
(শেষ পর্ব )
বনসাই রহস্যের ১ম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন এবং বনসাই রহস্যের ২য় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
সেদিন সন্ধ্যায় সেন ভিলার ড্রয়িং রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। বাইরে তখন কুয়াশা ধীরে ধীরে নেমে আসছে, লেকভিউ রোডের বাতিগুলো ম্লান আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ভেতরে যেন সবাই অপেক্ষা করছে—কোনো অদৃশ্য উত্তরের জন্য। ইশতিয়াক রহমান সবাইকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলেছিলেন। বড় সোফার একপাশে বসে আছেন মীরা দেবী। মুখে অদ্ভুত কঠোরতা, কিন্তু চোখের ভেতরে যেন চাপা অস্থিরতা। তার বিপরীতে বসে অয়ন সেন—চোখ নামানো, দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আর একটু দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বিশ্বস্ত সহকারী হরিপদ। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ইশতিয়াক। তার হাতে একটি ছোট স্প্রে বোতল। এই বোতলটাই যেন পুরো রহস্যের কেন্দ্র। তিনি ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন— “আজ আমরা দেখব কীভাবে একটি খুব সাধারণ অভ্যাস, একটি নিঃশব্দ মুহূর্ত, এবং একটি ভুল সিদ্ধান্ত—একটি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।”
কেউ কথা বলল না। ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। ইশতিয়াক আবার বললেন—
“আমি এখনো কাউকে খুনি বলছি না। কারণ এই ঘটনাটা এত সহজ নয়। প্রথম দেখায় যাকে দোষী মনে হয়, সত্যি অনেক সময় তার উল্টোটা হয়।”
মীরা দেবী একটু নড়ে বসেন। অয়ন মাথা তুলতে গিয়েও থেমে যায়। ইশতিয়াক স্প্রে বোতলটি টেবিলের ওপর রাখলেন।
“অরিন্দম সেনের একটি অভ্যাস ছিল,” তিনি বললেন। “প্রতিদিন রাতে কাজ করার সময় তিনি তার প্রিয় বনসাই গাছটিতে জল স্প্রে করতেন।”
ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট বনসাই গাছটির দিকে সবাই একবার তাকাল। সবুজ পাতায় মৃদু আলো পড়ছে। নিরীহ, নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই গাছই যেন এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রে। ইশতিয়াক ধীরে বললেন— “খুনি এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবে জানত। সে জানত ঠিক কখন অরিন্দম বাবু একা থাকবেন, কখন তিনি এই স্প্রে বোতল ব্যবহার করবেন। তাই সে এই বোতলের জলের মধ্যে খুব অল্প পরিমাণে অর্গানোফসফেট বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল।”
মীরা দেবীর চোখ বড় হয়ে গেল।
“আপনি কি বলতে চাইছেন—” তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, “আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন?”
তার গলায় ভয় আর রাগ মিশে গেছে। ইশতিয়াক মাথা নাড়লেন। “না, মীরা দেবী। আমি জানি আপনি ওই রাতে স্টাডি রুমে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুন করার জন্য নয়।” ঘরের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ইশতিয়াক বললেন— “যদিও আপনি চাইলেই কাজটি করতে পারতেন। কিন্তু আপনি গিয়েছিলেন উইলের কাগজ খুঁজতে। নতুন উইল কোথায় আছে সেটা জানার জন্য। হয়তো আপনি ভয় পেয়েছিলেন—আপনার স্বামী সম্পত্তির ভাগ বদলে দিতে পারেন।”
মীরা দেবীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
ইশতিয়াক শান্তভাবে বললেন— “হ্যাঁ, আপনি ভুল করেছেন। আপনি একটি নথি চুরি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু খুনের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।”
ড্রয়িং রুমে আবার নীরবতা নেমে এল। অয়ন ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে একধরনের অস্থিরতা। ইশতিয়াক এবার তার দিকে তাকালেন।
“অয়ন বাবু,” তিনি বললেন, “আপনার অবস্থাও খুব ভালো ছিল না।” অয়ন কিছু বলল না।
ইশতিয়াক বলতে লাগলেন—
“ব্যাংক স্টেটমেন্ট আমরা দেখেছি। কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সরানো হয়েছে। জুয়া, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার—সব মিলিয়ে আপনার আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়েছিল।”
অয়ন দাঁত চেপে বসে রইল।
“অরিন্দম বাবু যদি ব্যবসা বিক্রি করে দিতেন,” ইশতিয়াক বললেন, “তাহলে আপনার সব কেলেঙ্কারি প্রকাশ পেয়ে যেত। তাই আপনারও মোটিভ ছিল।”
এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, যেন অয়ন কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু ইশতিয়াক হাত তুলে তাকে থামালেন।
“তবে,” তিনি ধীরে বললেন, “খুন করার জন্য শুধু মোটিভ থাকলেই হয় না। দরকার জ্ঞান। দরকার পরিকল্পনা। দরকার এমন কিছু বোঝাপড়া—যা আপনার ছিল না।” অয়ন নিঃশ্বাস ফেলল। তবে "বিশ্বাস করে ভুল করেছি" কথাটা উনি বোধহয় আপনার উদ্দেশ্যে লিখেছেন।
ইশতিয়াক এবার ধীরে ধীরে তাকালেন সেই মানুষটির দিকে—যে এতক্ষণ প্রায় অদৃশ্যের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। হরিপদ। বছরের পর বছর এই বাড়িতে কাজ করছে। শান্ত, ভদ্র, অনুগত। কেউ কখনো তাকে নিয়ে সন্দেহ করেনি। ইশতিয়াক একটু এগিয়ে এলেন। “হরিপদ,” তিনি বললেন, “আপনি একসময় নার্সিং হোমে কাজ করতেন, তাই না?” হরিপদ চমকে উঠল। তার চোখে আতঙ্কের ছাপ। ইশতিয়াক বললেন— “সেখানে আপনি ওষুধ, রাসায়নিক এবং কীটনাশক সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছিলেন। আপনি জানতেন কোন বিষ কীভাবে কাজ করে।”
হরিপদের ঠোঁট কাঁপছে। ইশতিয়াক এবার স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন— “আপনি জানতেন অর্গানোফসফেট বিষ চামড়ার মাধ্যমে শরীরে ঢুকতে পারে। ধীরে কাজ করে। প্রথমে অসুস্থতার মতো লাগে।”
ঘরের সবাই স্তব্ধ। ইশতিয়াক বললেন—
“সেদিন রাতে আপনি স্প্রে বোতলের জলে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। যখন অরিন্দম বাবু বনসাই স্প্রে করলেন, তখন সেই বিষ তার হাতে লেগে গেল।”
তিনি একটু থামলেন। তারপর ধীরে বললেন— “সেই হাতেই তিনি কফি খেলেন। ল্যাপটপ ব্যবহার করলেন। ধীরে ধীরে বিষ তার শরীরে কাজ শুরু করল। তিনি ভাবলেন, হয়তো শরীরটা খারাপ লাগছে।”
হরিপদের মুখ দিয়ে ঘাম পড়ছে। ইশতিয়াক এবার ডায়েরির দিকে তাকালেন। “ডায়েরিতে লেখা ছিল—‘আজ সিদ্ধান্ত নেব।’”
তিনি বললেন— “সেই সিদ্ধান্ত ছিল আপনাকে বিদায় করার। অরিন্দম বাবু বুঝতে পেরেছিলেন আপনি কিছু ভুল করছেন।”
এই কথাটা যেন শেষ আঘাত। হরিপদ হঠাৎ ভেঙে পড়ল। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। তার গলা কেঁপে উঠল।
“আমি মারতে চাইনি হুজুর…” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল। “আমি শুধু চেয়েছিলাম উনি কয়েকদিন অসুস্থ থাকুন… যাতে আমাকে কাজ থেকে না ছাড়েন… আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না…”
ঘরটা নিঃশব্দ। মীরা দেবী স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। অয়ন যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। ইশতিয়াক ধীরে বললেন—
“এটাই সবচেয়ে কঠিন সত্য। অনেক সময় অপরাধীরা জন্মগত খুনি নয়। তারা ভয় পায়। নিজেদের বাঁচাতে গিয়ে এমন একটা ভুল করে বসে—যার ফল আর ফেরানো যায় না।”
পরদিন সকালে কুয়াশা কেটে সূর্যের আলো পড়ছিল লেকভিউ রোডে। পুলিশ হরিপদকে নিয়ে যাচ্ছে। তার মাথা নিচু। ইশতিয়াক শেষবারের মতো স্টাডি রুমে ঢুকলেন। ঘরের কোণে সেই ছোট বনসাই গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। সবুজ। সতেজ। নীরব। তিনি কিছুক্ষণ গাছটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন— “মানুষ হঠাৎ করে খুনি হয় না… কখনও কখনও পরিস্থিতিই তাকে সেই পথে ঠেলে দেয়।”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। অরিন্দম সেন নেই। রহস্যের সমাধান হয়েছে। কিন্তু স্টাডি রুমের কোণে সেই ছোট বনসাই গাছটি দাঁড়িয়ে রইল— একটি নিঃশব্দ হত্যার সাক্ষী হয়ে। এবং যেন মনে করিয়ে দিল— মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল কখনও কখনও বিশ্বাসের ভুল।
📚 আরও রহস্য, গল্প আর নতুন কল্পনার জগতে যেতে চান? এই গল্পটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে আমার অন্যান্য বাংলা গল্পগুলোও নিশ্চয়ই আপনার আগ্রহ জাগাবে। প্রতিটি গল্পে আছে নতুন রহস্য, নতুন চরিত্র এবং ভিন্ন স্বাদের কাহিনি। আমার অন্যান্য বাংলা গল্প পড়তে ঘুরে আসতে পারেন—
📖 প্রতিলিপি: Bangla Story Profile
💻 Digital Pencil: Bangla Website
🎥 Talent Stage: Bangla YouTube Channel
🌸 Fiction Factory: My other writings
সময় পেলে একবার হলেও এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘুরে আসুন। আশা করি নতুন গল্প আর সৃজনশীল কাজগুলো আপনার ভালো লাগবে। ✨