার শুরু করলে যে সাতকাহন সে আমি খুব ভাল করে জানি। কথা না বাড়িয়ে একরকম “যা থাকে কপালে” গোছের মুখ করে ক্লাসের দিকে পা বাড়ালাম! ক্লাসের কাছাকাছি আসতেই মোটামুটি ম্যামের সুতীক্ষ্ণ শব্দচ্চারণ শোনা গেল!  করিডোরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। মাঠের ওপারে চা-বাগানের মাথার ওপর মেঘ জমছে, কিন্তু এক ফালি রোদও পড়েছে ঠিক তার মাঝখানে। বৃষ্টি আর রোদ একসঙ্গে। ঠাকুমা বলতেন, "রোদ-বৃষ্টিতে শেয়ালের বিয়ে হয় রে।" আমি তখন ভাবিনি, সেদিন আমার জীবনেও কারও সঙ্গে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। শেয়ালের বিয়ে না, তবে ওই ধাঁচেরই কিছু, অদ্ভুত, অসম্ভব, আর খুব সুন্দর।

আমি হারাধনদার কচ্ছপের কথথায় বেশ ভালই দাঁত কেলিয়ে হাসছিলাম। কিন্তু দরজায় উঁকি দিতেই হাসি উবে গেল। কমলিকা ম্যামের চোখ আমার ওপর স্থির।

"এসো এসো, বাবা গাঁয়ের ছেলে !  ট্রাক্টর কি রাস্তায় বিগড়েছিল?"

পুরো ক্লাস হেসে উঠল। শানু বেঞ্চের তলায় মুখ লুকিয়ে হাসছে, অন্তু খাতার আড়াল থেকে। ওদের ক্ষমা নেই। আমি পেছনের বেঞ্চে অন্তুর পাশে বসতে বসতে বললাম, "আজ আবার ওজন-ফজন?"

"আজ শুধু ওজন না, আজ ঘরে নতুন আলো এসেছে," অন্তু ফিসফিস করল। তার গলায় সেই গোয়েন্দা-সুলভ গাম্ভীর্য। "আজ সকালে আমি দেখেছি HOD স্যার একটা মেয়েকে নিয়ে অফিসে ঢুকছেন। মেয়ে, ব্যাগ, ফাইল। নতুন অ্যাডমিশন!"

"তুই ঘুমোস না নাকি?"

"গোয়েন্দারা ঘুমোয় না, বন্ধু।"

আমি কিছু বোঝার আগেই দরজায় টোকা পড়ল।

ডক্টর সুবিমল রায়চৌধুরী, ধবধবে সাদা চুল, হাতে সেই বন্ধ ছাতা, ঢুকলেন। ছাতাটা নিয়ে ডিপার্টমেন্টে একটা কানাঘুষো আছে। ওটা নাকি কখনও খোলা হয়নি, তবে ওটা দিয়ে স্যার একবার একটা বিষাক্ত সাপ মেরেছিলেন। সে যাই হোক গে ওসব গল্প তুলে লাভ নেই। তবে এবার স্যারের সঙ্গে একটি মেয়ে। হালকা নীল কুর্তি, কাঁধে ঝোলা, চোখে এমন ভাব যেন সে ঠিক জানে না ঘরটা তার কিনা। সেই প্রথম, হ্যাঁ সেই প্রথম আমি পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে কাউকে দেখেছিলাম। রূপসী বলতে আমি শুধু এতদিন “কায়রা আদবানি” কেই জানতাম!  কিন্তু এমন দিঘল কেশরাশি, মালাবার উপকুলের মত গভীর চোখ, আর মানানসই সুহাস্য গজদন্তের যে ডেডলি কম্বিনেশন আমায় অলরেডি ক্লিন বোল্ড করে দিয়েছে ইন্সুইং দিয়ে সে বেশ বুঝতে পারছিলাম।  

আর ঠিক তখনই জানালার বাইরে সেই রোদ-বৃষ্টির ফালিটা সরে এসে ওর কাঁধের ওপর পড়ল। আমি শপথ করে বলতে পারি, ওটা কাকতালীয়। কিন্তু প্রকৃতি অনেক সময় এমন কাকতালীয় ঘটনা ঘটায়, যেগুলো বিশ্বাস না করলে জীবনটা বড্ড রুক্ষ হয়ে যায়।

"কমলিকা, লেট এডমিশনে একজন এসেছে। স্পট রাউন্ডে। নাম..." স্যার চশমা নামিয়ে কাগজ দেখলেন। "মেঘরাগিনী গুহঠাকুরতা।"

কমলিকা ম্যাম ভুরু তুলে বললেন, "বাপ রে! রোল কল করতে গেলে আধ ঘণ্টা লাগবে। খাতার একটা গোটা লাইন ওর নামেই শেষ।"

এই এক ম্যাডামের স্বভাব। খিল্লি ওড়াবার জিনিস পেলে আর জীবনে কিছু চান না। মানে কিছু করে লেগ পুল করতেই হবে। নতুন বা পুরোনো ওসব কোনো কিছুর ধার ধারেন না। মানে এই নয় যে উনি আদতে “খিল্লি” নামক বিষয়বস্তু তে অতীব পোক্ত ! আসলে এইটেই ওনার স্টাইল। মানুষ কে হালকা চেটে, হাল্কা কান এঁটো করা কথা বলে একটু সেই বাসর ঘরের দোর ধরা বোনেদের মত এক স্বর্গীয় সুখ পান! আমার কিন্তু বেশ বিরক্ত লাগে বিষয়টা ! 

ক্লাস আবার হাসল। আমি হাসলাম না। কেন জানি না। আমি শুধু দেখলাম সে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে আছে, আর কুর্তির প্রান্তটা আঙুলে পাকাচ্ছে। কানের ডগা ক্রমশ রক্তিম বর্ণ ধারণ করছে। ওই পাকানো আঙুল আমি চিনি। আমারও ঠিক এমনই হয়।

আমার মনে পড়ে গেল আমার প্রথম দিনের কথা। এই একই ক্লাসঘর, এই একই ম্যাম, "দিনহাটা? সেটা আবার কোথায়?" আমি সেদিন কিছু বলিনি, শুধু আঙুলে গামছার কোনা পাকিয়েছিলাম। কেউ খেয়াল করেনি। শুধু পেছনের বেঞ্চ থেকে অন্তু একটা চকোলেট এগিয়ে দিয়েছিল, কিছু না বলে। সেই থেকে আমি জানি, অপমানের মুহূর্তে একটা ছোট দয়া কতখানি বড় হতে পারে। আর সেই থেকে আমি ঠিক করেছিলাম, কেউ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি তাকিয়ে থাকব না, তাকে সঙ্গ দেব। তাই আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম না। শুধু চোখের কোণ দিয়ে, খুব সামান্য, একটু হাসলাম। যাতে সে বোঝে, এই ঘরে অন্তত একজন আছে যে ওর নামের দিকে তাকিয়ে হাসছে না, হাসছে ওর দিকে।

সে কি দেখল? জানি না।

"আমাকে মেঘ বললেই চলবে, ম্যাম," সে খুব নরম গলায় বলল। বলার ধরনে কোনো অভিযোগ নেই, অথচ ক্লাসটা একটু থমকে গেল। ঠিক যেমন ঝড়ের আগে বাতাস একটু থমকে যায়, গাছের পাতাও বুঝে নেয় কিছু একটা আসছে। 

অন্তু আমার কানে ঠেলা দিল। "মেঘ! আর তোর নাম পর্জন্য। মানে বৃষ্টির মেঘ। ব্যাপারটা খেয়াল করেছিস?"

"চুপ কর।"

"আমি চুপ করলেও ব্রহ্মাণ্ড করবে না, বন্ধু।"

মেঘ বসল দ্বিতীয় সারিতে, শ্রীর পাশে। শ্রী নাকের ডগার চশমা ঠেলে ওকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত জরিপ করল, তারপর ফিক করে হেসে খাতার একটা পাতা এগিয়ে দিল। নোটস। প্রথম দিনেই। হ্যাঁ মানে ম্যাম যা পড়াচ্ছিলেন আর কি। ওই মেয়ে যার সঙ্গে ভাব করে, তাকে নিজের নোটস দেয়, আর এই সম্মান ব্যাচে খুব কম লোকেই পেয়েছে। শ্রীর বাবা চা-বাগানের ম্যানেজার, তাই ও মানুষ চেনে পাতা চেনার মতো করে। কোনটা প্রথম পাতা, কোনটা দ্বিতীয়, কোনটা শুধু ঝুড়ি ভরানোর। মেঘকে ও এক নজরে "প্রথম পাতা" ধরে নিয়েছে, সেটা আমি ওর চোখের ভাষায় পড়লাম।

কমলিকা ম্যাম আবার Weber-Fechner-এ ফিরলেন। "...তাহলে বলো তো, ΔI/I = k। প্রাণীজগতের একটা বাস্তব উদাহরণ কে দেবে? এই যে তুমি, নতুন মেয়ে, মেঘ।"

আমি ভাবলাম, প্রথম দিনেই বেচারাকে ধরল।

মেঘ উঠে দাঁড়াল। এক সেকেন্ড ভাবল। তারপর বলল, "মৌমাছি, ম্যাম। দশ শতাংশ চিনির জলে সামান্য মিষ্টি বাড়ালে সে স্পষ্ট টের পায়। কিন্তু ষাট শতাংশে একই পরিমাণ বাড়ালে টেরই পায় না। অথচ বাড়তি চিনিটা একই। টের পাওয়াটা নির্ভর করে আগের পরিমাণের তুলনায় বদলটা কতটা, তার ওপর।"

ক্লাসে একটা চাপা গুঞ্জন। কমলিকা ম্যাম একটু চুপ করে থেকে বললেন, "বসো। ঠিক আছে।" ওই 'ঠিক আছে'টা ম্যামের মুখ থেকে বেরোনো সবচেয়ে বড় প্রশংসা। আমরা সবাই জানি। গত দু বছরে আমি ওটা মাত্র দুবার শুনেছি।

আমি সেদিন প্রথম ওই লজঝরে সূত্রটা সত্যিই বুঝলাম। বদলটা টের পাওয়া যায় আগের জিনিসের তুলনায়। আমার জীবনটা এতদিন ছিল ষাট শতাংশ চিনির জলের মতো, একঘেয়ে মিষ্টি। আর ওই এ কোন রাজ্যের মেঘ যে এসে হিসাবপত্র একটু ওলটপালট করে দিলো বুঝতেই পারলাম না। কিছুটা হয়তো টের পেলাম।

ক্লাস শেষ হলে সবাই হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল। আমি ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে খাতা গোছালাম। অন্তু জিজ্ঞেস করল, "কী রে, আকবরের দোকানে যাবি না?"

"তুই যা, আমি আসছি।"

"তুই 'আসছি' বললে বুঝতে হয় যে আসবি না।" অন্তু আমার দিকে এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, তারপর একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলল, "গোয়েন্দা হিসেবে আমি কিছু বলছি না। শুধু একটা তথ্য: মেয়েটা লেডিজ হোস্টেলে যাওয়ার রাস্তা চেনে না। HOD স্যার ওকে মেন গেট থেকে নিয়ে এসেছেন, এখন ফেরার রাস্তা কেউ দেখিয়ে দেয়নি।"

"তো?"

"তো কিছু না। আমি শুধু ইনফরমেশন দিলাম।" সে বুক চিতিয়ে বেরিয়ে গেল। ওর পেছনে শানু, যে আমাকে একবার চোখ মেরে গেল। এরা সবাই কি জানে? আমার তো নিজেই জানা ছিল না।

করিডোরে বেরিয়ে দেখি মেঘ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে। কাঁধের ঝোলাটা দু হাতে আঁকড়ে, চোখ মাঠের দিকে। বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে, খুব মৃদু, প্রায় না-হওয়ার মতো। এই বৃষ্টিটাকে ঠাকুমা বলতেন "গুঁড়ি গুঁড়ি", যে বৃষ্টি জামা ভেজায় না, মন ভেজায়।

আমি কিছু বলতে গিয়েও গিলে ফেললাম। কী বলব? "তুমি ঠিক আছ?" ওটা বোকার মতো শোনাবে। "ম্যামের কথায় কিছু মনে কোরো না?" ওটা সবাই বলে। "তোমার উত্তরটা দারুণ ছিল?" ওটা সত্যি, কিন্তু আমার গলায় আটকে গেল।

শেষে আমি যা বললাম, তা আমি জীবনে বলার কথা ভাবিনি।

"তুমি লেডিজ হোস্টেলের রাস্তা চেনো?"

ও ঘুরে তাকাল। কানের ডগা তখনও লালচে। "না। আমি... আসলে কাউকে জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিলাম না।"

"আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। মানে, যদি তোমার আপত্তি না থাকে।"

"আপত্তি?" ও একটু অবাক হলো, তারপর খুব হালকা একটা হাসি। গজদন্তটা দেখা গেল, ঠিক এক সেকেন্ডের জন্য। "না। কোনো আপত্তি নেই।"

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

ডিপার্টমেন্ট থেকে লেডিজ হোস্টেল হেঁটে আট মিনিট। কিন্তু আমি সেদিন ঘুরপথে নিয়ে গেলাম, যেটা পনেরো মিনিটের। কেন, তা আজ পর্যন্ত স্বীকার করিনি, শুধু মনে মনে জানি। পথের দু ধারে মাঠ, তার ওপর ভিজে ঘাসে টুপটাপ জলের ফোঁটা, দূরে চা-বাগানের মাথায় কুয়াশা নামছে। বিকেল সাড়ে চারটে, তবু আলো যেন সন্ধ্যার দিকে ঢলে পড়ছে।

"এই গাছটা কী?" ও একটা বড় গাছের দিকে আঙুল তুলল, যার ডালে ছোট ছোট সাদা ফুলের থোকা।

"ছাতিম। আশ্বিন-কার্তিকে ফোটে। রাতে এর গন্ধ খুব তীব্র হয়, মাথা ধরিয়ে দেয়। ঠাকুমা বলত, ছাতিমের তলায় রাতে বেশিক্ষণ বসতে নেই।"

"কেন?"

"গন্ধে নাকি মানুষ উদাস হয়ে যায়। ঘরে ফেরার কথা ভুলে যায়।"

মেঘ ফুলের দিকে তাকাল, তারপর আমার দিকে। "তুমি এসব জানো কীভাবে?"

"গ্রামের ছেলে তো," আমি বললাম। কথাটা বলেই আমার মনে পড়ে গেল, ওটা কমলিকা ম্যামের সেই লাইন। আমি নিজেই নিজের নামে সেই খোঁচা মেরে ফেললাম! কিন্তু মেঘ হাসল না। ও চুপ করে রইল, তারপর খুব আস্তে বলল, "আমার ওটা শুনতে ভালো লাগল।"

"কোনটা?"

"যে তুমি এত কিছু জানো। আমি ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে বড় হয়েছি, পনি..." ও থেমে গেল। "ও, তোমার নাম পনি, না? অন্তু বলছিল, তোমাকে সবাই পনি বলে।"

"পর্জন্য। কিন্তু সবাই পনি বলে।"

"পর্জন্য..." ও নামটা একবার উচ্চারণ করল, ধীরে, যেন স্বাদ নিচ্ছে। "বৃষ্টির দেবতা, না? আমার নামটাও ভারী। দেখো, দুজনেরই নাম আকাশের সঙ্গে জড়ানো।"

আমি কিছু বললাম না। কী বলব? আমার বুকের ভেতর তখন একটা আস্ত রেলগাড়ি নয়, একটা গোটা রেলস্টেশন ঢুকে পড়েছে, প্ল্যাটফর্ম, টিকিট কাউন্টার, চায়ের স্টল সমেত।

হোস্টেলের গেটে পৌঁছে ও থামল। ওয়ার্ডেন ম্যাডাম গেটের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছেন, চোখে সন্দেহ। মেঘ আমার দিকে ফিরে বলল, "ধন্যবাদ, পর্জন্য। তুমি আজ ক্লাসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলে, আমি দেখেছি।"

আমি থতমত খেলাম। "আমি... মানে..."

"আমার ভালো লেগেছিল।" ও বলল, তারপর হঠাৎ কানের ডগা লাল করে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।

আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আকাশে তখন আবার সেই রোদ আর বৃষ্টি, দুই-ই একসঙ্গে। আর দূরে, সারাদিন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা, কেন জানি না, একবারের জন্য মুখ বার করে দেখা দিল। বরফের চূড়ায় শেষ বিকেলের গোলাপি আলো। যেন কেউ আমাকে দেখাতে চাইল, "দেখ, আজকের দিনটা মনে রাখিস।"


আকবর চাচার দোকানে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল। অন্তু, শানু, শ্রী, সবাই বসে আছে। আমাকে ঢুকতে দেখে সবাই একসঙ্গে থেমে গেল, যেন কোনো সিনেমার ফ্রিজ-ফ্রেম।

"কী রে পনি," শানু ধীরে ধীরে মালদাই টানে বলল, "আজ রাস্তা বড় লম্বা হইল দেহি?"

"ট্র্যাফিক ছিল।"

"এই ক্যাম্পাসে ট্র্যাফিক বলতে একটা গোরু আর হারাধনদার ঝাঁটা!" অন্তু চেঁচাল।

শ্রী চায়ে চুমুক দিয়ে চশমা ঠেলে বলল, "ওকে ছেড়ে দে তোরা।" তারপর খুব নিচু গলায়, শুধু আমি শুনতে পাই এমনভাবে: "ও ভালো মেয়ে, পনি। সাবধানে।"

"কী সাবধানে?"

"কিছু না।" শ্রী হাসল। "শুধু এটুকু, যে ভালো জিনিস একবার হারালে ফেরত পাওয়া যায় না। আমার বাবার বাগানে একবার একটা বিরল অর্কিড ফুটেছিল। তিন দিনে ঝরে গেল।"

আমি কিছু বললাম না। আকবর চাচা আমার সামনে চায়ের কাপ রাখলেন। "নাও বাবা, আজ ফ্রি। পুরোনো ধারের বদলে।"

"কীসের জন্য ফ্রি?"

"তোমার মুখ দেখে," চাচা বললেন। "আঠাশ বছর ধরে এই দোকানে বসে আছি। মুখ দেখলে বুঝি, কার চা আজ মিষ্টি লাগবে।"

আমি কাপে চুমুক দিলাম। সত্যিই মিষ্টি। আজ চায়ের চিনি বেশি ছিল, না আমার জিভের থ্রেশহোল্ড নেমে গিয়েছিল, তা আজও জানি না।

আর সেই রাতে হোস্টেলের জানালা দিয়ে আমি অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মেঘ জমেছে, কিন্তু একটা ফাঁক দিয়ে একটা তারা দেখা যাচ্ছে। কমলিকা ম্যামের গলা কানে ভাসছে, ΔI/I = k। বদলটা টের পাওয়া যায় আগের জিনিসের তুলনায়।

আমার জীবনে সেই সন্ধ্যায় একটা বদল ঘটে গিয়েছিল। বদলের মাত্রা ছোট, কিন্তু আমার "আগের জিনিস" এত স্থির, এত নিস্তরঙ্গ ছিল যে সামান্য একটা ফোঁটাই আমার কাছে বন্যার মতো লাগল।

পাশের ঘর থেকে অন্তুর নাক ডাকার শব্দ আসছিল। গোয়েন্দারা ঘুমোয় না, বলেছিল সে। মিথ্যে কথা।

আমি ঘুমোইনি। আমি সারারাত শুধু একটা নাম মনে মনে বলছিলাম, মেঘ, মেঘ, মেঘ। আর বাইরে, ঠিক সেই মুহূর্তে, ছাতিম গাছের গন্ধ ভেসে আসছিল। আমি তখন বুঝিনি ঠাকুমা কেন বারণ করতেন, ঘরে ফেরার কথা ভুলে যায় মানুষ। আজ বুঝি।


Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.