শেষ চিঠিটা কবে এসেছিল, মনে নেই। অনেক বছর পর পুরোনো জিনিসপত্র গোছাতে গিয়ে বাক্সে পাওয়া গেল। কাগজগুলো হলুদ হয়ে গেছে। কালির রং ফিকে হয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও অক্ষর মুছে গেছে সময়ের আর্দ্রতায়। স্মৃতিগুলো আওড়াতেই চোখের কোণে কখন যে জল জমেছে, অনুভব করতে পারিনি। কিছু মানুষকে না দেখেও আপন করে নেওয়া যায়। জীবনে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না; তারা শুধু থেকে যায়; কাছে না থেকেও খুব কাছে। কিছু বন্ধুত্ব তৈরি হয় কাগজের পাতায়, অপেক্ষার প্রহরে, আর অক্ষরের সেতুবন্ধনে জন্ম নেয় এক মায়াময় পত্রমিতালী।
ক্যালেন্ডারের পাতায় নব্বই দশকের আনাগোনা। এ এক এমন সময়, যখন মানুষের ব্যস্ততা মাপা হতো ঘড়ির কাঁটায় নয়, বরং ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার আওয়াজে। দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক দেশ কিংবা বিচিত্রার শেষ পাতায় তখন ছোট ছোট অক্ষরে কিছু নাম আর ঠিকানা ছাপা হতো। নিচে লেখা থাকত; “পত্রমিতালী করিতে ইচ্ছুক।” ঠিকানাগুলো যেন একেকটি অচেনা শহরের সুবাস নিয়ে আসত। মানুষগুলোকে জানা নেই, চেনা নেই; অথচ কী অদ্ভুত এক টানে তারা একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে যেত; স্রেফ কয়েক ছত্র কালির আঁচড়ে। ভূমিকাহীন, অচেনা এক গন্তব্যের উদ্দেশে অপরিচিত কাউকে প্রথম চিঠি-
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
আপনার নামটা কাগজের পাতায় দেখে কলম ধরলাম। স্নিগ্ধ ও শান্ত প্রকৃতির এক মায়াজালে বুনে চলা শরতের কাশফুলেরা ফুটতে শুরু করেছে। দেখে যেন মনে হয়, যুগ থেকে যুগান্তরে তারা একে অন্যের মিতালী। নদীর ধার কিংবা মোহনায় স্নিগ্ধতা ছড়ানো শরৎ আর কাশফুলের সেই মেলবন্ধন, কাশবনের ওপর দিয়ে বয়ে চলা দোদুল্যমান হাওয়া—সেই হাওয়া কি কখনো আপনার গায়েও এসে লাগে?
ব্যস, ওইটুকুই।
তারপর শুরু হতো চাতক পাখির মতো এক অনন্ত প্রতীক্ষার প্রহর গোনার পালা। কখন ডাকপিয়ন আসবে, সাইকেলের ঘণ্টা বাজবে, আর সঙ্গে থাকবে একটি হলুদ খাম! দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস—অবশেষে একদিন ডাকপিয়নের সাইকেল এসে হঠাৎ দরজায়। বুকের ভেতরটায় শুরু হতো এক অদ্ভুত হৃৎস্পন্দন। চিঠি আসা মানে কেবল একটি হলুদ খাম আসা নয়; চিঠি আসা মানে একটি ঘরের আলো-ছায়া, একটি অচেনা মানুষের সুখ-দুঃখের সুবাস এসে পৌঁছানো। সস্তা হলুদ খামের ওপর গোটা গোটা সুন্দর হাতের লেখা, আর ভেতরের জলছাপ মাখানো কাগজে লেখা—
প্রিয়জনেষু,
আপনার চিঠি পেয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। তিস্তা নদীর চর ও মোহনা আমাদের এখান থেকে খুব কাছেই। জানালা খুলতেই শরতের কাশফুল যেন হঠাৎ আমার জানালার পাশে এসে দুলে উঠল, সঙ্গে হিমেল হাওয়াও। নদীর হাওয়ায় কাশফুলের মৃদু দোল দেখেছি অনেকবার, কিন্তু আজ বুঝলাম—দূরের কোনো অচেনা মন থেকেও এমন হাওয়া এসে ছুঁয়ে যেতে পারে। আপনার প্রশ্নের উত্তর—হ্যাঁ, সেই হাওয়া আমার গায়েও লাগে। তবে আজকের হাওয়ায় যেন নতুন এক মায়া মিশে আছে। অচেনা হয়েও এমন আপন করে চিঠি লেখার জন্য কৃতজ্ঞতা।
চিঠির এই আদান-প্রদান কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে কেন্দ্র করে ছিল না; এ যেন ছিল পুরো একটি প্রজন্মের গল্প। জীবন-পরিসরে এ ছিল জানা-অজানা এক মান-অভিমানের গল্প। কার পত্রমিত্র কত দ্রুত উত্তর দিতে পারে, তা ছিল এক অপরিমেয় প্রতিযোগিতার অংশ। মাস যায়, বছর ঘুরে; খামের স্তূপ আর চিঠিগুলো যেন চোখের আঙিনায় স্মৃতির সুবাস ছড়ায়। অথচ কেউ কাউকে কোনোদিন দেখেনি, কিংবা দেখার ব্যাকুলতাও কারও হৃদয়কে স্পর্শ করেনি। মানুষের অবয়বের চেয়ে মানুষের ভেতরের মনটাই কাগজের পাতায় বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠত। একজনের চোখের জল অন্যজনের কাগজের পাতায় এসে শুকিয়ে যেত। পত্রমিতালী আসলে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের একান্ত অপেক্ষার প্রতিফলন-বিনিসুতোর মালায় গাঁথা এক আবেগময় বন্ধনের নাম।
নব্বই দশক শেষের দিকে এগোচ্ছে। হঠাৎ চিঠি আসাও বন্ধ। বাতাসে তখন এক নতুন প্রযুক্তির গন্ধ। ল্যান্ডলাইন ফোনের টুংটাং আওয়াজ আর পেজারের আগমনী বার্তা পুরোনো চিঠির বাক্সগুলোকে কেমন যেন একাকী করে দিচ্ছিল। শেষ চিঠিটা ১৯৯৫-এর বর্ষায় লেখা হয়েছিল—
“প্রিয়া, কেমন আছ? অনেক দিন খবর নেই। আমাদের শহরের আকাশটা এখন বড্ড ধূসর হয়ে গেছে।”
সেই চিঠির কোনো উত্তর আর আসেনি। হয়তো প্রিয়ার বিয়ে হয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে, কিংবা ব্যস্ততার নতুন কোনো ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে গেছে সেই হলুদ খামগুলোর গন্ধ।
আজ, ২০২৬-এর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, আলমারির একদম নিচের তাকটা খুলতেই এক নিমেষে ঘরটা ভরে গেল তিরিশ বছর পুরোনো শুকনো কাগজের ঘ্রাণে। ভেতরে সাজানো গুচ্ছ গুচ্ছ হলুদ আর নীল খাম। কালির রং চটে গেছে, কাগজটাও জীর্ণ। কিন্তু লেখাগুলো ছুঁতেই মনে হলো—ফিরে গেছি সেই তেইশ বছরের তারুণ্যের দিনগুলোয়; সেই বিকেলবেলায়, যখন ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার অপেক্ষায় জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল এক অদ্ভুত আনন্দ। পত্রমিতালী আসলে কোনো মানুষের সঙ্গে মানুষের শুধু যোগাযোগ ছিল না; ওটা ছিল এক টুকরো অপেক্ষার নাম, এক ফোঁটা শুদ্ধ আবেগের নাম।
যে আবেগ আজকের দ্রুতগতির ই-মেইল আর মেসেঞ্জারের যুগে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তবু সেই পুরোনো হলুদ খামগুলোর ভাঁজে ভাঁজে আজও বেঁচে আছে কিছু স্মৃতিময় গল্প, কিছু না-বলা অনুভূতি—আর বেঁচে আছে একটি আস্ত দশকের ইতিহাস।