
কখনো কখনো মানুষকে শুধু একটু থামতে হয়। যান্ত্রিক শহুরে অনুভবের স্তব্ধ অনুভূতিগুলোকে কখনো কখনো আকাশ ছুঁয়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় ডানা মেলে উড়তে দিতে হয়। পৃথিবীটা এখনো সুন্দর, আকাশ নীল, পাখিরা উড়ে, বাগানে ফুল ফোটে আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস মানুষকে বাঁচতে শেখায়। আর জীবন— ভীষণ মায়াময়। এখনো প্রতিদিন ভোর হয়, গোধূলির আকাশে সূর্য, রাতের আকাশে চাঁদের আলোর আলৌকিক স্নিগ্ধতা, প্রকৃতির নিঃশব্দ ভালবাসা এ যেন এক পরম মিতালী।
কখনো কখনো মানুষ এই নগরায়নের যান্ত্রিক শহরে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এ যেন শরীরের ভারে ক্লান্ত নয়—অদম্য এক মনের ভারে। সেই ক্লান্তির কোনো শব্দ নেই, দৃশ্যমান কোনো চিহ্নও নেই। অথচ বুকের ভেতর কোথাও যেন নিরন্তর বৃষ্টি নামে, কত না-পাওয়া, কত অপূর্ণতা, কত ব্যর্থতা আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন- সবকিছু জমতে জমতে একসময় মন ভারী হয়ে ওঠে। তখন ইচ্ছে করে আকাশে ডানা মেলে দূর সীমানায় একটু পাড়ি দিতে। যেখানে থাকবে না মানুষের কোলাহল, ব্যস্ততার হিসাব, এমনকি নিজের কাছ থেকেও। ঠিক তখনই প্রকৃতি নিঃশব্দে কাছে এসে দাঁড়ায়। কোনো প্রশ্ন করে না, এমন কি সান্ত্বনার ভাষণও দেয় না। শুধু তার বিশাল বুকটা মেলে ধরে, এ যেন অচেনা আরেক মিতালী।
ভোরের পৃথিবী যেন প্রকৃতির এক কোমল মুখ। রাতের অন্ধকার পুরোপুরি সরে যায়নি, অস্পষ্ট রেখা। পূর্ব আকাশে ক্ষীণ আলোর রেখা ফুটে উঠেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করে। প্রকৃতির অপার মায়ায় কুয়াশাচ্ছন্ন শিশিরে শিউলী - বকুলেরা মৌ মৌ গন্ধে খেলা করে। শিশিরের এত ছোট্ট জলকণা—অথচ তার ভেতরেও যেন পুরো আকাশের প্রতিবিম্ব! হয়তো জীবনটাও এমন।
যান্ত্রিক নগরায়নে একটু থামা প্রয়োজন! অনুভবের অনুভূতি দিয়ে বাতাসের মৃদু স্পর্শ, দূরের কোনো পাখির ডাক, নদীর জলে ভেঙে পড়া সূর্যের আলো, অচেনা কোনো বুনোফুলের নিঃশব্দে ফুটে থাকা, কিংবা বৃষ্টির প্রথম ফোঁটায় মাটির বুক থেকে উঠে আসা সেই চিরচেনা গন্ধ; এ যেন এক অচেনা অনুভূতি। প্রকৃতি কখনো জিজ্ঞেস করে না—তুমি সফল কি ব্যর্থ। সে ব্যর্থ মানুষকেও ছায়া দেয়, ক্লান্ত মানুষকেও বাতাস দেয়, নিঃস্ব মানুষকেও তার সবুজের মধ্যে বসার জায়গা করে দেয়। একটি গাছ কখনো অন্য গাছের দিকে তাকিয়ে ভাবে না—“সে আমার চেয়ে বড় কেন?” একটি নদী অন্য নদীর কাছে গিয়ে বলে না—“তোমার জল আমার চেয়ে বেশি কেন?” একটি ফুলও ফুটে ওঠার আগে কাউকে জিজ্ঞেস করে না—“আমার সৌন্দর্য কে দেখবে?”সে শুধু ফোটে, নীরব- নিভৃত্তে; নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার জন্যে। হয়তো এটাই প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শিক্ষা- সুন্দর হওয়ার জন্য দর্শকের প্রয়োজন নেই।
অথচ, মানুষ কত অদ্ভুত! নিজের সুখের জন্য অন্যের স্বীকৃতি খোঁজে। কে কি বলল, কে কতটা এগিয়ে গেল, কার জীবন কতটা সুন্দর—এইসব হিসাব করতে করতে একসময় নিজের জীবনের সৌন্দর্যটাই ভুলে যায়। প্রকৃতি এসব জানে না। সে শুধু নিজের নিয়মে বেঁচে থাকে। আর সেই বেঁচে থাকাতেই তার সৌন্দর্য। শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকেও একদিন বর্ষার জল ফিরে আসে। ঝরে যাওয়া পাতার পরেই জন্ম নেয় নতুন কুঁড়ি। নিঃস্ব বৃক্ষের ডালেও একদিন সবুজের উৎসব নামে। অন্ধকার রাতেও তারকারা জেগে থাকে, সূর্যতো কখনো ভুল করে না, সবই যেন কোন না কোন নিয়মের নিয়তিতে অধরা এক প্রকৃতির অপরূপ। প্রকৃতি প্রতিদিন তার নীরব ভাষায় এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়। শুধু শুনতে হয়, শুনার জন্য মন- মানসিকতাও তৈরী করতে হয়।
তবুও জীবন সুন্দর। কারণ অসম্পূর্ণতার মধ্যেও সৌন্দর্য থাকে। কিছু মানুষ চলে যায়, কিছু সম্পর্ক হারিয়ে যায়, কিছু স্বপ্ন মরে যায়—তবুও আকাশ তার নীল রং হারায় না। ফুল ফোটা বন্ধ করে না। নদী বয়ে চলা থামায় না। প্রকৃতি কাউকে ধরে রাখে না। সবই নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। তবুও পৃথিবীর সৌন্দর্য থেমে থাকে না। তাই কোনো এক বিষণ্ণ সকালে যদি মনটা খুব ভারী হয়ে আসে, একটু বাইরে বেরিয়ে এসো। কোনো গন্তব্যের প্রয়োজন নেই। ভেজা ঘাসের ওপর পা রাখো। আকাশের দিকে তাকাও। গাছে গাছে পাতার মিতালী শব্দ শোনো। বাতাসকে মুখ ছুঁতে দাও। দৃষ্টি মেলে প্রকৃতির দিকে তাকাও আর তোমার একটু দীর্ঘশ্বাস তোমায় সজীবতা এনে দিবে অন্তত এই যান্ত্রিক নগরায়ন থেকে।
প্রকৃতি প্রতিদিন নিঃশব্দে তার স্নিগ্ধতার ঢালি সাজিয়ে রাখে, শুধু আমাদের একটু থামতে হয়। একটু নীরব হতে হয়। আর অনুভব করতে হয়- পৃথিবীটা এখনো সুন্দর। জীবনটা এখনো মায়াময়। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা এখনো ক্লান্ত মানুষের হৃদয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন জাগায়।
--মোঃ আবু হানিফ--
১৪ই ভাদ্র ১৪৩৩