ক্লান্তপথের রাস্তার পাশের সব চায়ের দোকানের চা প্রায় একই। এখানে একটা দোকানে থিতু হওয়া একটু মুশকিল। তারপরেও কেমনে জানি সুরুজ মিয়ার দোকানেই নিজেক প্রতিদিন আবিষ্কার করে সোয়েব। মাঝে পতিঝিলের এক দোকানে ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধের কাছে চা আর সিগারেট একসাথে না খেয়ে আলাদা আলাদা সময়ে খেলে বেশিদিন বেচে থাকা যায় এই ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান অর্জন করে সে। এই জ্ঞান সে কাজে লাগায় না।
প্রতিদিন দুইবেলা এই দোকানে আসা হয় সোয়েবের। সুরুজ মিয়ার দোকানে যে সুবিধা হয়েছে তা হলো এই চরম ব্যস্ত সড়কে এত লোকের ভীরেও দূর থেকে সুরুজ মিয়া সোয়েবকে প্রায় আসতে দেখে ফেলে আর চিনি ছাড়া চা বাননো শুরু করে। সোয়েবের টং এর মেনু মুখস্ত হয়ে গেছে সুরুজ মিয়ার৷
এই দোকানে বসেই সোয়েব অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। কিন্তু তার দুই হাতে সিগারেট,চা আর ফোন এই তিন জিনিসের সমন্বয় সে করতে পারে না। হাত তিনটা হলে ভালো হতো মনে হয়।
মাঝে এমন এক ভূমিকম্প লাড়া দিলো যে ক্লান্তপথের লোকেরা বাসে ট্রেনে করে দেশের বাড়ি চলে গেলো। দুইদিন ধরে সুরুজ মিয়ার চায়ের দোকান ফাকা। লোক আসে না, রাস্তায় লোক নাই,গাড়ি নাই। সুরুজ মিয়া এবার সোয়েবরে কইলো ভাই আমি তো ভাবসি আপনিও চইলা গেসেন। এখনও এইহানে আসেন কেন? আপনের কি জীবনের মায়া নাই। সোয়েব কইলো : না নাই। সোয়েব চিন্তা করলো এই সুযোগে সুরুজ মিয়ারে ভূমিকম্প নিয়ে একটু জ্ঞান দিবে। ভাই জানেন ভূমিকম্প কেমনে হয়? সুরুজ মিয়া কইলো আরে রাহেন আপনার ভূমিকম্প। বাড়িত খাওন নাই,ব্যবসা নাই, ট্যাকা নাই এই লেওড়ার ভূমিকম্প নিয়ে জাইনা আমি কি ছিড়মু! আরেকটা চা খাইলে বলেন। সোয়েব বললো হ দেন আরেকটা। আপনারে আর দুই টেকটনিক প্লেটের ভালোবাসা বোঝানো হইলো না।
সেদিন সুরুজ মিয়ারে খুব চিন্তায় দেখা গেলো। সোয়েব জিগাইলো ভাই কি হইসে। সুরুজ কইলো ভাই আমার আব্বা খুব অসুস্থ। অপারেশন করানো লাগবো। আমার কাছে কুনো ট্যাকা নাই। এর মাঝে ধামড়া পার্টি আইসা আমার কাছে ৫০০০ ট্যাকা চায়া গেসে। কইসে না দিলে দোকান করবার দিবো না। কন ভাই আমি কই যামু? বাপের চিকিৎসা করনের লাইগা ৫০০০০ টাকা লাগবো সেইডাও তো নাই। বাপটারে মনে হয় বাচাইতে পারবো না। সোয়েব ভাবলো এইখানে সে আর কি করবে? তার কাছেও তো টাকা নাই। বিড়ি খাওয়ার টাকাও তো হয়না। এই মাসের বেতন ও তো শেষ। নিজেই ধারে চলতেসে। বাসায় গিয়ে এর ওর থেকে হাজার ৫ এক এর মতো টাকা ম্যানেজ করলো। এইটা সুরুজের হাতে দিবে। পরেরদিন চা বিড়ি খেতে গিয়ে দেখে সুরুজ মিয়ার দোকান বন্ধ। আশেপাশের থেকে শুনলো সুরুজ মিয়া ১০০০০ টাকায় দোকান বেচে দিয়ে দেশের বাড়ি চলে গেছে।