সমুদ্র উত্তাল, তেলের দামের সুনামি চারদিকে আছড়ে পড়ছে, বিদ্যুতের বিশ্রী লোডশেডিংয়ে জনজীবন ভূতুড়ে অন্ধকারে ডুবে আছে, আর আইনশৃঙ্খলার গ্রাফ নেমে গেছে তলানিতে—অথচ রাষ্ট্রীয় জাহাজের ককপিটে বসে থাকা নাবিকরা চোখে কালো পট্টি বেঁধে এমন এক গভীর ঘুমে মগ্ন, যেন তাদের কোনো কালেই আর বন্দরে ফেরার তাগিদ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগুন, সাধারণ মানুষের পকেট শূন্য, আর পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন প্রশাসনের টেবিলে জমে থাকা ধুলো ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন নেই। এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ হতাশা থেকে এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "আহা, কী নিঃস্বার্থ সরকার! এরা জেনেশুনেই আগামীবার ক্ষমতায় আসার মতো কোনো পথ খোলা রাখছে না, জনদুর্ভোগ দূর করার কোনো বিকারই এদের নেই!"
সাধারণ চোখে প্রশাসনের এই দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তা বা উদাসীনতাকে নিছক অদক্ষতা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যখন আমরা একে সাহিত্যিক মেটাফোর এবং গভীর তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক চশমা দিয়ে বিচার করি, তখন এটি আর সাধারণ কোনো ব্যর্থতা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর, বধির ও সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় শিল্প—যাকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ক্রিটিক্যাল সোসিওলজির ভাষায় বলা চলে ‘অপারেশনাল সাইলেন্স’ বা কার্যকর নীরবতা। রাষ্ট্র যখন সচেতনভাবে জনগণের চোখের জল ও আর্তনাদকে ‘মিউট’ করে দিয়ে কেবল নিজের মতো চলতে ভালোবাসে, তখন বুঝতে হবে ক্ষমতা আর জনমতের মেলবন্ধন চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেছে।
আর ঠিক এখানেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত রাজনৈতিক শূন্যতা, যা তাত্ত্বিকভাবে পরিচিত ‘পোস্ট-পলিটিক্যাল সিনড্রোম’ নামে। এই ব্যবস্থার মোড়কে রাজনীতি আর জনগণের কল্যাণ, অধিকার কিংবা আশাবাদের প্রতীক থাকে না; বরং এটি পরিণত হয় এক যান্ত্রিক, ঠান্ডা ও নিস্পৃহ কর্পোরেট কাঠামোতে। যেখানে ব্যালট পেপারের দীর্ঘশ্বাস, মিছিলের স্লোগান কিংবা জনরোষের আগুন কোনো কিছুই এয়ারকন্ডিশন্ড কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে নীতিনির্ধারকদের বধির কানে পৌঁছায় না। নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সেই চিরন্তন ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট কবেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে, আর তার জায়গায় স্থান নিয়েছে এক অদ্ভুত আত্মঘাতী নিস্পৃহতা।
এই প্রবন্ধের বিস্তৃত ক্যানভাসে আমরা খতিয়ে দেখব, কীভাবে জনকল্যাণের মোহ কাটিয়ে বর্তমান প্রশাসন এক আত্মঘাতী ও ‘নিঃস্বার্থ’ উদাসীনতার চাদরে ঢেকে গেছে এবং এই অপারেশনাল সাইলেন্স কীভাবে পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক পোস্ট-পলিটিক্যাল অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
একটি রাষ্ট্র যখন তার মূল স্পন্দন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার প্রথম এবং সরাসরি আঘাত এসে লাগে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাপনের ওপর। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি মিলে জনজীবন আজ এক অবরুদ্ধ কূপে পরিণত হয়েছে। আর এই চরম সংকটের মুখে রাষ্ট্রযন্ত্রের অবিশ্বাস্য নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে জন্ম দিয়েছে এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও গভীর হতাশার মিশ্রণ—যাকে সাধারণ মানুষ অভিহিত করছে সরকারের এক ধরণের “নিঃস্বার্থ আত্মহনন” হিসেবে।
বাজারের থলে হাতে নিয়ে যখন একজন সাধারণ মানুষ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে হিসাব কষেন, তখন সেখানে শুধু সংখ্যা থাকে না, থাকে অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের গড় মূল্যস্ফীতি উচ্চহারে অস্থিতিশীল রয়েছে, যা বিগত অর্থবছরগুলোতে ৮ থেকে ৯ শতাংশের ওপরে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেছে। চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আজ সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে অবস্থান করছে। লাগামহীন এই মূল্যস্ফীতি মানুষের পকেট শূন্য করে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকুও। অথচ এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের টেবিল থেকে জোরালো কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বাজার যেন আজ এক অদৃশ্য এবং নির্মম শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কোনো প্রায়োগিক মূল্য নেই।
অর্থনীতি এবং জনজীবনের চাকা সচল রাখার মূল জ্বালানি—অর্থাৎ বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের বাজার আজ নিজেই এক গভীর সংকটে আবর্তিত। সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন ও সামগ্রিক বাজারদরে।
এর ওপর যুক্ত হয়েছে তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের বিশ্রী দশা। জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশাল বকেয়া বিল ও গ্যাস স্বল্পতার কারণে পিডিবি (PDB) চাহিদামুমাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক বিদ্যুতের ঘাটতি বা লোডশেডিং প্রায়ই ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা যখন পড়ার টেবিলে অন্ধকারে বসে হাঁপিয়ে ওঠে, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা যখন জেনারেটরের চড়া দামে পুঁজি হারায়, কিংবা হাসপাতালের জরুরি সেবাগুলো যখন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হুমকিতে পড়ে—তখন চারদিকে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। অথচ এই খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে বা জনগণের দুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো কার্যকর আশ্বাসের আলো দেখা যায় না; বরং এই লোডশেডিং যেন এক অদৃশ্য নিয়তিতে পরিণত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের তালিকার শীর্ষে রয়েছে জীবনের নিরাপত্তা। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ধাক্কায় মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের মনোবলে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যায়। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল পর্যন্ত ছিনতাই, চুরি, খুচরা সহিংসতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি আজ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। প্রশ্ন হলো, এই অপরাধগুলো দমনে প্রশাসনের যে proactive বা কঠোর ভূমিকা থাকার কথা, তার দেখা মিলছে না কেন? অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর নাগরিকেরা আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে—এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকা এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
এই বহুমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ জমা হয়, তা থেকেই জন্ম নেয় এক দারুণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—"আহা, এই সরকার আসলেই নিঃস্বার্থ! এরা তো আরেকবার ক্ষমতায় আসার বা জনসমর্থন কুড়ানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করছে না।"
মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই ব্যঙ্গের গভীর অর্থ রয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক সরকার স্বাভাবিক অবস্থায় জনরোষ এড়াতে এবং টিকে থাকার জন্য হলেও সংকট নিরসনে তৎপর হয়। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন যখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং এবং আইনশৃঙ্খলার চরম পতনের পরও সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে, তখন জনগণ বুঝতে পারে যে তাদের ভালো থাকার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের এজেন্ডাতেই নেই। সরকার জেনেশুনেই এমন সব আত্মঘাতী ও জনবিচ্ছিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে যা তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই সাধারণ মানুষ একে "নিঃস্বার্থ আত্মহনন" বলে অভিহিত করে—যেখানে ক্ষমতার মোহ বা টিকে থাকার বিন্দুমাত্র তাগিদ বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্র এক অদ্ভুত, শীতল ও বধির নিস্পৃহতায় নিমজ্জিত হয়েছে।
একটি সচল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংকট যখন পুঞ্জীভূত হতে শুরু করে, তখন প্রশাসনিক যন্ত্রের প্রথম এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা—দ্রুত সাড়া দেওয়া বা প্রো-অ্যাক্টিভ (Proactive) পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের শাসনকাঠামোর দিকে তাকালে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়, যেখানে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও প্রশাসন যেন এক অদ্ভুত ও কৃত্রিম বধিরতা বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বে এই অবস্থাকেই বলা চলে ‘অপারেশনাল সাইলেন্স’ বা কার্যকর নীরবতা। এটি কেবল সাধারণ কোনো অদক্ষতা নয়; বরং এটি এমন এক সুপরিকল্পিত ও সুদীর্ঘ নীরবতা সংস্কৃতি, যেখানে জনদুর্ভোগ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলের টেবিলে কোনো স্পন্দন তুলতে ব্যর্থ হয়।
রাষ্ট্র যখন একের পর এক বহুমুখী সংকটে আবর্তিত হয়—যেমন মূল্যস্ফীতির উর্ধ্বগতিতে মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়া কিংবা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়া—তখন প্রশাসনের তরফ থেকে কার্যকর বা দূরদর্শী কোনো ප්රතිকারমূলক পদক্ষেপ দেখা যায় না। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের তথ্য-উপাত্তে এর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চমাত্রায় (অষ্টম থেকে নবম শতাংশের ঘরে) অস্থিতিশীল রয়েছে, যার জেরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে সংকুচিত হয়েছে।
পাশাপাশি, জ্বালানি ঘাটতি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ধস নেমেছে, তাতে জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ একপর্যায়ে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মফস্বল বা গ্রামীণ জনপদে যেখানে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দিশাহারা, তখন প্রশাসনিক দপ্তরগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কোনো সমাধানের চিত্র উহ্য থেকে গেছে। সংকট মোচনে এই যে দীর্ঘমেয়াদী অনীহা, তা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রযন্ত্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালনের গতি হারিয়ে ফেলেছে।
‘অপারেশনাল সাইলেন্স’-এর সবচেয়ে বড় কৌশল হলো সামাজিক ক্ষোভ এবং জনগণের আর্তনাদের ওপর সচেতনভাবে ‘মিউট’ বাটন চেপে দেওয়া। মিডিয়ার শিরোনামে বা সাধারণ মানুষের মুখে যখন ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে, তখন ক্ষমতার উচ্চাসনে বসে থাকা কর্তাব্যক্তিরা এমন ভাব দেখান যেন কিছুই ঘটছে না। এটি নিছক উদাসীনতা নয়; এটি এক ধরনের সচেতন রাজনৈতিক পছন্দ (Political Choice)।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর অধীনে গ্রামাঞ্চলে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকা, কিংবা শিল্পোদ্যোক্তাদের গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাগুলো যখন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়, তখনও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে যে ধরনের জরুরি তৎপরতা বা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট দেখা যাওয়ার কথা ছিল, তার অভাব স্পষ্ট। রাষ্ট্র যেন নিজেই জনগণের সাথে যোগাযোগের সব ফ্রিকোয়েন্সি বন্ধ করে দিয়ে একটি কৃত্রিম ও শব্দহীন দ্বীপে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস পৌঁছানোর কোনো পথ নেই।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অপারেশনাল সাইলেন্স হলো নাগরিকের কণ্ঠস্বরকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বা 'রেডান্ডেন্ট' ঘোষণা করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। যখন কোনো সরকার বা প্রশাসন বুঝতে পারে যে তাদের ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য বা টিকে থাকার জন্য আর জনগণের মেন্ডেটের বা জনতুষ্টির প্রয়োজন নেই, তখন তারা জনগণের যেকোনো দাবি বা সমালোচনাকে শক্তি দিয়ে বা নিছক নীরবতা দিয়ে দমন করতে চায়।
এই অহংকারপূর্ণ নীরবতা প্রশাসনকে এক ধরনের অলীক নিরাপত্তার আবরণে ঢেকে রাখে। অপরাধের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কিংবা নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজারের বিরুদ্ধে যখন সাধারণ নাগরিকেরা রাজপথে বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এই অপারেশনাল সাইলেন্স সেই ক্ষোভের কোনো উত্তর দেয় না। ফলস্বরূপ, এই বধির ও অহংকারপূর্ণ নীরবতা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সেতুটি ভেঙে পড়েছে এবং প্রশাসন এখন জনগণের প্রতিক্রিয়াকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে নিজের খামখেয়ালি ছকে চলতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
একটি রাষ্ট্রে যখন অপারেশনাল সাইলেন্স বা বধিরতার সংস্কৃতি তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে, তখন পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো প্রবেশ করে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও শীতল অধ্যায়ে—যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা অভিহিত করেন ‘পোস্ট-পলিটিক্স’ বা রাজনীতির উত্তরকাল হিসেবে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক শ্যান্টাল মুফ (Chantal Mouffe) কিংবা স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভোজ জিজেকের (Slavoj Žižek) তাত্ত্বিক কাঠামোতে পোস্ট-পলিটিক্স বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে রাজনীতি থেকে জনমতের প্রকৃত দ্বন্দ্ব, আবেগ, আদর্শ এবং জনকল্যাণের মূল স্পন্দনগুলো চিরতরে মুছে যায়। রাষ্ট্র তখন আর মানুষের স্বপ্ন বা সংকটের অংশীদার থাকে না, বরং এটি পরিণত হয় এক যান্ত্রিক, ঠান্ডা এবং নিস্পৃহ কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায়।
পোস্ট-পলিটিক্যাল সিনড্রোমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের সাথে কোনো ধরনের জীবন্ত সংযোগ বজায় রাখে না। রাজনীতি যখন কেবল একটি টেকনোক্র্যাটিক বা যান্ত্রিক রুটিনে পরিণত হয়, তখন নীতিনির্ধারকদের কাছে সাধারণ মানুষের ভোট, ক্ষোভ, কিংবা বেঁচে থাকার আকুতিগুলো অর্থহীন সংখ্যায় পর্যবসিত হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও পরিকল্পনা কমিশনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির আকার কাগজে-কলমে দেখানো হলেও, মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনে এর কোনো ইতিবাচক সুফল পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি (ADB) কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রাক্কলন অনুযায়ী যেখানে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে ৮ থেকে ৯ শতাংশের ওপরে অনড় রয়েছে এবং শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পতনমুখী হয়েছে, সেখানে নীতিনির্ধারণী টেবিলে কোনো ধরনের মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন বা জনমুখী সংস্কারের দেখা মেলে না।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম, খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র এই কাঠামোগত লুটপাট ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা দূর করার জন্য কোনো কার্যকর বা যুগান্তকারী পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল প্রবৃদ্ধির ফাঁপা পরিসংখ্যান প্রচারেই ব্যস্ত থাকে। রাষ্ট্র যেন একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারের মতো কেবল নিজের কোডে চলছে—যেখানে জনগণের দুঃখ-কষ্ট ইনপুট দিলেও আউটপুটে কোনো সহানুভূতি বা কার্যকর সমাধান আসে না। এই যান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনকল্যাণের ধারণাটি পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে।
পোস্ট-পলিটিক্যাল যুগে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের মধ্যকার দূরত্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, মাঝখানে এক অলঙ্ঘনীয় ‘কাঁচের প্রাসাদ’ তৈরি হয়ে যায়। রাজধানী বা বড় শহরগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আর প্রাত্যহিক মাঠের বাস্তবতার জমিন একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য বা বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তাদের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার লাগাতার খবরের পরেও যখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা কাঠামোগত সংকট নিরসনে ব্যর্থ হন, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মাঠের বাস্তবতার সাথে প্রশাসনিক মগজধোলাইয়ের দূরত্ব আকাশ-পাতাল। গণমাধ্যমে বা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে যখন জ্বালানি খাতের বিশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতির চাপ কিংবা আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন ক্ষমতার উচ্চাসনে বসে থাকা কর্তাব্যক্তিদের কাছে সেই আওয়াজ পৌঁছায় না। কারণ তাদের যোগাযোগ বা ফিডব্যাক লুপটি পুরোপুরি বন্ধ থাকে। তারা কেবল তাদের নিজস্ব গণ্ডি বা আমলাতান্ত্রিক বৃত্তের ভেতর থেকে পৃথিবীটাকে দেখেন। ফলস্বরূপ, রাজপথের মিছিল, মধ্যবিত্তের হাহাকার কিংবা প্রান্তিক মানুষের উপোস থাকার দীর্ঘশ্বাস—কোনো কিছুই এই কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে নীতিনির্ধারকদের বধির কানে পৌঁছাতে পারে না।
এই পোস্ট-পলিটিক্যাল বাস্তবতায় রাষ্ট্রে নাগরিকের অবস্থান হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ প্রান্তিক। একটি গণতান্ত্রিক বা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে জনগণই হলো ক্ষমতার উৎস এবং নীতিমালার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু পোস্ট-পলিটিক্যাল সিনড্রোমে আক্রান্ত রাষ্ট্রে জনগণ পরিণত হয় কেবল একটি ‘শাসিত প্রজা’ বা ম্যানেজড পপুলেশনে, যাদের কাজ কেবল নির্দেশ পালন করা এবং যেকোনো মূল্যে সিস্টেমের বোঝা বয়ে চলা।
রাষ্ট্রের সমস্ত মনোযোগ বা অগ্রাধিকার যখন জনকল্যাণ থেকে সরে গিয়ে কেবল কাঠামোগত স্থায়িত্ব বা যান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্পৃহাগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বা জাতীয় সংস্থাসমূহের শ্রমবাজার বা অর্থনৈতিক শ্লথতার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও যখন রাষ্ট্রযন্ত্র উদাসীন থাকে, তখন প্রমাণিত হয় যে এই সমাজব্যবস্থা তার রাজনৈতিক প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এই ব্যবস্থার পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী—কারণ যখন একটি রাষ্ট্র সচেতনভাবে তার নাগরিকদের সাথে সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে, তখন সেই ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর থেকেই জন্ম নেয় এক গভীর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক শূন্যতা, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো শাসনব্যবস্থাকে এক অনিবার্য পতন ও অস্থিতিশীলতার মুখে নিয়ে যায়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তিমূল দাঁড়িয়ে আছে ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (Social Contract)-এর ধারণার ওপর—যা থমাস হবস, জন লক ও জ্যঁ-জ্যাক রুশোর মতো দার্শনিকদের তত্ত্বে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সারকথা হলো—নাগরিকেরা তাদের কিছু স্বাধীনতা বা অধিকার রাষ্ট্রের হাতে অর্পণ করে এবং বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের জীবন, সম্পত্তি, মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করবে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের পোস্ট-পলিটিক্যাল বাস্তবতায় এই অবিন্যস্ত ও পবিত্র চুক্তিটি আজ সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন। রাষ্ট্র যখন তার মৌলিক দায়িত্বগুলো থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং এক অদ্ভুত ‘নিঃস্বার্থ’ নিস্পৃহতা ও অপারেশনাল সাইলেন্স বজায় রাখে, তখন সেই চুক্তির একতরফা ও করুণ অবক্ষয় ঘটে।
সামাজিক চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের সেই মৌলিক অধিকারগুলো আজ চরমভাবে বিপন্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার বিভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক সূচকের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় (Real Income) এবং ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশের কোটি কোটি পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামের চাপে তাদের খাদ্যতালিকা ও পুষ্টির মান কমাতে বাধ্য হয়েছে।
একইভাবে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি (যেমন ডিজেল ও পেট্রোলের চড়া দাম), বিদ্যুৎ খাতের তীব্র বিপর্যয়—যেখানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং এবং গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে—এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী খুন, ছিনতাই ও সহিংসতার ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র তার চুক্তির ন্যূনতম শর্তগুলোও আর রক্ষা করতে পারছে না। কর, ভ্যাট ও রাজস্ব দিয়ে নাগরিকেরা ঠিকই তাদের আনুগত্য ও বাধ্যবাধকতা বজায় রাখছে, কিন্তু বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে কেবল নিরাপত্তাহীনতা, বঞ্চনা আর অব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘ তালিকা।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবেরমাস (Jürgen Habermas)-এর ‘লেজিটিমেসি ক্রাইসিস’ বা বৈধতার সংকট তত্ত্বের আলোকে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র যখন দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের কল্যাণ সাধনে ব্যর্থ হয় এবং জনরোষ বা সংকটের সামনে বধির বা অপারেশনাল সাইলেন্স বজায় রাখে, তখন সেই শাসনব্যবস্থা তার নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা হারাতে শুরু করে।
বিশ্বব্যাংক ও গ্লোবাল গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস (GGI)-এর বিভিন্ন সূচকে শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা এই কাঠামোগত ভাঙনেরই প্রমাণ। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বা যান্ত্রিক শক্তি যতই কঠোর করা হোক না কেন, জনগণের মনস্তত্ত্বে যখন একবার এই বিশ্বাস জন্ম নেয় যে—এই রাষ্ট্র আর তাদের নয়, বরং এটি একটি দূরবর্তী ও পরবাসী কর্পোরেট যন্ত্র—তখনই লেজিটিমেসি ক্রাইসিস বা বৈধতার সংকট তার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। সরকার বা প্রশাসনের প্রতি জনগণের এই আস্থার পতন কেবল সাময়িক কোনো ক্ষোভ নয়, এটি হলো রাষ্ট্রে কাঠামোগত আনুগত্যের চিরতরে ভেঙে যাওয়া।
সামাজিক চুক্তির সফল বাস্তবায়নে রাষ্ট্র বা সরকার হওয়ার কথা ছিল জনগণের ‘রক্ষক’ ও পরম আশ্রয়স্থল। কিন্তু পোস্ট-পলিটিক্যাল সিনড্রোমের প্রভাবে বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামো আজ সেই রক্ষকের ভূমিকা হারিয়ে এক সম্পূর্ণ ‘দূরবর্তী, পরবাসী এবং উদাসীন শক্তিতে’ রূপান্তরিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে তাদের হাহাকার, বেকারত্ব, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম কিংবা নিরাপত্তার অভাব নীতিনির্ধারকদের কাঁচের প্রাসাদের দেয়ালে এসে ধাক্কা খেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্র তাদের কাছে আর আস্থার প্রতীক থাকে না; বরং এটি এক ভীতিজনক ও শোষক যান্ত্রিক সত্তায় পরিণত হয়। এই দূরত্ব এবং আস্থার চরম সংকট দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজব্যবস্থাকে এক গভীর ঐতিহাসিক শূন্যতা, সামাজিক অস্থিরতা এবং কাঠামোগত পতনের মুখে ঠেলে দেয়—যেখান থেকে ফিরে আসার পথ অত্যন্ত দুর্গম ও রক্তাক্ত।
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যখন জাহাজের তলা ফুটো করে দেয়, আর ককপিটের নাবিকরা যদি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থেকে কানে তুলো গুঁজে বসে থাকেন—তবে সেই জাহাজের শেষ পরিণতি কী হতে পারে, তা ইতিহাসের যেকোনো শিক্ষার্থীরই জানা। একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো যখন তার প্রাণস্পন্দন, জনকল্যাণের তাগিদ এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাথে সমস্ত সংযোগ হারিয়ে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও বধির হয়ে পড়ে, তখন তার তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক পরিণতি এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকেই ধাবিত হয়। এই প্রবন্ধের পরতে পরতে আমরা তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোয় এবং সাম্প্রতিক নির্মম বাস্তবতার নিরিখে পর্যবেক্ষণ করেছি যে, কীভাবে ‘অপারেশনাল সাইলেন্স’ এবং ‘পোস্ট-পলিটিক্যাল সিনড্রোম’ যৌথভাবে একটি গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক গভীর, হিমশীতল ও আত্মঘাতী শূন্যতার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
শাসকগোষ্ঠীর এই তথাকথিত ‘নিঃস্বার্থ’ উদাসীনতা কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পরিপক্কতা বা দূরদর্শী কৌশল নয়; এটি হলো কর্তৃত্ববাদের এমন এক অন্ধ দশা, যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে জনগণের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে একচ্ছত্র ঈশ্বর মনে করে। যখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষের পকেট শূন্য হয়ে যায়, জ্বালানি তেলের দামের লাফে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে, কিংবা জাতীয় গ্রিডের লোডশেডিংয়ে জনজীবন অন্ধকারে ডুবে থাকে—তখনও প্রশাসন যখন সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তখন প্রমাণিত হয় যে সিস্টেমের ভেতরে আর কোনো জৈবিক বা সংশোধনীয় জীবনীশক্তি অবশিষ্ট নেই।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবেরমাসের ‘লেজিটিমেসি ক্রাইসিস’ কিংবা শ্যান্টাল মুফের পোস্ট-পলিটিক্যাল তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ধরনের কাঠামোগত বধিরতা বা অপারেশনাল সাইলেন্স সাময়িকভাবে ক্ষমতার যান্ত্রিক ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে এমন এক চিরস্থায়ী ফাটলে ফেলে যা কোনো সিমেন্ট দিয়ে জোড়া লাগানো যায় না।
ইতিহাসের নির্মম ও ধ্রুব সত্য হলো—যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাথে সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সেতু চিরতরে ভেঙে ফেলে, সেই রাষ্ট্র একসময় বাহ্যিক শক্তির আঘাতে নয়, বরং নিজেরই কুক্ষিগত ভার ও আস্থার অভাবে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে বাধ্য হয়। ব্যালট পেপারের দীর্ঘশ্বাস, মধ্যবিত্তের হাহাকার কিংবা প্রান্তিক মানুষের উপোস থাকার নীরব কান্না দীর্ঘদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের প্রাসাদের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রাখা যায় না। অপারেশনাল সাইলেন্স শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার অহংকারকে চূর্ণ করে দেয় এবং এমন এক শূন্যতার জন্ম দেয়, যেখানে কোনো প্রতিধ্বনিও ফিরে আসে না।
পরিশেষে এক সাহিত্যিক ব্যঞ্জনায় বলা যায়, রাজনীতির মাঠ থেকে যখন জনস্বার্থ, গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিতা পুরোপুরি নির্বাসিত হয়, তখন রাষ্ট্র কেবল একটি ফাঁপা , হিমশীতল ও ভীতিজনক কর্পোরেট যন্ত্রে পরিণত হয়। এই নিঃস্বার্থ শূন্যতার চূড়ান্ত পরিণতি কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনে না; বরং এটি কর্তৃত্ববাদের সেই নিঃশব্দ ও পতনমুখী প্রস্থানকে ত্বরান্বিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজকে এক অনিবার্য ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ও নতুন জাগরণের মহান বেদীতে দাঁড় করিয়ে দেয়।