Posts

নন ফিকশন

হালিশহরে ভূত

June 30, 2026

SANJIB ROY

41
View

বর্ষার শেষ দিক। আকাশে কালো মেঘের ভাঁজ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। হালিশহর-এর গঙ্গার ধারে পুরোনো এক এলাকায় বহুদিন ধরে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটির নাম ছিল "শান্তি ভিলা"। কিন্তু আশেপাশের মানুষ সেটিকে ডাকত "ভূতের বাড়ি" নামে।

লোকমুখে প্রচলিত ছিল, রাত বারোটার পর বাড়িটির ভাঙা জানালা দিয়ে সাদা পোশাক পরা এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসে। কেউ তার মুখ দেখেনি, কিন্তু সবাই বলত, সে নাকি কান্নার মতো এক অদ্ভুত শব্দ করে।

এই গল্পের নায়ক অর্ণব। সে কলকাতার এক তরুণ সাংবাদিক। অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তার একেবারেই বিশ্বাস ছিল না। সে মনে করত, প্রতিটি রহস্যেরই কোনো না কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা থাকে।

একদিন তার সম্পাদক বললেন, — "হালিশহরের ভূতের বাড়ি নিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করো।"

অর্ণব ক্যামেরা, টর্চ আর নোটবুক নিয়ে রওনা দিল।

সন্ধ্যার পর সে শান্তি ভিলার সামনে পৌঁছাল। বাড়ির চারদিকে আগাছা, ভাঙা দেওয়াল আর বিশাল বটগাছ। বাতাসে যেন এক অদ্ভুত শীতলতা।

পাশের চায়ের দোকানে বসে থাকা বৃদ্ধ নিত্যানন্দ তাকে বললেন, — "বাবা, রাত হলে ও বাড়িতে যেও না। যারা গেছে, সবাই ভয় নিয়ে ফিরেছে।"

অর্ণব হেসে বলল, — "ভূত বলে কিছু নেই কাকু।"

বৃদ্ধ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

রাত সাড়ে এগারোটা।

অর্ণব বাড়ির ভিতরে ঢুকল। ধুলোয় ঢাকা আসবাব, মাকড়সার জাল আর ভাঙা সিঁড়ি। প্রতিটি পদক্ষেপে কড়মড় শব্দ উঠছে।

হঠাৎ দোতলার দিক থেকে ভেসে এল— ঠক... ঠক... ঠক...

সে টর্চের আলো ফেলতেই শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে আবার।

এইবার শব্দটা আরও কাছে।

অর্ণব সাহস করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল।

দোতলায় একটি পুরোনো ঘরের দরজা অর্ধেক খোলা। ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল, দেয়ালে ঝুলছে একটি বিবর্ণ ছবি। ছবিতে এক তরুণী, সাদা শাড়ি পরে মৃদু হাসছেন।

ছবির নিচে লেখা— "মেঘলা, ১৯৭৮"

ঠিক তখনই ঘরের জানালা নিজে থেকেই খুলে গেল।

হাওয়ার ঝাপটায় ছবিটি মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।

হঠাৎ ঘরের এক কোণে সাদা পোশাক পরা এক নারীর অবয়ব দেখা দিল।

অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

মহিলাটি কোনো কথা বললেন না। শুধু ধীরে ধীরে হাত তুলে পাশের একটি কাঠের আলমারির দিকে ইশারা করলেন।

পরমুহূর্তেই তিনি মিলিয়ে গেলেন।

অর্ণব সাহস করে আলমারি খুলল।

ভিতরে একটি পুরোনো ডায়েরি।

ডায়েরিতে লেখা ছিল—

"আমার নাম মেঘলা। এই বাড়িতে আমি একা থাকতাম। আমার স্বামী বিদেশে ছিলেন। এক রাতে ডাকাতরা বাড়িতে ঢুকে আমাকে হত্যা করে। আমার হত্যাকারীরা কখনও ধরা পড়েনি। সত্যিটা সবাই ভুলে গেছে।"

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—

"যদি কেউ এই লেখা পড়ো, তবে আমার সত্যিটা সবাইকে জানিও।"

অর্ণব ডায়েরি হাতে নিয়ে নিচে নেমে এল।

ঠিক তখনই পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠল।

দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

চারদিকে অন্ধকার।

হঠাৎ করিডরে আবার সেই সাদা ছায়ামূর্তি।

এইবার তিনি ধীরে ধীরে হাসলেন।

কিন্তু সেই হাসিতে ভয় ছিল না, ছিল কষ্ট।

অর্ণব বলল, — "আমি তোমার গল্প সবাইকে জানাব।"

মুহূর্তের মধ্যেই দরজাটি খুলে গেল।

বাইরে বেরিয়ে এসে সে গভীর শ্বাস নিল।

পরদিন সে পুরোনো পুলিশ রেকর্ড খুঁজতে শুরু করল।

অবশেষে জানতে পারল, সত্যিই ১৯৭৮ সালে শান্তি ভিলায় এক তরুণী খুন হয়েছিলেন। মামলাটি অমীমাংসিত থেকে যায়।

অর্ণব সংবাদপত্রে পুরো ঘটনা প্রকাশ করল।

তার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—

"হালিশহরের ভূত নয়, এক অসমাপ্ত বিচার"

কয়েকদিন পর বাড়িটির সামনে মানুষ ফুল রেখে মেঘলার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করল।

অদ্ভুতভাবে, এরপর আর কেউ সেই বাড়িতে সাদা ছায়ামূর্তিকে দেখেনি।

কিন্তু স্থানীয় মানুষ এখনও বলে, বর্ষার গভীর রাতে যদি কেউ শান্তি ভিলার সামনে দাঁড়ায়, গঙ্গার হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসে এক মৃদু কণ্ঠ—

"ধন্যবাদ..."

সেই শব্দে আর ভয় থাকে না।

থাকে শুধু এক আত্মার শান্তি পাওয়ার অনুভূতি।

সমাপ্ত।

Comments

    Please login to post comment. Login