গল্প

নাম না জানা অনুভূতি

September 1, 2026

FIJON QURAYSH

Original Author ফিজন কোরাইশ

9
View

 

পর্ব ১: প্রথম পরিচয়

বৃষ্টিভেজা একটি সকাল।

ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আকাশজুড়ে কালো মেঘ, আর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দে চারপাশটা যেন অন্যরকম সুন্দর হয়ে উঠেছিল।

আরিফ জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

আজ তার নতুন স্কুলের প্রথম দিন।

নতুন স্কুল, নতুন ক্লাস, নতুন শিক্ষক—সবকিছুই নতুন। কিন্তু আরিফের মনটা ভালো ছিল না। পুরোনো বন্ধুদের ছেড়ে নতুন জায়গায় আসতে তার একদমই ইচ্ছা করছিল না।

মা দরজার সামনে এসে বললেন,

—আরিফ, আর কতক্ষণ বসে থাকবি? স্কুলে যেতে হবে।

আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—যাচ্ছি মা।

ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

বৃষ্টি তখন একটু কমেছে।

স্কুলে পৌঁছে আরিফ দেখল বিশাল একটা ভবন। চারদিকে অনেক ছাত্রছাত্রী। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, কেউ হাসছে, আবার কেউ ক্লাসে যাওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে।

কিন্তু আরিফ একা।

সে ধীরে ধীরে নিজের ক্লাসরুমে ঢুকল।

শেষের দিকের একটা বেঞ্চে বসতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জানালার পাশে বসে থাকা একটি মেয়ের দিকে তার চোখ গেল।

মেয়েটি বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার সামনে খোলা একটা বই।

মেয়েটির মুখে ছিল শান্ত একটা হাসি।

আরিফ জানত না কেন, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল।

ঠিক তখন শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন।

—সবাই শান্ত হও।

ক্লাসরুম মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল।

শিক্ষক আরিফের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—তুমি নিশ্চয়ই নতুন ছাত্র?

আরিফ মাথা নাড়ল।

—জি, স্যার।

—তোমার নাম?

—আরিফ।

শিক্ষক হাসলেন।

—ঠিক আছে, আরিফ। তুমি ওই খালি সিটে বসো।

আরিফ তাকিয়ে দেখল—

খালি সিটটা সেই মেয়েটির পাশেই।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত লাগল।

সে ধীরে ধীরে গিয়ে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।

তারপর মেয়েটি আস্তে করে বলল,

—তুমি নতুন?

আরিফ তার দিকে তাকাল।

—হ্যাঁ।

—আমি মায়া।

আরিফ একটু হাসল।

—আমি আরিফ।

মায়া বলল,

—জানি। স্যার তো একটু আগেই পুরো ক্লাসকে জানিয়ে দিলেন।

দুজনেই হেসে ফেলল।

সেদিনের সেই ছোট্ট হাসিটাই ছিল তাদের গল্পের শুরু।

দিন যেতে লাগল।

আরিফ ধীরে ধীরে নতুন স্কুলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করল।

আর তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মায়া।

মায়া ছিল খুব সাধারণ একটা মেয়ে।

সে খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু যার সঙ্গে কথা বলত, মন দিয়ে বলত।

পড়াশোনায় ভালো ছিল।

আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত বই পড়তে।

প্রায় প্রতিদিন টিফিনের সময় আরিফ দেখত, মায়া স্কুলের বাগানের এক কোণে বসে বই পড়ছে।

একদিন আরিফ তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

—তুমি সব সময় বই পড়ো কেন?

মায়া বই থেকে চোখ তুলে বলল,

—কারণ বই মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে বাস্তবে যাওয়া সম্ভব নয়।

আরিফ একটু ভেবে বলল,

—তাহলে তুমি এখন কোথায় আছ?

মায়া হেসে বলল,

—একটা গল্পের ভেতরে।

—আর আমি?

—তুমি তো বাস্তবে দাঁড়িয়ে আছ।

আরিফ মজা করে বলল,

—তাহলে আমাকেও গল্পে ঢুকিয়ে নাও।

মায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—দেখা যাবে।

সেই উত্তরটা আরিফ সারা দিন ভুলতে পারেনি।

দিনের পর দিন তাদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হতে লাগল।

একসঙ্গে পড়াশোনা।

একসঙ্গে স্কুলের কাজ করা।

পরীক্ষার আগে একে অপরকে সাহায্য করা।

কখনো ছোটখাটো ঝগড়া।

আবার কিছুক্ষণ পর সব ঠিক হয়ে যাওয়া।

কিন্তু আরিফ ধীরে ধীরে একটা বিষয় বুঝতে শুরু করল।

মায়া শুধু তার বন্ধু নয়।

মায়া তার দিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে।

সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে সে ভাবত—

আজ মায়ার সঙ্গে দেখা হবে।

ক্লাসে ঢুকে প্রথমেই তার চোখ মায়াকে খুঁজত।

মায়া কোনো দিন স্কুলে না এলে পুরো দিনটা কেমন ফাঁকা লাগত।

কিন্তু সে এই অনুভূতির নাম জানত না।

একদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো।

সবাই দৌড়ে বারান্দার নিচে আশ্রয় নিল।

আরিফ আর মায়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।

মায়া হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরার চেষ্টা করছিল।

আরিফ বলল,

—তুমি বৃষ্টি এত পছন্দ করো?

মায়া বলল,

—হ্যাঁ।

—কেন?

মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—বৃষ্টি হলে পৃথিবীটা অন্যরকম হয়ে যায়। মনে হয়, সব দুঃখ ধুয়ে যাচ্ছে।

আরিফ বলল,

—সব দুঃখ কি সত্যিই ধুয়ে যায়?

মায়া ধীরে মাথা নাড়ল।

—না। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় যায়।

আরিফ মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো—

সে চায় মায়ার মুখে সব সময় এমন হাসি থাকুক।

কিন্তু ঠিক তখনই মায়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

আরিফ জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

মায়া দূরের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আরিফ, যদি কোনো দিন আমি হঠাৎ চলে যাই?

আরিফ অবাক হয়ে গেল।

—কোথায় যাবে?

মায়া কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

—তাহলে কি তুমি আমাকে ভুলে যাবে?

আরিফের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

সে দ্রুত বলল,

—না।

মায়া তার দিকে তাকাল।

—এত নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলছ?

আরিফ উত্তর খুঁজে পেল না।

কারণ সে নিজেও জানত না কেন।

কিন্তু তার মন জানত।

সে মায়াকে ভুলতে পারবে না।

মায়া আবার বৃষ্টির দিকে তাকাল।

তার চোখে যেন লুকিয়ে ছিল কোনো অজানা দুঃখ।

আরিফ তখনও জানত না—

খুব শিগগিরই তাদের জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটবে, যা তাদের বন্ধুত্ব এবং অনুভূতি—দুটোকেই কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।

বৃষ্টি আরও জোরে নামতে লাগল।

আর দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো।

মায়া ধীরে বলল,

—আরিফ...

—হুম?

—কিছু মানুষ জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে।

আরিফ মায়ার দিকে তাকাল।

মায়া বলল,

—কিন্তু তারা চলে গেলেও তাদের গল্প শেষ হয় না।

আরিফ কিছু বলল না।

কারণ সে তখনও বুঝতে পারেনি—

মায়া আসলে কী বলতে চাইছে।

কিন্তু সেই দিনটির কথা সে অনেক বছর পরেও ভুলতে পারেনি।

কারণ সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলেই শুরু হয়েছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর...

আর সবচেয়ে কঠিন গল্প।

চলবে... 🌸

Comments

    Please login to post comment. Login