
বর্ষার সন্ধ্যা। আকাশে কালো মেঘ, মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। নদীর ধারের ছোট্ট গ্রাম কাশীপুরে সবাই আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়েছে। কারণ, আজ পূর্ণিমা।
কিন্তু গ্রামের এক কোণে পুরনো ফুটবল মাঠে দাঁড়িয়ে আছে রাহুল, সুমন, পিয়াল, রাজু আর তাদের কোচ অরিন্দম।
গ্রামের লোকেরা এই মাঠকে বলে "মৃতদের মাঠ"।
কথিত আছে, বহু বছর আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচের সময় বজ্রপাতে পুরো একটি দল মারা যায়। তারপর থেকে প্রতি পূর্ণিমায় সেই মাঠে অদ্ভুত আলো দেখা যায়, শোনা যায় বাঁশির শব্দ আর ফুটবলের লাথির আওয়াজ।
সবাই বিশ্বাস করলেও রাহুল এসব মানে না।
সে বলল, — "আজ যদি সত্যিই ভূত থাকে, তাহলে ওদের সঙ্গে ফুটবল খেলব!"
কোচ হেসে বললেন, — "সাহস ভালো, কিন্তু অহংকার ভালো নয়।"
ঠিক রাত বারোটায় মাঠের মাঝখানে রাখা পুরনো ফুটবলটি নিজে থেকেই গড়াতে শুরু করল।
তারপর...
ফুঁউউউউ...
একটি রেফারির বাঁশির শব্দ।
চারদিকে ঘন কুয়াশা।
হঠাৎ মাঠের ওপারে এগারোজন ফুটবলার দেখা গেল।
তাদের শরীরে বহু বছরের পুরনো জার্সি।
কারও মুখ পরিষ্কার দেখা যায় না।
চোখ দুটি শুধু নীল আগুনের মতো জ্বলছে।
একজন ক্যাপ্টেন এগিয়ে এসে বলল,
— "ম্যাচ শুরু হবে... অসমাপ্ত খেলা শেষ করতে হবে..."
রাহুলের শরীর কেঁপে উঠল।
কিন্তু সে পিছিয়ে এল না।
খেলা শুরু হলো।
প্রথম দশ মিনিট সব স্বাভাবিক।
তারপরই অদ্ভুত ঘটনা।
ভূতদের একজন বল মারতেই বলটি আকাশে মিলিয়ে গেল।
এক সেকেন্ড পরে আবার গোলপোস্টের সামনে এসে পড়ল।
রাহুল গোল করতে গিয়েও পারল না।
কারণ গোলরক্ষক হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে আবার অন্য জায়গায় দেখা দিল।
মাঠের চারদিকে অদ্ভুত ছায়ারা হাততালি দিচ্ছে।
দর্শক নেই...
তবুও গ্যালারি ভরা আওয়াজ।
হঠাৎ সুমন চিৎকার করে উঠল।
তার পায়ে কেউ ধরে টানছে।
নিচে তাকিয়ে দেখে—
মাটির ভেতর থেকে একটি কঙ্কালের হাত!
সুমন কোনোরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
কোচ সবাইকে বললেন,
— "এই মাঠে কিছু একটা অসমাপ্ত থেকে গেছে।"
রাহুল লক্ষ্য করল, ভূত দলের ক্যাপ্টেন বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছে।
মনে হচ্ছে কারও অপেক্ষায়।
ঠিক তখনই মাঠের উত্তর কোণে একটি ভাঙা ট্রফি দেখা গেল।
ট্রফির গায়ে লেখা—
"কাশীপুর ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ – ১৯৮৬"
রাহুল ট্রফিটি হাতে তুলতেই চারপাশ কেঁপে উঠল।
ভূতেরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল।
ক্যাপ্টেন বলল,
— "ওটা ফিরিয়ে দাও..."
রাহুল বুঝতে পারল, এই ট্রফির সঙ্গেই রহস্য জড়িয়ে আছে।
গ্রামের সবচেয়ে বৃদ্ধ মানুষ হরিদাস কাকার কাছে সবাই ছুটে গেল।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"১৯৮৬ সালে ফাইনাল ম্যাচে রেফারি ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
হেরে যাওয়া দল প্রতিবাদ করছিল।
ঠিক তখনই বজ্রপাত।
এগারোজন খেলোয়াড় মারা যায়।
কিন্তু আসল সত্য কেউ জানত না।
ট্রফি চুরি করেছিল গ্রামেরই এক লোভী ব্যক্তি।
সেই অপমান আর অসমাপ্ত খেলার জন্য আজও আত্মারা মুক্তি পায়নি।"
পরদিন রাত।
রাহুলরা আবার মাঠে এল।
ট্রফিটি মাঠের মাঝখানে রেখে দিল।
রাত বারোটা।
আবার বাঁশির শব্দ।
আবার কুয়াশা।
ভূতেরা ফিরে এল।
ক্যাপ্টেন ট্রফির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— "শেষ ম্যাচ হবে...
আজ সত্যিকারের বিচার।"
এইবার মানুষ আর ভূতের মধ্যে নয়।
দুটি ভূত দলের মধ্যে ম্যাচ শুরু হলো।
রাহুলরা শুধু দর্শক।
ম্যাচের শেষ মিনিট।
স্কোর ১-১।
ঠিক তখনই ক্যাপ্টেন দুর্দান্ত শটে গোল করল।
রেফারির বাঁশি।
ভূতেরা আনন্দে চিৎকার করল।
হঠাৎ পুরো মাঠ সাদা আলোয় ভরে গেল।
ক্যাপ্টেন হাসল।
বলল,
— "ধন্যবাদ...
আমাদের অসমাপ্ত খেলা শেষ হলো।"
এক এক করে সব খেলোয়াড় আলো হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল।
শুধু ফুটবলটি পড়ে রইল।
সবাই ভাবল, রহস্য শেষ।
কিন্তু না।
তিন দিন পরে গ্রামের নতুন স্কুল টিম সেই মাঠে অনুশীলন করতে আসে।
একটি ছেলে সেই পুরনো বলে লাথি মারতেই...
বলটি নিজে থেকেই গোলপোস্টে ঢুকে গেল।
তারপর মাঠজুড়ে ভেসে এল পরিচিত সেই বাঁশির শব্দ।
ফুঁউউউ...
সবাই দৌড়ে পালাল।
রাহুল পিছনে তাকিয়ে দেখল—
গোলপোস্টের পাশে একজন ফুটবলার দাঁড়িয়ে।
সে ধীরে ধীরে হাত তুলে স্যালুট করল।
তারপর মিলিয়ে গেল কুয়াশার মধ্যে।
আজও কাশীপুর গ্রামের মানুষ বলে—
পূর্ণিমার রাতে যদি কেউ সেই মাঠে যায়, তবে দূর থেকে ফুটবল খেলার শব্দ শোনা যায়।
কখনও কখনও দেখা যায়, বলটি নিজে থেকেই গড়িয়ে যাচ্ছে।
আর গোল করার পর অদৃশ্য দর্শকদের হাততালির শব্দ ভেসে আসে।
সেই মাঠে আর কোনো টুর্নামেন্ট হয় না।
কিন্তু গ্রামের শিশুরা বিশ্বাস করে—
যারা সত্যিকারের খেলোয়াড়, তাদের ক্ষতি করে না সেই আত্মারা।
তারা শুধু চায়, খেলা হোক ন্যায়ের সঙ্গে।
তবুও পূর্ণিমার রাতে কেউ সাহস করে সেই মাঠে নামে না।
কারণ, যদি আবার রাত বারোটায় রেফারির বাঁশি বেজে ওঠে...
তাহলে হয়তো পরের ম্যাচে খেলোয়াড় হিসেবে ডাক পড়বে জীবিত মানুষেরই।
সমাপ্ত।