FF.
​ইনফো-ক্যাপিটালিজম ও ডেটাস্ফিয়ার: সাম্প্রতিক পুঁজিবাদের অদৃশ্য জালে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ Book page

Chapter 5

​ইনফো-ক্যাপিটালিজম ও ডেটাস্ফিয়ার: সাম্প্রতিক পুঁজিবাদের অদৃশ্য জালে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ

Sep 21, 2026 12 min read

মানবসভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তন পরিক্রমায় ক্ষমতার স্বরূপ এবং তার প্রকাশের রূপরেখা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাক-আধুনিক যুগে ক্ষমতা ছিল দৃশ্যমান, যা রাজদণ্ড, রক্তপাত ও সরাসরি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের শরীরকে পরাধীন করত। পরবর্তীতে আধুনিকতার সূচনায় মিশেল ফুকোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উন্মোচিত হলো এক নতুন ডিসিপ্লিনারি সমাজ, যেখানে কারাগার, হাসপাতাল আর স্কুলের ঘেরা টোপে মানুষকে শৃঙ্খলিত করা হলো নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই অন্তরীক্ষে দাঁড়িয়ে আজ আমরা এমন এক অভূতপূর্ব ও ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে ক্ষমতা তার দৃশ্যমান খোলস ছেড়ে প্রবেশ করেছে এক অদৃশ্য, সর্বগ্রাসী ও অশরীরী জগতে—যার নাম 'ইনফো-ক্যাপিটালিজম' বা তথ্য-পুঁজিবাদ।

​এই নতুন যুগে উৎপাদনের মূল উপকরণ আর কোনো কলকারখানা বা প্রথাগত মাটি নয়; বরং মানুষের প্রতিদিনের জীবন, অবচেতন মন, আবেগ, একাকীত্ব এবং তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ডেটা। 'ডেটাস্ফিয়ার' নামের এই বিশাল অদৃশ্য মহাশূন্যে প্রতিটি মানুষ আজ স্বেচ্ছায় এক একটি লাইভ ডেটা-পয়েন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনে আঙুল চালাই, কোনো সার্চ ইঞ্জিনের সার্চ বারে কৌতূহল প্রকাশ করি কিংবা রিলস বা শর্টসের অন্তহীন অতল সমুদ্রে ভেসে বেড়াই, তখন আমরা আসলে নিছক বিনোদন উপভোগ করি না; বরং আমরা নিজেরাই নিজেদের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম ব্লু-প্রিন্ট তুলে দিই অদৃশ্য কর্পোরেশনগুলোর হাতে।

​এই ব্যবস্থায় অ্যালগরিদম কেবল আমাদের পছন্দ-অপছন্দ বা রুচিকেই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং এটি আমাদের চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে আগে থেকেই প্রোফাইলবন্দী করে এবং আমাদের স্বাধীন ইচ্ছার (Free Will) ধারণাকে এক সুনিপুণ মায়ায় পরিণত করে। এটি উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের এমন এক চূড়ান্ত রূপ, যেখানে মানুষকে আর বলপ্রয়োগ করে দাস বানাতে হয় না; বরং মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, হাসিমুখে এবং পরম ভালোবেসে নিজের দাসত্বকে বরণ করে নেয়। পোস্ট-স্ট্রাকচারাল এপিটেমের আলোকাউন্সিল বা তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান সময়ের এই ইনফো-ক্যাপিটালিজম কেবল অর্থনীতির কোনো রূপান্তর নয়, এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সাবজেক্টিভিটির ওপর এক সর্বব্যাপী উপনিবেশ। এই অদৃশ্য ডিজিটাল জালের বুনন কোথায় এবং এর শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত, তা উন্মোচন করাই এই প্রবন্ধের মূল অনুসন্ধান।

ক্ষমতা এবং নজরদারির ঐতিহাসিক বিবর্তনকে যদি আমরা ফুকো ও উত্তর-কাঠামোগত দর্শনের লেন্স দিয়ে পাঠ করি, তবে দেখতে পাবো কীভাবে জেরেমি বেনথামের ‘প্যানোপটিকন’ আর্কিটেকচার থেকে আজকের ডেটাস্ফিয়ারে উত্তরণ ঘটেছে। বেনথামের প্যানোপটিকন ছিল মূলত একটি স্থানিক ও দৃশ্যমান বন্দোবস্ত—যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পরিদর্শক বা 'গার্ড' সব বন্দীকে দেখতে পেত, কিন্তু বন্দীরা অন্ধকারের আড়ালে থাকা গার্ডকে দেখতে পেত না। ফুকো তাঁর 'Discipline and Punish' (১৯৭৫) গ্রন্থে এই প্যানোপটিক মডেলকে আধুনিক ডিসিপ্লিনারি সমাজের রূপক হিসেবে ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন যে, কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে (যেমন—কারাগার, সেনাছাউনি, হাসপাতাল, স্কুল ও কারখানা) আটকে রেখে তাদের শরীর ও আচরণকে শৃঙ্খলিত করে। এই ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ বা শারীরিক শাস্তির প্রয়োজন হতো।

​কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক ও ইনফো-ক্যাপিটালিজমের যুগে ফুকোর সেই শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজের সীমানা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ফরাসি দার্শনিক জিল দ্যলেজ (Gilles Deleuze) তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'Postscript on the Societies of Control' (১৯৯২)-এ উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক সমাজ আর আগের মতো প্রথাগত 'ইনস্টিটিউশন' বা প্রতিষ্ঠানের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং আমরা প্রবেশ করেছি এক অন্তহীন ‘নিয়ন্ত্রণ সমাজে’ (Society of Control), যেখানে নজরদারি চলতেই থাকে, যার কোনো নির্দিষ্ট সূচনা বা সমাপ্তি নেই। এই নিয়ন্ত্রণ সমাজের চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো বর্তমান যুগের 'ডেটাস্ফিয়ার' (Datasphere)।

​ডেটাস্ফিয়ার কেবল কোনো প্রযুক্তিগত শব্দ নয়; এটি হলো উত্তর-পুঁজিবাদী ক্ষমতার এক সর্বব্যাপী ও অশরীরী ডিসকোর্স। পল ভিরিলিওর (Paul Virilio) ‘স্পিড অ্যান্ড পলিটিক্স’ তত্ত্বে যেমন গতির সাথে ক্ষমতার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, তেমনি বর্তমান ইনফো-ক্যাপিটালিজমে গতি এবং ডেটার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহই হলো ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার। শোশনা জুবফ (Shoshana Zuboff)-এর ‘সার্ভেইলান্স ক্যাপিটালিজম’ (Surveillance Capitalism)-এর তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বলা যায়, বর্তমান যুগে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও আচরণগত উদ্বৃত্ত (Behavioral Surplus) হলো অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান কাঁচামাল। ঐতিহ্যগত পুঁজিবাদ কাঁচামাল আহরণ করত প্রকৃতি থেকে—মাটি খুঁড়ে লোহা বা কয়লা তুলে এনে। কিন্তু ইনফো-ক্যাপিটালিজম কাঁচামাল আহরণ করে মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রাত্যহিক পছন্দ, আবেগ এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থেকে।

​এই নতুন নজরদারির সবচেয়ে ভীতিপ্রদ এবং অভিনব দিক হলো এর ‘স্বেচ্ছাপ্রণোদিত’ চরিত্র। প্রাক-আধুনিক বা আধুনিক রাষ্ট্রে পাহারাদারকে চাবুক হাতে পাহারায় থাকতে হতো, মানুষকে জোর করে বন্দি করে রাখতে হতো। কিন্তু ডেটাস্ফিয়ারের এই মায়াজালে মানুষ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে এবং আনন্দের সাথে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, লোকেশন, পছন্দ-অপছন্দ এবং অবচেতন মনের তথ্য কর্পোরেট সার্ভারে আপলোড করে দিচ্ছে। আমরা যখন মুঠোফোনে জিপিএস অন করি, কোনো অ্যাপের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনে না পড়েই 'অ্যাগ্রি' বা সম্মতি দিই, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের অনুভূতি প্রকাশ করি—তখন আমরা আসলে নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্বকে এক একটি লাইভ ডেটা পয়েন্টে রূপান্তরিত করছি।

​ফলশ্রুতিতে, প্যানোপটিকনের সেই কেন্দ্রীয় মিনারটি আজ অদৃশ্য হয়ে গেছে এবং তার জায়গা নিয়েছে প্রতিটি মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোন ও স্ক্রিন। মানুষ আর বাইরের কোনো কারারক্ষীর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এই ডেটাস্ফিয়ারের ভেতরে বাস করতে করতে সে নিজেই নিজের প্যানোপটিক্যাল কারারক্ষী হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার এই উত্তর-কাঠামোগত বিন্যাসে কোনো লোহার শিকল বা দৃশ্যমান দেওয়াল নেই, রয়েছে কেবল অ্যালগরিদমের অদৃশ্য কোড এবং ডেটার অনন্ত প্রবাহ—যা মানুষের সমগ্র সাবজেক্টিভিটি ও আত্মসত্তাকে এক সর্বগ্রাসী শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।

সমসাময়িক ইনফো-ক্যাপিটালিজমের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি হলো 'মনোযোগ অর্থনীতি' (Attention Economy)। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট এ. সাইমন (Herbert A. Simon) বহু আগেই তথ্য আধিক্যের যুগে মনোযোগের দুষ্প্রাপ্যতা নিয়ে তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তথ্যের প্রাচুর্য মানেই মনোযোগের অভাব (A wealth of information creates a poverty of attention)। বর্তমান উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদে এসে সেই তত্ত্বটি এক চরম ও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। আজকের ইনফো-ক্যাপিটালিজমে মানুষের ফোকাস বা মনোযোগই হলো সবচেয়ে মূল্যবান কাঁচামাল এবং একক মুদ্রা। ব্যবহারকারীর মনোযোগ যত দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখা যাবে, কর্পোরেশনের বিজ্ঞাপনভিত্তিক মুনাফা এবং ডেটা সংগ্রহ তত বেশি নিশ্চিত হবে।

​এই মনোযোগকে টিকিয়ে রাখতে এবং তাকে একটি অবিরত পণ্যে রূপান্তর করতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল গেমগুলো ডিজাইন করা হয় অত্যন্ত সুনিপুণ 'ডোপামিন লুপ' (Dopamine Loop)-এর আদলে। জুয়ার মেশিনের (Slot Machines) মনস্তাত্ত্বিক মেকানিক্সকে আধুনিক অ্যালগরিদমের সাথে যুক্ত করে এই অ্যাপগুলো তৈরি করা হয়েছে। যখনই একজন ব্যবহারকারী স্ক্রিন রিফ্রেশ করেন, নিচে টানেন (Pull-to-refresh) কিংবা হঠাৎ কোনো নতুন নোটিফিকেশন পান, তখন মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস আকমবেন্স (Nucleus Accumbens) থেকে ডোপামিন ক্ষরিত হয়, যা এক ক্ষণস্থায়ী আনন্দের বা উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ বা গ্যামিফিকেশন টেকনিক মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে এমন এক আচরণগত আসক্তি (Behavioral Addiction) তৈরি করে, যা প্রথাগত মাদকাসক্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও অদৃশ্য। মানুষ এখানে নিজের অবচেতন মন এবং জৈবিক হরমোনকে কর্পোরেশনের হাতে স্বেচ্ছায় ইজারা দেয়।

​এই পুরো প্রক্রিয়ায় অ্যালগরিদম কেবল একটি নিছক প্রযুক্তিগত কোড বা প্রোগ্রাম হিসেবে কাজ করে না; বরং এটি হলো উত্তর-আধুনিক যুগের এক অদৃশ্য ও অপ্রতিরোধ্য 'কারারক্ষী'। মিশেল ফুকোর ডিসিপ্লিনারি সমাজের কারারক্ষী বা প্রহরীরা যেমন কড়া পাহারা দিয়ে মানুষকে শারীরিক গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখত, এই অ্যালগরিদমিক কারারক্ষী তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও সর্বব্যাপী। কারণ এটি মানুষের বাহ্যিক চলাফেরা বা শরীরকে নয়, সরাসরি তার বোধশক্তি, রাজনৈতিক বিশ্বাস, সামাজিক রুচি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো আমাদের প্রতিটি ক্লিকের ধরণ, কোনো কনটেন্টে ঠিক কত সেকেন্ড আমাদের চোখ আটকে ছিল তার নিখুঁত হিসাব (Dwell Time), এবং আমাদের অবচেতন ভীতি বা পছন্দগুলোকে রিয়েল-টাইমে প্রোফাইলবন্দী করে।

​ফলশ্রুতিতে, এই অ্যালগরিদমই পর্দার আড়ালে বসে ঠিক করে দেয় আমাদের নিউজফিডে ঠিক কোন তথ্যটি ভেসে উঠবে আর কোন সত্যটি চিরতরে মুছে যাবে। আমাদের তথাকথিত স্বাধীন পছন্দ, মুক্ত চিন্তা বা 'চয়েস'-এর ধারণাটি আসলে অ্যালগরিদমের তৈরি একটি সুনিপুণ মায়া বা হ্যালুসিনেশন মাত্র। আমরা যা দেখতে, পড়তে বা বিশ্বাস করতে চাই বলে মনে করি, তা মূলত অ্যালগরিদম আমাদের অবচেতন মনে আগে থেকেই রোপণ করে দিয়েছে—যাকে সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় 'ফিল্টার বাবল' (Filter Bubble) বা 'ইকো চেম্বার' (Echo Chamber) বলা হয়। এভাবে মানুষের চিন্তা করার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং স্বাধীন ইচ্ছার (Free Will) প্রকৃত জায়গাটি ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য ডিজিটাল শৃঙ্খলের নিচে পুরোপুরি বন্দী হয়ে পড়ে, যেখানে সে বন্দিত্বকে ভালোবেসে নিজের মুক্তির পথ নিজেই বন্ধ করে দেয়

উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং ইনফো-ক্যাপিটালিজমের যুগে মানুষের সাবজেক্টিভিটি বা আত্মসত্তা আর কোনো স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ বা অভ্যন্তরীণ সত্তা হিসেবে টিকে থাকে না; বরং তা পুরোপুরি পণ্যে রূপান্তরিত হয়, যাকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় 'কমোডিফাইড সাবজেক্ট' (Commodified Subject)। কার্ল মার্ক্সের ধ্রুপদী 'পণ্য-বস্তুায়ন' (Commodity Fetishism) তত্ত্বের উত্তর-আধুনিক ও ডিজিটাল সম্প্রসারণ হলো এই ব্যবস্থা। যেখানে প্রথাগত পুঁজিবাদ মানুষের শারীরিক শ্রমকে কারখানায় কিনে নিত এবং উৎপাদিত বস্তু বাজারে বিক্রি করত, সেখানে ইনফো-ক্যাপিটালিজম মানুষের অস্তিত্ব, জীবনযাপন এবং মনস্তত্ত্বকে সরাসরি পণ্যে পরিণত করেছে।

​এই নতুন ব্যবস্থায় মানুষ নিজেকে কেবল একজন ব্যবহারকারী বা নাগরিক ভাবে না, সে নিজেই নিজের একটি ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন এবং পণ্যে পরিণত হয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তীর্ণ বাজারে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, আবেগ, একাকীত্ব, আনন্দ কিংবা হতাশার প্রকাশকে ক্রমাগত পরিমাপযোগ্য 'এঙ্গেজমেন্ট' (যেমন—লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ভিউজ এবং রিঅ্যাক্ট)-এ রূপান্তর করা হচ্ছে। মানুষ যখন তার ব্যক্তিগত শোক, আনন্দ, সেলফি বা প্রাত্যহিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ইন্টারনেটের চত্বরে উন্মুক্ত করে, তখন সে আসলে সজ্ঞানে বা অজজ্ঞানে নিজেরই একটি প্রতীকী পণ্য বা কমোডিফিকেশন ঘটাচ্ছে।

​এই প্রক্রিয়ায় মানুষের ভেতরের স্বকীয়তা, নৈতিকতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং গভীর মানবিক সম্পর্কগুলো বাজার ব্যবস্থার মুনাফা অর্জনের প্রত্যক্ষ হাতিয়ার হয়ে ওঠে। কর্পোরেশনগুলো এই ডেটা ও এঙ্গেজমেন্ট বিক্রি করে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিশাল মুনাফা অর্জন করে, আর সাধারণ মানুষ বিনিময়ে পায় কৃত্রিম স্বীকৃতি বা ডোপামিনের ক্ষণস্থায়ী খোরাক। একজন সাধারণ ব্যক্তি যখন তার প্রতিদিনের অস্তিত্ব, সুখ-দুঃখ বা ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে ইন্টারনেটের বাজারে লাইভ ডেটা বা কনটেন্ট হিসেবে প্রদর্শন করতে শুরু করে, তখন তার মানবসত্তা ক্রমান্বয়ে বিবর্ণ, যান্ত্রিক ও কৃত্রিম হয়ে পড়ে।

​পুঁজিবাদ এখানে মানুষের ভেতরের সমস্ত অস্তিত্বকে এক বিশাল বাজারের পণ্যে পরিণত করে, যেখানে আত্মোপলব্ধি, গভীর সৃজনশীলতা বা আত্মিক মুক্তির জায়গাটি পুরোপুরি দখল করে নেয় কর্পোরেশনের তৈরি করা কৃত্রিম চাহিদার ফিরিস্তি এবং ভিউজ-ভিত্তিক স্বীকৃতির মোহ। মানুষ এখানে নিজেই বিক্রেতা, নিজেই বিপণনকারী এবং নিজেই উৎপাদিত পণ্য—যার ফলে তার সাবজেক্টিভিটি বা ব্যক্তিসত্তা বাজার অর্থনীতির এক নিঃশব্দ ও মায়াবী শিকারে পরিণত হয়, যেখানে দাসত্বই হয়ে ওঠে তার কাছে সবচেয়ে আরাধ্য বিষয়।

মিশেল ফুকো, জিল দ্যলেজ এবং উত্তর-কাঠামোগত দর্শনের অন্যান্য প্রবক্তাদের তত্ত্বে ক্ষমতার উপস্থিতি যেখানেই সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে, ঠিক তার বিপরীত বিন্দুতেই প্রতিরোধের (Resistance) সম্ভাবনা সমানভাবে ও অনিবার্যরূপে নিহিত থাকে। ফুকোর বিখ্যাত ডিসকোর্সিভ তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্ষমতা কোনো উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একক বা কেন্দ্রীভূত বিষয় নয়, বরং এটি একটি জালের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা সম্পর্ক—যার অর্থ হলো, ক্ষমতার নেটওয়ার্ক যেখানেই সক্রিয়, সেখানেই তার ভেতর থেকে জন্ম নেয় প্রতিরোধের নানা আন্তঃসম্পর্ক (Where there is power, there is resistance)। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান ইনফো-ক্যাপিটালিজম এবং ডেটাস্ফিয়ারের এই অদৃশ্য, মনস্তাত্ত্বিক ও অ্যালগরিদমিক জালের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের মুক্তির প্রশ্নটি আজ এক চরম ও অভূতপূর্ব তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

​আজকের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হলো—যেখানে মানুষের বাহ্যিক শরীর নয়, বরং সরাসরি তার অবচেতন মন, আবেগ, স্বপ্ন, পছন্দ এবং চিন্তার প্রতিটি স্তর অ্যালগরিদমের নিখুঁত কোড দ্বারা আগে থেকেই প্রোফাইলবন্দী, পূর্বাভাসিত (Predictive) এবং নিয়ন্ত্রিত, সেখানে প্রথাগত বা প্রকৃত প্রতিরোধ কিংবা সাবজেক্টের আত্মসচেতনতা অর্জন কীভাবে সম্ভব? যে মানুষ নিজেই নিজের প্যানোপটিক্যাল কারারক্ষী হয়ে উঠেছে এবং নিজের দাসত্বকে আনন্দের সাথে বরণ করে নিয়েছে, সে কীভাবে এই শৃঙ্খল ভাঙবে?

​এই গভীর সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হলে আমাদের তাত্ত্বিকভাবে প্রবেশ করতে হবে 'ডিসকোর্সের রূপান্তর' (Transformation of Discourse) এবং আত্মসমালোচনামূলক চেতনার আমূল জাগরণের ভেতর। যখন একজন মানুষ ইনফো-ক্যাপিটালিজমের এই অদৃশ্য কারসাজি, মনোযোগ অর্থনীতির শোষণ এবং ডেটাস্ফিয়ারের সুনিপুণ মায়াজালকে তাত্ত্বিকভাবে উন্মোচন করতে পারে, কেবল তখনই সে অ্যালগরিদমিক কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে একটি সুদৃঢ় বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করে।

​এই প্রতিরোধ কোনো প্রথাগত সশস্ত্র বিপ্লব, রাজপথের রণকৌশল কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়; বরং এটি হলো নিজের সত্তা, মনোযোগ, একান্ত সময় এবং আত্মাকে কর্পোরেট বাজারের সর্বগ্রাসী গ্রাস থেকে ছিনিয়ে আনার এক নিঃশব্দ, প্রজ্ঞাবান কিন্তু তীব্র ডিসকোর্সিভ লড়াই। মিশেল ফুকোর শেষ জীবনের কাজগুলোতে আলোচিত 'কেয়ার অফ দ্য সেল্ফ' (Care of the Self) বা আত্ম-পরিচর্যার ধারণার আলোকে, এই প্রতিরোধ মানে হলো—অ্যালগরিদমের সরবরাহ করা কৃত্রিম চাহিদাকে সজ্ঞানে প্রত্যাখ্যান করা, মনোযোগের অবিরাম অপচয় রোধ করা এবং ডিজিটাল প্যানোপটিকনের বাইরে নিজের স্বাধীন সত্তার একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীপ বা মুক্ত জোন তৈরি করা।

​অ্যালগরিদমের এই সর্বব্যাপী নজরদারি, প্রি-ডটার্মিনড চয়েস এবং কনজিউমারিস্ট সাবজেক্টিভিটির ডিসকোর্সকে বয়কট বা নিষ্ক্রিয় করে ব্যক্তি যখন তার নিজস্ব মৌলিক চিন্তন প্রক্রিয়া, গভীর সৃজনশীলতা, নীরবতা এবং গোপনীয়তাকে পুনরায় আবিষ্কার করতে শেখে, তখনই এই উত্তর-কাঠামোগত জালের মধ্যে গভীর ফাটল ধরতে শুরু করে। আর এই বুদ্ধিবৃত্তিক ফাটল এবং ডিসকোর্সিভ বিচ্যুতির মধ্য দিয়েই ইনফো-ক্যাপিটালিজমের অন্ধকূপ ভেদ করে জন্ম নিতে পারে মানবমুক্তির এক নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়।

মানবসভ্যতার এই অন্তিম ডিজিটাল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, ইনফো-ক্যাপিটালিজম, ডেটাস্ফিয়ার, মনোযোগ অর্থনীতি এবং কমোডিফাইড সাবজেক্টের এই সমগ্র তাত্ত্বিক যাত্রার গভীরে প্রবেশ করলে মনে হয়—আমরা যেন আধুনিকতার এমন এক অতলান্তিক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছি, যার কোনো প্রস্থানদ্বার নেই। প্রাচীন গ্রিক উপকথার সেই সর্বগ্রাসী মনোটর বা সিন্ধুকুরের মতো আজকের ডেটাস্ফিয়ার মানুষকে সরাসরি গ্রাস করে না; বরং তাকে এক মায়াবী, অদৃশ্য ও মোহাচ্ছন্ন জালে জড়িয়ে ফেলে। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—অতীতের পরাধীনতা ছিল দৃশ্যমান লোহার শিকল বা রাজদণ্ডের ভয়, আর বর্তমানের পরাধীনতা হলো সোনাঝরা আলোয় মোড়ানো এক সাইবারনেটিক ক্যারোসেল, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায়, ভালোবেসে এবং পরম উল্লাসে নিজের বন্দিদশার টিকিট নিজে কাটে।

​প্রথাগত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা অর্থনীতির ক্লাসিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে এই মনস্তাত্ত্বিক কলোনিয়ালিজমকে আর মাপা যায় না। ফুকো যাকে ডিসিপ্লিনারি সমাজের শৃঙ্খল বলেছেন, তা আজ আর কোনো চার দেওয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এমন এক অদৃশ্য অস্পৃশ্য মেঘমালার মতো আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে, যাকে ফরাসি দার্শনিক জিল দ্যলেজ বলেছেন 'নিয়ন্ত্রণ সমাজ'। এই সমাজের কারারক্ষী কোনো লাঠিয়াল বা পাহারাদার নয়; এই কারারক্ষী হলো আমাদের পকেটে থাকা একেকটি স্ক্রিন, অ্যালগরিদমের অদৃশ্য কোড আর ডোপামিনের অবিরাম প্রলোভন। মানুষ এখানে নিজেই তার নিজের কারারক্ষী এবং নিজেই নিজের বন্দি—একাধারে সে বাজারের ভোক্তা এবং উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল।

​তবে, উত্তর-কাঠামোগত দর্শনের চিরন্তন আশাবাদের জায়গাটি এখানেই যে, ক্ষমতার বিস্তার যত বেশি অশরীরী ও সর্বগ্রাসী হয়, তার ভেতরের ফাটল বা প্রতিরোধের সম্ভাবনার ক্ষেত্রটিও ততই তীব্র হয়ে ওঠে। এই অদৃশ্য জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা আধুনিক মানুষ যখন তার আত্মসচেতনতার আলো জ্বেলে বুঝতে পারে যে তার ভেতরের স্বপ্ন, প্রেম, রাগ, একাকীত্ব এবং মনোযোগ সবকিছুকেই কর্পোরেট সার্ভারের ডেস্কে কাঁচামাল হিসেবে ওজন করা হচ্ছে, ঠিক তখনই জন্ম নেয় এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ।

​এই বিদ্রোহ কোনো রণকৌশল বা রাজপথের প্রথাগত বিপ্লব নয়; এটি হলো আত্মাকে পুনরুদ্ধার করার এক নিঃশব্দ লড়াই। ফুকোর ভাষায় যাকে বলা চলে 'কেয়ার অফ দ্য সেল্ফ'—নিজের সত্তাকে অ্যালগরিদমের বন্দিত্ব থেকে ছিনিয়ে এনে তার নিজস্ব মৌলিক সৃজনশীলতা, নীরবতা ও গোপনীয়তার ভূখণ্ডে ফিরিয়ে দেওয়া। যে পর্যন্ত মানুষ তার স্বাধীন চিন্তার চাবিটি কর্পোরেট অ্যালগরিদমের হাত থেকে নিজের মুষ্টিতে ফিরিয়ে না আনছে, সে পর্যন্ত এই ইনফো-ক্যাপিটালিজমের মায়াজাল ভেদ করা অসম্ভব। এই গভীর তাত্ত্বিক বোধ ও ডিসকোর্সিভ জাগরণের ভেতর দিয়েই রচিত হতে পারে উত্তর-আধুনিক মানবমুক্তির এক নতুন সকাল, যেখানে মানুষ আবার তার হারিয়ে যাওয়া সাবজেক্টিভিটি বা আত্মসত্তাকে সগৌরবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.