Posts

নন ফিকশন

মার আঁচল

June 30, 2026

SANJIB ROY

54
View

বর্ষার শেষ রাত। আকাশে কালো মেঘের ভিড়, বিদ্যুতের ঝলকানিতে মাঝেমধ্যে আলোকিত হয়ে উঠছে নদীর ধারের ছোট্ট গ্রাম শিউলিপুর। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, রাত বারোটার পর বাঁশবাগানের পাশের পুরোনো পথ দিয়ে কেউ হাঁটলে সে আর আগের মানুষ থাকে না।

এই গ্রামেই বহু বছর পর ফিরে এল অরিন্দম। কলকাতায় চাকরি করলেও মায়ের মৃত্যুর পর পৈতৃক বাড়ি একেবারে ফাঁকা হয়ে পড়েছিল। এবার সে ঠিক করেছে বাড়িটি বিক্রি করবে।

গ্রামে পৌঁছে প্রথমেই সে অনুভব করল, বাড়িটা যেন এখনও কারও অপেক্ষায়। বারান্দায় রাখা মায়ের পুরোনো দোলচেয়ারটি বাতাস ছাড়াই আস্তে আস্তে দুলছে। অরিন্দম নিজেকে বোঝাল—হয়তো বাতাসের খেলা।

রাতে খাওয়া শেষ করে সে মায়ের ঘরে ঢুকল। ঘরের কোণে কাঠের আলমারির ওপর সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা ছিল মায়ের সাদা-লাল পাড়ের আঁচল। এত বছর পরও সেটি যেন নতুনের মতো।

ঠিক রাত বারোটায় হঠাৎ ঘরের বাতি নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে একটি পরিচিত গন্ধ ভেসে এল—নারকেল তেলের গন্ধ, যেটা তার মা ব্যবহার করতেন।

তারপর খুব আস্তে একটি কণ্ঠস্বর...

"খোকা..."

অরিন্দমের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বলল, — কে?

কোনো উত্তর নেই।

হঠাৎ দেখল, আলমারির ওপর রাখা আঁচলটি নিজে থেকেই মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোতে লাগল, যেন অদৃশ্য কেউ সেটি টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

ভয়ে বুক ধড়ফড় করলেও অরিন্দম সেই আঁচলের পিছু নিল।

আঁচলটি তাকে বাড়ির পেছনের পুরোনো তুলসী মঞ্চের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে পৌঁছতেই সবকিছু থেমে গেল।

মাটির ওপর একটি পুরোনো লোহার বাক্সের কোণা বেরিয়ে ছিল।

পরদিন সকালে গ্রামের বৃদ্ধ হরিপদ কাকাকে ডেকে এনে বাক্সটি খোলা হল।

ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো ছবি, কিছু সোনার গয়না আর একটি চিঠি।

চিঠিটি ছিল অরিন্দমের মায়ের লেখা।

"যদি কখনও এই চিঠি তুই পড়িস, তাহলে বুঝবি আমি আর নেই। এই গয়নাগুলো বিক্রি করিস না। এগুলো তোর ঠাকুমার স্মৃতি। আর সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের পরিবারের একটা রহস্য এখনও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।"

চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—

"যাকে সবাই দুর্ঘটনা বলেছিল, সেটা আসলে খুন।"

অরিন্দমের মাথায় যেন বাজ পড়ল।

তার বাবা বহু বছর আগে নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। সবাই বলেছিল দুর্ঘটনা।

তাহলে?

সেই রাতেই আবার শুরু হল অদ্ভুত ঘটনা।

দেয়ালে টাঙানো বাবার ছবিটি আচমকা পড়ে ভেঙে গেল।

কাঁচের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ছোট্ট চাবি।

চাবির সঙ্গে বাঁধা ছিল একটি কাগজ—

"বাঁশবাগানের কুয়ো।"

অরিন্দম টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

বাঁশবাগানের মাঝখানে ছিল বহু বছরের পুরোনো একটি শুকনো কুয়ো।

সেখানে পৌঁছতেই আবার সেই গন্ধ...

আর সেই কণ্ঠস্বর—

"ভয় পাস না খোকা..."

টর্চের আলোয় সে দেখল, কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক মহিলা।

মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ ঝড়ের দমকায় তার শাড়ির আঁচল উড়ে উঠতেই অরিন্দম বুঝল—

এটা তার মায়েরই আঁচল।

মহিলাটি ধীরে ধীরে কুয়োর ভেতরের দিকে ইশারা করলেন।

পরদিন গ্রামের লোকজনকে নিয়ে কুয়ো পরিষ্কার করা হল।

অনেক নিচে পাওয়া গেল একটি লোহার সিন্দুক।

সিন্দুক খুলতেই বেরিয়ে এল পুরোনো জমির দলিল, কিছু নথি আর একটি ডায়েরি।

ডায়েরিতে লেখা ছিল—

অরিন্দমের বাবার ছোট ভাই লোভের বশে সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে করতে চেয়েছিল।

অরিন্দমের বাবা বাধা দিলে এক বর্ষার রাতে তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

তার মা সব জানতেন, কিন্তু ছেলেকে বাঁচানোর জন্য চুপ ছিলেন।

প্রমাণগুলো তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন।

ঠিক তখনই গ্রামের এক বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন—

"আমি সব জানি... আমি সব দেখেছিলাম..."

ভয়ে এতদিন তিনি মুখ খোলেননি।

পুলিশে খবর দেওয়া হল।

পুরোনো মামলাটি নতুন করে খোলা হল।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নথিগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হল।

অপরাধীদের বংশধরেরাও সত্য স্বীকার করল।

বহু বছরের অন্যায়ের বিচার শুরু হল।

সবকিছু শেষ হওয়ার পর অরিন্দম শেষবারের মতো মায়ের ঘরে গেল।

আলমারির ওপর আবার সেই আঁচলটি সুন্দর করে ভাঁজ করা ছিল।

সে আঁচলটি বুকে জড়িয়ে ধরতেই মনে হল, কেউ যেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

বাতাসে ভেসে এল খুব পরিচিত কণ্ঠ—

"এবার আমি শান্তি পেলাম, খোকা..."

অরিন্দমের চোখ ভিজে উঠল।

সেদিনের পর আর কখনও সেই বাড়িতে কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি।

তবে গ্রামের মানুষ আজও বলে, বর্ষার গভীর রাতে যদি কেউ শিউলিপুরের সেই পুরোনো বাড়ির পাশ দিয়ে যায়, তবে হালকা নারকেল তেলের গন্ধ ভেসে আসে।

আর কখনও কখনও দেখা যায়, বাতাসহীন রাতেও একটি সাদা-লাল পাড়ের মায়ের আঁচল নিঃশব্দে দুলছে—যেন কোনো মা এখনও তার সন্তানের ওপর অদৃশ্য পাহারা দিয়ে চলেছেন।

—সমাপ্ত—

Comments

    Please login to post comment. Login