Story

প্রাণের প্রতি মায়া

July 24, 2026

Original Author মোঃ আবু হানিফ

311 views



জীবন একটাই—তাকে ভালোবাসো। জীবন—স্রষ্টার সবচেয়ে নীরব ও  মহামূল্যবান উপহার। যে প্রাণ এই পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলে, সে আর নিভে যেতে চায় না। অস্তিত্বের গভীরে তখন জেগে ওঠে এক অনির্বচনীয় আকুতি—আরও একটু বাঁচি, আরও একটু আলো দেখি, আরও কিছুক্ষণ এই অনন্ত সৃষ্টির সান্নিধ্যে থাকি। প্রাণের কোনো ভাষা নেই, তবু তার বিনীত আহ্বান আছে। প্রাণের কোনো বর্ণ, জাত, ধর্ম কিংবা সীমারেখা নেই, তবু তার অস্তিত্ব সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিটি কোণায় বিস্তৃত। যে হৃদয় অনুভব করতে জানে - প্রাণের কান্না কখনো শব্দে ঝরে না; ঝরে নিঃশব্দ কম্পনে, অদৃশ্য আর্তনাদে, অস্তিত্বের গভীরতম স্পন্দনে। কারও কণ্ঠস্বর উচ্চ, কারও নীরব; কেউ নিজের ব্যথা ভাষায় প্রকাশ করে, কেউ কেবল চোখের গভীরতায় লুকিয়ে রাখে। কিন্তু অনুভূতির কোনো ভাষা নেই। মৃত্যুর ভয়ে সব হৃদয়েরই স্পন্দন এক হয়ে যায়; বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় সব প্রাণেরই আর্তনাদ একই সুরে প্রতিধ্বনিত হয়। অথচ কত সহজেই আমরা ভুলে যাই—জীবন কেবল আমার নয়। 

এই পৃথিবী যেন এক বিশাল প্রাণমন্দির। এখানে প্রতিটি স্পন্দন অন্য একটি স্পন্দনের সঙ্গে অদৃশ্য সেতুবন্ধনে আবদ্ধ। একটি প্রাণের আনন্দ নিঃশব্দে অন্য প্রাণের আকাশে আলো ছড়ায়, আবার একটি প্রাণের যন্ত্রণা অদৃশ্য ঢেউ হয়ে সমগ্র সৃষ্টির বুক স্পর্শ করে যায়, যা  আমরা হয়তো দেখতে পাই না। কিন্তু অনুভব করতে জানলে বোঝা যায়—সৃষ্টির কোথাও কোনো প্রাণ একা নয়। প্রকৃতি কখনো বৈষম্য শেখায় না। সূর্যের আলো কারও জন্য আলাদা নয়, বাতাস কোনো পরিচয় জিজ্ঞেস করে না, বৃষ্টির ফোঁটা বেছে বেছে ঝরে না। আকাশ তার নীল বিস্তার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখে। অথচ মানুষ কখনো কখনো নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে ভুলে যায়—সে-ও এই অসীম প্রাণপ্রবাহের একটি ক্ষুদ্র প্রাণীমাত্র।

মানুষ সভ্য হয়েছে, জ্ঞান অর্জন করেছে, নক্ষত্রের দূরত্ব মেপেছে, সমুদ্রের গভীরতা জেনেছে। অথচ অনেক সময় সে ভুলে যায়, সভ্যতার প্রকৃত উচ্চতা শক্তিতে নয়—মমতায়। যে শক্তি রক্ষা করে না, সে শক্তি কেবল ভয়ের জন্ম দেয়; কিন্তু যে মমতা একটি প্রাণের অস্তিত্বকে সম্মান করতে শেখায়, সেই মমতাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। কত অদ্ভুত আমাদের এই জীবন! নিজের বেদনাকে আমরা গভীরভাবে অনুভব করি, কিন্তু অন্যের নীরব যন্ত্রণার সামনে প্রায়ই নির্বিকার। অথচ ব্যথার কোনো আলাদা অভিধান নেই। মৃত্যুভয়েরও কোনো ভিন্ন ব্যাকরণ নেই। প্রতিটি প্রাণ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তার সমগ্র অস্তিত্বই নিঃশব্দে জীবনের পক্ষেই প্রার্থনা করে। সেই প্রার্থনার কোনো ভাষা নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো জাত নেই। অথচ আছে শুধু বাঁচার আকুতি, সেই আকুতিই পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর বেদনাবিধুর আর্তনাদ। প্রকৃতি প্রতিদিন আমাদের এই পাঠই শেখায়। আলো যখন উদিত হয়, সে কাউকে আলাদা করে ডাকে না। বাতাস যখন প্রবাহিত হয়, সে কোনো পরিচয় জানতে চায় না। বৃষ্টি যখন ঝরে, তার করুণা সমানভাবে ছুঁয়ে যায় তার সমগ্র  অস্তিত্বকে। সৃষ্টি কখনো বিভাজন শেখায় না; বিভাজন জন্ম নেয় আমাদের অহংকার ও সংকীর্ণতায়।

মায়া আসলে দুর্বলতার নাম নয়; মায়া হলো চেতনার সর্বোচ্চ পরিণতি ও বিবেকের সৌন্দর্য। যে হৃদয় অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখে, সেখানে অহংকারের কোন স্থান বা ধ্বংসের উল্লাস থাকে না। সেখানে থাকে শুধু একটি নীরব উপলব্ধি—আমরা একা নই; অসংখ্য প্রাণের অস্তিত্বের মমতায় আমরা জড়িয়ে আছি। পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য বিশাল কোনো বিপ্লবের প্রয়োজন নেই,  প্রয়োজন শুধু একটি কোমল হৃদয়ের। এমন একটি হৃদয়, যা নিজের আনন্দের জন্য অন্যের বেদনা রচনা করে না; নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের জীবনকে তুচ্ছ করে না; নিজের শক্তির অহংকারে কোনো দুর্বল স্পন্দনকে স্তব্ধ করে দিতে চায় না। একটি প্রাণ নিভে যাওয়া মানে শুধু একটি জীবন শেষ হওয়া নয়; যেন সৃষ্টির মহাকাব্য থেকে এক একটি অক্ষর চিরদিনের জন্য মুছে যাওয়া। একটি স্পন্দন থেমে যাওয়া মানে মহাবিশ্বের অদৃশ্য সুরে একটি নীরব বিরতি নেমে আসা। হয়তো পৃথিবী তার চলার পথ থামায় না, কিন্তু করুণ ইতিহাসে সেই ক্ষতি চিরকাল অমোচনীয় থেকে যায়।

একদিন আমাদের এই প্রাণের অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে থাকবে কি না? জানা নেই। কিন্তু সময় আমাদের নাম ধুয়ে নিয়ে যাবে, পরিচয় মুছে দেবে, অর্জনের স্মারক ধূলায় ঢেকে যাবে। কিন্তু একটি বিষয় থেকে যাবে—আমাদের হৃদয় কতখানি মমতাময় মায়ায় ভরপুর ছিল। আমাদের কারণে কোনো প্রাণ ভয় পেয়েছিল, নাকি আশ্রয় পেয়েছিল; কোনো স্পন্দন নিভে গিয়েছিল, নাকি নতুন করে বাঁচার সাহস যোগিয়েছিল—ইতিহাসের অদৃশ্য পাতায় লেখা থাকবে কেবল সেই মহামানবেরই নাম। কারণ প্রাণের মূল্য কখনো পরিচয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রাণের মূল্য নির্ধারিত হয় স্রষ্টার সেই নিঃশব্দ উপহারে। প্রাণের প্রতি মায়াই হলো মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়। "প্রাণকে ভালোবাসা কোনো দয়া নয়; এটি সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। যে হৃদয় সকল প্রাণের স্পন্দন শুনতে শেখে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত মানবতার মন্দির।"

জীবন আমাদের এটাই শিক্ষা দেয়—প্রাণকে ভালোবাসো। শুধু নিজের প্রাণকে নয়, সমগ্র সৃষ্টির প্রাণকে। কারণ প্রতিটি স্পন্দন স্রষ্টারই অর্পণ, প্রতিটি শ্বাস তাঁরই আমানত, প্রতিটি জীবন তাঁরই নিঃশব্দ অলৌকিকতা। যেদিন মানুষের হৃদয়ে এই উপলব্ধি সত্য হয়ে উঠবে, সেদিন পৃথিবী আর শুধু মানুষের বাসস্থান থাকবে না; সে হয়ে উঠবে মমতার এক অনন্ত আশ্রায়ন যেখানে প্রতিটি প্রাণ নিরাপদে বলতে পারবে—এই পৃথিবী আমারও।

-- আবু হানিফ --

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login