সাতক্ষীরার এক সংসদ সদস্যকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এআই-নির্মিত নয় -এমন দাবি করেছে জামায়াত-ঘরানার গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট এবং ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। সুতরাং, এই ভিডিওকে এআই-জেনারেটেড বলে চালানোর সুযোগ আপাতত খুবই সীমিত। বরং অমন অভিযোগে স্থির থাকলে আপনাদের ধর্মীয় অনুভূতির মতো এআই অনুভূতিও ভীষণভাবে আঘাত খেতে পারে।
ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর দাবি করা হয়েছে, সেখানে থাকা অল্পবয়সী নারী ওই এমপির স্ত্রী। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে এখনও ভিন্নমত ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কাজেই চূড়ান্ত সত্য কী, সেটি প্রমাণ ও তথ্যের ওপরই নির্ভর করবে।
গণমাধ্যমের জানা উচিত ইসলামিজমের নামে মুতা বিয়ে বলে একটি টার্ম সুবিধাবাদীরা চালু রেখেছে। এমপি সাহেবের মতো ৫০১ মতাদর্শে বিলিভাররা যেকোনো সময় যেকোনো নারীকে মুখের কথায় বিয়ে করতে পারেন। আবার অ্যামিউজমেন্ট শেষে পরিস্থিতি বদলালে মুখের কথায় তালাকও দিতে পারেন।
এসবের সাথে ধর্মের মৌল স্পিরিটের কোনো সম্পর্ক নাই।
এখন আপনি রাষ্ট্রীয় নিয়মমাফিক বিয়ের কাবিননামা পান বা না পান -দুইজন সমভিব্যাহারেই যেহেতু বলছেন তারা দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেছেন -আপনাকে ওটাতেই থাকতে হবে।
কিন্তু এই ঘটনায় আসল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ যদি পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যক্তিগত পরিসরে সময় কাটান, সেটি নৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে; কিন্তু সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফৌজদারি অপরাধ হয়ে যায় না। আধুনিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও অপরাধ -এই দুটি বিষয় এক নয়। প্রেমহীন দাম্পত্যে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক যেমন অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, তেমনি সম্মতিপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেবল কারও অপছন্দের কারণে অপরাধে পরিণত হয় না।
এখন আসা যাক আইনপ্রণেতার প্রসঙ্গে। একজন সংসদ সদস্য কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন ও জনআস্থার প্রতিনিধি। তাই তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও নৈতিক প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায়, যেখানে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নানা গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও বছরের পর বছর জনজীবনে প্রভাবশালী থাকেন, এমপি হতে পারেন -সেখানে একলা গাজী নজরুল ইসলামের ওপর দায় চাপাই কেমনে?
বাংলাদেশের পেনাল কোড-১৮৬০-এর আলোকে, প্রাপ্তবয়স্ক দুই ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় সম্পর্ক স্থাপন করেন, তাহলে শুধুমাত্র সেই কারণে সেটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ নয়। কিন্তু যদি সেখানে ধর্ষণ, জবরদস্তি, প্রতারণা, মানবপাচার, অপ্রাপ্তবয়স্কের সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো অপরাধের উপাদান থাকে, তখন বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আরেকটি বিষয় যেন আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে না যাই।
একজন মানুষের ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ মুহূর্ত গোপনে ধারণ করা, অথবা তাঁর সম্মতি ছাড়া সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া -এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার গুরুতর লঙ্ঘন। এমন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা অ্যাক্টসহ প্রচলিত অন্যান্য আইনের অধীনেও অপরাধের প্রশ্ন তুলতে পারে। ন্যায়বিচারের পথ আদালত; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনতার আদালত কখনোই নয়।
আমরা ঠিক কার বিচার করব? দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যারা দাবি করছেন তাঁদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক সম্মতির -তাদের? নাকি সেই মানুষগুলোর, যারা অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি দিয়ে, গোপনে ধারণ করা অন্তরঙ্গ মুহূর্তকে জনসমক্ষে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের নৈতিকতার পতাকা ওড়াতে চান?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় শুধু কে কী করেছে, তা দিয়ে নয়; বরং অন্যের মর্যাদা, গোপনীয়তা ও আইনের শাসনকে সে কতটা সম্মান করে, তা দিয়েও। আইনপ্রণেতাকেও দেশের প্রচলিত আইন দেখান। আর আমরাও আইনের আওতায় থাকি। পারস্পরিক নৈতিকতা তো এটাই।
লেখক: সাংবাদিক
২১ জুলাই ২০২৬