যখন কোনো জাতির মননভূমির আকাশ থেকে নিজস্ব নক্ষত্রগুলো নিভে যায় এবং কৃত্রিম নিওনের আলোয় চারপাশ ঝলমলে হয়ে ওঠে, তখন সেই জাতি ধীরে ধীরে শেকড়চ্যুতির এক গভীর কুয়াশায় হারিয়ে যায়। এই কুয়াশাচ্ছন্ন ও পরনির্ভরশীল জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা—বা যাকে তাত্ত্বিক ভাষায় বলা যায় Epistemological Alienation—এমন এক বৌদ্ধিক শৃঙ্খল, যেখানে মানুষ নিজের মাটিতে দাঁড়িয়েও নিজের ইতিহাস, নিজের ভাষা ও নিজের সত্তাকে পরবাসীর চোখে দেখতে শুরু করে। সে অন্যের তর্জমা করা ভাষায় স্বপ্ন দেখে, অন্যের ধার করা আলোয় পথ চলে এবং নিজের পরাধীনতাকে সংস্কৃতির আধুনিকতা বলে ভুল করে। এই অন্ধ ও কৃত্রিম জ্ঞানকাঠামোর কংক্রিট দেয়ালে প্রথম ধাক্কাটি যিনি একাকী কনকনে শীতেও খালি পায়ে দিয়েছিলে, তিনি আর কেউ নন—বাঙালির ইতিহাসের এক অনমনীয় প্রতিবাদী পুরুষ, আহমদ ছফা। তাঁর জীবন কোনো মসৃণ রাজপথের আরামদায়ক হাঁটা ছিল না; বরং তা ছিল ক্ষমতার মদমত্ত কাঠামো, ভণ্ড এলিট সমাজ এবং কৃত্রিম ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে এক আজীবন রক্তক্ষয়ী বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ।
যেকোনো জনপদের নিজস্ব একটি অর্গানিক জ্ঞানভাণ্ডার থাকে, যা তার মাটি, নদী, হাওয়া এবং মেহনতী মানুষের ঘাম থেকে রস সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। কিন্তু যখন ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী ডিসকোর্স এসে সেই স্বকীয় জমিনকে বিষাক্ত করে দেয়, তখন সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ক্ষমতার দরবারে নিজেদের মেরুদণ্ড বিকিয়ে দিয়ে চাটুকারিতার তসবিল জপতে শুরু করে। আহমদ ছফা তাঁর প্রখর দূরদৃষ্টি দিয়ে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক দেউলিয়াত্বকে হাড়ের মজ্জায় অনুভব করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’-এর প্রতিটি পঙক্তিতে যেন কুঠারের আঘাত রয়েছে—যেখানে তিনি উন্মোচন করেছেন কীভাবে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিক গোলামির জিঞ্জির পরে নিজেদের ধন্য মনে করে। ছফা এই শেকড়হীনতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন একা, মরুভূমির বুকে জ্বেলে দেওয়া একাকী প্রদীপের মতো, যা কেবলই দ্রোহের আলো ছড়ায়। তাঁর ‘গাভী বৃত্তান্ত’ উপন্যাসের শ্লেষাত্মক ও পৈশাচিক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং জ্ঞান বিক্রির যে নগ্ন রূপ তিনি এঁকেছেন, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—চিন্তার দাসত্ব কতটা ভয়ংকর হতে পারে। ছফা আজীবন এই সত্যটি বিশ্বাস করতেন যে, যে জাতি নিজের চিন্তার জমিন নিজে উর্বর করতে পারে না, তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসলে পরাধীনতার চেয়েও হাজার গুণ বেশি লজ্জাজনক।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতার অতল গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সেই প্রান্তিক মানুষের শক্তিকে চেনা, যারা ইতিহাসের মূলস্রোত বা অভিজাত ইতিহাসের পাতা থেকে বরাবরই পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। আর এখানেই আসে ‘সাবল্টার্ন রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রান্তিক প্রতিবাদের ধারণা। আহমদ ছফা কখনোই ক্ষমতার অলিন্দে, মন্ত্রীর ড্রয়িংরুমে বা তথাকথিত সাহিত্যিক আড্ডার ক্ষমতার কেন্দ্রে ভিড় জমাননি। তিনি সচেতনভাবে এবং স্বেচ্ছায় অবস্থান নিয়েছিলেন সমাজের একেবারে কিনারায় থাকা, পেষণক্লিষ্ট, ভাষাহীন ও মেহনতী মানুষের সারিতে। তাঁর ‘ওংকার’ উপন্যাসের সেই মূক মেয়েটির কথা ভাবুন; যার কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ভাষা ফিরে পাওয়ার আকুতি এবং রাজপথে তার বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য কেবল একটি উপন্যাসের প্লট নয়—সেটি হয়ে উঠেছে পুরো বাঙালি জাতির অবদমিত স্বর, বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন এবং পরাধীনতার বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের এক মহাকাব্যিক রূপায়ণ। ক্ষমতার বন্দুক কিংবা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের মাতৃভাষার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার যে নিরন্তর লড়াই, তা মূলত সাবল্টার্ন রেজিস্ট্যান্সেরই সবচেয়ে খাঁটি প্রতিচ্ছবি।
ছফার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল তাঁর এই তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের এক জীবন্ত মেটাফোর। কিংবদন্তি শিক্ষক ও ক্ষণজন্মা প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ সম্পর্কের কথা আমরা জানি, যা অমর হয়ে আছে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থে। গুরুর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকা সত্ত্বেও ছফা কখনো অন্ধ অনুসারী হয়ে ওঠেননি; গুরুর বিশাল ছায়ায় থেকেও তিনি নিজের স্বকীয় মেরুদণ্ডকে একটুও নুয়ে পড়তে দেননি। ক্ষমতার দারে দারে ঘুরে পদক কিংবা স্বীকৃতির ভিক্ষা চাওয়ার চতুর পথ তিনি কখনোই মাড়াননি। আমৃত্যু এক তীব্র অর্থাভাব, চরম নিঃসঙ্গতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক একাকীত্ব তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল, তবুও তিনি তাঁর আত্মমর্যাদার চেরাগটি নিভতে দেননি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আহমদ ছফা শুধু কলম দিয়ে কিছু চটকদার প্রবন্ধ বা উপন্যাস লিখে ক্ষান্ত হননি; তিনি ছিলেন জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশের কৃত্রিম মিনারগুলোতে ফাটল ধরানো এক অদম্য এন্টি-থিসিস। তাঁর জীবন এবং সাহিত্য এক চিরন্তন পাঠশালা—যেখানে নিঃসঙ্গ শেরপার মতো তিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, কীভাবে মূলধারার ক্ষমতা ও কৃত্রিম ডিসকোর্সের বাইরে থেকেও প্রান্তিক মানুষের সোজা মেরুদণ্ড নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায়।
. tobecontinue.....