Posts

গল্প

যোগ্যতা -অধ্যায় ১

July 17, 2026

FIJON QURAYSH

Original Author ফিজন কোরাইশ

30
View

স্বপ্নের পথে যাত্রা (পর্ব ১)

একটি ছোট সুন্দর গ্রাম ছিল—নাম তার সোনাঝুরি। গ্রামটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু সেখানে বাস করত অনেক স্বপ্নবান মানুষ। সেই গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, জন্ম বা সম্পদ নয়—মানুষের আসল পরিচয় হলো তার যোগ্যতা, পরিশ্রম আর ভালো চরিত্র

এই গ্রামের এক কোণে থাকত কয়েকজন বন্ধু। তাদের মধ্যে ছিল তাহমিদ, তাজবিদ, মিহি, রাইকা, আবির, আনাস, শান্তি ও বায়জিদ

তাহমিদ ছিল খুব চিন্তাশীল ছেলে। সে সবসময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করত। তাজবিদ ছিল সাহসী ও পরিশ্রমী। মিহি ও রাইকা পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখত। আবির ছিল প্রযুক্তিপ্রেমী, আর আনাস ছিল মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন ভালো মনের মানুষ। শান্তি ছিল ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিমান, আর বায়জিদ ছিল সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলা একজন বন্ধুবৎসল ছেলে।

একদিন গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ঘোষণা করলেন,

“আগামী ছয় মাস পরে আমাদের এলাকায় একটি বড় প্রতিযোগিতা হবে। সেখানে যে দল সবচেয়ে ভালো কাজ দেখাতে পারবে, তারা জেলার সেরা শিক্ষার্থী দলের পুরস্কার পাবে।”

খবরটি শুনে সবাই খুব আনন্দ পেল। কিন্তু প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল কঠিন—নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে সমাজের জন্য নতুন কিছু তৈরি করতে হবে।

তাহমিদ বলল,
“আমরা শুধু পুরস্কারের জন্য কাজ করব না। আমরা এমন কিছু করব, যা আমাদের গ্রামের মানুষের উপকারে আসবে।”

সবাই তার কথায় রাজি হলো।

কিন্তু তাদের সামনে ছিল অনেক বাধা। গ্রামের কিছু মানুষ তাদের নিয়ে হাসাহাসি করত।

সাত্তার মিয়া নামের এক বৃদ্ধ বলতেন,
“এত বড় বড় স্বপ্ন দেখলে কী হবে? গ্রামের ছেলেমেয়েরা কি আর বড় কিছু করতে পারে?”

আবার আলম খান বলতেন,
“যোগ্যতা তৈরি করতে হলে শুধু ইচ্ছা নয়, কঠোর পরিশ্রমও লাগে।”

তার কথা শুনে বন্ধুরা আরও উৎসাহ পেল।

তাদের পাশে ছিলেন গ্রামের জ্ঞানী মানুষ জামাল চাচা। তিনি বলতেন,
“যে মানুষ নিজের দুর্বলতা বুঝে সেটাকে শক্তিতে পরিণত করতে পারে, সেই আসল বিজয়ী।”

বন্ধুরা প্রতিদিন স্কুল শেষে একসঙ্গে বসত। কেউ পরিকল্পনা করত, কেউ তথ্য সংগ্রহ করত, কেউ নতুন ধারণা খুঁজত।

একদিন তারা সিদ্ধান্ত নিল, গ্রামের জন্য একটি শিক্ষা ও সাহায্য কেন্দ্র তৈরি করবে। যেখানে দরিদ্র শিশুরা বিনামূল্যে পড়তে পারবে এবং বড়দের কাছ থেকে বিভিন্ন কাজ শেখার সুযোগ পাবে।

কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না।

মালেক মোল্লা বললেন,
“তোমরা ছোট, এই বড় কাজ কীভাবে করবে?”

তাহমিদ শান্তভাবে উত্তর দিল,
“ছোট মানুষ বড় কাজ করতে পারে না—এটা সত্য নয়। ছোট থেকেই মানুষ বড় হওয়ার শিক্ষা নেয়।”

কথাটি শুনে মালেক মোল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

অন্যদিকে কাশেম নামের একজন ব্যবসায়ী তাদের চেষ্টা দেখে বললেন,
“আমি তোমাদের সাহায্য করব, তবে একটা শর্ত আছে—তোমাদের প্রমাণ করতে হবে যে তোমরা শুধু কথা বলছ না, সত্যিই কাজ করতে পারো।”

বন্ধুরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল।

দিনের পর দিন তারা কাজ করতে লাগল। তাজবিদ ও আবির পুরোনো জিনিস দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বানানোর চেষ্টা করল। মিহি ও রাইকা শিশুদের পড়ানোর পরিকল্পনা করল। আনাস গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রয়োজন জানল। শান্তি পুরো দলের কাজের হিসাব রাখল। বায়জিদ সবাইকে একসঙ্গে রাখার দায়িত্ব নিল।

কিন্তু হঠাৎ একদিন বড় সমস্যা দেখা দিল।

তাদের তৈরি করা পরিকল্পনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ হারিয়ে গেল।

সবাই চিন্তায় পড়ে গেল।

তাজবিদ বলল,
“আমাদের এত দিনের পরিশ্রম কি তাহলে শেষ হয়ে যাবে?”

তাহমিদ বলল,
“না। যোগ্য মানুষ কখনো সমস্যাকে দেখে থেমে যায় না। সমস্যা আমাদের আরও শক্তিশালী করবে।”

তারা আবার নতুন করে কাজ শুরু করল।

সেই রাতে সবাই বুঝল—সাফল্য শুধু প্রতিভা দিয়ে আসে না। আসে ধৈর্য, সততা আর বারবার চেষ্টা করার মাধ্যমে।

আর সোনাঝুরি গ্রামের এই ছোট দল তখনও জানত না, তাদের এই ছোট উদ্যোগ একদিন পুরো এলাকার মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে…

(পর্ব ২)

সোনাঝুরি গ্রামের সেই ছোট দলটি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করল। আগের দিনের হারানো কাগজপত্র তাদের মন ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তারা বুঝেছিল—জীবনে বড় কিছু করতে গেলে বাধা আসবেই।

তাহমিদ সবাইকে বলল,

“আমরা যদি শুধু ভালো সময়েই চেষ্টা করি, তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ হয়ে থাকব। কিন্তু খারাপ সময়েও যদি চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমরা নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে পারব।”

বন্ধুরা আবার পরিকল্পনা তৈরি করল।

তারা একটি নিয়ম বানাল—
প্রতিদিন নতুন কিছু শিখবে, নিজের ভুল খুঁজে বের করবে এবং একে অপরকে সাহায্য করবে।

নতুন দিনের শুরু

সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তাহমিদ বই পড়ত। তাজবিদ গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে নিয়ে কাজের অনুশীলন করত। আবির কম্পিউটারে নতুন নতুন বিষয় শিখত। মিহি ও রাইকা ছোট শিশুদের পড়ানোর জন্য সহজ পদ্ধতি তৈরি করত।

আনাস একদিন বলল,

“আমরা যদি শুধু নিজেরা সফল হই, তাহলে সেই সফলতার মূল্য কম। আমাদের এমন সফল হতে হবে, যাতে অন্যরাও এগিয়ে যেতে পারে।”

তার কথা সবাইকে অনুপ্রাণিত করল।

আলম খানের শিক্ষা

একদিন আলম খান তাদের কাজ দেখতে এলেন।

তিনি দেখলেন, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মন দিয়ে কাজ করছে।

তিনি বললেন,

“আমি আগে ভাবতাম বড় কিছু করতে হলে বড় বয়স আর অনেক টাকা লাগে। কিন্তু তোমাদের দেখে বুঝলাম—আসল সম্পদ হলো জ্ঞান আর চেষ্টা।”

তাহমিদ হাসি দিয়ে বলল,

“আমরা এখনও শিখছি। আমরা চাই সবাই মিলে এগিয়ে যেতে।”

আলম খান তাদের কিছু বই দিলেন এবং বললেন,

“এই বইগুলো তোমাদের জ্ঞান বাড়াবে। মনে রেখো, যোগ্যতা অর্জন করতে হলে প্রতিদিন নিজেকে উন্নত করতে হয়।”

সাত্তার মিয়ার পরিবর্তন

সাত্তার মিয়া আগে তাদের স্বপ্ন নিয়ে হাসতেন। কিন্তু একদিন তিনি দেখলেন, বন্ধুরা গ্রামের এক দরিদ্র শিশুকে পড়াশোনায় সাহায্য করছে।

তিনি কাছে এসে বললেন,

“আমি তোমাদের ভুল বুঝেছিলাম। তোমরা শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য কাজ করছ।”

সাত্তার মিয়ার চোখে আনন্দের ছাপ দেখা গেল।

তিনি বললেন,

“আমার কাছে কিছু পুরোনো বই আছে। এগুলো তোমাদের শিক্ষা কেন্দ্রে দিয়ে দিচ্ছি।”

সবাই খুশি হলো।

প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি

প্রতিযোগিতার দিন যত কাছে আসতে লাগল, তাদের কাজের চাপও বাড়তে লাগল।

মালেক মোল্লা তাদের পরীক্ষা করার জন্য বললেন,

“তোমরা কি সত্যিই দায়িত্ব নিতে পারবে? কারণ বড় কাজ করতে হলে দায়িত্বশীল হতে হয়।”

শান্তি উত্তর দিল,

“আমরা জানি কাজ কঠিন। কিন্তু আমরা একা নই, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি।”

এই উত্তর শুনে মালেক মোল্লা সন্তুষ্ট হলেন।

তিনি বললেন,

“যে দলের মধ্যে বিশ্বাস থাকে, সেই দল অনেক দূর যেতে পারে।”

কাশেমের পরীক্ষা

কাশেম তাদের সামনে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ দিলেন।

তিনি বললেন,

“তোমাদের কাছে মাত্র সাত দিন সময়। এই সময়ের মধ্যে তোমাদের শিক্ষা কেন্দ্রের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করতে হবে।”

সবাই অবাক হয়ে গেল।

সাত দিন খুব কম সময়।

তাজবিদ বলল,

“আমরা চেষ্টা করব।”

কাজ শুরু হলো।

কেউ চেয়ার তৈরি করল, কেউ বই সাজাল, কেউ দেয়ালে শিক্ষামূলক লেখা লিখল।

রাইকা লিখল—

“যোগ্যতা জন্ম থেকে পাওয়া যায় না, যোগ্যতা তৈরি করতে হয়।”

মিহি লিখল—

“যে শেখে, সে এগিয়ে যায়।”

কঠিন মুহূর্ত

ষষ্ঠ দিনে প্রচণ্ড বৃষ্টি হলো। তাদের তৈরি করা কিছু জিনিস নষ্ট হয়ে গেল।

সবাই কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ল।

আবির বলল,

“এত কষ্টের পর আবার সব শুরু করতে হবে?”

তখন শান্তি বলল,

“ভেঙে যাওয়া জিনিস আবার তৈরি করা যায়। কিন্তু ভেঙে যাওয়া মন ঠিক করা কঠিন। তাই আগে মন শক্ত করি।”

সবাই আবার কাজে ফিরে গেল।

পরের দিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ একটি সুন্দর দৃশ্য দেখল।

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা, বড়রা, শিক্ষক—সবাই মিলে একটি শিক্ষা কেন্দ্র তৈরি করছে।

জামাল চাচা দূর থেকে দেখে বললেন,

“আজ তোমরা শুধু একটি ঘর বানাওনি। তোমরা মানুষের মনে আশা তৈরি করেছ।”

কিন্তু সামনে ছিল আরও বড় পরীক্ষা।

কারণ প্রতিযোগিতার বিচারকরা আসতে চলেছেন।

তারা কি পারবে সবাইকে নিজের যোগ্যতা দেখাতে?

সোনাঝুরি গ্রামের এই ছোট দলের আসল পরীক্ষা এখন শুরু…

Comments

    Please login to post comment. Login