পরের দিন কিছু উৎকৃষ্ট ঢপের ক্লাসের পর বিকেলে আকবর চাচার দোকানে আমাদের সভা বসল। কাঠের বেঞ্চ, খুরপিওয়ালা কাপে হাফ লিকার চা, সঙ্গে অনিবার্য প্রজাপতি বিস্কুট। দোকানের দেয়ালে ঝুলছে একটা পুরোনো ক্যালেন্ডার, সালটা দু বছর আগের। চাচা বলেন, "সময় তো থেমে নেই, ক্যালেন্ডারটা থেমে আছে, তাতে কার ক্ষতি?"
মাঝে মাঝে আকবর চাচা এরকম একটু স্বগতোক্তি করে দেয়। তার মানে কিন্তু এটাই নয় যে সে কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছে কিন্তু তার বক্তব্যটা এরকমই থাকে যেন তার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ কথাগুলো শুনছে।
শানু, মানে শাহীন আশরাফ, মালদার আমের দেশ থেকে এসেছে। তার ঝোলা থেকে আজও আচারের কৌটো বেরোল। সে তার সবচেয়ে সিরিয়াস মুখ করে বলল, "ভাই, পনি কহেন তো, আপনার কানের ডগাও কি ওই মাইয়ার মতো লাল হইছিল?"
"আমার কান লাল হয়নি।"
"সত্যি কহিতেছেন?" শানু মালদাই টানে ঠাট্টা চালাল। "এ যে এক্সপেরিমেন্টাল ইভিডেন্সের বিরুদ্ধে যাইতেছে।" তারপর কৌটো খুলে আমার দিকে আচার এগিয়ে দিল। "খাও। প্রেম ভাঙলে আমের আচার লাগে। প্রেম হলেও লাগে। আমের আচার সব অবস্থায় লাগে।"
শ্রী, শ্রীমঞ্জরী, জলপাইগুড়ির মেয়ে, চশমা নাকের ডগায় ঠেলে বলল, "ওকে ছেড়ে দে। পনি তো প্রেমে পড়ে গেছে। দেখছিস না, চা ঠান্ডা হয়ে গেল, ও খেয়ালই করেনি?"
আমি সলজ্জে তাড়াতাড়ি কাপে চুমুক দিলাম। সত্যিই ঠান্ডা।
অন্তু, রায়গঞ্জের ছেলে অথচ কথায় কলকাতার ভাব, বুক চিতিয়ে ঘোষণা করল, "আমি ইনফরমেশন কালেক্ট করেছি কাকা। মেঘরাগিনী ভবানীপুরের মেয়ে। এক বছর গ্যাপ গেছে, কারণ জানা নেই। লেডিজ হোস্টেলের তিন নম্বর ব্লকে ঘর পেয়েছে। আর ও চা খায় না, কফি খায়।"
"কফি কে বলল?"
"আমি দেখেছি ওর ঝোলায় ইনস্ট্যান্ট কফির স্যাশে।"
"তুই ওর ঝোলা ঘেঁটেছিস?"
"ঘাঁটিনি, চোখে পড়েছে। গোয়েন্দার চোখ সবসময় খোলা থাকে।"
"তুই গোয়েন্দা হলে সিআইডি বন্ধ হয়ে যাবে," শ্রী বলল।
তখন বাকিরাও এসে বসল। দোলনচাঁপা এল গুনগুন করতে করতে, 'আজি ঝড়ের রাতে' সুরে, কিন্তু কথাগুলো বানিয়ে 'আজি চায়ের দোকানে'। ঋত্বিক ঢুকল ব্যাট কাঁধে, যদিও ডিপার্টমেন্টে ব্যাট আনার কোনো কারণ নেই। ভাস্বতী, ডাকনাম ভাসু, সবার শেষে এসে চেয়ারে বসে চারদিকে তাকিয়ে নাটকীয় পজ দিল, তারপর বলল, "ওর নাম নিয়ে সবাই এত খিল্লি করছে, বেচারি কীভাবে সহ্য করছে ভাবো।"
সবাই একটু চুপ করল। শ্রী বলল, "কালকে ওকে নিজেদের টেবিলে ডাকব। আমরা তো আর কমলিকা ম্যাম নই।"
আমি মনে মনে বললাম, ধন্যবাদ।
রাতে হোস্টেলে ফিরে বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলতেন, "পনি, কথা কম বলবি, কাজ বেশি করবি। যে বেশি কথা বলে, সে নিজের মনের কথাটাই শেষ পর্যন্ত বলে উঠতে পারে না।" তখন বুঝিনি। এখন বুঝছি, কার নাম মনে আসছে, আর আমি সেটা কাউকে বলতে পারছি না।
বিকেলের রোদ একটু কমে এসেছে ! সূর্য অনেকটা সেই টোপা কমলালেবুর মত দেখতে লাগছে ।
পরের দিন আবার প্র্যাক্টিকাল। ল্যাবের দায়িত্বে ডক্টর নির্মাল্য চক্রবর্তী। লম্বা, রোগা, গম্ভীর। হাসলে নাকি ডিপার্টমেন্টের রেজাল্ট খারাপ হয়, এমনই গুজব। তাঁর ঘরের টেবিলে সারি সারি পুরোনো ঘড়ি, কোনোটার কাঁটা খোলা, কোনোটার ভেতরের চাকা বেরিয়ে আছে। হারাধনদা আমাদের ফিসফিস করে বলেছিলেন, "স্যার ঘড়ি সারান, কারণ উনি বিশ্বাস করেন, সময় ভাঙলে সারানো যায়।"
তিনি লটারি করে জোড়া বাঁধলেন। আমার ভাগে উঠল: "পর্জন্য সরকার, মেঘরাগিনী গুহঠাকুরতা।"
অন্তু ল্যাবের উল্টোদিক থেকে বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল। আমি খুবই ছোটোলোকের মত স্টাইলে চোখ মটকালাম!
এক্সপেরিমেন্ট: মৌমাছির Probosis extension response। একটা ছোট নলে মৌমাছিকে আলতো করে আটকানো থাকবে। একজন ধরবে, অন্যজন তুলির ডগায় চিনির জলের ফোঁটা তার শুঁড়ে ছোঁয়াবে। কত ঘনত্বের তফাত থেকে সে বুঝবে "এটা আগেরটার চেয়ে মিষ্টি" আর জিভ বাড়াবে, সেটাই তার JND।
মেঘ নলটার দিকে তাকিয়ে সরু গলায় বলল, "আমি... একটু ভয় পাই। মানে, যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তুমি ধরবে?"
"না না, আপত্তি কীসের।"
আমি নলটা হাতে নিলাম। আমার ঠাকুমার বাড়িতে মৌবাক্স ছিল। ছোটবেলায় ঠাকুমা আমাকে শিখিয়েছিলেন, মৌমাছিকে ভয় দেখালে সে কামড়ায়, ভালোবাসলে সে সঙ্গ দেয়। ঠাকুমা বলতেন, "ওরা ফুলের গল্প বয়ে আনে রে।" মৌমাছি আমার আঙুলে একদম শান্ত। মেঘ তুলি এগিয়ে দিল, ওর আঙুল একবার আমার কবজি ছুঁয়ে গেল, খুব হালকা। মৌমাছিটা জিভ বাড়াল।
"দেখেছ!" ও প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। "ও বুঝেছে! এই ঘনত্বটা আগেরটার চেয়ে বেশি!" তারপর ও হাসল। প্রথম শুনলাম ওর হাসি। ঘণ্টার মতো নয়, পাতার ওপর জলের ফোঁটার মতো।
"আমার গ্রামের হাত তো, আনাড়ি," আমি বললাম।
"ওটা ভুল কথা।" ও বেশ জোরের সঙ্গে বলল। "দেখো, ও তোমার হাতে কত শান্ত।" তারপর গলা নামিয়ে, "আমি কখনও ধানক্ষেত দেখিনি, জানো? বইয়ে পড়েছি, সিনেমায় দেখেছি। ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে বড় হয়েছি। আমার কাছে গ্রাম মানে একটা স্বপ্ন। ওটাকে কেউ গালাগালি হিসেবে বলে কেন, আমি ভেবে পাই না।"
আমি ওর দিকে তাকালাম। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড। ওর চোখের তারা ঠিক কফির রঙের মতো গাঢ় বাদামি, আমি আগে খেয়াল করিনি। ঠিক সেই সময় নির্মাল্য স্যার পেছন থেকে গলা খাঁকারি দিলেন। "রিডিং নেওয়া হচ্ছে, না গল্প?"
আমরা দুজনেই লাফিয়ে সোজা হলাম। মৌমাছিটা ততক্ষণে নল থেকে উড়ে গিয়ে স্যারের ঘড়ির টেবিলের দিকে রওনা দিয়েছে। স্যার একটা ঘড়ির কাঁটা হাতে তুলে ওকে অনুসরণ করলেন, মুখে একটা শব্দও করলেন না।
আমি ঠিক করে ফেললাম, ওকে ধানক্ষেত দেখাব।
ক্যাম্পাসের পেছন দিকে যে মাঠ, তার ওপারেই চাষের জমি, তারও ওপারে চা-বাগানের সবুজ ঢেউ। এক রবিবার সকালে আমি আর মেঘ, সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে শ্রী, সেদিকে হাঁটলাম। শ্রী খানিক পর "জুতোয় কাদা লাগছে" বলে একটা জরুরি ফোনের অছিলায় সরে পড়ল। ওর মতো ধূর্ত মেয়ে আমি দেখিনি। যাওয়ার আগে আমাকে একবার চোখ টিপে গেল, যেটা বুঝিয়ে দিল, "এবার তোর পালা।"
আশ্বিনের শুরু। ধানগাছগুলো সবুজ থেকে সোনার দিকে যাচ্ছে। দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা আজ মেঘের আড়ালে নেই। মেঘ আলপথে দু হাত মেলে ব্যালান্স করে হাঁটছে, ঠিক ছোট মেয়ের মতো। জমির ধারে ফড়িং উড়ছে, একটা সরু জলনালায় ছোট ছোট মাছ। ওর কাঁধের ঝোলা থেকে স্কেচবুকটা উঁকি দিচ্ছিল।
"ওটা কী মাছ?" ও ঝুঁকে পড়ল।
"পুঁটি। আর ওই যে ব্যাঙটা দেখছ, কোলা ব্যাঙ। আর ওপরে ওই যে চিলটা..."
"তুমি তো চলন্ত চিড়িয়াখানা!" ও হেসে ফেলল। তারপর স্কেচবুক বের করে ঝটপট পুঁটি মাছটার একটা ছবি এঁকে ফেলল। আমি অবাক। "তুমি আঁকো?"
"শুধু নিজের জন্য। কাউকে দেখাই না।" ও একটু লজ্জা পেল, কানের ডগা লাল। তারপর একটা ধানের শিষ ছুঁয়ে বলল, "এটাই ধান? এর থেকেই ভাত?"
"আমার ঠাকুমা বলত, ধান হল লক্ষ্মী। আর ভাত অপচয় করলে লক্ষ্মী রেগে যান।"
"তোমার ঠাকুমার গল্প বলো।"
আমি বললাম। দিনহাটার সেই ঠাকুমা, আমার প্রথম গুরু। যিনি ভোর চারটেয় উঠে উঠোনে আলপনা দিতেন, তারপর মৌবাক্সের কাছে গিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলতেন। যিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, কোন পাখি কোন ঋতুতে আসে। যাঁর মৃত্যুর দিন মৌমাছিরা বাক্স ছেড়ে সারা উঠোনে ঘুরে ঘুরে উড়েছিল। এই কথাটা আমি কাউকে বলিনি, বন্ধুদেরও না। মেঘকে বললাম, কেন জানি না। বলতে বলতে খেয়াল করিনি কখন আকাশ কালো হয়ে এসেছে। প্রথম ফোঁটাটা পড়ল মেঘের নাকের ডগায়।
"এই যাঃ!" ও ছাতা খুঁজতে ঝোলায় হাত ঢোকাল। কিছু নেই।
"আমার কাছেও নেই।"
"তোমার নামেই তো বৃষ্টি! পর্জন্য! তুমি এলেই আকাশ ভেঙে পড়ে।"
আমি অবাক। "তুমি জানো আমার নামের মানে?"
"অন্তুটা বলেছে। বলেছে ওটা বৃষ্টির দেবতা।" ও ভিজতে ভিজতে হাসছে। "তাহলে এক আকাশে দুটো মেঘ। একজন বৃষ্টি, একজন রাগিনী।"
আমরা দৌড়ে একটা পরিত্যক্ত পাম্প-ঘরের চালার নিচে ঢুকলাম। দুজনেই চুপচুপে। মেঘের চুল থেকে জল গড়াচ্ছে। ও একটু কাঁপছিল। স্কেচবুকটা বুকে চেপে ধরে রেখেছে, যেন সেটাই ওর সবচেয়ে দামি জিনিস। আমি ঝোলা থেকে শুকনো গামছাটা, হ্যাঁ, গামছাই, বের করে দিলাম।
"গামছা!" ও হেসে ফেলল। "তুমি গামছা নিয়ে ঘোরো?"
"গ্রামের ছেলে।"
"গ্রামের ছেলেরা আসলে খুব বুদ্ধিমান," ও মাথা মুছতে মুছতে বলল। তারপর গামছাটা একটু উঁচু করে ধরে বলল, "এটা আমি আজ রাখব। ধুয়ে ফেরত দেব।"
"ফেরত দিতে হবে না।"
"দেব। এটাই আমার ফেরার কারণ হবে।" ও কথাটা বলেই লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ফেরার পথে আমরা কেউ বেশি কথা বলিনি। শুধু বৃষ্টি পড়ছিল, আর আমার মনে হচ্ছিল Weber-Fechner মিথ্যা না। ছোট একটা ঘটনাও যখন আগের শূন্যতার ওপর এসে পড়ে, সে বিরাট হয়ে ওঠে।
ঝুম বৃষ্টির পর পাম্প-ঘরের টিনের চালে জলের তোড় একটু কমে এসেছে, কিন্তু একটানা ‘টুপটাপ’ শব্দটা থামেনি। চালের কোণ থেকে বড় বড় জলের ফোটা এসে পড়ছে নিচে জমে থাকা ছোট্ট কাদাজলে, সেখানে তৈরি হচ্ছে একের পর এক আবর্ত। যেন একটা বড় স্মৃতির ভেতর ছোট ছোট আরও কত স্মৃতি জন্ম নিচ্ছে।
আমি আর মেঘ সেই ভাঙা চালার নিচে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। বাতাসটা হঠাৎ বেশ হিম হয়ে এসেছে, আশ্বিনের নরম রোদের পর এই হঠাৎ বৃষ্টি যেন প্রকৃতির একটা অদ্ভুত খামখেয়াল। মেঘের ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে ওর কাঁধে, কিন্তু ওর চোখ দুটো যেন থমকে আছে দূরের ওই চা-বাগানের দিকে। সেখানে মেঘ আর কুয়াশা মিলেমিশে সব কিছুকে কেমন একটা ধূসর আস্তরণে ঢেকে দিয়েছে।
“জানো পনি,” মেঘ হঠাতই বলে উঠল, ওর গলাটা বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিলে যেন আরও মায়াবী শোনালো, “ভবানীপুরের ওই চারতলার ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন বৃষ্টি দেখতাম, তখন মনে হতো বৃষ্টিটা শুধু কংক্রিটের ওপর আছড়ে পড়া কিছু জলের ফোঁটা। গাড়িগুলোর কাচ ঘোলা হয়ে যেত, রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যাম আরও বেড়ে যেত... ব্যস, ওইটুকুই। কিন্তু এখানে, এই মাটির সুবাসের সঙ্গে বৃষ্টির মিশে যাওয়া দেখে মনে হচ্ছে—বৃষ্টির নিজস্ব একটা ভাষা আছে। আমরা শহরের মানুষরা সেই ভাষার ব্যাকরণটাই শিখিনি।”
আমি কথা না বলে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যি, প্রকৃতির এই রূপান্তরটাই তো আসল। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে আমরা বলি ‘ফেজ ট্রানজিশন’—এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরেও যে এত সহজে আবহাওয়ার বদল ঘটে যায়, তা কোনো ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবে মাপা যায় না।
“আমাদের ইউনিভার্সিটির বটতলাটার কথা ভাবো,” আমি আস্তে করে বললাম, “রোদ উঠলে ওখানে ঝালমুড়ি আর চায়ের বাটি হাতে কত আড্ডা জমে। আর একটু বৃষ্টি নামলেই সব ধূ-ধূ ফাঁকা। শুধু কিছু কাক ভিজতে ভিজতে ডালপালার মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। অথচ এই মাঠটা দ্যাখো, বৃষ্টি নামার পর যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠল। ধানের শিষগুলো কেমন নুয়ে পড়ে জলকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।”
মেঘ একটু হাসল। সেই হাসিটা যেন বৃষ্টিভেজা বিকেলে একফালি রোদের মতো। “তোমার এই কথাটা খুব সুন্দর পনি। তুমি সব কিছুকে এত সহজভাবে দেখতে পারো কী করে বলতো? আমি তো বিজ্ঞানের ছাত্রী, অথচ আমার মনে হয় জীবনের আসল পড়াগুলো কোনো টেক্সটবুক-এ লেখা থাকে না। ওই যে নির্মাল্য স্যার ঘড়ি সারান—উনি কি সত্যিই সময়কে ফেরাতে চান, নাকি ভেঙে যাওয়া কোনো মুহূর্তকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেন?”
কথাটা আমাকে ভাবাল। ল্যাবের সেই মেটানোমিক টিকটিক শব্দ, র্যাকে সাজানো পুরনো ক্যালিবার, আর নির্মাল্য স্যারের সেই নির্জন বিষণ্ণতা—সবটা যেন হঠাৎ এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেল। ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টাল করিডোরগুলোর একটা নিজস্ব গল্প থাকে। সকালবেলা লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ, ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে চকের গুঁড়ো ওড়া, আর বিকেল হলেই চায়ের দোকানে রাজনীতির তর্ক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত অনুভূতির গোপন আদান-প্রদান—সবটাই যেন এক অদ্ভুত ক্যানভাস।
“সময় তো নদী মেঘ,” আমি বললাম, “তাকে ফেরানো যায় না। কিন্তু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যেমন জলের স্রোত ছোঁয়া যায়, তেমনই স্মৃতিকে ছুঁয়ে থাকা যায়। নির্মাল্য স্যার হয়তো সেই স্মৃতিগুলোকেই টিকটিক শব্দের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে চান।”
মেঘ কিছু বলল না। ওর হাত থেকে সেই ভেজা গামছাটা একটু আলগা হয়ে ঝুলে পড়েছিল। ও সেটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দূরে একটা মাছরাঙা পাখি বৃষ্টি থামার অপেক্ষা ছেড়ে দিয়ে ঝপ করে জলের ওপর নেমে এলো, তারপর একটা ছোট্ট পুঁটি মাছ মুখে নিয়ে উড়ে গেল ওপাশের ঝোপের দিকে। জীবনটা কত সহজ, অথচ কত গভীর।
বৃষ্টির তেজ আরেকটু কমতেই আমরা হাঁটতে শুরু করলাম ক্যাম্পাসের দিকে। ভিজা কাঁচা মাটির গন্ধ আমাদের চারপাশে এক অদৃশ্য মায়াজাল বুনে দিয়েছে। আলপথের ওপর এখন আমাদের চারটে পায়ের ছাপ—দুটো বড়, দুটো ছোট।
শ্রী ততক্ষণে ক্যাম্পাসের গেটের কাছে বটতলায় চায়ের দোকানে অপেক্ষা করছিল। আমাদের দুজনকে একসাথ ভিজতে ভিজতে ফিরতে দেখে ওর চোখের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি খেলে গেল। কিন্তু আজ আর ও কোনো ঠাট্টা করল না। হয়তো আমাদের দুজনের মুখের আবহাওয়া দেখে ও বুঝেছিল, এই বৃষ্টির রূপকথাকে এখন কোনো কৌতুক দিয়ে ভাঙা ঠিক হবে না।
চাচার দোকানে তখন বিকেলের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে। কাউন্টারে সেই দু’বছর আগের মেয়াদউত্তীর্ণ ক্যালেন্ডারটা দোলে দোলে একাই হেলে রয়েছে।
আকবরচাচা ঢালতে ঢালতে আবার সেই স্বগতোক্তি করলেন, “মেঘ নামলে সবাই ছাতা খোঁজে গো, কিন্তু কিছু পাগল থাকে যারা শুধু ভেজার বাহানা খোঁজে। সময় পার হয়ে যায়, ভিজে যাওয়া জামা শুকিয়ে যায়, কিন্তু ওই বৃষ্টির দাগটা মনের ভেতরে থেকে যায়...”
মেঘ চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে একটু মৃদু হাসল। আজ ও কফির কথা আর মনেও আনেনি। গরম চায়ের ধোঁয়া উঠছে, আর সেই ধোঁয়ার ওপার থেকে মেঘের বাদামি চোখের তারা দুটো আমার দিকে স্থির হয়ে আছে।
আমি বুঝতে পারলাম, প্রকৃতি আর মানুষের মনের ভেতরের অনুভূতির মধ্যে কোনো তফাত নেই। যখন ভেতরে মেঘ জমাট বাঁধে, তখনই বাইরের আকাশে বৃষ্টি নামে। আর এই বৃষ্টিতেই সম্পর্কের প্রথম শিকড়টা মাটির গভীরে ছড়িয়ে যায়, অলক্ষে, চুপচাপ।