কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সামনে এলেই পুরো পরিবেশটা বদলে যায়। সাধারণ দিনে যে করিডোরে শুধু ক্লাসে যাওয়ার তাড়া থাকে, সেখানে হঠাৎ পোস্টার, রঙিন কাগজ, মাইক্রোফোন আর ছুটে বেড়ানো মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ গান অনুশীলন করছে, কেউ নাটকের সংলাপ মুখস্থ করছে, কেউ আবার এমন ব্যস্ততার অভিনয় করছে যেন কলেজের পুরো অনুষ্ঠানটাই তার কাঁধে।
শাওন অবশ্য প্রথম দিন থেকেই নিজেকে অনুষ্ঠান পরিচালনা কমিটির অনানুষ্ঠানিক সভাপতি ঘোষণা করেছিল।
কেউ তাকে দায়িত্ব দেয়নি।
তবু সে দায়িত্ব নিয়েছিল।
একদিন সকালে ক্লাসে ঢুকেই সে আমার সামনে একটা কাগজ রেখে বলল, “এইটা মুখস্থ কর।”
আমি কাগজটা তুলে দেখলাম, একটা কবিতা।
“এটা কী?”
“তোর আবৃত্তি।”
“আমি আবৃত্তি করব না বলেছি।”
“বলেছিস। আমি শুনিনি।”
আমি কাগজটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, “তুই কর।”
শাওন কাগজটা এমনভাবে সরিয়ে দিল যেন সেটা কোনো বিপজ্জনক বস্তু।
“আমার গলায় আবৃত্তি মানাবে না।”
“কেন?”
“আমি আবৃত্তি করলে কবিতাও আমাকে ছেড়ে পালাবে।”
মেঘলা পাশ থেকে বলল, “এটা অবশ্য সত্যি।”
শাওন তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি সবসময় আমার বিরুদ্ধে কেন?”
“কারণ তুমি সবসময় ভুল দিকে থাকো।”
“আমি আহত।”
“বেঁচে থাকো।”
আমি হেসে ফেললাম।
মেঘলা তখন নিজের কিছু কাগজ গুছাচ্ছিল। তার বিতর্ক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি চলছে। গত কয়েকদিন ধরে তাকে লাইব্রেরিতে বসে বিভিন্ন বই পড়তে দেখেছি। কখনো নোট নিচ্ছে, কখনো নিজের বক্তব্য জোরে জোরে বলছে। একদিন আমি মজা করে বলেছিলাম, “তুমি কি ঘুমের মধ্যেও বিতর্ক করো?”
সে বলেছিল, “প্রয়োজনে।”
“আমার সঙ্গে?”
“তোমার সঙ্গে তো বিনা প্রস্তুতিতেই করা যায়।”
আমি ভান করে আহত হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেলে আমরা অডিটোরিয়ামে মহড়া দিতে গেলাম। মঞ্চটা খুব বড় নয়। সামনে কয়েক সারি চেয়ার, পেছনে নীল পর্দা, আর মাথার ওপরে কয়েকটা পুরোনো আলো। মঞ্চের এক পাশে দাঁড়ালে পুরো হলটা দেখা যায়।
শাওন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল, “শ্রদ্ধেয় দর্শকমণ্ডলী—”
একজন শিক্ষক দূর থেকে চিৎকার করে বললেন, “শাওন! মাইক্রোফোনটা নামাও।”
সে সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোফোন নামিয়ে বলল, “জি স্যার।”
মেঘলা হাসতে হাসতে বলল, “তোমার ক্যারিয়ার শেষ।”
শাওন বলল, “ক্যারিয়ার শুরুই হয়নি।”
আমার আবৃত্তির পালা এল। মঞ্চে উঠে দাঁড়াতেই অদ্ভুত একটা ভয় কাজ করল। এত মানুষের সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস আমার ছিল না। হাতের কাগজটা কয়েকবার ভাঁজ করলাম, আবার খুললাম।
মেঘলা নিচে বসে ছিল।
সে চোখের ইশারায় বলল, “শান্ত হও।”
আমি মাথা নাড়লাম।
তারপর পড়া শুরু করলাম।
প্রথম কয়েক লাইন কাঁপা গলায় বের হলেও পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেল। শেষ করার পর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ছিল। তারপর শাওন হাততালি দিতে শুরু করল।
“দারুণ! আমাদের রুদ্র বেঁচে গেছে!”
আমি মঞ্চ থেকে নামতে নামতে বললাম, “বেঁচে গেছি মানে?”
“আমি ভেবেছিলাম মাঝপথে পালিয়ে যাবি।”
মেঘলা বলল, “ভালো হয়েছে।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
তার ‘ভালো হয়েছে’ কথাটা অদ্ভুতভাবে আমার কাছে অন্য সবার প্রশংসার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। কেন, সেটা তখন নিজেও জানতাম না।
পরদিন অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে কলেজের মাঠে মানুষের ভিড় জমে গেল। সিনিয়ররা ব্যস্ত, শিক্ষকরা ব্যস্ত, আমরা আরও বেশি ব্যস্ত। শাওন একবার মাইক্রোফোন খুঁজছে, একবার চেয়ার, আবার পাঁচ মিনিট পর এসে বলছে, “আমার কলম কে নিয়েছে?”
আমি বললাম, “তোর পকেটে।”
সে পকেটে হাত দিয়ে কলম বের করে বলল, “আমি পরীক্ষা করছিলাম।”
“কী?”
“তোর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।”
“কেমন?”
“মোটামুটি।”
মেঘলা তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। শাওন বলল, “মেঘলা, তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
“প্রস্তুতি নিতে।”
“ভয় লাগছে?”
“না।”
“একদম না?”
“একটু।”
শাওন বলল, “ভালো। ভয় থাকলে মানুষ ভুল কম করে।”
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আজকে তোমার কথাটা ঠিক।”
শাওন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। “রুদ্র, আমার কথা আজ ঠিক হলো?”
আমি বললাম, “তারিখটা লিখে রাখ।”
অনুষ্ঠান শুরু হলো।
একটার পর একটা পরিবেশনা। গান, নাচ, নাটক, আবৃত্তি। দর্শকদের হাততালি আর হাসির শব্দে অডিটোরিয়াম ভরে উঠছিল।
মেঘলার বিতর্ক ছিল বিকেলের দিকে।
তার নাম ঘোষণা হতেই সে মঞ্চে উঠল।
আমি দর্শকসারির মাঝামাঝি বসেছিলাম। শাওন আমার পাশে। সে আমার কানে বলল, “দেখ, এখন আমাদের বিপক্ষে যুক্তি দেবে।”
আমি বললাম, “কেন?”
“মেয়েটার যুক্তির সামনে আমরা টিকব না।”
মেঘলা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কথা শুরু করল।
প্রথম কয়েক মুহূর্তেই পুরো হলটা শান্ত হয়ে গেল।
তার কথা বলার মধ্যে অদ্ভুত একটা স্থিরতা ছিল। সে চিৎকার করছিল না, হাত-পা নেড়ে নাটকও করছিল না। শুধু নিজের কথাগুলো পরিষ্কারভাবে বলছিল। যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আমি তাকে দেখছিলাম।
শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রতিযোগী হিসেবে নয়। গত কয়েক সপ্তাহের পরিচিত মেঘলাকে যেন সেদিন নতুন করে দেখলাম।
যে মেয়েটা ক্যান্টিনে শাওনের সঙ্গে তর্ক করে, ক্লাসে চুপচাপ জানালার বাইরে তাকায়, লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে—সেই মেয়েটাই এখন শত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলছে।
তার বক্তব্য শেষ হলে পুরো হল হাততালিতে ভরে গেল।
শাওন আমার কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “আমাদের বন্ধু ভয়ংকর।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
“তুই এত চুপ কেন?”
“কী বলব?”
“এই যে, মুগ্ধ হয়ে গেছিস নাকি?”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“চুপ কর।”
শাওন হাসতে লাগল।
অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। সবাই ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছিল। অডিটোরিয়ামের আলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। মাঠের ওপর একটা নরম অন্ধকার নেমে এসেছে।
আমি গেটের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন পেছন থেকে মেঘলার গলা শুনলাম।
“রুদ্র!”
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
সে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে কাছে এসে বলল, “একটু দাঁড়াও।”
“কী হয়েছে?”
“তুমি আজ আমার বক্তব্য শুনেছ?”
“হ্যাঁ।”
“কেমন হয়েছে?”
আমি একটু ভেবে বললাম, “ভালো।”
সে বলল, “শুধু ভালো?”
“খুব ভালো।”
“এবার ঠিক আছে।”
আমি হেসে বললাম, “তুমি কি সবার কাছ থেকে প্রশংসা আদায় করো?”
“না। যাদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ, তাদের কাছ থেকেই করি।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “তোমার আবৃত্তিটাও ভালো হয়েছিল।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি তো তখন সামনে ছিলে না।”
“ছিলাম।”
“কোথায়?”
“পেছনে।”
আমি অবাক হলাম। এত মানুষের মধ্যে তাকে খেয়াল করিনি।
মেঘলা বলল, “তুমি মঞ্চে ওঠার আগে খুব নার্ভাস ছিলে।”
“দেখা যাচ্ছিল?”
“অনেক।”
“তাহলে হাসোনি কেন?”
“সবকিছু দেখে হাসতে নেই।”
কথাটা বলে সে সামনে হাঁটতে শুরু করল।
আমি তার পাশে হাঁটতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললাম না।
কলেজের গেট প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। বাইরে রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। দূরে একটা বাসের হর্ন শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ মেঘলা বলল, “রুদ্র, তোমার একটা ব্যাপার ভালো লাগে।”
“কী?”
“তুমি বেশি কথা বলো না।”
আমি হেসে বললাম, “এটা প্রশংসা?”
“হ্যাঁ।”
“শাওন শুনলে কষ্ট পাবে।”
“ওর কথা আলাদা।”
“আমার কী আলাদা?”
মেঘলা একটু হেসে বলল, “তুমি শুনতে পারো।”
আমি আর কিছু বললাম না।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।
‘তুমি শুনতে পারো।’
কখনো কখনো কারও বলা খুব ছোট একটা কথা মানুষের ভেতরে অকারণে জায়গা করে নেয়।
পরদিন কলেজে গিয়ে দেখি শাওন আমাকে দেখেই বলল, “গতকাল কোথায় ছিলি?”
“বাড়ি।”
“মিথ্যা।”
“কেন?”
“তুই আর মেঘলা একসঙ্গে বের হয়েছিলি।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, তারপর?”
শাওন নাটকীয়ভাবে বুকের ওপর হাত রেখে বলল, “আমাদের বন্ধুত্বের পতন শুরু হয়েছে।”
মেঘলা পাশ থেকে বলল, “তুমি কি সবসময় এমন করো?”
“কেমন?”
“অতিরিক্ত নাটক।”
“এটা নাটক না। ইতিহাস।”
আমি হেসে ফেললাম।
মেঘলা আমাদের পাশে বসে পড়ল। জানালার বাইরে তখন সকালের রোদ। মাঠে কয়েকজন ছাত্র দৌড়াচ্ছে। ক্লাস শুরু হতে এখনও দশ মিনিট বাকি।
শাওন ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করে বলল, “আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
আমি বললাম, “কী সিদ্ধান্ত?”
“আমাদের তিনজনের বন্ধুত্বের একটা নিয়ম থাকবে।”
মেঘলা বলল, “কী নিয়ম?”
শাওন আঙুল তুলে বলল, “কেউ কাউকে একা ছেড়ে যাবে না।”
আমি হেসে বললাম, “এটা আবার কেমন নিয়ম?”
“খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে।”
শাওন খাতায় লিখে ফেলল—
‘কেউ কাউকে একা ছেড়ে যাবে না।’
আমরা তখন জানতাম না, কয়েক বছর পর এই একটা বাক্য আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর সামনে দাঁড় করাবে।
সেদিন অবশ্য এসব ভাবিনি।
সেদিন শুধু মনে হয়েছিল, কলেজে আসার একটা কারণ এখন তৈরি হয়েছে।
ক্লাস আছে, পরীক্ষা আছে, অনুষ্ঠান আছে।
আর আছে দুজন মানুষ—যাদের সঙ্গে দিনের শেষে কিছু না কিছু বলার থাকে।
তখনও প্রেম শব্দটা আমাদের বন্ধুত্বের দরজায় এসে দাঁড়ায়নি।
কিন্তু দরজাটা যে ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে, সেটা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি।