Posts

নন ফিকশন

মোস্তাফা জিলানীর জীবনী পর্ব ৪

July 17, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

22
View

চতুর্থ পর্ব: কাদেরিয়া তরিকার বিকাশ, গ্রন্থ রচনা, ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও সমাজে গভীর প্রভাব (প্রায় ১১৩০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়)
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনের এই পর্যায়ে তাঁর প্রচার ও শিক্ষাদান পূর্ণতা লাভ করে। তিনি শুধু বক্তা হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মুরশিদ ও ইমাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই চতুর্থ পর্বে আমরা তাঁর তরিকার সংগঠিত রূপ, গ্রন্থ রচনা, ছাত্রদের বিস্তারিত প্রশিক্ষণ, সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাঁর প্রভাব এবং দৈনন্দিন জীবনের কর্মকাণ্ড বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করব। এটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে রচিত ১০০% নন-ফিকশন। পূর্ববর্তী পর্বগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখানে তাঁর জীবনের এই নির্দিষ্ট অধ্যায় তুলে ধরা হলো। পুরো জীবনী ১০টি পর্বে সমাপ্ত হবে, দশম পর্বে তাঁর ইন্তেকাল বর্ণিত হবে।
বাগদাদে প্রচার শুরুর পর আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত আধ্যাত্মিক তরিকা গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে কাদেরিয়া নামে খ্যাতি লাভ করে। তিনি ছাত্রদের বায়আত গ্রহণ করাতেন এবং তাদেরকে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রথমে শরীয়তের কঠোর অনুসরণ, তারপর তরিকতের অনুশীলন। তিনি বলতেন, “শরীয়ত ছাড়া তরিকত অন্ধ এবং তরিকত ছাড়া শরীয়ত পঙ্গু।” এই সমন্বয় তাঁর তরিকাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
তাঁর দরসে শত শত ছাত্র উপস্থিত থাকত। সকালবেলা তিনি মাদ্রাসায় হাদিসের শ্রেণি নিতেন। তিনি সহীহ বুখারী ও মুসলিমের ব্যাখ্যা করতেন এবং ছাত্রদেরকে সনদের গুরুত্ব বোঝাতেন। বিকেলে তাসাউফের দরস দিতেন। তিনি “ফুতুহুল গাইব” গ্রন্থের মতো বিষয়ে আলোচনা করতেন, যেখানে অদৃশ্যের রহস্য, অন্তরের অবস্থা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ বর্ণিত হয়েছে। তাঁর গ্রন্থসমূহ এই সময়কালে রচিত বা সংকলিত হয়। “আল-ফতহুর রাব্বানী” তাঁর ওয়াজ-নসিহতের সংকলন, যেখানে তিনি দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানের উপায় বলেছেন। “আল-গুনিয়া লি তালিবি তারিকিল হক” গ্রন্থে তিনি সাধকদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান সংকলন করেন।
তাঁর লেখনী সরল আরবিতে ছিল, যাতে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে। তিনি ছাত্রদেরকে গ্রন্থ লিখতে উৎসাহিত করতেন। অনেক ছাত্র তাঁর বক্তৃতা নোট করে পরবর্তীতে সংকলন করেছিল। এই গ্রন্থগুলো তাঁর মৃত্যুর পরও ছড়িয়ে পড়ে এবং কাদেরিয়া তরিকার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি “জিলাউল খাতির” এবং “সিররুল আসরার”-এর মতো গ্রন্থেও অবদান রাখেন, যেখানে হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক স্তরসমূহ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ছাত্রদের প্রশিক্ষণে তিনি ব্যক্তিগত মুরাকাবা ও জিকিরের উপর জোর দিতেন। প্রত্যেক শিষ্যকে নির্দিষ্ট জিকিরের আমল দিতেন। তিনি বলতেন, “জিকির হলো অন্তরের খাদ্য।” তিনি ছাত্রদেরকে রাত জেগে ইবাদত করতে উৎসাহিত করতেন এবং তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন। কোনো ছাত্র ভুল করলে তিনি স্নেহের সাথে সংশোধন করতেন। তাঁর মাদ্রাসায় দরিদ্র ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। তিনি নিজে তাদের সেবা করতেন।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁর কাছে আসত। ব্যবসায়ী, শাসক, সাধারণ শ্রমিক সকলেই তাঁর উপদেশ নিত। তিনি ধনীদেরকে দানশীলতার উপদেশ দিতেন এবং গরিবদেরকে ধৈর্য ধারণ করতে বলতেন। তাঁর প্রভাবে অনেক অসৎ লোক তওবা করে সৎপথে ফিরে আসে। তিনি বিশেষ করে যুবসমাজকে মাদক, জুয়া এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে বলতেন। তাঁর ওয়াজে হাজারো মানুষ ক্রন্দন করত এবং জীবন পরিবর্তন করত।
তৎকালীন বাগদাদে সামাজিক অবক্ষয় ছিল। তিনি মসজিদে মসজিদে ঘুরে সংশোধনমূলক বক্তৃতা দিতেন। তাঁর খ্যাতি ইরাকের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। সিরিয়া, পারস্য এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসত। তিনি তাদেরকে ফিরে গিয়ে স্থানীয়ভাবে দাওয়াত চালাতে বলতেন। এভাবে কাদেরিয়া তরিকা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে।
তাঁর দৈনন্দিন রুটিন ছিল অত্যন্ত নিয়মিত। ফজরের পর দরস, দুপুরে ছাত্রদের সাথে আলোচনা, বিকেলে ওয়াজ, রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত। তিনি কম খেতেন—সাধারণত রুটি, দুধ বা সবজি। ঘুম খুব কমাতেন। অবসর সময়ে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁর বাড়িতে সবসময় অতিথি থাকত। তিনি তাদের সেবা করতেন এবং উপদেশ দিতেন।
এই সময়ে তাঁর পরিবার বৃদ্ধি পায়। তাঁর পুত্র আবদুল রাজ্জাক (রহ.) তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তরিকা চালিয়ে যান। তিনি পরিবারের সদস্যদেরকেও একই নিয়মে চলতে বলতেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা তাঁর আদর্শ অনুসরণ করত।
তাঁর প্রভাব রাজদরবারেও পৌঁছায়। শাসকরা তাঁর কাছে উপদেশ চাইতেন। তিনি তাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রজাদের কল্যাণের কথা বলতেন। কিন্তু তিনি কখনো ক্ষমতার লোভ করেননি। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহর দাসত্ব।
এই পর্যায়ে তাঁর সিলসিলা অনেক শিষ্যের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ ভারত, আফ্রিকা পর্যন্ত যান এবং তরিকা প্রচার করেন। তিনি চিঠিপত্রের মাধ্যমে দূরের শিষ্যদের নির্দেশনা দিতেন। তাঁর চিঠিগুলো “খামসাতা আশারা মাকতুবান” নামে সংকলিত হয়েছে।
তাঁর শিক্ষায় জোর ছিল ইহসানের উপর—যেন আল্লাহকে দেখছেন এমনভাবে ইবাদত করা। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন, “আমল ছাড়া জ্ঞান অর্থহীন।” তিনি বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ স্থাপন করতেন। গরিবদের খাবার বিতরণ, অসুস্থদের সেবা, এসব তাঁর নিয়মিত কাজ ছিল।
বাগদাদের উলামা সমাজ তাঁকে সম্মান করতেন। তাঁর সাথে অনেক আলেম আলোচনা করতেন এবং তাঁর জ্ঞানের প্রশংসা করতেন। তিনি কখনো বিতর্কে জড়াতেন না, বরং ঐক্যের কথা বলতেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর স্বাস্থ্যও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরে চালিয়ে যান। তাঁর জীবন ছিল অবিরাম সেবা ও শিক্ষাদানের। এই পর্যায় তাঁকে “মুহিউদ্দিন” উপাধিতে ভূষিত করে, যা ধর্মের পুনরুজ্জীবনকারী অর্থ বহন করে।
তাঁর প্রভাবে সমাজে নৈতিক উন্নয়ন ঘটে। অনেকে তাঁর মাধ্যমে সঠিক পথ খুঁজে পায়। এই সময়কাল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কর্মময় অংশগুলোর একটি, যা পরবর্তী পর্বে আরও বিস্তৃত প্রভাবে রূপ নেয়।
 

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login