পরদিন কলেজে যাওয়ার জন্য অ্যালার্ম বাজার আগেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ছিল। সাধারণত সকালবেলার অ্যালার্ম আমার সঙ্গে এমন সম্পর্ক বজায় রাখত, যেখানে সে নিয়মিত আমাকে জাগানোর চেষ্টা করত আর আমি নিয়মিত তাকে উপেক্ষা করতাম। কিন্তু সেদিন অ্যালার্ম বাজার আগেই চোখ খুলে গেল। কয়েক সেকেন্ড বিছানায় শুয়ে থেকে হঠাৎ মনে পড়ল—আজ কলেজে যেতে হবে।
গতকালকের কথা মনে পড়তেই উঠে পড়লাম।
মা নাশতার টেবিলে বসে বললেন, “আজ এত তাড়াতাড়ি?”
“কলেজ আছে।”
মা একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। “কাল তো কলেজ ছিল।”
আমি চুপ করে গেলাম।
মা হাসলেন। “বুঝেছি।”
“কী বুঝেছ?”
“কিছু না। নাশতা কর।”
মায়ের সেই হাসির অর্থ তখন বুঝিনি, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করেছিলাম।
কলেজে পৌঁছাতে আজ আর গতকালের মতো অচেনা লাগল না। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মুখের মধ্যে দু-একজনকে চিনতে পারলাম। করিডোরে উঠতেই দূর থেকে শাওনের গলা শুনলাম।
“এই যে মহাশয়! গতকাল যে মানুষটা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থেকে দর্শন করছিল, আজ এত সকালে?”
আমি বললাম, “তুই কখন এলি?”
“আমি সবসময় সময়ের আগে আসি।”
“মিথ্যা বলিস না।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আজ দশ মিনিট আগে এসেছি। কারণ ক্যান্টিন খোলার আগেই পৌঁছাতে হয়।”
আমি হাসতে হাসতে ক্লাসে ঢুকলাম।
গতকালের শেষ বেঞ্চে গিয়ে দেখি মেঘলা ইতিমধ্যে বসে আছে। তার সামনে খোলা বই, পাশে একটা পানির বোতল। আমাকে দেখে সে বলল, “আজও জানালার পাশে?”
আমি ব্যাগটা নামিয়ে বললাম, “জায়গাটা ভালো।”
“জায়গাটা ভালো, নাকি জানালাটা?”
“দুটোই।”
শাওন আমাদের মাঝখানে এসে বসে বলল, “তোমরা দুজন কি আমাকে ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছিলে?”
মেঘলা বলল, “না। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
শাওন খুশি হয়ে বলল, “জানতাম।”
মেঘলা শান্তভাবে বলল, “তোমাকে বাদ দিয়ে আমরা শান্তিতে থাকতে পারব কি না, সেটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম।”
শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমার দিকে তাকাল। “রুদ্র, মেয়েটা বিপজ্জনক।”
আমি বললাম, “গতকালই তো বলেছিলাম।”
মেঘলা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল, “দুজন মিলে আমাকে নিয়ে আলোচনা করছ? ভালো। অন্তত পড়াশোনার বাইরে একটা বিষয় পেয়েছ।”
সেদিন থেকেই আমাদের তিনজনের একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হতে শুরু করল। খুব দ্রুত নয়, খুব নাটকীয়ভাবেও নয়। বরং এমনভাবে, যেভাবে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস একসময় সম্পর্কের অংশ হয়ে যায়।
প্রথম সপ্তাহেই আমরা বুঝে গেলাম, আমাদের তিনজনের স্বভাব একেবারেই আলাদা।
শাওন কথা না বলে পাঁচ মিনিট থাকতে পারত না। সে শিক্ষক কী বলছেন, পাশের ক্লাসে কী হচ্ছে, ক্যান্টিনে আজ সিঙ্গারা ছোট কেন, এমনকি কলেজের দারোয়ান কেন দুপুরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে—সবকিছু নিয়ে তার মতামত ছিল।
মেঘলা কথা বলত কম, কিন্তু বললে যুক্তি দিয়ে বলত। কোনো বিষয়ে নিজের মতামত না থাকলে সে চুপ থাকত। আর মতামত থাকলে তাকে চুপ করানো কঠিন।
আমি ছিলাম মাঝামাঝি। শাওনের কথা শুনে হাসতাম, মেঘলার কথা শুনে ভাবতাম, আর দুজনের মাঝখানে বসে নিজের অস্তিত্বটাকে বেশ নিরাপদ মনে হতো।
একদিন দ্বিতীয় পিরিয়ডে শিক্ষক আসতে দেরি করছিলেন। শাওন হঠাৎ বলল, “চল, ক্যান্টিনে যাই।”
আমি বললাম, “স্যার চলে এলে?”
“তখন ফিরে আসব।”
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “এটা ক্লাস ফাঁকি।”
শাওন বলল, “না। এটা শিক্ষার বিকল্প পদ্ধতি।”
“ক্যান্টিনে গিয়ে কী শিখবে?”
“মানুষ।”
মেঘলা বলল, “তাহলে তুমি সারাজীবন ক্যান্টিনেই থাকো।”
শাওন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চলো রুদ্র।”
আমি নড়লাম না।
শাওন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই আসবি না?”
আমি মেঘলার দিকে তাকালাম।
সে বলল, “যেতে চাইলে যাও। কিন্তু পরে স্যার জিজ্ঞেস করলে আমি কিছু জানি না।”
শাওন ফিসফিস করে বলল, “এই মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা কঠিন।”
আমি হেসে বললাম, “চল।”
আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
ক্যান্টিনে গিয়ে শাওন এমনভাবে চা অর্ডার করল, যেন কলেজের পুরো অর্থনীতি তার হাতে।
দুই কাপ চা আর তিনটা সিঙ্গারা আসার পর সে বলল, “রুদ্র, একটা কথা বলি?”
“বল।”
“আমাদের বন্ধুত্বের একটা নাম দরকার।”
আমি বললাম, “কেন?”
“সবকিছুর নাম থাকা উচিত।”
মেঘলা বলল, “বন্ধুত্বের আবার নাম কী?”
শাওন গম্ভীর হয়ে বলল, “রুদ্র, শাওন, মেঘলা—তিনজন।”
আমি বললাম, “এটা তো নামই হয়ে গেল।”
“না। একটু স্টাইল থাকতে হবে।”
মেঘলা বলল, “তুমি নাম দিলে সেটা স্টাইল হবে না, সমস্যা হবে।”
শাওন কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “ঠিক আছে। নাম হবে—তিন বেকার।”
মেঘলা মাথা নাড়ল। “আমি এই দলে নেই।”
“তুমি সবচেয়ে বড় বেকার।”
“কেন?”
“তুমি আমাদের সঙ্গে বসে আছ।”
মেঘলা হাসল। আমি বুঝলাম, আমাদের বন্ধুত্বের সবচেয়ে ভালো দিকটা সম্ভবত এটাই—আমাদের কেউই কাউকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতাম না। আমরা একে অন্যকে নিয়ে হাসতাম, আবার প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াতাম।
কয়েকদিন পর কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হলো। শাওন স্বাভাবিকভাবেই সবকিছুর মধ্যে ঢুকে গেল। একদিন সে এসে ঘোষণা করল, “রুদ্র, তোর নাম দেওয়া হয়েছে।”
আমি চমকে উঠলাম। “কোথায়?”
“আবৃত্তি।”
“কে দিয়েছে?”
“আমি।”
“আমাকে না বলে?”
“চমক দিতে চেয়েছিলাম।”
“আমাকে কেন?”
শাওন বলল, “তোর চেহারায় দুঃখ আছে।”
আমি বললাম, “এটা কি কারণ?”
“সাহিত্যে এটাই কারণ।”
মেঘলা পাশ থেকে বলল, “তুমি সত্যিই আবৃত্তি করবে?”
“জানি না।”
“চেষ্টা করো।”
আমি বললাম, “তুমি করছ?”
“আমি বিতর্কে আছি।”
“তাহলে তুমি জিতবে?”
মেঘলা একটু হেসে বলল, “আমি চেষ্টা করব।”
“তুমি হারলে?”
“তাহলে পরেরবার আবার চেষ্টা করব।”
তার কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেদিন প্রথমবার মনে হলো, মেঘলা নিজের ব্যাপারে বেশ দৃঢ়। সে হারতে ভয় পায় না; বরং চেষ্টা না করাটাকেই বেশি ভয় পায়।
অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির কারণে আমাদের কলেজে থাকা বাড়তে লাগল। ক্লাস শেষে সবাই যখন বাড়ি ফিরত, আমরা মাঠের পাশে বসে থাকতাম। কখনো স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা, কখনো গান শোনা, কখনো একেবারেই কোনো কারণ ছাড়া গল্প।
এক বিকেলে শাওন বলল, “তোরা ভবিষ্যতে কী হতে চাস?”
মেঘলা বলল, “আমি আগে ঠিক করতে চাই, আমি কী হতে চাই না।”
শাওন বলল, “এই উত্তরটা খুব কঠিন।”
“জীবনও তো সহজ না।”
শাওন আমার দিকে তাকাল। “তুই?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বললাম, “জানি না।”
মেঘলা বলল, “জানি না বলাটাও একটা উত্তর।”
“কীভাবে?”
“কারণ অন্তত তুমি মিথ্যা বলছ না।”
আমি কিছু বললাম না।
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে মাঠের ওপর নেমে আসছিল। কলেজের ভবনের জানালাগুলো একে একে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। দূরে কয়েকজন ছাত্র ফুটবল খেলছিল। আমাদের সামনে পড়ে থাকা তিনটি চায়ের কাপের মধ্যে দুটিতে চা শেষ, একটিতে অল্প বাকি।
সেদিন আমরা প্রথমবার নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছিলাম।
তখনও জানতাম না, কয়েক বছর পর সেই ভবিষ্যৎ আমাদের তিনজনকে তিনদিকে নিয়ে যাবে।
একদিন মেঘলা কলেজে আসেনি।
প্রথম পিরিয়ড থেকেই তার জায়গাটা খালি ছিল। জানালার পাশে বসে থাকতে থাকতে অকারণে কয়েকবার দরজার দিকে তাকিয়েছিলাম। নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, কাউকে খুঁজছি না; শুধু অভ্যাসবশত তাকাচ্ছি।
শাওন অবশ্য বিষয়টা বুঝে ফেলেছিল।
সে কানে কানে বলল, “কাউকে মিস করছিস?”
“না।”
“তাহলে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিস কেন?”
“এমনিই।”
“এমনিই মানুষ এতবার তাকায়?”
আমি উত্তর দিলাম না।
দুপুরে শাওন বলল, “মেঘলা অসুস্থ। কাল হয়তো আসবে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই জানলি কীভাবে?”
“তার বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করেছি।”
“কেন?”
শাওন আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। “আমি মানুষ পর্যবেক্ষণ করি, মনে আছে?”
আমি এবারও কিছু বললাম না।
পরদিন মেঘলা ক্লাসে এল। আগের মতোই বই খুলে বসে পড়ল। যেন আগের দিন কিছুই হয়নি।
আমি বললাম, “কেমন আছ?”
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো।”
“কাল আসনি কেন?”
“জ্বর ছিল।”
“এখন ঠিক?”
“হ্যাঁ।”
“ও।”
এরপর আর কোনো কথা হলো না।
কিন্তু সেদিন বুঝলাম, বন্ধুত্ব কখনো কখনো খুব ছোট প্রশ্নের মধ্যে লুকিয়ে থাকে—‘কেমন আছ?’
আর কখনো কখনো সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরও মন পুরোপুরি শান্ত হয় না।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের তিনজনের জায়গাটা বদলে গেল। প্রথম দিনের শেষ বেঞ্চটা তখন শুধু বসার জায়গা ছিল না; সেটাই হয়ে উঠেছিল আমাদের ছোট্ট পৃথিবী। সেখানে নোট ভাগাভাগি হতো, টিফিন ভাগ হতো, পরীক্ষার আগে আতঙ্ক ভাগ হতো, আবার অকারণে হাসিও ভাগ হতো।
একদিন শিক্ষক হঠাৎ ঘোষণা করলেন, পরদিন ক্লাস টেস্ট।
শাওন মাথায় হাত দিয়ে বলল, “আমাদের বন্ধুত্ব শেষ।”
মেঘলা বলল, “কেন?”
“কারণ আমি পড়িনি।”
“তুমি তো কখনো পড়ো না।”
“সেটাই তো সমস্যা।”
আমি বললাম, “কী পরীক্ষা?”
শাওন বলল, “যেটা আমরা জানি না।”
মেঘলা খাতা খুলে বলল, “আজ বিকেলে লাইব্রেরিতে বসব। সবাই পড়ব।”
শাওন বলল, “তুই আমাদের জীবন নষ্ট করবি।”
“কেন?”
“কারণ তুই আমাদের পড়াশোনার মধ্যে টেনে আনছিস।”
শেষ পর্যন্ত সেদিন বিকেলে আমরা সত্যিই লাইব্রেরিতে বসেছিলাম। শাওন প্রথম আধঘণ্টা পড়ার ভান করল, তারপর চুপিচুপি কমিকস পড়তে শুরু করল। মেঘলা সেটা দেখে বইটা কেড়ে নিল। আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলাম।
সেদিন বুঝলাম, কলেজে ভালো বন্ধু পাওয়ার জন্য একই রকম হওয়া লাগে না। বরং কখনো কখনো একে অন্যের সম্পূর্ণ বিপরীত মানুষগুলোর মধ্যেই সবচেয়ে অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
দিনগুলো এগোতে লাগল।
প্রথম দিনের অচেনা মুখগুলো পরিচিত হয়ে উঠতে লাগল। করিডোরের শব্দ, ক্যান্টিনের চায়ের গন্ধ, মাঠের ধুলো, ক্লাসরুমের জানালা—সবকিছু ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেল।
আর শেষ বেঞ্চে বসা তিনজন মানুষও বুঝতে না বুঝতেই একে অন্যের দিনের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে উঠল।
তখনও আমাদের গল্পে কোনো প্রেম ছিল না।
ছিল শুধু বন্ধুত্ব।
ছিল একসঙ্গে হাসার অভ্যাস।
ছিল ক্লাস শেষে আরও পাঁচ মিনিট বসে থাকার অজুহাত।
আর ছিল পরদিন আবার দেখা হবে—এই নিশ্চিন্ত বিশ্বাস।
আমরা কেউ জানতাম না, এই বিশ্বাসটাই একদিন সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে।