🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️

Comments
পড়ালেখাই কি সব?
এই দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আর সবচেয়ে বড় হতাশার নাম পড়ালেখা। প্রতিটি সাধারণ ঘর থেকে শুরু করে শহরের অ্যাপার্টমেন্ট, গ্রামের টিনের চালের বাড়ি—সব জায়গায় একই কথা ঘুরে ফিরে আসে: “পড়ালেখা করো, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হও, চাকরি পাও, সংসারের মুখ উজ্জ্বল করো।” কিন্তু বাস্তবতা যখন সামনে আসে, তখন সেই স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পরিবারের সব সঞ্চয়, ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা, এমনকি তার চেয়েও বেশি খরচ করে সন্তানকে পড়ানোর পর যখন সে বেকার বসে থাকে, তখন পুরো পরিবারের জীবন একটা অন্ধকার গহ্বরে ডুবে যায়। এই চিন্তাটা শুধু একটা পরিবারের নয়, পুরো জাতির, পুরো সমাজের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পুরুষ সমাজের একটা যৌথ যন্ত্রণা।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন একটা বিশাল কারখানা। সেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণীকে ডিগ্রির ছাঁচে ঢেলে বের করে দেওয়া হয়। প্রাইমারি থেকে শুরু করে এইচএসসি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রাইভেট কলেজ—পুরো পথটাই টিউটর, কোচিং সেন্টার, মডেল টেস্ট আর রাত জাগা পড়াশোনায় ভরা। মধ্যবিত্ত বাবা-মা রাতের ঘুম ছেড়ে দেন, মায়ের গয়না বিক্রি হয়, বাবার রিটায়ারমেন্টের টাকা উড়ে যায়, জমি বন্ধক রাখা হয়, ধারদেনা করে সন্তানকে পড়ানো হয়। উদ্দেশ্য একটাই—একটা ভালো চাকরি। কিন্তু চাকরির বাজার যেন একটা শুকনো মরুভূমি। হাজার হাজার শিক্ষিত যুবক সেখানে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, অথচ কাজ মেলে না।
কল্পনা করুন একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের কথা। ছোটবেলা থেকে তার মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে পড়ালেখাই একমাত্র রাস্তা। খেলাধুলা, সৃজনশীলতা, ব্যবসায়িক চিন্তা—সবকিছু বন্ধ। শুধু বইয়ের পাতা। এসএসসি, এইচএসসি, তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল বা বিবিএ। পরিবারের সব আশা তার ওপর। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের পর যখন চাকরির আবেদন করতে করতে হাতের আঙুলগুলো ক্ষয়ে যায়, ইন্টারভিউয়ে গিয়ে দেখা যায় শত শত প্রতিযোগী, তখন হতাশা নামে। বাড়িতে প্রশ্ন ওঠে— “এত টাকা খরচ করলাম, কী হল?” আত্মীয়-স্বজনের কাছে মুখ দেখানো যায় না। বিয়ের প্রস্তাব আসে না। সমাজের চাপে মানুষটা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।
এই দেশে এমন হাজার হাজার ঘটনা ঘটছে প্রতি বছর। শিক্ষিত যুবকেরা যখন চাকরি না পেয়ে মানসিক চাপ সহ্য করতে পারে না, তখন কেউ কেউ চরম সিদ্ধান্ত নেয়। খবরের কাগজে, টেলিভিশনে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতি সপ্তাহে এমন সব ঘটনা আসে যে চোখে জল চলে আসে। একজন ইঞ্জিনিয়ার, একজন এমবিএ, একজন মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট—পরিবারের সব স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণটি বেড়ে উঠেছিল, সে শেষে ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়ে বা বিষ খেয়ে নেয়। পুরো জাতির যুবশক্তি এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত সমাজের ছেলেরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। কারণ তাদের পরিবারের সামর্থ্য সীমিত, অথচ আশা অসীম।
যারা আত্মহত্যা করেন না, তারাও একটা অদৃশ্য মৃত্যুর মধ্যে বেঁচে থাকেন। অনেকে শেষ পর্যন্ত রিকশা চালানো, দোকানে চাকরি করা, ডেলিভারি বয়ের কাজ—এসব করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা যুবক রিকশার হ্যান্ডেল ধরে রাস্তায় ঘুরছে, এ দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। পড়ালেখার পেছনে পরিবারের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে, অথচ সে রোজগার করছে মাত্র কয়েকশো টাকা দিনে। লজ্জায়, অপমানে, হতাশায় তার মাথা নিচু হয়ে যায়। সমাজ তাকে দেখে বলে, “এত পড়েও কিছু হল না?” কিন্তু সমাজটা কখনো জিজ্ঞাসা করে না যে শিক্ষা ব্যবস্থা কেন শুধু ডিগ্রি তৈরি করে, বাস্তব দক্ষতা তৈরি করে না।
পুরো দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব ভয়াবহ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা লাখ লাখ। তারা যদি উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতো, দেশ এগিয়ে যেত। কিন্তু তারা হতাশায় ডুবে আছে। মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। অনেক মেধাবী মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির অপেক্ষায় বসে থাকে, বিয়ের চাপ বাড়ে, পরিবারের অশান্তি বাড়ে। পুরুষ সমাজের চাপটা আরও বেশি, কারণ ছেলেকে সংসারের ভার বহন করতে হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। ফলে ছেলেরা আরও বেশি ভেঙে পড়ে।
একটা সময় ছিল যখন ডিগ্রি পেলেই চাকরি পাওয়া যেত। সরকারি চাকরি, ব্যাংক, কর্পোরেট—সব জায়গায় সুযোগ ছিল। এখন সেই সময় আর নেই। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, শিক্ষার প্রসার, কিন্তু কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি সেভাবে হয়নি। ফলে প্রতিযোগিতা প্রচণ্ড। ইন্টারভিউ বোর্ডে যোগ্যতার চেয়ে রেকমেন্ডেশন, টাকা, রাজনৈতিক যোগাযোগ বেশি কাজ করে। সাধারণ মেধাবী ছেলেরা পিছিয়ে পড়ে। তারা যখন দেখে যে অল্প পড়াশোনা করে কেউ ব্যবসা করে সফল হচ্ছে, বা স্কিল শিখে ফ্রিল্যান্সিং করে বিদেশি টাকা আনছে, তখন তাদের নিজেদের পড়ালেখার ওপর ঘৃণা জন্মায়।
পড়ালেখার এই অন্ধ নির্ভরশীলতা পুরো সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বাবা-মায়েরা সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য চাপ দেন, কিন্তু বাস্তব জীবনের দক্ষতা শেখান না। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, উদ্যোগশীলতা, কৃষি প্রযুক্তি, ছোট ব্যবসা—এসবের কথা বলা হয় না। ফলে ডিগ্রিধারী যুবকেরা বেকার থেকে যায়। যারা একটু সচেতন, তারা নিজে নিজে স্কিল শিখে বেরিয়ে আসে। কিন্তু বেশিরভাগই হতাশায় ডুবে থাকে।
দেশের যুবসমাজের এই অবস্থা দেখে মনে হয়, শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ভুল পথে চলছে। শুধু থিওরি, শুধু মুখস্থ, শুধু পরীক্ষা। বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। ইন্ডাস্ট্রির সাথে যোগাযোগ নেই। ফলে গ্র্যাজুয়েটরা বেরিয়ে এসে দেখে তাদের শেখা জ্ঞান বাজারে অচল। এই অচল জ্ঞানের জন্য পরিবারের লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট হয়। তারপর শুরু হয় ঋণ শোধ করার চাপ। বাবা-মা বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট করেন। ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। পুরো পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস হয়।
যারা রিকশা চালায় বা অন্যান্য ছোট কাজ করে, তাদের গল্পগুলো আরও করুণ। তারা লজ্জায় কাউকে বলতে পারে না যে সে গ্র্যাজুয়েট। সমাজের চোখে সে ব্যর্থ। অথচ সে যদি ছোটবেলা থেকে কোনো স্কিল শিখত, তাহলে হয়তো আজ অনেক ভালো অবস্থায় থাকত। পড়ালেখা খারাপ নয়, কিন্তু শুধু পড়ালেখার ওপর নির্ভর করে থাকাটা ভয়ানক ভুল। বাস্তব জীবনে টাকা ইনকাম করার জন্য দরকার দক্ষতা, সাহস, উদ্যোগ আর সঠিক দিকনির্দেশনা।
এই সমাজে যদি পরিবর্তন আনতে হয়, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলাতে হবে। স্কুল-কলেজে স্কিল ডেভেলপমেন্টের কোর্স চালু করতে হবে। বাবা-মায়েরা সন্তানকে শুধু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখবেন না, বরং স্বাবলম্বী করে তুলবেন। তরুণেরা নিজেরাই সচেতন হবে, অনলাইনে স্কিল শিখবে, ছোট ছোট উদ্যোগ নেবে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, কৃষি-ভিত্তিক ব্যবসা, টেকনিক্যাল স্কিল—এগুলোই আজকের সময়ের চাহিদা।
পড়ালেখাই সব নয়। পড়ালেখা একটা হাতিয়ার মাত্র। জীবন অনেক বড়। বাস্তব জীবনে কীভাবে টাকা ইনকাম করতে হয়, কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে সমাজের চাপকে অতিক্রম করতে হয়—এগুলো শেখা আরও জরুরি। যে সমাজ শুধু ডিগ্রির পেছনে ছুটে, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের যুবশক্তি হারিয়ে ফেলে। এই দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, এই দেশের তরুণ সমাজ, এই পুরো জাতি যদি এই সত্যটা উপলব্ধি করে, তাহলেই কেবল পরিবর্তন সম্ভব।
শিক্ষিত বেকারত্বের এই অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি তরুণের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি শুধু পড়ছি, নাকি শিখছি? পরিবারগুলোর উচিত সন্তানকে চাপ না দিয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখানো। সমাজের উচিত সফলতার সংজ্ঞা বদলানো—শুধু চাকরি আর ডিগ্রি নয়, স্বাবলম্বিতা আর উদ্যোগকেও সম্মান দেওয়া। তাহলেই হয়তো এই যন্ত্রণার অবসান হবে। পড়ালেখার পেছনে এতটা নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয়। বাস্তব জীবনে টাকা ইনকাম করার কৌশল, দক্ষতা আর সাহসই আসল চাবিকাঠি। এই চিন্তাটা যদি পুরো জাতি গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হবে।
এই চিন্তার গভীরতা আরও অনেক দূর যায়। প্রতিদিন যখন রাস্তায় শিক্ষিত যুবকদের হতাশ মুখ দেখা যায়, যখন পরিবারগুলোর ভাঙা স্বপ্নের গল্প শোনা যায়, তখন মনে হয় এটা শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতা। দেশের উন্নয়নের জন্য এই যুবশক্তিকে কাজে লাগানো দরকার। না হলে শুধু পড়ালেখার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্ট হতেই থাকবে, আর হতাশা আর আত্মহত্যার স্রোত বইতেই থাকবে। সময় এসেছে বদলানোর। সময় এসেছে বুঝে নেওয়ার যে পড়ালেখাই সব নয়।