Posts

চিন্তা

হামুদুর রহমান কমিশন ও শেখ মুজিবের মেজর জিয়া!

August 16, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

36
View

হামুদুর রহমান কমিশন ছিল পাকিস্তান সরকারের গঠিত একটি তদন্ত কমিশন, যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল War Inquiry Commission। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানের পরাজয়, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের কারণ অনুসন্ধান করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করার পর পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে -কীভাবে পাকিস্তান এত বড় সামরিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ল? এরপর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কমিশনটি গঠন করেন।

কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতিহামুদুর রহমান -তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি। ওই কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে মাত্র।

হামুদুর রহমান কমিশনের মতে, শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধীনতার রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান নেতা ও ১৯৭০-এর নির্বাচনী ম্যান্ডেটের অধিকারী; আর জিয়াউর রহমান ছিলেন সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সামরিক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডারদের একজন। কমিশনের মূল দায় নির্ধারণের জায়গায় জিয়াকে পাকিস্তান ভাঙার রাজনৈতিক হোতা হিসেবে দাঁড় করানো হয়নি; বরং কমিশনের অনুসন্ধানের বড় অংশই দেখায় কীভাবে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত করে।

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের দুটি বেসিক পার্থক্য আছে। হাসিনা নিজের পিতাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের একমাত্র নেতা বানাতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়ার সামরিক ভূমিকা এবং শেখ মুজিবের পক্ষে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণাকে টোটালই অস্বীকার করেছে। কিন্তু শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান খুব ভালোভাবেই স্বীকার করেছে -এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।

এর সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ হলো স্বাধীন বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু সরকারের সরকারি গেজেট। ১৩ মে ১৯৭২-এর বাংলাদেশের গেজেট অনুযায়ী তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর Temporary Deputy Chief of Staff হিসেবে নিয়োগ দেয় মুজিব সরকার। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ই তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো -১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে “বীর উত্তম” খেতাব প্রদান করে। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। প্রথম আলো-র ঐতিহাসিক পর্যালোচনাতেও উল্লেখ আছে -১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ৪৯ জন যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাকে বীর উত্তম পদকে ভূষিত করে, তাঁদের মধ্যে জিয়াউর রহমানও ছিলেন।

এমনকি সরকারি গেজেটের পরবর্তী নথিতে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে জিয়াউর রহমানকে মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। বুঝাই যায় শেখ হাসিনা সুস্পষ্টভাবে তার পিতার সিদ্ধান্তের অবমাননা করেছেন। মেজর জিয়াকে আন্ডারমাইন করতে গিয়ে নিজেকে অসত্যের ধ্বজাধারী হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

এছাড়া সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসচর্চায় জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এখনও উল্লেখ আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, জিয়া মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন -উভয় পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; তিনি প্রথম সেক্টরের কমান্ডার এবং পরে Z Force-এর প্রধান ছিলেন।

বিতর্কটা আসলে অন্য জায়গায় -জিয়ার ২৭ মার্চের বেতার ঘোষণা কি তাঁকে 'স্বাধীনতার ঘোষক' বানায়, নাকি তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাই প্রচার করেছিলেন? এই প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক বয়ান পরস্পরবিরোধী। এই জায়গাটিতে যদি আ.লীগ ও বিএনপি ঐকতান রচনা করতে পারত -রাজনৈতিক বিসংবাদে পড়ে বাংলাদেশিদের দুর্দশা অনেকখানি কমত।

আর একটি চমৎকার দলিল আছে: জিয়ার নিজের লেখা 'একটি জাতির জন্ম' ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চদৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল -অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়েই তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকা নিয়ে তাঁর লেখা প্রকাশ্যে আসে। যেখানে তিনি আ.লীগের স্বাধীনতা আন্দোলনকে অকুণ্ঠচিত্তে প্রশংসা করেছেন -সংহতি জানিয়েছেন। এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন খোদ মেজর জিয়া।

সুতরাং ইতিহাসের দলিলভিত্তিক অবস্থান হলো: বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং জিয়ার সামরিক অবদান -দুটিই ১৯৭১-এর ইতিহাসের অংশ। একটিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে মুছে ফেলার চেষ্টা দলিলসম্মত নয়।

২৫ মার্চে গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সাথে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন শেখ মুজিব। কিন্তু সেই কথোপকথন ছিল মূলত রাজনৈতিক সমাধান, ক্ষমতা হস্তান্তর ও সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার নিয়ে; যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নয়। হামুদুর রহমান কমিশনও এই আলোচনার অস্তিত্ব স্বীকার করেছে এবং ইয়াহিয়ার রাজনৈতিক সমাধান ব্যর্থ করার ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছে।

এমন বাস্তবতায় সামরিক বাহিনীর সদস্য মেজর জিয়াউর রহমান মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে তিনি নিজেই একটি সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করাটা মুক্তিযুদ্ধে জোরালো দ্যোতনা সৃষ্টি করেছিল। তার অবদান স্বীকার করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করেছে খোদ শেখ মুজিব। শেখ হাসিনাকে কেন তার পিতার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হলো? একা একজন মানুষ কি রাষ্ট্র উদ্ধার করতে পারে? সহযোগী ও সহযোদ্ধা লাগে না? মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়া শেখ মুজিবের শ্রেষ্ঠতম সহচর।

লেখক: সাংবাদিক 
১৫ আগস্ট ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login