Posts

ফিকশন

আমি পাতা জোড়া জোড়া

June 30, 2026

SANJIB ROY

44
View

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে গ্রামের কাঁচা পথের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে কাশফুলের দোলা, দূরে নদীর ঢেউ, আর বটগাছের নিচে বসে আছে অর্ণব। তার হাতে একটি পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

"আমি পাতা জোড়া জোড়া, তবু গল্পটা অসম্পূর্ণ..."

এই ডায়েরিটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি।

পাঁচ বছর আগে, কলেজের প্রথম দিন।

অর্ণব লাইব্রেরিতে বই খুঁজছিল। হঠাৎ পাশের তাক থেকে একটি বই পড়ে গেল। বইটি তুলে দিতে গিয়েই তার চোখে চোখ পড়ল এক মেয়ের।

মেয়েটি হেসে বলল, — "ধন্যবাদ।"

অর্ণব শুধু বলল, — "স্বাগতম।"

মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা

সেই এক মুহূর্তেই যেন অর্ণবের পৃথিবী বদলে গেল।

ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হলো। প্রতিদিন ক্লাস শেষে তারা লাইব্রেরিতে বসত। বই পড়ত, গল্প করত, কবিতা লিখত।

মেঘলার একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

সে শুকনো গাছের পাতা কুড়িয়ে ডায়েরির পাতার মধ্যে রেখে দিত।

অর্ণব একদিন জিজ্ঞেস করল, — "এভাবে পাতা জমাও কেন?"

মেঘলা মুচকি হেসে বলল,

— "পাতা একা থাকলে শুকিয়ে যায়। কিন্তু দুটো পাতা একসাথে রাখলে মনে হয় তারা গল্প করছে।"

অর্ণব হেসে বলল, — "তাহলে আমরাও কি দুই পাতার মতো?"

মেঘলা উত্তর দিল না।

শুধু ডায়েরির মধ্যে দুটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার পাতা পাশাপাশি রেখে দিল।

কলেজজীবন শেষ হতে না হতেই ভালোবাসা অজান্তেই জন্ম নিল।

কেউ কাউকে বলেনি।

তবু চোখের ভাষা সব বলে দিত।

বর্ষার দিনে ভিজতে ভিজতে হাঁটা, পরীক্ষার আগে একসাথে পড়া, পূজার মেলায় ঘোরা—সবই যেন অদৃশ্য এক বন্ধনে বাঁধা ছিল।

একদিন নদীর ধারে বসে মেঘলা বলল,

— "যদি কোনোদিন হারিয়ে যাই?"

অর্ণব হেসে বলল,

— "তোমাকে খুঁজে আনব।"

মেঘলা আবার বলল,

— "যদি না পাও?"

অর্ণব উত্তর দিল,

— "তাহলে সারাজীবন খুঁজব।"

মেঘলার চোখে জল এসে গিয়েছিল।

সব গল্পে সুখ থাকে না।

মেঘলার বাবা হঠাৎ অন্য শহরে বদলি হলেন।

বিদায়ের আগের দিন মেঘলা অর্ণবকে একটি ডায়েরি দিল।

বলল,

— "শেষ পাতায় পৌঁছানোর আগে আমাকে ভুলে যেও না।"

অর্ণব কিছু বলতে পারল না।

বাস ছেড়ে দিল।

জানালার পাশে বসে মেঘলা কাঁদছিল।

অর্ণব শুধু দাঁড়িয়ে রইল।

দিন কেটে গেল।

মাস কেটে গেল।

প্রথমে চিঠি আসত।

তারপর কমে গেল।

তারপর একদিন একেবারেই বন্ধ।

অর্ণব বহুবার ফোন করল।

নম্বর বন্ধ।

ঠিকানায় গিয়ে জানল—

ওরা অন্য কোথাও চলে গেছে।

প্রতিদিন রাতে অর্ণব ডায়েরি খুলত।

প্রতিটি পাতার ভাঁজে শুকনো পাতা।

প্রতিটি পাতায় মেঘলার হাতের লেখা।

শেষ পাতায় লেখা ছিল—

"যদি কোনোদিন আমাদের দেখা না হয়, তবুও এই পাতাগুলো খুলে দেখো। আমি এখানেই থাকব।"

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

পাঁচ বছর পর।

একটি বইমেলায় অর্ণব নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করতে এসেছে।

বইয়ের নাম—

"আমি পাতা জোড়া জোড়া"

অনেক পাঠক বই কিনছে।

অটোগ্রাফ নিচ্ছে।

হঠাৎ একজন মেয়ে বইটা এগিয়ে দিল।

অর্ণব তাকিয়ে স্তব্ধ।

মেঘলা।

একই হাসি।

একই চোখ।

শুধু সময় কিছুটা বদলে দিয়েছে।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।

মেঘলা বলল,

— "তুমি কথা রেখেছ।"

অর্ণব অবাক হয়ে বলল,

— "কোন কথা?"

— "তুমি বলেছিলে আমাকে সারাজীবন খুঁজবে।"

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

— "আমি খুঁজেছি।"

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

— "আমিও।"

একটি কফিশপে বসে অনেক কথা হলো।

মেঘলা জানাল—

বাবার অসুস্থতার জন্য হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

মোবাইল হারিয়ে যায়।

চিঠির ঠিকানাও বদলে যায়।

জীবন যেন সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিল।

সে বিয়েও করেনি।

অর্ণবও না।

দুজনেই শুধু স্মৃতি বাঁচিয়ে রেখেছিল।

১০

মেঘলা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।

ভেতরে দুটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার পাতা।

বলল,

— "মনে আছে?"

অর্ণবের চোখ ভিজে গেল।

— "এগুলো এখনও রেখেছ?"

— "যে মানুষকে ভুলিনি, তার স্মৃতি কীভাবে ফেলি?"

১১

সেদিন সন্ধ্যায় তারা আবার সেই পুরোনো নদীর ধারে গেল।

বটগাছ এখনও আছে।

নদী এখনও বয়ে চলেছে।

অর্ণব ডায়েরি খুলল।

শেষ খালি পাতায় লিখল—

"আজ গল্পটা সম্পূর্ণ হলো।"

মেঘলা লিখল—

"পাতা কখনও একা ছিল না। আমরা শুধু সময়ের ভাঁজে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম।"

১২

এক বছর পর।

ছোট্ট একটি বাড়ি।

বারান্দায় ফুলের টব।

একটি বুকশেলফ।

দুজনের যৌথ লাইব্রেরি।

মেঘলা এখনও শুকনো পাতা কুড়িয়ে বইয়ের ভেতরে রাখে।

অর্ণব হাসে।

একদিন তাদের ছোট্ট মেয়ে জিজ্ঞেস করল,

— "মা, শুকনো পাতা রাখো কেন?"

মেঘলা তাকে কোলে নিয়ে বলল,

— "কারণ প্রতিটি পাতার একটা গল্প থাকে।"

মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল,

— "আর দুটো পাতা?"

অর্ণব উত্তর দিল,

— "দুটো পাতা একসাথে থাকলে সেটা ভালোবাসার গল্প হয়ে যায়।"

সমাপ্তি

অনেক বছর পরে, তাদের বুকশেলফের এক কোণে সেই পুরোনো ডায়েরিটি এখনও রাখা ছিল। প্রথম পাতায় লেখা—

"আমি পাতা জোড়া জোড়া..."

আর শেষ পাতায়—

"ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না। সময় তাকে শুধু একটু অপেক্ষা করতে শেখায়।"

যে দুটি শুকনো পাতা একদিন নিঃশব্দে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল, তারা আজও যেন বলে যায়— সত্যিকারের ভালোবাসা কেবল মানুষের হৃদয়ে নয়, স্মৃতির পাতাতেও বেঁচে থাকে।

Comments

    Please login to post comment. Login