হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাগদাদে পৌঁছে যে জ্ঞানচর্চা শুরু করেছিলেন, তা তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পর্বে আমরা তাঁর বাগদাদের প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষকদের সান্নিধ্য, কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা এবং খলওয়াত (নির্জনবাস) জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা করব। এখানে তাঁর পূর্ণ জীবনী নয়, শুধু এই নির্দিষ্ট সময়কালের ঘটনাবলি তুলে ধরা হলো, যাতে পরবর্তী পর্বগুলোতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বাগদাদে আগমনের পর তিনি প্রথমে আবু সাঈদ মুবারক মাখযুমী (রহ.)-এর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাখযুমী ছিলেন হাম্বলী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম এবং সুফি শায়েখ। তাঁর কাছে আব্দুল কাদের (রহ.) ফিকহ, উসুলুল ফিকহ এবং হাদিসের গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। দিনের প্রথম ভাগে তিনি দরস নিতেন। শিক্ষক তাঁর মেধা ও একাগ্রতা দেখে মুগ্ধ হতেন। তিনি শুধু পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করতেন না, বরং তার মর্মার্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন।
একই সাথে তিনি ইবনে আকিল (রহ.)-এর কাছেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। ইবনে আকিল ছিলেন বাগদাদের বিখ্যাত হাম্বলী আলেম, যিনি যুক্তিবিদ্যা ও ফিকহের সমন্বয় সাধন করেছিলেন। আব্দুল কাদের (রহ.) তাঁর কাছে বিতর্ক ও দলিল-প্রমাণের কৌশল শিখেন। হাদিস শাস্ত্রে আবু মুহাম্মদ জাফর আস-সাররাজের সান্নিধ্য লাভ করেন। এই শিক্ষকদের কাছে তিনি সহীহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযীসহ প্রধান হাদিস গ্রন্থসমূহের সনদসহ জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি এত প্রখর ছিল যে, দীর্ঘ হাদিস শুনে তা শুদ্ধভাবে পুনরাবৃত্তি করতে পারতেন।
বাগদাদের জীবন ছিল কঠোর। তিনি অভাবের মধ্যে দিন কাটাতেন। অনেক সময় খাবার জুটত না। এক ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে যে, তিনি একবার তিন দিন না খেয়ে থেকেছিলেন। ক্ষুধার তাড়নায় তিনি মাটি খেয়েছিলেন বলে কথিত আছে, কিন্তু কখনো অন্যের কাছে হাত পাতেননি। এই সময় তাঁর আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষক আবুল খায়ের হাম্মাদ আদ-দাব্বাস (রহ.)-এর সাথে যোগাযোগ ঘটে। দাব্বাস তাঁকে তাসাউফের মূলনীতি—নফসের শুদ্ধি, জিকির, মুরাকাবা এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পথ দেখান।
তিনি প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর থেকে রাত গভীর পর্যন্ত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তাঁর খলওয়াত (নির্জন সাধনা) শুরু হয় এই সময় থেকে। বাগদাদের উপকণ্ঠে বা নির্জন স্থানে তিনি দিনের পর দিন কাটাতেন। সেখানে তিনি কুরআন তিলাওয়াত, জিকিরে রাসূল (সা.) এবং মোরাকাবায় নিমগ্ন থাকতেন। এই সাধনার ফলে তাঁর আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। তিনি নিজেকে দুনিয়ার লোভ-লালসা থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করতেন।
একবার তিনি বাগদাদের বাজারে গিয়ে দেখেন যে, মানুষ ব্যস্ত দুনিয়াবি কাজে। তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে আরও বেশি নির্জনতা অবলম্বন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বিভিন্ন মাজহাবের সাথে পরিচিতি। তিনি হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী হলেও শাফেয়ী মাজহাবের ফতোয়াও অধ্যয়ন করতেন এবং উভয় মাজহাবের সমন্বয় সাধন করতেন। এটি তাঁর পরবর্তী জীবনে মানুষের মধ্যে ঐক্য স্থাপনে সাহায্য করেছিল।
প্রায় ২৫ বছরের দীর্ঘ সময় তিনি এই সাধনা ও ভ্রমণে কাটিয়েছিলেন। বাগদাদ থেকে তিনি ইরাকের মরুভূমি, পাহাড়ি অঞ্চল এবং বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়ান। এই ভ্রমণকালে তিনি বিভিন্ন আলেম ও সাধকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। কখনো কখনো তিনি একাকী চলতেন, খাবার ছাড়াই দিন কাটাতেন। এই সময় তাঁর মধ্যে ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর উপর ভরসার গুণ বিকশিত হয়।
এক ঘটনায় বর্ণিত আছে যে, তিনি মরুভূমিতে একটি গাছের নিচে বসে জিকির করছিলেন। হঠাৎ একটি বিপজ্জনক প্রাণী তাঁর সামনে আসে, কিন্তু তিনি ভয় না করে আল্লাহর নাম স্মরণ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে। তিনি কোনো কারামত প্রকাশ করতেন না, বরং গোপনে ইবাদত করতেন।
বাগদাদে ফিরে তিনি মাখযুমীর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পূর্ণভাবে প্রচার শুরু করার আগে তিনি আরও গভীর সাধনা করেন। তাঁর এই সময়কালের জীবন ছিল দুনিয়াবিমুখতার উদাহরণ। তিনি সামান্য খাবারে সন্তুষ্ট থাকতেন, পুরনো কাপড় পরতেন। এই ত্যাগ তাঁকে পরবর্তীতে হাজারো মানুষের হৃদয় জয় করতে সাহায্য করেছিল।
তাঁর শিক্ষায় জোর ছিল তাকওয়া ও আমলের উপর। তিনি বলতেন, জ্ঞান শুধু মুখে নয়, অন্তরে ধারণ করতে হবে। এই সময় তিনি কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের তাফসীর অধ্যয়ন করেন এবং সেগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ শেখেন। তাঁর সাথে অনেক ছাত্র জড়ো হতে শুরু করে, যারা তাঁর আচরণ দেখে প্রভাবিত হতো।
এই দীর্ঘ সাধনার ফলে তিনি আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নতি লাভ করেন। তিনি নিজেকে “গাউস” বা সাহায্যকারীর মর্যাদার জন্য প্রস্তুত করছিলেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর উপাধি হয়। কিন্তু তখনো তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখতেন।
।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
