Essay

ও কে ওখানে

June 30, 2026

108 views

বর্ষার রাত। আকাশে ঘন কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। দূরে কোথাও শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট্ট গ্রাম—চন্দনপুর। গ্রামের এক প্রান্তে বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে জমিদার হেমাঙ্গ রায়ের বিশাল বাড়ি। গ্রামের মানুষ বলে, রাত বারোটার পর ওই বাড়ির সামনে কেউ গেলে একটি অদ্ভুত কণ্ঠস্বর শোনা যায়—

"ও কে... ওখানে?"

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ কখনও দিতে পারেনি। যারা দিয়েছে, তারা আর কখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেনি।

অর্ক, শহরের একজন তরুণ সাংবাদিক। ভূতের গল্প বা অলৌকিক ঘটনায় তার একেবারেই বিশ্বাস ছিল না। গ্রামের এই রহস্যের কথা শুনে সে ঠিক করল, সত্যিটা নিজেই খুঁজে বের করবে।

এক বর্ষার সন্ধ্যায় ক্যামেরা, টর্চ আর একটি নোটবুক নিয়ে সে পৌঁছে গেল চন্দনপুরে। গ্রামের প্রবীণ মানুষ নিত্যানন্দ কাকা তাকে অনেকবার সতর্ক করলেন।

"বাবা, রাত বারোটার আগে ওই বাড়ি ছেড়ে চলে এসো। যদি কেউ বলে—'ও কে ওখানে?'—কখনও উত্তর দিও না।"

অর্ক শুধু হেসে বলল, "কাকা, এসব কুসংস্কার।"

রাত বাড়তে লাগল। ঠিক বারোটা বাজতেই জমিদারবাড়ির ভেতরে যেন হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। টর্চের আলো বারবার নিভে যাচ্ছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা।

হঠাৎ...

"ও কে... ওখানে?"

কণ্ঠস্বরটি এতটাই গভীর যে অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

সে চারদিকে আলো ফেলল। কেউ নেই।

আবার—

"ও কে... ওখানে?"

এবার শব্দটি যেন তার ঠিক পিছন থেকে এল।

অর্ক ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আমি অর্ক। সাংবাদিক।"

সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল।

দরজাগুলো নিজেরাই বন্ধ হয়ে গেল।

উপরতলা থেকে ভেসে এল ধীর পায়ের শব্দ।

টুপ... টুপ... টুপ...

অর্ক ক্যামেরা চালু করল।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে সাদা কাপড় পরা একটি ছায়ামূর্তি। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু দুটি জ্বলজ্বলে চোখ।

মূর্তিটি আবার বলল—

"ও কে... ওখানে?"

অর্ক এবার কোনও উত্তর দিল না।

হঠাৎ চারদিক থেকে শত শত মানুষের কান্নার শব্দ ভেসে এল।

দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরনো ছবিগুলোর চোখ যেন নড়ে উঠল।

একটি ছবিতে দেখা গেল জমিদার হেমাঙ্গ রায়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর ছবির মুখ বদলে গেল। সেখানে এখন অর্কের নিজের মুখ!

তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে চাইল।

কিন্তু দরজা খুলছে না।

হঠাৎ একটি বৃদ্ধা মহিলার আত্মা তার সামনে এসে দাঁড়াল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন, "উত্তর দিও না... পালাও..."

ঠিক তখনই পিছন থেকে বরফশীতল একটি হাত অর্কের কাঁধে স্পর্শ করল।

সে ঘুরতেই দেখল—সেই ছায়ামূর্তির মুখ নেই।

মুখের জায়গায় শুধু গভীর অন্ধকার।

সেখান থেকেই বেরিয়ে আসছে একই প্রশ্ন—

"ও কে... ওখানে?"

অর্ক প্রাণপণে চোখ বন্ধ করে দৌড়াতে লাগল।

হঠাৎ সে অনুভব করল কেউ যেন তাকে টেনে বাইরে ফেলে দিল।

জ্ঞান ফিরল ভোরে।

সে নিজেকে জমিদারবাড়ির বাইরে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখল।

গ্রামের মানুষ তাকে উদ্ধার করল।

অর্কের ক্যামেরা পরীক্ষা করে সবাই অবাক হয়ে গেল।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অর্ক একাই দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

কিন্তু শেষ কয়েক সেকেন্ডে ক্যামেরার এক কোণে স্পষ্ট দেখা গেল সাদা পোশাক পরা এক মুখহীন ছায়া।

আর শোনা গেল সেই ভয়ংকর কণ্ঠস্বর—

"ও কে... ওখানে?"

এরপর থেকে অর্ক আর কখনও ওই ঘটনার কথা বলতে চাইত না।

কয়েক মাস পরে সে আবার সেই গ্রামে ফিরে যায়।

তারপর...

সে আর কখনও ফিরে আসেনি।

আজও বর্ষার অন্ধকার রাতে কেউ যদি জমিদারবাড়ির সামনে দাঁড়ায়, বাতাস থেমে যায়।

তারপর ধীরে ধীরে ভেসে আসে সেই পরিচিত কণ্ঠ—

"ও কে... ওখানে?"

গ্রামের মানুষ বলে, যদি কখনও এই প্রশ্ন শুনতে পাও, কোনও উত্তর দেবে না।

কারণ উত্তর দিলেই...

হয়তো পরের প্রশ্নটি আর কেউ শুনতে পাবে না।

সমাপ্ত

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login