FF.
এপিস্টেমিক ইন্টারভেনশন ও ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমি: উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রান্তিকতার ফুকো-স্পিভাকিয়ান পাঠ Book page

Chapter 7

এপিস্টেমিক ইন্টারভেনশন ও ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমি: উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রান্তিকতার ফুকো-স্পিভাকিয়ান পাঠ

Sep 21, 2026 14 min read

​মানুষ যখন প্রথম রাষ্ট্রের সীমানা এঁকেছিল, তখন সে ভেবেছিল এটি বুঝি তার নিরাপত্তার চাদর, স্বাধীনতার এক সুদৃঢ় দুর্গ। ম্যাক্স ওয়েবারের তাত্ত্বিক কাঠামোর খেরোখাতায় রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এমন এক সত্তা হিসেবে, যার হাতে রয়েছে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে ‘শারীরিক বলপ্রয়োগের বৈধ একচেটিয়া অধিকার’ (Monopoly on the Legitimate Use of Physical Force)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমরা রাষ্ট্রকে চিনে এসেছি তার দৃশ্যমান রূপগুলো দিয়ে—খাকি পোশাকের পুলিশ, লৌহকপাটের কারাগার, সংসদ ভবনের গম্বুজ, আর আমলাতন্ত্রের ভারী ফাইলের স্তূপ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর উত্তর-কাঠামোবাদী (Post-structuralist) ঝড় এবং মিশেল ফুকোর তাত্ত্বিক বিচরণের পর রাষ্ট্রদর্শনের সেই রৈখিক ও কংক্রিট ধারণা চিরতরে বদলে গেছে। রাষ্ট্র কেবল বুটজুতার আওয়াজ বা চাবুকের আঘাত নয়; রাষ্ট্র হলো এক সর্বব্যাপী, অদৃশ্য এবং সর্বগ্রাসী ‘ডিসকোর্স’ (Discourse) বা বয়ানজাল, যা মানুষের অবচেতন মন, ভাষা, জ্ঞান এবং চিন্তার কাঠামোকে অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখে।

​আর এই অদৃশ্য সুতোর বাঁধন যখন উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন (Subaltern) জনগোষ্ঠীর ওপর চেপে বসে, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক বঞ্চনা বা রাজনৈতিক অধিকারহানি থাকে না—তা রূপ নেয় এক গভীর, নিরাময়হীন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ‘এপিস্টেমিক সহিংসতা’য় (Epistemic Violence)। ফুকোর ‘পাওয়ার/নলেজ’ (Power/Knowledge) জাঁতাকল এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের তাত্ত্বিক প্রশ্ন—"Can the Subaltern Speak?"-এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই প্রবন্ধের জমিন তৈরি হয়েছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল ঔপনিবেশিক আমলের অবশিষ্টাংশ নয়; এটি এমন এক ‘এপিস্টেমিক ইন্টারভেনশন’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক আগ্রাসনের ক্ষেত্র, যা প্রান্তিক মানুষের হাজার বছরের প্রথাগত জ্ঞান, নিজস্ব কথ্য ভাষা, বাস্তুতন্ত্র এবং জীবনাচরণকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে এক কৃত্রিম, আমলাতান্ত্রিক এবং হেজিমোনিক আধুনিকতার মুখোশ পরে নেয়।

​ইতিহাসের ধূলিমলিন পথ ধরে যদি আমরা খেয়াল করি, তবে দেখব ঔপনিবেশিক বণিকরা যখন একদিন সাম্পান বা স্টিমারে চড়ে আমাদের নদীতীরে ভিড়েছিল, তারা কেবল আমাদের মশলা বা পাট লুটে নেয়নি, তারা আমাদের ভাবার ভাষাকে, চেনার চোখকে এবং জানার পদ্ধতিকে কলোনাইজ করে গিয়েছিল। উপনিবেশের স্যান্ডেলের সেই পোড়াদাগ স্বাধীনতা-উত্তর জাতি-রাষ্ট্রের মসনদেও মুছে যায়নি। বরং স্থানীয় শাসকশ্রেণি যখন সেই ঔপনিবেশিক চেয়ারে বসল, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের রূপ পাল্টাল, কিন্তু তার গভীরের ব্যাকরণটি রেখে দিল অপরিবর্তিত। রাষ্ট্র তখন নিজেই এক মায়াবী প্রলোভন হয়ে দাঁড়িয়ে গেল—যে প্রলোভনের মোড়কে লেখা থাকে ‘উন্নয়ন’, ‘নাগরিক অধিকার’ আর ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’, কিন্তু যার আদ্যোপান্ত জুড়ে রয়েছে এক সুক্ষ্ম এপিস্টেমিক এক্সক্লুশন (Epistemic Exclusion)।

​এই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর দাঁড়িয়ে পাহাড়ের কোনো জুমচাষী, সুন্দরবনের কোনো মৌয়ালি, কিংবা চা-বাগানের সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো শ্রমিকের জীবন আজ এক নিরন্তর ট্র্যাজেডি। রাষ্ট্র যখন তার উন্নয়নমূলক ডিসকোর্সের মানদণ্ডে এদের মাপে, তখন এদের জীবন হয়ে ওঠে ‘অবৈধ’, এদের সংস্কৃতি হয়ে ওঠে ‘অনগ্রসর’, আর এদের প্রতিবাদ হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’। ফুকোর ‘বায়োপাওয়ার’ (Biopower) এবং ‘গভর্নমেন্টালিটি’ (Governmentality)-র নিরিখে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি নিঃশ্বাসকে তার পরিসংখ্যানের খাতায় বন্দি করে। অন্যদিকে স্পিভাক দেখিয়ে দেন, বুদ্ধিজীবী বা সুশীল সমাজের মসিহাগণ যখন এই প্রান্তিক মানুষের ‘হয়ে’ কথা বলতে যান, তখন তারা আসলে সাবঅল্টার্নের নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে নিজেদের রাজনৈতিক ডেকোরামের ভেতরে গলা টিপে হত্যা করেন।

​ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের এই ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমি বা বয়ানভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ কেবল তাত্ত্বিক অনুশীলনের বিষয় নয়; এটি আমাদের সমাজতাত্ত্বিক আত্মোপলব্ধির এক অনিবার্য তাগিদ। যেখানে রাষ্ট্র নিজেই এক সর্বগ্রাসী জাদুকর, যে তার ডিসকোর্সের জাদুদণ্ডে প্রান্তিক মানুষকে সত্যের মানচিত্র থেকে মুছে দিয়ে কেবল একটি ‘সংখ্যামূলক অবজেক্ট’ বানিয়ে ফেলে—সেখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে এই এপিস্টেমিক ইন্টারভেনশনের অন্দরমহলে।

রাষ্ট্র যখন তার দৃশ্যমান লাঠিয়াল বাহিনী, জেলখানার খিল বা প্যারেড গ্রাউন্ডের বুটের আওয়াজ থামিয়ে দেয়, তখন সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবে—‘এবার বুঝি স্বাধীনতা এল!’ কিন্তু মিশেল ফুকোর উত্তর-কাঠামোবাদী চশমা চোখে দিয়ে রাষ্ট্রকে দেখলে এই স্বস্তির মুহূর্তটি এক নিদারুণ ভ্রম বলে প্রতিভাত হয়। ফুকো আমাদের শিখিয়েছেন যে, আধুনিক ক্ষমতা কেবল কারাগারের লৌহকপাটে বন্দি নয়; ক্ষমতা হলো এক সূক্ষ্ম, সর্বব্যাপী এবং অদৃশ্য মাকড়সার জাল, যা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে মানুষের প্রতিদিনের রক্তকণিকা, জৈবিক অস্তিত্ব এবং অবচেতনের বাসনাগুলোকে। এই অদৃশ্য জালের নামই হলো ‘বায়োপাওয়ার’ (Biopower) এবং এর পরিচালনার কলাকৌশলকে ফুকো বলেছেন ‘গভর্নমেন্টালিটি’ (Governmentality)। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে এই বায়োপাওয়ার কোনো কল্যাণকামী প্রলেপ নিয়ে হাজির হয় না; বরং এটি রূপ নেয় এক নিখুঁত, যান্ত্রিক এবং সর্বগ্রাসী অদৃশ্য নিকেতনে—যেখানে রাষ্ট্রের চোখ প্রতিটি নাগরিকের শোবার ঘর থেকে শুরু করে তার জন্ম-মৃত্যুর পরিসংখ্যানে মুঠোর ভেতর বন্দি করে রাখে।

​জর্মি বেন্থামের ‘প্যানঅপটিকন’ (Panopticon) ধারণাকে ফুকো যেভাবে আধুনিক সমাজের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তার চরম প্রকাশ দেখা যায় উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দৈনন্দিন কার্যক্রমে। প্যানঅপটিকনের মাঝখানে থাকে এক কেন্দ্রীয় মিনার, যেখান থেকে অদৃশ্য প্রহরীর চোখ কয়েদিদের প্রতিটি কোণ পর্যবেক্ষণ করে—অথচ কয়েদি জানে না সে কখন প্রহরীর নজরে আছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে এই অদৃশ্য মিনারটি বসে আছে মানুষের চামড়ার নিচে, তার প্রতিদিনের জীবনাচরণের ভেতরে।

​রাষ্ট্র এখানে আর শুধু আইন করে বলে না—‘তুমি এটা করতে পারবে না’। রাষ্ট্র বরং এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক ডিসকোর্স তৈরি করে, যার ভেতর দিয়ে নাগরিক নিজেই তার নিজের ওপর নজরদারি করতে শেখে। সাবঅল্টার্ন বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন যখন এই বায়োপাওয়ারের আবর্তে পড়ে, তখন তাদের শরীর কেবল শ্রমের একটি কাঁচামাল বা ‘কমোডিটি’ হয়ে দাঁড়ায়। চা-বাগানের কোনো শ্রমিকের ঘামে ভেজা পিঠ, সুন্দরবনের মৌয়ালির ম্যানগ্রোভের খাঁড়িতে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া বুক, কিংবা আদিবাসী জুমচাষীর উদাসীন চোখ—রাষ্ট্রের কাছে এগুলোর কোনো মানবিক মূল্য থাকে না। রাষ্ট্রের খেরোখাতায় এই শরীরগুলো কেবল কিছু ডেটা, কিছু শ্রমঘণ্টা, কিংবা কিছু প্যাথলজিক্যাল পরিসংখ্যান।

​ফুকোর বায়োপাওয়ারের তত্ত্বে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি আরেকটি নিষ্ঠুর সত্য লুকিয়ে আছে—‘কাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে আর কাকে মরতে দেওয়া হবে’। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে এই ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমি এক ভয়ংকর রূপ নেয়। রাষ্ট্র যখন তার তথাকথিত ‘উন্নয়ন’, ‘মেগা প্রজেক্ট’ বা ‘ডিজিটাল রূপান্তর’-এর স্লোগান তোলে, তখন সেই উন্নয়নের বেদীমূলে বলি হয় প্রান্তিক মানুষের জৈবিক সত্তা।

​নদীভাঙা মানুষ যখন সর্বস্ব হারিয়ে শহরের বস্তিতে এসে আশ্রয় নেয়, তখন রাষ্ট্রীয় বায়োপাওয়ার তাকে একজন ‘নাগরিক’ হিসেবে দেখে না; রাষ্ট্র তাকে দেখে এক ধরণের ‘জনমিতিক জঞ্জাল’ বা ‘শহরের সৌন্দর্যের অন্তরায়’ হিসেবে। তাদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্যানিটেশন বা বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোকে রাষ্ট্র এমন এক অবহেলায় ফেলে রাখে, যা পরোক্ষভাবে এক ধরণের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড (Structural Murder)। রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্সে এই প্রান্তিক জীবনগুলো এতই গুরুত্বহীন যে, তাদের মৃত্যু কোনো জাতীয় শোকের খবর হয় না; তা কেবল ডায়েরির পাতায় বা পুলিশি ফাইলের এক কোণে ‘দুর্ঘটনা’ কিংবা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে সিলগালা হয়ে যায়। একেই বলে জীবনের ওপর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ও নিরাময়হীন নিকেতন—যেখানে জীবন নিজেই রাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগার, আর প্রান্তিক মানুষ সেই গবেষণাগারের ভাগ্যহত গিনিপিগ।

​ফুকোর ‘গভর্নমেন্টালিটি’ ধারণাটি আমাদের বোঝায় কীভাবে রাষ্ট্র মানুষকে সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে তাকে ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুগত’ করে তোলে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে এই গভর্নিকালচার এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে। স্কুল, হাসপাতাল, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্যাক্স অফিস থেকে শুরু করে এনজিওর ঋণের খাতা—প্রতিটি মাধ্যম এক অদৃশ্য সুতোয় মানুষকে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখে।

​রাষ্ট্র প্রান্তিক মানুষকে বোঝায় যে, সে যদি রাষ্ট্রের দেওয়া এই নিয়মের ভেতর না চলে, তবে সে আধুনিক সমাজের অংশ হতে পারবে না। ফলে আদিবাসী তার নিজস্ব ভাষা ছেড়ে রাষ্ট্রের ভাষায় কথা বলতে বাধ্য হয়, প্রান্তিক চাষী তার লোকায়ত কৃষি পদ্ধতি বাদ দিয়ে বাজারের কৃত্রিম সারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই যে নিজের সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনদর্শনের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী অনাস্থা তৈরি করে দেওয়া—এটাই হলো গভর্নিকালচারের সবচেয়ে বড় এপিস্টেমিক আঘাত। রাষ্ট্র মানুষকে শারীরিকভাবে মুক্ত রাখে, কিন্তু তার মনন, তার বেঁচে থাকার আকুতি এবং তার জৈবিক সত্তাকে এমন এক অদৃশ্য খাঁচায় পুরে রাখে যে, বন্দি নিজেই সেই খাঁচার সোনার শিক নিয়ে গর্ববোধ করতে শুরু করে।

​এভাবেই ফুকোর বায়োপাওয়ার ও গভর্নিকালচার উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে প্রান্তিক মানুষের জীবনকে এক চিরকালীন শৃঙ্খলের নিচে বন্দি করে রাখে, যেখানে মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের অদৃশ্য, যান্ত্রিক ও বয়ানভিত্তিক কলকাঠের ইশারায়।

ইতিহাসের নির্মম এক পরিহাস এই যে, প্রান্তিক মানুষ যখন তার জীবনের না-বলা বেদনা, বঞ্চনা আর অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে যায়, ঠিক তখনই তার কণ্ঠস্বরকে মুছে ফেলার জন্য একদল তথাকথিত ‘মসিহা’ বা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এসে হাজির হন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বিশ্বখ্যাত এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রশ্নটি—"Can the Subaltern Speak?"—কোনো সাধারণ জিজ্ঞাসা নয়; এটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের মুখের ওপর মারা এক কঠিন তাত্ত্বিক চপেটাঘাত। স্পিভাক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন (Subaltern) জনগোষ্ঠীর শারীরিক কণ্ঠস্বর হয়তো বাতাসে ভেসে বেড়ায়, কিন্তু জ্ঞানতাত্ত্বিক বা এপিস্টেমিক পরিসরে তাদের নিজস্ব কোনো ‘কথা বলার অধিকার’ বা স্বীকৃতি থাকে না। রাষ্ট্র এবং মূলধারার অভিজাত ডিসকোর্স এমন এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে রাখে, যেখানে সাবঅল্টার্নের স্বর পৌঁছানোর আগেই তা রাষ্ট্রীয় বা মধ্যবিত্তের বয়ানের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চিরতরে নিঃশব্দ হয়ে যায়।

উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে যখন কোনো আদিবাসী জনপদে উচ্ছেদ চলে, সুন্দরবনের কোনো প্রান্তিক জেলে তার শেষ সম্বলটুকু হারায়, কিংবা পাহাড়ের কোনো জুমচাষীর জীবন রাষ্ট্রীয় বুটজুতার নিচে পিষ্ট হয়—তখন মূলধারার রাজনীতি, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যম এক অদ্ভুত তৎপরতা নিয়ে এগিয়ে আসে। তারা বলতে চায়, "আসো, আমরা তোমাদের হয়ে কথা বলব।" স্পিভাক এই জায়গাতেই তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ফারাক টানেন—'Darstellen' (রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বা চিত্রায়ণ) এবং 'Vertreten' (আইনি বা প্রক্সি প্রতিনিধিত্ব)-এর মধ্যে।

যখন মূলধারার বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সাবঅল্টার্নের হয়ে কথা বলতে যান, তখন তাঁরা আসলে প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব ভাষা, দর্শন ও বেদনাকে নিজেদের রাজনৈতিক ডেকোরাম, পরিভাষা এবং এজেন্ডার ছাঁচে ফেলে ‘পরিমার্জিত’ করেন। পাহাড়ি মানুষের আর্তনাদ যখন কোনো শহুরে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর কলমে বা এনজিওর সেমিনারের পত্রে অনুবাদ হয়ে আসে, তখন তা আর সেই আদি মানুষের কাঁচা ও রক্তক্ষরণী সত্যি থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক সুশীল ও ‘গ্রহণযোগ্য’ বয়ান। এই যে সাবঅল্টার্নকে নিজের মতো করে কথা বলতে না দিয়ে তার হয়ে অন্য কারও কথা বলে দেওয়া—এটাই হলো প্রতিনিধিত্বের সবচেয়ে বড় মায়াজাল। রাষ্ট্র এবং অভিজাত শ্রেণি এই প্রক্রিয়ায় সাবALLISAN (সাবঅল্টার্ন) সত্তাকে একটি নিছক ‘প্রপাগাণ্ডার অবজেক্ট’ বা পুতুলে পরিণত করে, যার মুখ দিয়ে কথা বলায় তার নিজের প্রভুশ্রেণি।

রাষ্ট্র যখন দেখে যে সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠী সমস্ত প্রতিনিধিত্বের জাল ছিন্ন করে নিজের লোকায়ত ভাষায়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের ভঙ্গি নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে, তখন রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমি তার চূড়ান্ত হিংস্র রূপ ধারণ করে। রাষ্ট্র তখন এই স্বরকে সহ্য করতে পারে না।

  • অপরাধীকরণ ও তকমাঁ সেঁটে দেওয়া: সাবঅল্টার্নের নিজস্ব দাবিগুলোকে রাষ্ট্র কখনোই ‘রাজনৈতিক অধিকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। রাষ্ট্র তার সংবিধান, আইন এবং বিচারব্যবস্থার ডিসকোর্সে তাদের চিহ্নিত করে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘আইন অমান্যকারী’, ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘অজ্ঞ কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ হিসেবে। ফলে তাদের বাঁচার আকুতি মুহূর্তের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নথিতে অপরাধের খাতায় ট্রান্সফার হয়ে যায়।

  • জ্ঞানের একচেটিয়াত্ব (Epistemic Monopolization): রাষ্ট্র যে ভাষায় আইন লেখে, যে ভাষায় নীতি নির্ধারণ করে এবং যে ভাষায় বিচার করে, সেই ভাষাটিই হলো এক ধরণের অদৃশ্য খাঁচা। প্রান্তিক মানুষ সেই ভিনদেশি আইনের ভাষা বোঝে না। সে যখন নিজের না-বলা ভাষায় বিচার চায়, রাষ্ট্র তখন তার দিকে খড়্গহস্ত হয়ে তেড়ে আসে। এই ভাষার দেয়ালই হলো সাবঅল্টার্নের চিরন্তন নীরবতার মূল কারণ।

ফুকোর ক্ষমতার জাল এবং স্পিভাকের রিপ্রেজেন্টেশনের সংকট মিলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে প্রান্তিক মানুষের জন্য এক রুদ্ধদ্বার কক্ষ তৈরি করে। সেখানে একদিকে রাষ্ট্র তার বায়োপাওয়ার দিয়ে তাদের শরীর ও জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে মূলধারার বুদ্ধিজীবী ও শাসকশ্রেণি তাদের কণ্ঠস্বরকে হাইজ্যাক করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে।

এই দ্বিমুখী আগ্রাসনের চক্রে পড়ে সাবঅল্টার্ন সাবজেক্টিভিটি এমন এক চরম শূন্যতায় নিক্ষিপ্ত হয়, যেখানে তার কান্না শোনা যায়, কিন্তু ইতিহাসের কোনো মানচিত্রেই তার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের কোনো স্বাক্ষর থাকে না। স্পিভাকের তত্ত্ব আমাদের এই নিষ্ঠুর সত্যটিই মনে করিয়ে দেয় যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মসনদে বসে থাকা তথাকথিত মুক্তির স্লোগানগুলো আসলে প্রান্তিক মানুষের নীরবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাসাদ বৈ আর কিছু নয়। এই নীরবতা কোনো দুর্বলতা নয়; এটি হলো এক সর্বগ্রাসী ডিসকোর্সিভ ব্যবচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বাধীন সত্তার কাঠামোগত ও চিরন্তন ট্র্যাজেড

মিশেল ফুকোর ‘বায়োপাওয়ার’ বা জীবন নিয়ন্ত্রণের ডিসকোর্সকে যখন আমরা উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর বাস্তব জমিনে প্রয়োগ করি, তখন সেখানে এক ভয়ানক ও অন্ধিসন্ধিপূর্ণ মোড় দেখতে পাই। ফুকো যেখানে দেখিয়েছিলেন রাষ্ট্র কীভাবে জীবনকে পরিচালনা ও সুশৃঙ্খল করে, ঠিক সেই বিন্দুটিকে আরও এক ধাপ তীব্র ও নির্মম করে ক্যামেরার ফ্রেমে নিয়ে আসেন আধুনিক ক্যামেরুনের রাজনৈতিক দার্শনিক ও তাত্ত্বিক আচিল মেম্বে (Achille Mbembe)। মেম্বে তাঁর যুগান্তকারী তাত্ত্বিক ধারণায় যে শব্দটির জন্ম দিয়েছেন, তা হলো ‘নেক্রোপলিটিক্স’ (Necropolitics)—অর্থাৎ, এমন এক রাজনীতির ডিসকোর্স, যা জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েমের চেয়েও বেশি ফোকাস করে কার জীবন মূল্যবান আর কার মৃত্যু রাষ্ট্রীয় বা পুঁজিতান্ত্রিক স্বার্থে প্রয়োজনীয় ও বৈধ। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে এই নেক্রোপলিটিক্স কোনো ব্যতিক্রমী বা জরুরি অবস্থার ঘটনা নয়; এটি হলো প্রান্তিক সাবঅল্টার্ন মানুষের জীবনকে এক স্থায়ী ‘মৃত্যু উপত্যকা’ বা বর্জনীয়তার পরিসরে রূপান্তর করার নিখুঁত ও প্রাতিষ্ঠানিক এক মেকানিজম।

উন্নয়ন, বিশ্বায়ন এবং আধুনিক রাষ্ট্রের গ্ল্যামারাস ডিসকোর্সের আড়ালে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিদিন এক অদৃশ্য কসাইখানা পরিচালনা করে। এই কসাইখানায় কার শরীর বাঁচে আর কার শরীর কাঁচামালের মতো ব্যবহৃত হয়ে ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়, তা নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ডিসকোর্সিভ মানদণ্ডে।

  • শ্রমের বেদীমূলে বলিদান: সুন্দরবনের গভীর খাঁড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁকড়া ধরা বা মধু সংগ্রহ করা মৌয়ালি, পাহাড়ের পাদদেশের ইটভাটার ধোঁয়াশায় তিল তিল করে তামা হয়ে যাওয়া শ্রমিক, কিংবা সীমান্ত এলাকার অরক্ষিত পয়েন্টে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গরুর রাখাল—রাষ্ট্রের কাছে এদের জীবন কখনোই ‘নাগরিক জীবন’ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা পায় না। তাদের জীবনকে রাষ্ট্র ও পুঁজিতান্ত্রিক ডিসকোর্স ধরে নেয় ‘ডিসপোজেবল’ (Disposable) বা সহজেই বর্জনীয় হিসেবে।

  • কাঠামোগত হত্যা ও স্বাভাবিকীকরণ: এই মানুষগুলো যখন মেগা প্রজেক্টের নদীশাসন, বন উজাড়করণ কিংবা শিল্পায়নের বিষাক্ত বর্জ্যের মুখে পড়ে তিল তিল করে নিঃশেষ হয়, তখন রাষ্ট্র তাকে কোনো ‘হত্যা’ হিসেবে স্বীকার করে না। রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্সে এই মৃত্যুগুলো হয়ে দাঁড়ায় ‘উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী মূল্য’ (Collateral Damage) কিংবা নেহাতই ‘দুর্ঘটনা’। এটিই নেক্রোপলিটিক্সের চরম রূপ—যেখানে প্রান্তিক মানুষের মৃত্যু এতটাই স্বাভাবিকীকৃত করা হয় যে, তাদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুই হারিয়ে যায় রাষ্ট্রের বয়ানমূলক মানচিত্রে।

জরুরি অবস্থার স্থায়ী বন্দোবস্ত: সীমান্ত, কারাগার এবং রাষ্ট্রীয় হিংসা

মেম্বের তত্ত্বে নেক্রোপলিটিক্স কাজ করে এমন সব ভূখণ্ডে, যাকে তিনি ‘স্টেট অফ এক্সেপশন’ বা জরুরি অবস্থার স্থায়ী ক্ষেত্র বলেছেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে প্রান্তিক মানুষ সবসময় এক স্থায়ী জরুরি অবস্থার মধ্যে বাস করে। তাদের ওপর রাষ্ট্রের যে পুলিশি নজরদারি, উচ্ছেদ অভিযান কিংবা সামরিক বা আধাসামরিক কড়াকড়ি চলে, তা মূলধারার নাগরিকের জন্য অকল্পনীয়।

রাষ্ট্র যখন কোনো আদিবাসী এলাকা বা প্রান্তিক জনপদকে তার উন্নয়নের বা নিরাপত্তার স্বার্থে অধিগ্রহণ করতে চায়, তখন সে সেখানে আইন, সংবিধান বা মানবাধিকারের প্রচলিত ডিসকোর্সগুলোকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয়। সেখানে তখন চালু হয় সরাসরি ক্ষমতার নগ্ন প্রকাশ—বন্দুক, উচ্ছেদ বুলডোজার আর আইনি মারপ্যাঁচের নেক্রোপলিটিক্যাল অ্যানাটমি। সাবঅল্টার্ন তখন বুঝতে পারে যে, রাষ্ট্র তার জন্য কোনো রক্ষাকবচ নয়; রাষ্ট্র নিজেই তার অস্তিত্বের ওপর এক স্থায়ী ও জলজ্যান্ত ডেথ ওয়ারেন্ট।

বর্জনীয়তার রাজনীতি ও সাবঅল্টার্নের শেষ আর্তনাদ

ফুকোর বায়োপাওয়ার, স্পিভাকের প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং মেম্বের নেক্রোপলিটিক্স মিলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র-সমাজতাত্ত্বিক পাঠের এক পূর্ণাঙ্গ ও শিউরে ওঠার মতো চিত্র আমাদের সামনে হাজির করে। রাষ্ট্র তার ডিসকোর্সিভ হেজিমোনি দিয়ে সাবALLISAN (সাবঅল্টার্ন) মানুষের জ্ঞানকে মুছে ফেলে, রিপ্রেজেন্টেশনের নামে তার রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে হাইজ্যাক করে, এবং পরিশেষে নেক্রোপলিটিক্সের মাধ্যমে তার জৈবিক অস্তিত্বটাকেই বিপন্ন বা বর্জনীয় করে তোলে।

এই সর্বগ্রাসী কাঠামোর ভেতর দাঁড়িয়ে সাবঅল্টার্নের জীবন ও মৃত্যু আজ এক সুতোয় বাঁধা। রাষ্ট্র কেবল তাদের আইনি বা রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত করেই ক্ষান্ত হয় না, তাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুকেও সে তার বয়ানের জাঁতাকলে পিষ্ট করে। নেক্রোপলিটিক্সের এই অন্ধকূপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো—রাষ্ট্রীয় ডিসকোর্সের এই মারণাস্ত্রগুলোকে চিহ্নিত করা এবং প্রান্তিক মানুষের সেই মৌন অথচ তীব্র প্রতিরোধকে পুনরুজ্জীবিত করা, যা এই মৃত্যুর রাজনীতির শেকড়কেই একদিন সমূলে উৎপাটন করতে সক্ষম হবে।

​উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং প্রান্তিকতার এই দীর্ঘ ও তাত্ত্বিক পরিক্রমা শেষ পর্যন্ত আমাদের এসে দাঁড় করায় এক করুণ কিন্তু অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি। রাষ্ট্রকে আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে একটি নিরেট কংক্রিট দুর্গ, মঙ্গলাপেক্ষার সুদৃঢ় ছাদ কিংবা কেবল খাকি পোশাকের বুটের আওয়াজ বলে ভেবে এসেছি, ফুকো, স্পিভাক আর মেম্বের তাত্ত্বিক লেন্স সেই মোহগ্রস্ততাকে চিরতরে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র কেবল বাহুবলের প্রতিষ্ঠান নয়; রাষ্ট্র হলো এক অদৃশ্য, সর্বগ্রাসী এবং বয়ানভিত্তিক ‘ডিসকোর্স’ (Discourse)—যে ডিসকোর্স মানুষের মনন, ভাষা, অবচেতনের স্বপ্ন এবং জৈবিক অস্তিত্বকে জালের মতো জড়িয়ে রাখে।

​এই জালের অন্দরে যখন আমরা প্রান্তিক বা সাবঅল্টার্ন (Subaltern) মানুষটির দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই এক সুদূরপ্রসারী এপিস্টেমিক ট্র্যাজেডি। ঔপনিবেশিক প্রভুরা একদিন সাম্পান বা স্টিমারে চড়ে বিদায় নিলেও, তারা রেখে গিয়েছিল তাদের ঔপনিবেশিক ‘এপিটেম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো। স্বাধীনতা-উত্তর জাতি-রাষ্ট্রের মসনদে বসে যখন স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি সেই চেয়ার দখল করল, তখন তারা রাষ্ট্রের রূপ পাল্টাল, কিন্তু তার গভীরের ব্যাকরণটি রেখে দিল অপরিবর্তিত। রাষ্ট্র তখন এক মায়াবী জাদুকর হয়ে হাজির হলো—যার এক হাতে থাকে ‘উন্নয়ন’, ‘নাগরিক অধিকার’ আর ‘ডিজিটাল সাক্ষরতার’ রঙিন বেলুন, আর অন্য হাতে লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য এপিস্টেমিক সহিংসতা।

​ফুকোর বায়োপাওয়ার ও গভর্নিকালচারের অদৃশ্য নিকেতনে সাবঅল্টার্নের শরীর ও জীবন আজ এক যান্ত্রিক পরিসংখ্যানে রূপান্তরিত হয়েছে। পাহাড়ের জুমচাষী, সুন্দরবনের মৌয়ালি কিংবা চা-বাগানের ঘামে ভেজা শ্রমিকের প্রতিটি নিঃশ্বাস আজ রাষ্ট্রের ডিসকোর্সিভ পুলিশিংয়ের মুঠোর ভেতর বন্দি। অন্যদিকে, স্পিভাকের ‘রিপ্রেজেন্টেশন’-এর মায়াজালে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের মসিহাগণ যখন তাদের হয়ে কথা বলতে আসেন, তখন তারা আসলে প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব কাঁচা বেদনাকে নিজেদের শহুরে ও প্রগতিশীল ডেকোরামের ভেতরে গলা টিপে হত্যা করেন। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার চরম ও অন্তিম পরিণতি দেখা যায় আচিল মেম্বের ‘নেক্রোপলিটিক্স’-এর ক্যানভাসে—যেখানে রাষ্ট্র কেবল শাসন করেই ক্ষান্ত হয় না, সে ঠিক করে দেয় কার জীবন মূল্যবান আর কার মৃত্যু কেবলই উন্নয়নের একখণ্ড ‘কোলট্রাল ড্যামেজ’ বা বর্জনীয় জঞ্জাল।

​ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে সাবঅল্টার্নের নীরবতা কোনো হীনমন্যতা বা নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি হলো এক সর্বগ্রাসী বয়ানভিত্তিক ব্যবচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বাধীন সত্তার কাঠামোগত ট্র্যাজেডি। এই নীরবতা এক বোবা কান্না, যা রাষ্ট্রের মার্বেল পাথরের সংসদ ভবন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিচারালয়ের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে মরে যায়, কিন্তু ক্ষমতার ভিতকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে তোলে।

​এই অবরুদ্ধ ও ডিসকোর্সিভ কারাগার থেকে মুক্তির পথ কোনো সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা নেহাত ক্ষমতার হাতবদল নয়। মুক্তির চাবি লুকিয়ে রয়েছে জ্ঞানতাত্ত্বিক বা এপিস্টেমিক বিপ্লবের ভেতরে। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র তার ঔপনিবেশিক এপিটেম, একচ্ছত্র ডিসকোর্সিভ হেজিমোনি এবং এপিস্টেমিক সহিংসতার সংস্কৃতি বিসর্জন না দেবে, ততদিন প্রান্তিক মানুষের মুক্তি কেবল একটি সান্ত্বনার বুলি হয়েই থাকবে।

​প্রয়োজন আজ সেই সর্বগ্রাসী ডিসকোর্সের লৌহকপাটকে ভেতর থেকে বিগঠিত (Deconstruct) করা। রাষ্ট্রীয় বয়ানের কৃত্রিম ও ভিনদেশি ভাষার বিপরীতে সাবঅল্টার্নের লোকায়ত জ্ঞান, নিজস্ব কথ্য ভাষা, বাস্তুতন্ত্রের টান এবং প্রতিবাদের বহুমুখী স্বরগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। যেদিন প্রান্তিক মানুষ আর অন্যের ‘প্রতিনিধিত্বের’ দয়ায় মুখ খুলবে না, বরং নিজের শর্তে, নিজের ভাষায় এই হেজিমোনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠবে—সেদিনই রচিত হবে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের প্রকৃত মুক্তির ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসই হবে ক্ষমতার ডিসকোর্সিভ অ্যানাটমির বিরুদ্ধে সাবঅল্টার্নের অন্তিম, অদম্য এবং চিরকালের বিজয় নিশান।

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.