অশ্রুকে দেখো, চোখে তার আশ্রয় মেলেনি। হাসতে শেখো- তবেই দুনিয়া তোমাকে গ্রহণ করবে। আসলে, এই ধরণী বড় বিচিত্র এক নাট্যশালা। শরতের ক্লান্ত এক শেষ বিকেল যখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, তখন বুকের ভেতর জমে থাকা একাকীত্বগুলো কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে। চারপাশের চেনা ঘর, দেয়ালের ওই নিস্তব্ধতা কিংবা রাস্তার পরিচিত কোলাহল—সবকিছুই তখন এক অচেনা মরুভূমির মতো মনে হয়। জীবনের কোনো এক মোড়ে এসে মনে হয়, চারপাশের এই বিশাল চেনা জগৎ আচমকা এক গভীর পরবাসী করে তুলেছে। যেখানে নিজের সত্তা এক বুক বিষাদ আর চোখের জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু এই ব্যস্ত দুনিয়া তার দিকে ফিরেও তাকায় না।
পৃথিবী বড়ই এক অদ্ভুত ও নির্মম নিয়মে ঘূর্ণায়মান। মানুষ যখন তার নিজের বিষাদের কুয়াশায় বন্দি হয়ে পড়ে, তখন সে আলোকময় হতে ক্রমশ দূরে সরে যায়। চোখের কোণে টলমল করতে থাকা এক ফোঁটা অশ্রুকে তখন জীবনের একমাত্র চরম সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু একটু নিবিড়ভাবে তাকালেই দেখা যায়, সেই অশ্রুরও নিজস্ব কোনো স্থায়ী বসতি নেই। অশ্রুকে দেখো, চোখে তার আশ্রয় মেলেনি। যে চোখের গভীরে তার জন্ম, সেই চোখই তাকে পরম যত্নে ধরে রাখতে পারে নি; সময়ের নিয়মে তাকে ঝরে পড়তেই হয়। নিজের আপন চোখই যাকে চিরন্তন আশ্রয় দিতে কুণ্ঠিত, এই গতিময় ও নির্মম পৃথিবী তাকে কীভাবে বুকে টেনে নেবে?
ঠিক এই চরম সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন এক মুহূর্তের নীরবতা। হয়তো কোনো এক শরতের সকালে শিউলি ঝরার শব্দে, কিংবা পথের ধারে কোনো এক ধূসর শিশুর অমলিন ও স্বর্গীয় হাসির আলোয় এই বোধ প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠে। প্রিয় কোনো খেলনা ভেঙে যাওয়া বা মহামূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলার পরেও যখন কেউ এক চিলতে অমলিন হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে দেয়, তখন হৃদয়ের স্পন্দন থমকে দাঁড়ায়। মনকে তখন প্রশ্ন করতে হয়—যা হারিয়ে গেছে তা তো মহাকালের গর্ভে বিলীন, তবে বর্তমানের এই সোনালী মুহূর্তকে কেন কান্নায় মলিন করো? ঠিক তখনই চেতনার গহীন অরণ্যে এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে। চোখের সেই অবাধ্য, মরীচিকা সম জলটুকু মুছে ফেলে যখন ওষ্ঠাধরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটিয়ে তোলা যায়, তখন অলৌকিকভাবেই যেন চারপাশের বিবর্ণ পৃথিবীটা এক মায়াবী ক্যানভাসে রূপ নেয়। নিজের মনের ভেতরের সেই অন্ধকারের পাষাণ দেয়ালগুলো এক নিমেষে ভেঙে পড়ে।
বাস্তবতায় দেখো, যে পৃথিবী এতক্ষণ মুখ ফিরিয়ে নিরাসক্ত ছিল, সে-ই আবার দু-হাত বাড়িয়ে সাদরে বরণ করে নিচ্ছে। পত্রপল্লবের মর্মর ধ্বনি, অচেনা পথিকের স্মিত চাহনি কিংবা দখিনা বাতাসের এক ঝলক কোমল স্পর্শ-সবকিছুই তখন এক নতুন জীবনের সুচনা করে। এই সত্যটি তখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই জগৎ আসলে এক অতল দর্পণ। এখানে বিষণ্ণ মুখের ছায়া ফেললে চারপাশটাই অমাবস্যার মতো অন্ধকার মনে হয়, কিন্তু মন থেকে একবার হাসতে পারলে পুরো সৃষ্টি সেই হাসির সুরকে প্রতিধ্বনিত করে বা স্বাগত জানায়।
তাই নিজের দুঃখের বোঝা একাকী বয়ে বেড়ানোর চেয়ে, হাসির আলোয় নিজেকে সুরভিত করাই শ্রেয়। হাসতে শেখো- তবেই দুনিয়া তোমাকে সাদরে গ্রহণ করবে। চোখের জলকে চিরবিদায় দিয়ে, অতীতকে স্মৃতির পাতায় বন্দি করে, হাসিকে জীবনের ধ্রুবতারা করে নেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার আসল সার্থকতা। যখনই এই শাশ্বত সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করা যায়, তখনই এক নতুন ভোরের উদয় হয়, যেখানে আর কোনো অশ্রুর দীর্ঘশ্বাস থাকে না, থাকে কেবল এক বুক আলো আর বেঁচে থাকার এক অদম্য, অনাবিল আনন্দ।
মোঃ আবু হানিফ
০৪ আশ্বিন ১৪৩৩
83
View