
বাবা আজ বেঁচে নেই। সময় বহমান, ঘূর্ণায়নের চাকায় কেমন যেন সব অতীত। সেই এক অজপাড়া গাঁয়ে নানুবাড়ীর স্কুলঘর মাঠে বাবা ফুটবল খেলা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। শৈশবের সেই প্রশ্নবিদ্ধ চোখ দুটো খুঁজে বেড়াতো চতুরতা আর চঞ্চলতা। চঞ্চলতায় চোখ দুটি খেলায় যতটা মুগ্ধ হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি থমকে গিয়েছিল সুভাস ছড়ানো এক সৌরভময়ী ফুল বকুলের গাছে। চারদিকে ঝরে ছিল অসংখ্য সুভাষমাখা সাদা ফুল। বাতাস যেন তাদের সুবাসে ভরে উঠেছিল চারিদিক। আমি কৌতূহলী হয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসায় বাবা মৃদু হেসে বলেছিলেন, বকুলের কথা। সেই বকুল আজও চিরচেনায় মনের অজান্তেই কেমন যেন সৌরভ ছড়িয়ে বেড়ায়। অথচ সময় অতীত; বাবাও বেঁচে নেই, বেঁচে আছে বাবার হাতের ছোঁয়ায় বকুল কুড়িয়ে পাওয়ার রোমন্থর স্মৃতিময় অতীতের আনন্দ।
কেন এমন বিধাতার নিয়মের নিষ্ঠুরতা? ফুটে, ঝড়ে, সুভাষ ও মায়ায়ও ছড়ায় চারিদিকে। সেই ঝড়া ফুল কখনও মালায়, কখনোবা পুজোঁয় আলোক ছড়ায়। এই ছোট্ট জীবন পরিসরে দেশ-দেশান্তরের পথে প্রান্তরে অনেক পথ হেঁটেছি ও মারিয়েছি অসংখ্য বকুলের সুভাষিত জীবন। নিজের বিবেকের কাছে দংশিতও হয়েছি বারংবার। তবু জিজ্ঞাসা;
" কত ফুল ফুটে আর ঝরে,
সব ফুল কি মালা হতে পারে?"

সময়ের ঘূর্ণায়ন চাকায় শহরের ব্যস্ত রাজপথ, ঘরে ফেরার তাড়া। সবাই মোবাইল ফোনের স্কিন নিয়ে ব্যস্ত, এই শহুরে যেন কেউ কারো নয়। ভাবছি; ঠিক তখনই কানে এলো একটি অতি মৃদু ও স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর—
"স্যার, একটা মালা নিয়ে যান; 'বকুল ফুলের মালা'।"
মেয়েটার কত সদয় চাহনি ও আকুতি! পরনে মলিন পোশাক হলেও তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত মায়া আর আকুলতা। তার বাড়িয়ে দেওয়া ছোট্ট হাতেই শোভা পাচ্ছিল সদ্য গাঁথা কতগুলো বকুল ফুলের মালা। ম্মৃতির কোলাহলে এ যেন কেবল সুতোয় গাঁথা কিছু ফুল নয়; এ তো বিধাতার নিজের হাতের এক অপরূপ সৃষ্টির খেলা! অতি সাধারণ কিছু অবোধ ফুলকে এক বিনীসুতোয় বেঁধে মেয়েটি যেন তৈরী করেছে শিল্পীর আছড়ে আকাঁ এক অনবদ্য সম্পর্কের শৈল্পিক ছবি। ফুলের পবিত্র শুভ্রতা আর মেয়েটির চোখের সরলতা মিলেমিশে যেন একাকার। মেয়েটির হাতে বিনিময় গুঁজে দিয়ে মালাটা হাতে নিলাম, মেয়েটির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে স্বর্গীয় হাসি। সেই হাসির আলোয় বকুল ফুলের সুবাস যেন আরও তীব্র হয়ে চারপাশের বাতাসকে সিক্ত করে তুলেছিল। আসলেই বিধাতার সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যের খেলায় এক বিনীসুতার গাঁথা মালায় সৃজিত হয়েছে সম্পর্ক, ছড়িয়েছে সুভাষ ও জীবিকা আর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম অতীতের কিছু স্মৃতিচারণ।
মেঠো পথের বাঁকে আর শহরের পথে প্রান্তরে সবুজের সমারোহে বকুলের দেখা অনেকটাই বিরহের মতো। শহরায়নের ছোঁয়ায় বকুল আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। তবু আজও দাঁড়িয়ে থাকা এক একটা বকুল যেন মনে হয় নীরব প্রাচীন গল্প। যুগের পর যুগ সে শুধু ঝরেই পড়েছে। তার ডালপালা থেকে খসে পড়া প্রতিটি শুভ্র ফুল যেন একেকটি অলিখিত চিঠির গল্প, যা মাটিতে মিশে যাওয়ার আগে বাতাসের বুকে নিজের অস্তিত্বের কথা বলে যায়। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও ফুরিয়ে যায় না তার রূপ ও সৌন্দর্য। ভোরবেলা শিশিরভেজা ঘাসের ওপর বা সন্ধ্যা-বিকেলে বকুলেরা একে একে মায়াবী রূপে ধরা দেয় ঝরে পড়া বকুল কুড়ানোর এক নস্টালজিয়া শৈশবকালীন স্মৃতির গল্প।
শুকিয়ে যাওয়া বকুল যেন স্বর্গীয় এক স্মৃতির প্রতীক। তার তামাটে রঙ ও কুঁকড়ানো পাপড়িগুলো থেকে বুক চিরে বের হয়ে আসে এক তীব্র ও মায়াবী সুবাস। এই সুবাস কোনো উগ্রতা ছড়ায় না, বরং মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো পুরোনো নস্টালজিয়াকে জাগিয়ে তোলে। মনে হয়, কোনো এক যুগে কোনো এক মেঘলা দুপুর, কোনো এক চেনা হাতের স্পর্শ, কিংবা ডায়েরির পাতায় লুকিয়ে রাখা কোনো এক গোপন দীর্ঘশ্বাস—সবকিছুকে যেন এক নিমেষে জীবন্ত করে তোলে এই বাসি বকুলের গন্ধ। সময়ে নিয়মের বদল হয়, মানুষ আসে, আবার চলেও যায়। ঝরে পড়া কোনো পরাজয় নয়, এ হলো নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক চরম সার্থকতা। পৃথিবীর সব গল্প শেষ হয়ে গেলেও, শুকনো বকুলের গন্ধ হৃদয় থেকে কখনো শুকায় না। সে ধূলিকণায় মিশে গিয়েও ফিসফিসিয়ে বলে যায়—কিছু হারিয়ে যাওয়া আসলে হারিয়ে যাওয়া নয়, তা হলো অনন্তকাল ধরে কারও হৃদয়ে সুবাস হয়ে বেঁচে থাকা।
মোঃ আবু হানিফ
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩