
এ জীবন কেন এত রঙ বদলায়? এই গল্প কোনো একজন মানুষের নয়। এটি আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর একটি জীবন্ত গল্প। এটি সেই সব মানুষের গল্প, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সমাজ ও সংসারে বিলিয়ে দিয়ে একসময় নিঃস্ব ও নিপীড়িত হয়ে আপন মানুষের কাছ থেকে বিতারিত হয়ে একাকীত্বের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মানুষের জীবনে সবচেয়ে আপন কারা? যাদের জন্য একজন মানুষ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে, তারা? না কি, যারা বিপদের সময় নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই জীবনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একজন মানুষ জীবনের সিংহভাগ সময় প্রবাসে কাটিয়েছিলেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি নিজের জীবন, যৌবন, স্বপ্ন, আনন্দ সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন। প্রখর রোদ, ক্লান্তিকর শ্রম আর হাজারো কষ্টের বিনিময়ে উপার্জিত প্রতিটি অর্থ তিনি তুলে দিয়েছিলেন পরিবারের হাতে। ভেবেও ছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে ও সন্তানগণ মানুষ হবে, সেই আশাও আজ অনেকটাই গুড়ে বালি। বছরের পর বছর তিনি ভেবেছিলেন, এটাই তো জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। পরিবার ভালো থাকলেই তিনি ভালো থাকবেন ও সুখে থাকবেন।
কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ যে এক অদেখা ভূবন, অন্ধকারে নিমজ্জিত। দেখা যায় না, আবার ছুঁয়াও যায় না। নিয়তি কখন কার জীবনে কোন অধ্যায় লিখে রাখে, তা যেন অনেকটাই অধরা। যে মানুষটি একসময় স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য বিদেশ বিভূঁইয়ে নিরন্তর সংগ্রাম করেছিলেন আজ তিনি নিজেই হয়ে গেলেন নিঃস্ব- সহায়সম্বলহীন এক বাস্তুহারা। দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে গ্রাস করল। স্ত্রী, সন্তান তার সকল সহায় সম্পদ কেড়ে নিয়ে রাতের আধাঁরে রাস্তায় ফেলে গেল, এ যেন এক অন্ধকার অমানিশার গল্প। হায়রে নিয়তি! এটাই কি ছিল তার প্রাপ্যতা? অসুস্থ শরীর নিয়ে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটু স্নেহ, একটু যত্ন আর প্রিয়জনের সান্নিধ্য। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তিনি উপলব্দি করলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়, অভাব হলো ভালোবাসা আর হৃদ্যতার।
গভীর রাত। চারদিকে নীরবতা। অন্ধকারে ঢাকা জনপদ। সেই রাতেই জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনার শিকার হলেন তিনি। যাদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই আপন মানুষেরাই তাঁকে পথের ধারে ফেলে রেখে চলে গেল। কতটা অসহায় হলে একজন মানুষ রাতের আঁধারে রাস্তার পাশে পড়ে থাকেন? কতটা কষ্ট হলে তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর জীবনের সমস্ত ত্যাগ হয়তো মূল্যহীন হয়ে গেছে? তিনি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছিলেন জীবনের শেষ অধ্যায়ের বা হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, কেউ একজন ফিরে আসবে। কেউ এসে বলবে, ‘চলো, তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাই।’ কিন্তু কেউজ ফিরে আসেনি। অথচ পৃথিবীটা এখনো পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি। কিছু অচেনা মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের কিছু মানুষ তাঁকে উদ্ধার ও সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। রক্তের সম্পর্ক যেখানে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে মানবতার সম্পর্ক জয়ী হয়েছিল। মানবতা আজো বেঁচে আছে বলেই চোখের অশ্রুরা কথা বলে। দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে এক বিকেলে তিনি পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট, মান-অভিমান আর অপেক্ষার প্রহর গুনে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে জীবনের শেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটালেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আপনজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু তার স্ত্রী, সন্তানরা আসেনি; কি এমন হয়েছিল, শেষবারের মতো তাঁর মুখটি দেখার প্রয়োজনও কেউ অনুভব করেনি। সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়ার আগেই কিছু স্বজন, প্রতিবেশী আর গ্রামের মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে মাটির বুকে শায়িত করা হলো। জীবনের শেষ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিল না প্রবাসের উপার্জিত অর্থ, ছিল না কোনো ব্যাংক হিসাব, ছিল না কোনো সম্পদের অহংকার। ছিল শুধু একটি কাফনের কাপড় আর কয়েকজন মানুষের চোখের জল।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য সম্ভবত এটিই; অর্থ মানুষকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা কিনে দিতে পারে না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সম্পদের হিসাব খোঁজে না; খোঁজে একটি পরিচিত ও আত্মবিশ্বাসী হাত, একটি স্নেহভরা স্পর্শ ও একটি আশ্বাসের বাক্য। হয়তো এই গল্প আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে। কারণ নিয়তির সবচেয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস হলো, মানুষ অনেক সময় নিজের সবকিছু উজাড় করে দেয় সেই মানুষগুলোর জন্য, যারা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাকে চিনতেও চায় না। তবুও পৃথিবী টিকে আছে কিছু মানবিক মানুষের জন্য, যারা রক্তের সম্পর্ক না হয়েও বিপদের সময় হাত বাড়িয়ে দেয়। হায়রে নিয়তি! মানুষকে তুমি কত বিচিত্র শিক্ষা দাও!
মানুষ কি শুধু অর্থের জন্য প্রিয় হয়ে ওঠে? নাকি ভালোবাসাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়? যদি ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়, তাহলে অর্থ ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কগুলো কেন এত দ্রুত বদলায়???
-- মোঃ আবু হানিফ --
০৬ ভাদ্র ১৪৩৩