বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং এগিয়ে নেয়ার দায় ভারতেরই বেশি। কারণ ভারত স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাদের দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দিচ্ছে। এবং ওই হাসিনার প্রধানতম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। যাদেরকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এড়িয়ে হাসিনা সরকার অন্তত তিনবার নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশের আদালতে শেখ হাসিনা এখন পলাতক আসামি। সুতরাং হাসিনা বাংলাদেশের আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন কিনা, ভারতে বসে বর্তমান সরকারবিরোধী রাজনীতি করবার সুযোগ দেয়া হবে কিনা -মূলত এসব বিষয় নিষ্পত্তির ওপর ঝুলে পড়েছে তারেক রহমানের ভারত সফর।
তারেক রহমানকে প্রথমে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানায় সেদেশের সরকার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিনন্দন জানিয়ে তাঁকে পরিবারসহ সুবিধাজনক সময়ে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। সে সময় আমন্ত্রণটির মূল প্রেক্ষাপট ছিল নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া।
এরপর দ্বিতীয়বার ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায় দুটি প্রসঙ্গে: -দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর; ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত ও স্বাভাবিক করার জন্য সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। পাশাপাশি দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় BRICS সম্মেলনের Outreach অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিজেই এ কথা জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে ওই আমন্ত্রণের কথা জানান।
এই আলোচনার মধ্যেই গেল ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে দিল্লিতে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। এর ফলে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন করে তৈরি হয় টানাপোড়েন।
পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ অন্য সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অব্যাহত রাখা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
প্রথম আলো জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য ভারতের কাছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠাতে এবং শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
আজ রোববার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এ মন্তব্য করেন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা তাঁদের (ভারতের) জবাবের অপেক্ষায় রয়েছি।’
এ কে এম শহীদুল করিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তিনি বলেন, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে।
তারপরও আমরা ধারণা করি শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান হয়ত ভারত সফরে যাবেন। এর কারণ হলো, দুপক্ষই সম্পর্ক ছিন্ন করবার অবস্থায় নেই। ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, আর ঢাকারও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কূটনীতির কারণে যোগাযোগ দরকার। প্রভাবশালী গণমাধ্যম Reuters-ও গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক “reset” করার চেষ্টা চলছে এবং ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করছে।
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত ভারত সফরে যাবেন -তবে সেটি শেখ হাসিনাকে সরাসরি প্রত্যর্পণ করিয়ে তারপর নয়; বরং দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর স্বার্থে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ ও ভারত -উভয় দেশের জন্যই পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখা জরুরি; সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা কোনো দেশই উপেক্ষা করতে পারে না।
ফলে ভারত হয়তো শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করেও তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে সীমিত করার বিষয়ে বাংলাদেশকে দৃশ্যমান নিশ্চয়তা দিতে পারে। আর তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে, দিল্লি সফরের আগে ভারতের তরফ থেকে এমন কিছু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি আদায় করা, যা দেশে ফিরে তিনি বিরোধীদের স্পষ্টভাবে দেখাতে পারেন -এটি কোনো নতজানু সফর নয়, বরং সমমর্যাদার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থভিত্তিক সমঝোতা।
হাসিনাকে ফেরত না পাওয়ার পরও যদি তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা ভারত থেকে অব্যাহত থাকে, তাহলে বিএনপি সরকারের জন্য তা বড় রাজনৈতিক অস্বস্তি হবে; বিপরীতে ভারত যদি হাসিনার প্রত্যর্পণ না করেও তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ রাখে এবং ঢাকার উদ্বেগের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়, তাহলে দুই দেশই মুখ রক্ষা করে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে।
শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বা কার্যক্রম চলতে থাকলে সেটাকে ঢাকার নতুন সরকার নিজেদের জন্য রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছে। এ কারণেই হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে বিএনপি সরকারের তরফে জোরালো নিশ্চয়তার কথাও এসেছে।
যেহেতু ভারত এখন পর্যন্ত হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং তারা বলছে, প্রত্যর্পণ-অনুরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেহেতু এই মুহূর্তে সফরে যাওয়াটা শুধু কূটনৈতিক সফর নয় -বরং তারেক রহমানের জন্য এটা একটা ঘরোয়া রাজনৈতিকভাবে 'symbolic test' হয়ে গেছে। তিনি যদি হাসিনা ভারতে অবস্থানরত থাকা অবস্থায় দিল্লি যান, বিরোধীরা সহজেই বলতে পারবে যে বিএনপি শেষ পর্যন্ত ভারতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। তাই তাঁর সরকারের জন্য সফরের আগে অন্তত দৃশ্যমান কিছু অর্জন দেখানো রাজনৈতিকভাবে জরুরি। এবং এটাই এই মুহূর্তে পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মোদ্দাকথা হলো, হাজারো যদি, কিন্তু, তবে'র পরও হয়ত সফর হবে, কিন্তু এখনই নয় এবং হাসিনাকে হাতে নিয়েও নয় -বরং হাসিনা ইস্যুতে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা তৈরি করেই। বাংলাদেশ খালি হাতে ইনডিয়াকে কিছু দেয়ার অবস্থানে এখন আর নেই।
লেখক: সাংবাদিক
১৬ আগস্ট ২০২৬