Posts

চিন্তা

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা সভ্যতার সামাজিক প্রতিষেধক

July 20, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

24
View

বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ উপলক্ষে সারাদেশে খিচুড়ি উৎসব হয়েছে। আনন্দ করতে করতে খেলা দেখা শুরু করে বিয়োগান্তক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সেই আনন্দের নাস্তি হয়েছে। এই যে ট্রাজেডি -এটি আমাদের মনে ক্যাথারসিস তথা বিমোক্ষণ ঘটায়। এটা আমাদের কথা নয় -মহামতি অ্যারিস্টটল বলেছেন। মনের ভেতর জমে থাকা ভয়, রাগ, দুঃখ বা ক্ষোভের মতো প্রবল নেতিবাচক আবেগগুলোকে কোনো বিশেষ উপায়ে বের করে দিয়ে মানসিক শান্তি বা ভারমুক্তি লাভ করার প্রক্রিয়া তথা শুদ্ধিকরণের দরকার আছে।

যে মানুষটি ভেবে নিয়েছিল তার সমর্থিত আর্জেন্টিনা অজেয় -সে দেখল যে না, মাটিতেই পা রাখতে হবে। ব্রাজিল সাপোর্টার যে মনে মনে চাইছিল তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল আর্জেন্টিনার বিপক্ষ স্পেন জিতে যাক -তারা অনেকদিন পর বিশাল আনন্দের ভাগিদার হলো। এই যে উত্থান-পতন, আনন্দ-বিষাদ; মানুষের জীবনে এই আবেগ অনুভূতির দরকার আছে। গেল একমাস সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনজুড়ে খেলাধুলা নিয়ে আলাপচারিতা সবচেয়ে বেশি ছিল। এবং মানুষের মনোসংযোগ বিশুদ্ধ বিনোদনে বুঁদ হয়েছিল। একে অপরকে ট্রল করেছে বটে -কিন্তু সেটা স্থায়ী ঘৃণা উদ্রেককারী নয়; বরং আজ সবাই স্বাভাবিক -সেই আগের মতো।

প্রতি বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের পছন্দের দল নিয়ে আনন্দ করে, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, পতাকা টাঙায়, রাত জেগে খেলা দেখে। এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু প্রতি আসরেই প্রতিক্রিয়াশীল একদল মানুষ এই আনন্দকে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কখনও বলা হয় ফুটবল হারাম, কখনও বলা হয় অন্য দেশের দল সমর্থন করা হারাম, কখনও পতাকা টাঙানোকে ধর্মবিরোধী বলা হয়। কোথাও কোথাও বড় পর্দায় খেলা দেখানোর বিরোধিতাও করা হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে -মানুষের স্বাভাবিক বিনোদনের জায়গাগুলো যদি সংকুচিত করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণ হবে কী করে?
সমাজবিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বলছে, মানুষের অবসর, বিনোদন ও খেলাধুলা কেবল আনন্দের বিষয় নয়; এগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। তরুণদের শক্তি ও আবেগ যদি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিল্প কিংবা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত না হয়, তবে সেই শক্তি খুব সহজেই সহিংসতা, মাদক, উগ্রবাদ কিংবা অপরাধের দিকে মোড় নিতে পারে।

বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অনেকটা এমনই। রাতভর চায়ের দোকানে, ক্যাম্পাসে, মহল্লায়, ক্লাবে, পারিবারিক আড্ডায় মানুষ খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু তা প্রতীকী; সংঘাত নয়, প্রতিযোগিতা। অনেক তরুণ, যারা অন্য সময় উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় কাটায়, তারাও খেলা বিশ্লেষণ, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা ম্যাচ আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সামাজিক সম্পৃক্ততা অপরাধের সুযোগ ও আকর্ষণ -দুটিই কমাতে পারে। বাংলাদেশেও নিশ্চিত গেল দেড়মাস অন্যসময়ের তুলনায় অপরাধপ্রবণতা কম ছিল।

ফুটবল বা অপরাপর ক্রীড়াশৈলী আসলে মানুষের আদিম প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তিকে সভ্যতার নিয়মে পরিচালিত করে। যুদ্ধের বদলে খেলা, ঘৃণার বদলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অস্ত্রের বদলে বল -এটাই আধুনিক ক্রীড়া সংস্কৃতির দর্শন। একটি ম্যাচে মানুষ হার-জিতের আবেগ অনুভব করে, কিন্তু ম্যাচ শেষ হলে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোর শিক্ষা পায়। এই শিক্ষাই গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি -মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহাবস্থানও থাকবে।

বিশ্বসভ্যতার দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। অলিম্পিক, বিশ্বকাপ কিংবা মহাদেশীয় প্রতিযোগিতাগুলো কেবল ক্রীড়া আসর নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেও খেলাধুলা বহুবার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। তাই খেলাধুলাকে অনেক গবেষক 'সফট পাওয়ার' এবং 'পিস বিল্ডিং'-এর কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন।

যে সমাজ তরুণদের হাতে বই, বল, বাদ্যযন্ত্র কিংবা তুলি তুলে দেয়, সেই সমাজ সাধারণত উগ্রবাদীদের জন্য কম উর্বর হয়। কারণ উগ্রবাদ বেড়ে ওঠে একাকীত্ব, বঞ্চনা, ক্ষোভ ও সংকীর্ণ পরিচয়ের রাজনীতির ভেতর; আর খেলাধুলা শেখায় দলগত পরিচয়, নিয়ম মানা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম সম্মান।

তাই ফুটবলকে হারাম বা অপরাধের উৎস হিসেবে দেখার আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত -মানুষের আনন্দ, উৎসব ও সামাজিক সম্পৃক্ততার বিকল্প কী? যদি সেই বিকল্প কেবল নিষেধ, ভয় এবং সংকীর্ণতার ভাষা হয়, তবে সমাজ কখনোই মানবিক হবে না; বরং আরও বিচ্ছিন্ন হবে।

একটি সুস্থ রাষ্ট্র শুধু আইন দিয়ে অপরাধ কমায় না; মানুষের জীবনে আনন্দের বৈধ ও নিরাপদ ক্ষেত্রও তৈরি করে। ফুটবল সেই ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম। যে তরুণ রাত জেগে বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখে, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, প্রিয় দলের জার্সি পরে উল্লাস করে, লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, এমবাপে, ইয়ামালদের আইডল মানে -সে অন্তত সেই সময়টুকু ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করছে না। সব সমস্যার সমাধান ফুটবল নয়, কিন্তু সুস্থ বিনোদন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি -একটি মানবিক, সহনশীল এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অপরিহার্য উপাদান। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে আমরা নির্দ্বিধায় সভ্যতার সামাজিক প্রতিষেধক বলতে পারি।

তাই বিশ্বসভ্যতাকে আরও শান্তিপূর্ণ করতে খেলাধুলাকে সংকুচিত নয়, বরং আরও বিস্তৃত করা দরকার। ব্যাপক পরিসরে পাড়া-মহল্লায় খেলারমাঠ গড়ে তোলা দরকার। আমরা সামষ্টিক মানুষ এটা আর কবে বুঝব?

লেখক: সাংবাদিক 
২০ জুলাই‌ ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login