Article

অপ্রতিমের অকাল প্রয়াণ: আমাদের শিশুদের এমন করুণ পথ কে গড়ে দিল!

September 19, 2026

36
View

মানুষের পৃথিবীতে সন্তান হলো ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠতম আশীর্বাদ। ১৩৮০ কোটি বয়সী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আমাদের নীলগ্রহ পৃথিবীর বয়স ৪৫৪ কোটি বছর। এরমধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হোমো স্যাপিয়েন্স তথা মানবপ্রজাতির বয়স ৩ লক্ষ বছর। যে মানুষ ৩ লাখ বছর ধরে তার পূর্বপুরুষের জিন বয়ে চলেছে, যেই মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ক্রমবর্ধমান এই universe কিংবা cosmosকে চিনে নিচ্ছে -সেই মানুষের মর্তবা সবার উপরে রেখেছেন মহামহিম ঈশ্বর। মায়ের উদর থেকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত নিজের প্রিয়তর সন্তানকে কত যত্ন, আদর, আহ্লাদই না করেন বাবা মা। ও বাবা মা যদি চোখের সামনে দেখেন তার অল্পবয়সী কোমলমতি শিশুটি অপঘাতে প্রাণ হারিয়ে ফেলল -কেমন লাগে তার? পুরো আকাশ মাথায় ভেঙে পড়ে না? পৃথিবীর তাবৎ মেঘ কারুণ্যের বৃষ্টি হয়ে ঝড়ে না?

কী দোষ ছিল শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের? কেন তার প্রাণ এভাবে অকালে কেড়ে নেবে সমাজচ্যুত পতিত পাবনেরা? এর পেছনে কি কেবলই একটা আইফোনের লোভ? নাকি ভেঙে পড়া সমাজবাস্তবতার অমোঘ উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া?

অপ্রতিমের দুঃখী মা বাবা কী নিয়ে বাঁচবে এখন? কোন আশায় সন্তানহারা পৃথিবীর আলো বাতাস একাকী গ্রহণ করে ফুল, পাখি, লতাপাতা, হেমন্তে প্রভাত সূর্যের বিপরীতে দুর্বাঘাস কিংবা মাকড়সা জালে শিশিরের অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করবে? জলহীন লাউয়ের ডগার মতো নুইয়ে পড়া জীবনকে কী জবাব দেবে ওরা?

এইদেশে যবে থেকে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া সহজলভ্য হয়ে গেছে এবং যবে থেকে ইয়াবা বদির মতো মানবতাবিরোধীরা আইনপ্রণেতার চেয়ারে বসে গেছে; ঠিক তবে থেকেই এই জাতির চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত হয়ে গেছে। বদিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশজুড়ে ইয়াবা ছড়িয়ে দিয়েছে। আর মূর্খ, অশিক্ষিত ও বোধহীন ইয়াবাখোরেরা ইন্টারনেট থেকে বিচিত্রসব অপরাধপ্রবণতা রপ্ত করে নিয়েছে।

খেয়াল করলেই দেখবেন আপনার আমার সন্তান পরিবারের স্বজনদের সাথে খোলামেলা কোনো কথা বলে না। মা-বাবা মোবাইলে স্ক্রল করতে থাকে। আর ছেলেমেয়েরাও মাথানিচু করে গেম খেলতে থাকে। এরমধ্যে ছেলেশিশুরা বয়োসন্ধিতে পৌঁছানোর আগেই দুষ্ট বন্ধুর পাল্লায় পড়ে ইয়াবা-গাঁজাসহ বিচিত্র মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। ক্লাস ফাইভে উঠার আগেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের জৈবিক সম্পর্কের আদ্যোপান্ত শিখে ফেলে শিশু ও কিশোরেরা।

এই শিশুরা আর আপনার ভালোবাসার কাঙ্গাল থাকে না। ওরা বিকৃত আনন্দ পায় মোবাইল স্ক্রিন আর বন্ধু সমভিব্যাহারে। পিতা ও মাতার প্রেমময় অভিভাবকত্বের সাথে ঠিক এভাবেই সন্তানের বাঁধন কেটে গেছে। এর সর্বশেষ ও সবিশেষ করুণ পরিণতি দেখতে পেলাম কুমিল্লার লালমাই সানন্দা পাহাড়ে। শিশু অপ্রতিমের নিথর দেহ। বন্ধু অথবা এলাকার বড় ভাইয়েরা ছলচাতুরি করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে অপ্রতিমের প্রাণপাখিটা কেড়ে নিয়ে নিশ্চিত বুনোউল্লাসে মেতেছিল। খুনিরা না জানে বিচারের পরিণতি, না শিখেছে জীবনবোধ। এরমধ্যে যদি ওরা নেশাগ্রস্ত হয়ে থাকে -তাহলে তো কথাই নেই। সমস্ত শুভবোধ ও হিতাহিত জ্ঞান খেয়ে নিয়েছিল বিষের বড়ি ইয়াবা।

আপনি এখন এর জন্য কাকে দায়ী করবেন? এই রাষ্ট্রকে? এই সরকারকে? রাষ্ট্র বা সরকার তো নিজে কিছু না। আমাকে আপনাকে ছাড়া তো তার কোনোই অস্তিত্ব নাই। আমরা পাকিস্তান বা ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস সবাই জানি ওদিকে তাই যাব না। পঞ্চান্ন বছরের বাংলাদেশে কোনো শাসকেরাই কি এইদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। একজন আরেকজনকে রাজনৈতিক শত্রু বানাতে গিয়েই সময় পার করেছেন। কেউ কাউকে ভালোবাসা, সহমর্মিতা বা মহানুভবতার গল্প শোনান নাই। এখানে পালে পালে সংখ্যায় দ্বিপদ প্রাণী বেড়েছে কেবল। মানুষ করে গড়ে তুলবার দায়িত্ব কেউই নেননি।

এতটা ধর্মান্ধ, বিজ্ঞাবিমুখ, সংস্কৃতি বিরোধী জাতি পৃথিবীতে আরেকটা নাই বলেই অনুমান করি। সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে কেবলমাত্র বাণিজ্যিক চিন্তায় আগাছার মতো ধর্মীয় শিক্ষালয় গড়ে তোলা হচ্ছে যত্রতত্র। অথচ শিক্ষার প্রধানতম শর্ত হওয়া উচিত ছিল সর্বজনে প্রেম এবং সার্বিক সেবা। প্রকান্তরে হচ্ছেটা কি ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে অসৎ উপার্জনে বড়লোক হওয়া মানুষের দানখয়রাতে ফুলেফেঁপে উঠা এসব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন হয়ে উঠেছে pedophile ও pederasty'র বড় আখড়া। যেখানে রোজরাতে সম্ভ্রম হারানো শিশুদের আর্তনাদ আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠে।

অনিয়ন্ত্রণের সুযোগে unproductive ধর্মগুরুতে ভরে উঠছে সমাজ। এই ধর্মগুরুরা কনসার্ট, গান-বাজনা, নৌকাবাইচ, খেলাধুলা ও দেশজ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যতটা গলা চড়াচ্ছে, পক্ষান্তরে ঠিক ততটাই নিরব থাকছে ইয়াবা, কিশোর অপরাধ, ছেলেশিশু ধ'র্ষণসহ ইত্যাকার সমস্ত অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে।

দেশের বিবদমান রাজনীতি ব্যক্তি মানুষকে বুদ্ধিদীপ্ত, মননশীল ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে না। এই জাতির দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই একমুখী শিক্ষানীতি নাই। অপরাধীদের কাছ থেকে অনুদান ভিক্ষা করে চলা ধর্মগুরুরা সামজিক অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে একটা ওয়াজও করেন না -কার্যত এই দেশের মানুষ দিশাহীন উন্মাদে পরিণত হচ্ছে দিন দিন। কথায় কথায় তেতে উঠে যে কাউকে যখন তখন মেরে ফেলছে। আজকের দিনেই খুলনায় ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে আজমুল হোসেন নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে তার হোস্টেলের সতীর্থরা পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলেছে।

পুলিশের হিসাবেই হাজারো শিশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। প্রায়ই জানা যাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্ররা শিশুদের চুরি করে নিয়ে হাত পা কেটে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামাচ্ছে। এই সমাজে এখানে অমানুষ যেমন বেড়েছে তেমনি পাল্লা দিয়ে মহাসড়কে বাড়ছে ব্যাটারি রিকশা। রাস্তার ধারের একজন ক্ষুদ্র দোকানদার গাড়ি বাননোর মতো জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং করছে। রোজই ওসব গাড়ির ধাক্কায় মানুষ মারা পড়ছে। প্রাণঘাতি ভাইরাসের মতো ওই গাড়ি বন্ধ করা কেন যায় না? কারণ মহাসড়কে ওই গাড়ি চলতে দিয়ে কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে ক্ষমতার কাছে থাকা কয়েকটি চক্র।

সুতরাং এইদেশে ভালো কিছু আশা করা পাপ। আপনি আমি গুড প্যারেন্টিং করতে পারব না। সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মেশে -সেটি হয়ত মনিটর করতে পারব না। এরমধ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া অর্থগৃধ্নু অমানুষেরা সারাদেশে ইয়াবার সরবরাহ চেইন ঠিক রাখবে। আমাদের শিক্ষার উন্নয়ন দিয়ে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন থেকে শিশুদেরকে বাইরে রাখতে পারব না। গোঁড়ামি ও মূর্খতা ঘোচাতে পারব না। মানুষকে কাজে ব্যস্ত রাখতে পারব না। এমন বিশৃঙ্খল ও উদ্ভট এক জাতির শেষ পরিণতি হলো নিজেরাই নিজেদেরকে নিঃশেষ করে দেবে। সেই প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গমাইল এলাকায় ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জনসংখ্যা সীমিত হয়ে আসলে হয়ত এই জাতি রক্ষা পাবে।

তার আগ পর্যন্ত আমরা সবাই একেকজন অপ্রতিমের বাবা মা। ক্রমাগত ক্রন্দনই আমাদের ট্রাজিক নিয়তি।

ফুটনোটস:

এমন বিয়োগান্তক দিনে এখনো যারা অপ্রতিমের মায়ের রাজনৈতিক অতীত ঘেটে একটা নিষ্পাপ দেবশিশুর ন্যাক্কারজনক খুনকে জাস্টিফাইড করছেন -তাদের ধিক্কার জানাই আর প্রার্থনা করি আপনাদের জীবনে যেন কখনো এমন দিন না আসে। শত্রুর জন্যও ফিলানথ্রোপিস্ট আমরা এতটুকু বদ দোয়া করি না।

লেখক: সাংবাদিক

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

#অপ্রতিম

Comments

    Please login to post comment. Login