FF.
পর্ব ৩ঃ ফনোট্যাক্সিস  Book page

Chapter 3

পর্ব ৩ঃ ফনোট্যাক্সিস 

Oct 24, 2026 10 min read

খবরটা ছড়াতে দু দিন লাগল না। ডিপার্টমেন্টের নোটিস বোর্ডে কে যেন লিখে রেখে গেল: ΔM/P = ♥। সন্দেহের তালিকায় একমাত্র নাম অন্তু। সে নির্লজ্জের মতো স্বীকারও করল। "আমি পরীক্ষামূলক তথ্য প্রকাশ করেছি। বিজ্ঞানের স্বার্থে।"

"এই নোটিসটা হারাধনদা তিনবার মুছেছেন, তুই চারবার লিখেছিস!" শ্রী রেগে গেল।

"গবেষণা চলতে থাকে, শ্রী।"

শানু আমাকে দেখলেই গাইত, "মেঘলা দিনে একলা ঘরে..." আমি তাকে বললাম, "তুই গান গাস না, তুই বরং আম বিক্রি করিস।"

"আম বিক্রিও সম্মানের পেশা ভাইটি!"

শানু যে একেবারেই কলকাতা স্টাইলে কথা বলতে পারে না এমন না। আসলে ব্যাপারটা একটু আলাদা গোছের। মালদাই টান ওর কথার মধ্যে ভাল করেই লক্ষ্য করা যায়। তবে আমাদের সাথে থেকে থেকে কথা গুলো বেশ শহুরে হয়েছে। আমাদের সাথে থেকে বলাটা ভুল হবে। আগেও তো কলেজে পড়েছে। সেখানে সবাই তো আর “গ্রামের ছেলে” ছিল না রে বাবা। ওই দেখ আবার নিজেকে খিল্লি করছি! হাহাহাহা! 

এর মধ্যে কমলিকা ম্যামের সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটল, যা আমি আজও ভুলিনি। মাঝসেমিস্টারের আগে ভাইভা। ম্যাম আমাকে প্রশ্ন করলেন, আমি উত্তর দিলাম। তিনি ভুরু কুঁচকে বললেন, "তোমার ইংরেজি উচ্চারণটা একটু..." তারপর সেই পুরোনো লাইনটা: "কোন গ্রাম থেকে এসেছ গো তুমি?"

আমি দাঁতে দাঁত চেপে ছিলাম। ঠিক তখন পাশের চেয়ার থেকে মেঘ উঠে দাঁড়াল। আমরা দুজনই ভাইভার জন্য একসঙ্গে বসেছিলাম।

"ম্যাম, ও দিনহাটা থেকে এসেছে। আর ও আমাদের ব্যাচের মধ্যে সবচেয়ে ভালো প্র্যাক্টিকাল রিপোর্ট লিখেছে। নির্মাল্য স্যার নিজে বলেছেন।" মেঘের গলা কাঁপছিল!  

ঘরটা নিস্তব্ধ। কমলিকা ম্যাম অনেকক্ষণ মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ওঁর চোখে একটা অদ্ভুত ছায়া, যা আমি আগে দেখিনি, রাগ নয়, আরও অন্য কিছু। যেন উনি মেঘকে নয়, নিজের কোনো পুরোনো ছবিকে দেখছেন। তারপর খুব ধীরে বললেন, "বসো মেঘরাগিনী। ...আর পর্জন্য, তোমার উত্তরটা ঠিক ছিল।" 

আমি অবাক হলাম। ম্যামের কান এঁটো করা খিল্লির শিকার আমিই সব থেকে বেশি হয়েছি! এ আমার কাছে নতুন কিছু না। কিন্তু মেঘ ম্যামের  মুখের উপর কথাটা বলে ঠিক করেনি !  ডেফিনেটলি না!

বেরিয়ে এসে আমি বললাম, "তুমি কেন এসব করলে? আরে ম্যাম যদি ফাইনালে দুম করে নম্বর কেটে নেন?"

"কাটুক।" ও বলল। "তুমি সবসময় চুপ করে সহ্য করো, আমি দেখতে পাই না। সবাইকে সব কিছু সহ্য করতে হবে এমন কথা তো কোথাও লেখা নেই।"

হস্টেলে রাতের খাবার সারার পর সেদিন রাতে হারাধনদা আমাকে ডেকে চুপিচুপি বললেন, "জানো পনি, ম্যাডামও কিন্তু গ্রামের মেয়ে ছিলেন। বাঁকুড়ার এক গ্রাম থেকে এসেছিলেন। প্রথম বছরে ওঁকেও সবাই বলত 'কোন গ্রাম থেকে এসেছ গো'।"

আমি হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। "তাহলে উনি..."

"যাকে মারা হয়, সে অনেক সময় ভুলতে পারে না, তাই মারতে শিখে যায়," হারাধনদা বললেন। "এটাই দুনিয়ার নিয়ম।" মানে সেই অনেকটা যা দেখব তাই শিখব টাইপ্স! এই যে ধরো কিছু ঢ্যামনার গাছ ডাক্তার রা হাসপাতালে মরা লোককে জ্যান্ত বলে অপরেশন করাবার অছিলায় পেশেন্ট পার্টির থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা তোলে! কেন তোলে??? দেখগে যাও ডাক্তারি পড়তে যে খরচা হয়েছিল সেগুলো তোলার জন্য। এদের জন্যই আবার ভাল ডাক্তার দের বদনাম হয়। 

প্রসঙ্গ হঠাৎ করে হারাধন দা বদলে দিচ্ছিল সে ভালই বুঝতে পারছিলাম। “গব্বর ইজ ব্যাক” সিনেমা টার কথা মনে পড়ে গেল। সে মরুক গে  যাক, আমি যে মরছি আমার জ্বালা নিয়ে সেটা কারে বোঝাই?  আমি অনেকক্ষণ ভাবলাম। কমলিকা ম্যামের ওপর আমার রাগ ঠিক গলে গেল না, কিন্তু একটু ফিকে হয়ে গেল। ওসব ভাবা বাদ দিয়ে আমি পড়তে বসলাম। 

গোল বাধল অন্য জায়গায়। অন্তু একদিন আকবর চাচার দোকানে ঘোষণা করল, "বন্ধুগণ, মেঘরাগিনীর নামের একটা রহস্য আবিষ্কার করেছি। মে-ঘ-রা-গি-নী গু-হ-ঠা-কু-র-তা। মোট এগারো অক্ষর। আর আমাদের ল্যাবের নতুন সেন্ট্রিফিউজের মডেল নম্বরও এগারো অক্ষরের। এটা কাকতালীয় নয়!"

"তুই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হিসেব কষিস নাকি?" শানু চায়ে বিস্কুট ডোবাতে ডোবাতে বলল। "আর এগারো গুনলি কোন হিসাবে? আমি তো গুনিয়া দেখলাম তেরো!" শানু একটু কেমন ইচ্ছে করেই যেন ঘাঁটতে চেষ্টা করল ব্যাপারটা। 

"তুই বানান করে গুনেছিস?"

"না, আন্দাজে।"

"তাহলে তোর আন্দাজই ভুল।"

দুজনে প্রায় হাতাহাতির জোগাড়। ঋত্বিক ব্যাট তুলে রেফারির ভঙ্গিতে মাঝখানে দাঁড়াল। "নো বল! নো বল!" দোলন গান ধরল, "ওরে ভাই, ঝগড়া থামা..." শেষে মেঘকেই জিজ্ঞেস করা হলো। মেঘ সব শুনে গম্ভীর মুখে বলল, "আমার নামে মোট চোদ্দটা অক্ষর। কিন্তু যুক্তাক্ষর ধরলে বারোটা, আর মাত্রা বাদ দিলে..." তারপর সবার মুখ দেখে ফিক করে হেসে ফেলল। "যাও, তোমরা সবাই ভুল। আমার নামটাই ভুল, তোমরা আর কী করবে!"

সবার মধ্যে ভাসু সবচেয়ে চুপচাপ ছিল। একটু পরে নাটকীয় পজ দিয়ে বলল, "জানিস মেঘ, আমার ছোটবেলায় সবাই আমাকে 'ভাস্বতী ভাঁড়' বলে ডাকত। আমি তো কান্না করে দিতাম। তারপর আবৃত্তি শিখে সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়েছি।"

মেঘ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। ফট করে বলে বসলো "আমি তো... জানতাম না।"

"তুমি কি করে জানবে??? একি অদ্ভুত কথা! এখন জানলে। এখানে সবারই কিছু না কিছু আছে।" ভাসু হাসল, এবার কোনো পজ ছাড়াই।

সেদিন থেকে গ্যাংয়ের নতুন নিয়ম: মেঘের নাম নিয়ে কেউ ঠাট্টা করলে তাকে এক রাউন্ড চা খাওয়াতে হবে। প্রথম দিনেই অন্তু দেউলিয়া। আকবর চাচা খাতায় লিখলেন, "অন্তু: বারো টাকা, এবং বাকি ভবিষ্যতেও।" আকবর চাচা কেমন অদ্ভুত না???  প্রায় হাফ দিন ধার মাফ করে দেয়। একদিন কাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কাকা এমন কেন কর তুমি?? আকবর চাচা পানপরাগের কষে ধরা ঈষৎ হলুদাভ দাঁত বের করে বলেছিল “জমি আছে তো অনেক! ফসলের কাঁচাপাকা টাকা! গাঁয়ের বসতবাড়ি, আমার ঠিক চলে যাবে। তোমরা চা খাও। 

আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশনের বই। নির্মাল্য স্যার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন, "Sensory Systems of Animals", আর ওই বইয়ের একটাই কপি।

আমি আর মেঘ ঠিক করলাম, সবার আগে লাইব্রেরিতে যাব। সকাল সাড়ে ন'টায় খোলে। আমরা পৌঁছলাম নটায়। দরজা বন্ধ। সিঁড়িতে বসে আছি দুজন। লাইব্রেরিয়ান ননীগোপালবাবু রোজ ঠিক সাড়ে নটায় আসেন, এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না। এটা নিয়ে ডিপার্টমেন্টে একটা বাজি চলে।

"তুমি আগে কখনও এত ভোরে এসেছ?" মেঘ জিজ্ঞেস করল।

"আমি তো ভোর পাঁচটায় উঠি। গ্রামের অভ্যেস।"

"ইশ, আমি তো আটটার আগে চোখই খুলতে পারি না!" ও একটা হাই চাপল। "আমাকে একদিন ভোর পাঁচটায় ডেকে দেবে? আমি দেখতে চাই ভোর কেমন।"

"তুমি গালাগাল দেবে।"

"দেব না।"

"দেবে।"

"বাজি ধরো?"

"কী বাজি?"

"যে হারবে, সে অন্যজনকে একটা কফি খাওয়াবে। ক্যান্টিনের আসল কফি।"

"আমি তো চা-ই খাই।"

"তাই তো! তাহলে তুমি হারলে তোমাকে কফি খেতে হবে। আর আমি হারলে আমাকে চা।" ও জেতার ভঙ্গিতে হাসল। "দুজনেরই লোকসান। এটাই আসল ফেয়ার গেম।"

পরের দিন সত্যিই ভোর পাঁচটায় আমি ওর হোস্টেলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে একটা ঘুম-জড়ানো, বিরক্ত, অথচ অদ্ভুত নরম গলা, "...পনি, তুমি কি মানুষ?"

"ভোর দেখবে বলেছিলে।"

"আমি মরে গেছি। আমার ভূত আসবে। রাতের আঁধারে ভুত আসবে"। খানিক মজা, খানিক রোষের আখরে বলে ওঠে মেঘ। 

কিন্তু বিশ মিনিট পর সে ঠিকই এল, কার্ডিগান গায়ে, চুল এলোমেলো, চোখ আধবোজা। আমরা হোস্টেলের পেছনের ঢিবিতে গিয়ে বসলাম। পুব আকাশে সূর্য উঠছে, কুয়াশা চা-বাগানের ওপর তুলোর মতো ভাসছে। গাছে গাছে পাখিরা জেগে উঠছে, এক এক করে।

"ওই যে, ওটা শালিক," আমি বললাম। "আর ওই ডাকটা বুলবুলির। আর ওই যে দূরে কোকিলের ডাক, এখন তো ডাকার কথা নয়, ওটা বোধহয় ভুল সময়ে জেগেছে।"

"আমার মতো?" মেঘ হাসল।

"তোমার মতো না। তুমি ঠিক সময়েই জেগেছ।"

মেঘ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "এটা তো..." আর কিছু বলল না। শুধু তার ঠান্ডা আঙুলগুলো আমার হাতের পাশে রাখল, ধরল না, শুধু পাশে রাখল। আমি নড়লাম না। পাছে এই ভোর ভেঙে যায়। হোস্টেলের জানালা থেকে ওয়ার্ডেন ম্যাডাম একবার উঁকি দিলেন, তারপর পর্দা টেনে দিলেন। আমরা কেউ খেয়াল করলাম না। আমার ভাল লাগছিলো কিনা জানি না, তবে এটুকু বুঝেছিলাম যে ভোর যদি কিনতে চাই তাহলে দাম হিসেবে সকালে উঠতে হবে, ভাল লাগা বলতে, তার উপস্থিতি। এমা ! মেঘের মুখ থেকে মেঘ যেন একটু একটু করে সরে গিয়ে একফালি ভোরের রোদ দেখা দিচ্ছে!  

ওই বাজিটা কেউ জেতেনি। দুজনেই ঠিক করলাম, কফিও খাব না, চাও না।

আচ্ছা মাঝেমধ্যে কি কারু মনে হচ্ছে না যে মেঘ কেন আমাকে “তুমি” করে বলে বা “আমিও কেন বলি”? আমরা তো সহপাঠী। তুমি করে তো কেউ কথা বলে না একে অপরের সাথে! তাহলে আমরা কেন? এর উত্তর আজও জানি না। আসলে দেখবেন ক্লাসে হোক বা পাড়ায় হোক একটা লাভগুরু টাইপের লোক থাকে মাঝে মাঝে! যাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাওয়া যায় “আরে সব এমনি এমনি হয়ে যায়”। সব কিছুর কারণ খুঁজতে গেলে তো তুই লালবাজারে গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতি তাই না”? যাকগে বাদ দিন। আসল কথা শুনুন।  

ক্লাসে গিয়ে সেদিন দেখলাম কমলিকা ম্যামের রাগ থামেনি। ভাইভার পর তিনি আমাদের দুজনকে টার্গেট করতে শুরু করলেন, অথচ এবার খোঁচাগুলো কেমন যেন নরম। হারাধনদার কথা শোনার পর থেকে আমি ওঁকে একটু অন্য চোখে দেখতাম। ওঁর শাড়ির পাড়, ওঁর চশমার ফ্রেম, ওঁর হাতঘড়ি, সবকিছুতে একটা যত্ন, একটা সংগ্রামের চিহ্ন।

একদিন ক্লাসে বললেন, "পর্জন্য, মেঘরাগিনী, তোমরা দুজন তো সবসময় একসঙ্গে। এটা কি গবেষণার স্বার্থে?"

পুরো ক্লাস হাঁ। অন্তু প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছে।

আমি কিছু বলার আগেই মেঘ উঠে বলল, "হ্যাঁ ম্যাম, আমরা একটা প্রজেক্ট করছি।"

"কী প্রজেক্ট?"

আমি মনে মনে প্রার্থনা করছি, ও যেন কিছু একটা বানিয়ে বলে। ও এক সেকেন্ড দ্বিধা করল না। "'ঘনিষ্ঠতার মাত্রা বাড়লে একজনের উপস্থিতির প্রতি সংবেদনশীলতা কীভাবে বদলায়'। আমরা প্রতিদিন রিডিং নিচ্ছি, ম্যাম।"

ক্লাসে প্রায় বোমা ফাটল। শানু টেবিলে মাথা ঠুকে হাসছে। ভাসু তার বিখ্যাত পজ দিয়ে বলল, "...আহা, কী গভীর, কি কঠিন!" ঋত্বিক বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "কিসের রিডিং? ব্যাটিং অ্যাভারেজ কত?" আর দোলন হাসি চাপতে চাপতে গুনগুন করে 'তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী' ধরে ফেলল।

কমলিকা ম্যাম কয়েক সেকেন্ড মুখ শক্ত করে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য একটা হাসির রেখা, যেটা তাঁর মুখে আমি প্রথমবার দেখলাম। "রিপোর্ট জমা দেবে। রেফারেন্স সহ। 

ক্লাস শেষে অন্তু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "ভাই, ম্যামও শিপ করছে তোদের!"

"চুপ কর!"

"খ্যাক খ্যাক!"

না রিপোর্ট জমা দেবার আর সাহস দেখাইনি ! 

নির্মাল্য স্যার একদিন আমাদের দুজনকে ডেকে পাঠালেন। ল্যাবে ঢুকে দেখি তিনি একটা পুরোনো যন্ত্র নিয়ে ঝুঁকে আছেন, সামনে ধুলো-জমা একটা বাক্স।

"তোমরা দুজন এখন আমার ল্যাবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জুটি। এটা একটা টোন জেনারেটর। ঝিঁঝিঁপোকার ফনোট্যাক্সিসের এক্সপেরিমেন্টে লাগে, অনেকদিন বন্ধ পড়ে আছে। সারাতে পারবে?"

আমরা দুজনেই এক সঙ্গে বললাম, "পারব!"

স্যার প্রায় অদৃশ্য একটা ভুরু তুলে বললেন, "অতি উৎসাহ ভালো লক্ষণ। অথবা খারাপ।"

তিন দিন ধরে আমরা ওই যন্ত্র নিয়ে পড়ে থাকলাম। বিকেল চারটে থেকে সন্ধে সাতটা, ল্যাব ফাঁকা, শুধু আমরা দুজন আর একটা যন্ত্র। মেঘ সার্কিট বোঝে, আমি হাত দিয়ে বাকিটা। ও খোলে, আমি জোড়ি। কোণের কাচের বাক্সে ঝিঁঝিঁরা ডেকে যাচ্ছে, যেন আমাদের কাজের তদারকি করছে। হারাধনদা মাঝে মাঝে চা নিয়ে ঢুকছেন, আর কিছু না বলে চলে যাচ্ছেন। এক সময় ফিসফিস করে বললেন, "আমি তিরিশ বছর এই ল্যাবে আছি। কত জুটি দেখলাম। তোমাদের মতো কাউকে দেখিনি।"

একবার সোল্ডারিং আয়রন নিয়ে ও বেশ বিপদে পড়ল। "পনি, ধরো না! আমার হাত কাঁপছে!"

আমি ওর হাতের ওপর হাত রেখে আয়রনটা স্থির করলাম। ওর কবজি ঠান্ডা, আমার হাত গরম। দুজনেই চুপ। শুধু রজনের হালকা ধোঁয়া উঠছে।

"ঠিক জায়গায় আছে?" আমি ফিসফিস করলাম।

"হুঁ," ও বলল। কিন্তু ওর চোখ তারের দিকে ছিল না।

চতুর্থ দিনে যন্ত্রটা চালু হলো। একটা সরু, তীক্ষ্ণ সুর বেরোল। আর বাক্সের ভেতর থেকে একটা ঝিঁঝিঁ সঙ্গে সঙ্গে সুরের দিকে ছুটে গেল। আমরা দুজন লাফিয়ে উঠলাম, প্রায় জড়িয়ে ধরতে ধরতে থেমে গেলাম। কিন্তু ওই আবার! মুখটা কেমন যেন পান্ডুর হয়ে গেল! 

খানিকটা নিজেকে ঠিক করে নিয়ে-"ও আমাদের গান শুনতে পেয়েছে!" মেঘ বলল।

অনুভব হল নির্মাল্য স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, কখন এসেছেন জানি না। "ভালো," তিনি বললেন। তারপর, ইতিহাসে প্রথমবার, তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাসি। "এ বছরের রেজাল্ট ভালো হবে বোধহয়।"

মেঘ ফিসফিস করে বলল, "গুজবটা তাহলে সত্যি। ওনার হাসলে রেজাল্ট খারাপ হয়।"

"না," আমি বললাম। "ওনার হাসলে আমাদের রেজাল্ট ভালো হয়।"

স্যার যাওয়ার আগে টেবিলে একটা ছোট ঘড়ি রেখে গেলেন। পুরোনো, কাঁটা নেই। "এটা তোমাদের জন্য। কাঁটা তোমরা নিজেরা লাগিয়ো।" আমরা তাকিয়ে রইলাম। মেঘ খুব আস্তে বলল, "ওনারও কিছু আছে, না? কিছু যেটা উনি সারাতে পারেননি।" তবে কি এটা গিফট?
আমি নিরুত্তর রইলাম!

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.