ষষ্ঠ পর্ব: পরিণত বয়সে প্রভাবের চূড়ান্ত বিস্তার, শিষ্যদের মাধ্যমে তরিকার প্রসার, নৈতিক সংস্কার এবং সমাজীয় নেতৃত্ব (প্রায় ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী বছরগুলো)
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবনের পরিণত বয়স ছিল তাঁর দাওয়াত ও শিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায়। এই ষষ্ঠ পর্বে আমরা তাঁর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তরিকার আরও বিস্তার, শিষ্যদের ভূমিকা, সমাজে নৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টা, বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা করব। এটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্রভিত্তিক নন-ফিকশন। পূর্ববর্তী পর্বগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে লেখা হয়েছে। পুরো জীবনী ১০টি পর্বে সমাপ্ত হবে এবং দশম পর্বে তাঁর ইন্তেকাল বর্ণিত হবে।
পরিণত বয়সে পৌঁছে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাগদাদকে কেন্দ্র করে তাঁর কার্যক্রম আরও সংগঠিত করেন। তাঁর বয়স তখন ৭০ এর কাছাকাছি। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও আধ্যাত্মিক শক্তি ও জ্ঞান ছিল অটুট। তিনি প্রতিদিন মাদ্রাসায় আসতেন এবং ছাত্রদের দরস দিতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর এখনো শক্তিশালী ছিল এবং হাজারো মানুষ তাঁর ওয়াজ শুনতে আসত। তিনি বিশেষ করে কুরআনের আয়াতসমূহের গভীর তাফসীর করতেন, যেখানে আধ্যাত্মিক অর্থের সাথে বাস্তব জীবনের সমন্বয় দেখাতেন।
কাদেরিয়া তরিকা এই সময়ে অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর শিষ্যরা ভারত উপমহাদেশ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলে গিয়ে তরিকা প্রচার করেন। তিনি শিষ্যদেরকে খিলাফত দিয়ে পাঠাতেন এবং নির্দেশ দিতেন যে, শরীয়ত মেনে চলতে হবে। তাঁর একজন বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন শেখ কাদিব আল-বান (রহ.), যিনি তরিকার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অনেক শিষ্য চিঠির মাধ্যমে তাঁর সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং উপদেশ নিতেন।
তিনি নৈতিক সংস্কারের উপর ব্যাপক জোর দেন। বাগদাদে অনেক অসৎ প্রথা প্রচলিত ছিল। তিনি মসজিদে মসজিদে গিয়ে লোকদেরকে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, “দুনিয়া অস্থায়ী, আখিরাতই চিরস্থায়ী।” তাঁর প্রচেষ্টায় অনেক ব্যবসায়ী অন্যায় বাণিজ্য ত্যাগ করে সৎ ব্যবসা শুরু করে। শাসকদেরকে তিনি ন্যায়বিচারের উপদেশ দিতেন। তাঁর প্রভাবে অনেক যুদ্ধবাজ নেতা শান্তির পথ বেছে নেন।
তাঁর গ্রন্থসমূহ এই সময়ে আরও বেশি প্রচারিত হয়। “আল-ফুয়ুদাত আল-রাব্বানিয়া” এবং অন্যান্য গ্রন্থে তিনি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি লিখতেন যে, সাধকের জীবন হওয়া উচিত সরল এবং আল্লাহমুখী। ছাত্ররা এই গ্রন্থগুলো কপি করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যেত। এতে তাঁর শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর দৈনন্দিন জীবনে তিনি এখনো গরিবদের সেবা করতেন। তাঁর বাড়িতে লঙ্গরখানা চালু ছিল, যেখানে দরিদ্ররা খাবার পেত। তিনি নিজ হাতে তাদের খাবার বিতরণ করতেন। অসুস্থদের দেখতে যেতেন এবং দোয়া করতেন। তাঁর উদারতা ছিল অসীম। যদি কেউ সাহায্য চাইত, তিনি যতটুকু পারতেন দিতেন।
পরিবারের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল আদর্শ। তিনি সন্তানদেরকে শিক্ষা দিতেন এবং তাদেরকে তরিকার উত্তরাধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতেন। আবদুল রাজ্জাক (রহ.) তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তিনি পরিবারকে বলতেন, “দুনিয়ার লোভ ত্যাগ করো।”
এই সময়ে তিনি আরও বেশি করে খলওয়াতে সময় কাটাতেন। যদিও বয়স হয়েছিল, তবু রাতের অনেকটা সময় তিনি নামাজ ও জিকিরে কাটাতেন। তাঁর শিষ্যরা বলতেন, তাঁর অন্তর সবসময় আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকত।
তাঁর প্রভাব রাজনৈতিক নেতাদের উপরও পড়ে। সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর মতো নেতা তাঁর উপদেশ মেনে চলতেন। তিনি তাদেরকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে বলতেন এবং ন্যায়ের পথে থাকতে উপদেশ দিতেন। তবে তিনি নিজে কোনো সামরিক কার্যক্রমে জড়াননি।
বাগদাদের বাইরে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে অনেকে তাঁকে দেখতে আসত। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন এবং ফিরে যেতে বলতেন। এভাবে তাঁর দাওয়াতের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়। তরিকার শাখা বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠে।
তিনি সবসময় বলতেন, “আমি শুধু আল্লাহর বান্দা।” তিনি কখনো নিজেকে বড় মনে করতেন না। এই বিনয় তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে। মানুষ তাঁর কাছে সমস্যার সমাধান চাইত এবং তিনি ধৈর্যের সাথে শুনে উপদেশ দিতেন।
এই পর্যায়ে তাঁর স্বাস্থ্য কিছুটা খারাপ হয়, কিন্তু তিনি কাজ থামাননি। তিনি ছাত্রদেরকে বলতেন, “জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইলম শেখাও।” তাঁর এই কর্মনিষ্ঠা ছাত্রদেরকে অনুপ্রাণিত করত।
তাঁর শিক্ষা ছিল ব্যাপক। তিনি ফিকহ, হাদিস, তাফসীরের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতা শেখাতেন। তাঁর ছাত্ররা পরবর্তীকালে বড় বড় আলেম হন। এভাবে তাঁর উত্তরাধিকার চলতে থাকে।
এই সময়কাল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে তিনি তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রেখে যান। তাঁর প্রভাব শতাব্দী ধরে চলতে থাকে।
🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
