Posts

নন ফিকশন

বড় পুকুর

June 30, 2026

SANJIB ROY

39
View

বর্ষার শেষ দিক। পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম—শালবনি। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশাল জলাশয়, যার নাম বড় পুকুর। বহু বছর আগে জমিদার হরিশঙ্কর রায় এই পুকুর খনন করেছিলেন। একসময় এখানেই গ্রামের উৎসব, মাছ ধরা আর পূজা হতো। কিন্তু হঠাৎ একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করলে মানুষ সেই পুকুরের ধারে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

গ্রামের বৃদ্ধরা বলতেন, "সূর্য ডোবার পর বড় পুকুরের জলে তাকিও না। সেখানে নিজের মুখ নয়, অন্য কারও মুখ দেখা যায়।"

কলকাতার তরুণ সাংবাদিক অরিন্দম এসব গল্পকে নিছক কুসংস্কার মনে করত। রহস্যের সত্যতা খুঁজে বের করাই ছিল তার নেশা। তাই একদিন সে ক্যামেরা, টর্চ আর নোটবুক নিয়ে শালবনি গ্রামে পৌঁছাল।

গ্রামের চায়ের দোকানে বসে সে বড় পুকুরের কথা জানতে চাইতেই সবাই চুপ হয়ে গেল।

এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন, "বাবা, সেখানে রাত কাটানোর চেষ্টা কোরো না। গত দশ বছরে চারজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছে।"

অরিন্দম শুধু হেসে বলল, "ভূত নয়, সত্যিটাই খুঁজতে এসেছি।"

সন্ধ্যা নামতেই সে বড় পুকুরের ধারে পৌঁছাল। চারপাশে বিশাল বটগাছ, ঝোপঝাড় আর কুয়াশা। বাতাস যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

হঠাৎ—

ঝপাং!

জলের ভেতর যেন কেউ বিশাল কিছু ফেলল।

সে টর্চের আলো ফেলতেই কিছুই দেখা গেল না।

কিছুক্ষণ পরে আবার—

"বাঁচাও..."

মেয়েলি কণ্ঠস্বর।

অরিন্দম শব্দের দিকে এগোতেই কণ্ঠস্বর থেমে গেল।

ঠিক তখনই তার ক্যামেরা নিজে থেকেই ছবি তুলতে শুরু করল।

ক্লিক...
ক্লিক...
ক্লিক...

সে অবাক হয়ে ক্যামেরা বন্ধ করল।

রাত গভীর হলে হঠাৎ জলের ওপর সাদা পোশাক পরা এক নারীর অবয়ব দেখা গেল।

মুখ দেখা যাচ্ছে না।

সে ধীরে ধীরে হাত তুলে ইশারা করল।

অরিন্দম সাহস করে এগিয়ে গেল।

হঠাৎ পুরো অবয়বটি মিলিয়ে গেল।

পরদিন সকালে ক্যামেরার ছবি দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।

যেখানে সাদা ছায়া ছিল, সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এক যুবতীর মুখ।

কিন্তু তার চোখ দুটো যেন সম্পূর্ণ কালো।

গ্রামের স্কুলশিক্ষক নরেনবাবু ছবিটি দেখে চমকে উঠলেন।

"এ তো কমলা!"

"কমলা কে?"

"প্রায় পঁচিশ বছর আগে গ্রামের এক মেয়ে। বিয়ের আগের রাতে নিখোঁজ হয়েছিল। সবাই বলেছিল সে পালিয়ে গেছে।"

অরিন্দম সন্দেহ করল, ঘটনাটার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য রহস্য আছে।

সে পুরোনো থানার নথি ঘাঁটতে গেল।

সেখানে একটি রিপোর্ট পেল।

'কমলা রায়—নিখোঁজ। তদন্ত অসমাপ্ত।'

আরও একটি নাম চোখে পড়ল—

জমিদারের নাতি রমেশ রায়।

কিন্তু রিপোর্টের শেষ পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলা।

অরিন্দম এবার জমিদারবাড়িতে গেল।

পুরোনো ভাঙা প্রাসাদের এক ঘরে সে একটি ডায়েরি খুঁজে পেল।

ডায়েরিতে লেখা—

"কমলা সব জেনে গেছে। গুপ্তধনের কথা কাউকে জানাতে দেওয়া যাবে না।"

তারিখের পর আর কিছু লেখা নেই।

রাতে আবার বড় পুকুরে ফিরে এল অরিন্দম।

হঠাৎ কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে এল সেই নারী।

এবার সে কথা বলল।

"সত্যিটা... জলের নিচে..."

তারপরই মিলিয়ে গেল।

অরিন্দম পরদিন ডুবুরি ডেকে আনল।

অনেক খোঁজার পর পুকুরের তলায় একটি লোহার সিন্দুক পাওয়া গেল।

কিন্তু সিন্দুকের পাশেই পড়ে ছিল মানুষের কঙ্কাল।

সঙ্গে একটি রুপোর হার।

নরেনবাবু হারটি দেখেই কেঁদে ফেললেন।

"এটা কমলার।"

পুলিশ খবর পেয়ে তদন্ত শুরু করল।

কঙ্কালের ফরেনসিক পরীক্ষায় জানা গেল, সেটি সত্যিই কমলার।

সিন্দুক খুলে পাওয়া গেল সোনার গয়না, পুরোনো মুদ্রা আর জমিদারের গোপন সম্পদের নথি।

তদন্তে বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর সত্য।

জমিদারের নাতি রমেশ গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছিল বড় পুকুরের নিচে।

কমলা ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

তারপর সবাইকে বলা হয়, কমলা পালিয়ে গেছে।

বহু বছর ধরে সেই অপরাধ চাপা পড়ে ছিল।

কিন্তু রহস্য চাপা থাকেনি।

কমলার আত্মা যেন সত্য প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল।

সবকিছু প্রকাশ হওয়ার পর গ্রামে কমলার নামে শ্রাদ্ধ ও স্মরণসভা করা হলো।

সেই রাতের পর আর কেউ বড় পুকুরে অদ্ভুত ছায়া দেখেনি।

অরিন্দম কলকাতায় ফিরে একটি প্রতিবেদন লিখল—

"প্রতিটি ভূতের গল্পের পেছনে কখনও কখনও লুকিয়ে থাকে মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ।"

কয়েক মাস পরে সে আবার শালবনি গ্রামে গেল।

বড় পুকুর এখন শান্ত।

শিশুরা মাছ ধরছে।

গ্রামের মানুষ আবার সেখানে যেতে শুরু করেছে।

অরিন্দম মনে মনে ভাবল, "রহস্যের শেষ হয়েছে।"

ঠিক তখনই—

পুকুরের জলে হালকা ঢেউ উঠল।

সে নিচের দিকে তাকাল।

জলের ভেতর স্পষ্ট দেখা গেল এক বৃদ্ধ মানুষের মুখ।

মুহূর্তের মধ্যে মুখটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

অরিন্দম ভেবেছিল চোখের ভুল।

কিন্তু বাড়ি ফিরে ক্যামেরার শেষ ছবিটি খুলতেই সে জমে গেল।

ছবিতে বড় পুকুরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাকের কমলা।

তার পাশে আরেকজন বৃদ্ধ।

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি।

ছবির নিচে হঠাৎ নিজে থেকেই একটি বাক্য ফুটে উঠল—

"একটি সত্য প্রকাশ পেয়েছে... আরেকটি এখনও জলের নিচে ঘুমিয়ে আছে।"

অরিন্দমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

পরদিন সে আবার শালবনিতে ফিরে আসে।

কিন্তু বড় পুকুরের ধারে পৌঁছে দেখে, আগের রাতের ঝড়ে একটি পুরোনো বটগাছ উপড়ে পড়েছে। গাছের শিকড়ের নিচে দেখা যাচ্ছে পাথরের তৈরি একটি বন্ধ সুড়ঙ্গের মুখ।

গ্রামবাসীরা বিস্ময়ে হতবাক।

সুড়ঙ্গটি বহু পুরোনো। মনে হয় জমিদার আমলের।

পুলিশ ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করা হলো।

ভেতরে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার, দেওয়ালে মশালের কালো দাগ। কিছুদূর এগোতেই একটি ছোট ঘর।

সেখানে একটি লোহার বাক্স।

বাক্স খুলে পাওয়া গেল পুরোনো দলিল, কিছু চিঠি এবং একটি স্বীকারোক্তি।

তাতে লেখা ছিল—

"আমি রমেশ রায় নই, আসল খুনি আমার কাকা। আমাকে দোষ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। যদি কেউ এই লেখা পড়ে, তবে জানবে—কমলার মৃত্যুর বিচার কখনও সম্পূর্ণ হয়নি।"

অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল।

অর্থাৎ এতদিন যে সত্য সবাই বিশ্বাস করেছে, সেটিও অসম্পূর্ণ ছিল।

ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেল।

দূরে যেন কারও মৃদু কণ্ঠ ভেসে এল—

"এবার... আমি মুক্ত..."

সেই কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভেতরের অদ্ভুত শীতলতা মিলিয়ে গেল।

পরবর্তীতে নতুন তদন্তে প্রকৃত অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ্যে আসে। গ্রামের ইতিহাসে বহু বছরের অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

আজও শালবনির মানুষ বলে, পূর্ণিমার রাতে বড় পুকুরের জলে চাঁদের আলো পড়লে কখনও কখনও সাদা একটি ছায়া দেখা যায়। তবে সেটি আর ভয়ের নয়—সেটি যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিতে যাওয়া এক আত্মার নীরব বিদায়।

সমাপ্ত

Comments

    Please login to post comment. Login